Kojagari Lakshmi Puja, Pair of Hilsa Fish Tradition | কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় জোড়া ইলিশ কেন? জানুন রীতি ও ভোগের বিশেষ রান্না

SHARE:

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ভোগের জন্য তেল-মশলা ছাড়া তৈরি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী জোড়া ইলিশের পাতলা ঝোল

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর (Kojagari Lakshmi Puja) প্রস্তুতি। পদ্মফুল, খই, মুড়কি, নাড়ু আর নারকেলের পাশাপাশি অনেক পরিবারের বাজারের তালিকায় জায়গা করে নেয় দু’টি ইলিশ মাছ। মাছের বাজারে তখন খোঁজ পড়ে সমান মাপের ইলিশের জোড়ার। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গীয় শিকড় রয়েছে এমন কিছু বাঙালি পরিবারে লক্ষ্মীপুজোর ভোগে জোড়া ইলিশ নিবেদনের প্রথা আজও টিকে রয়েছে। কিন্তু কেন লক্ষ্মীদেবীর আরাধনায় এই মাছের জোড়া এত গুরুত্বপূর্ণ? কেনই বা এই ভোগের ইলিশ রান্না করতে ব্যবহার করা হয় না তেল, সর্ষে কিংবা নানা রকম মশলা? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির লোকাচার, পারিবারিক বিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার ঐতিহ্যের মধ্যে।।কোজাগরী পূর্ণিমার (Kojagari Purnima) রাতে ধনসম্পদ, শস্য ও সংসারের মঙ্গল কামনায় লক্ষ্মীদেবীর পুজো করেন বহু বাঙালি।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ভোগের জন্য তেল-মশলা ছাড়া তৈরি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী জোড়া ইলিশের পাতলা ঝোল
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় জোড়া ইলিশ কেন? জানুন রীতি ও ভোগের বিশেষ রান্না। ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী

আরও পড়ুন : Telangana reservoir water levels | তেলঙ্গানায় বৃষ্টির ঘাটতি ৯৫ শতাংশ, শুকোচ্ছে জলাধার, সঙ্কটে কৃষি ও বিদ্যুৎ

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে দেবী জাগ্রত থেকে ভক্তদের ঘরে ঘরে বিচরণ করেন। তাই পুজোর আয়োজনেও থাকে নানা পারিবারিক রীতি। কারও বাড়িতে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ, কোথাও ধানের শিষ ও শস্যের প্রতীকী নিবেদন, আবার কোনও পরিবারে বিশেষ ভোগের আয়োজন। পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য অনুসরণকারী কিছু পরিবারে এই ভোগের অন্যতম উপকরণ জোড়া ইলিশ। যদিও সব বাঙালি পরিবারে এই রীতি নেই, তবু যাঁদের বাড়িতে প্রচলন রয়েছে, তাঁদের কাছে এটি পুজোর আবেগ ও পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিশেষ প্রথা। জোড়া ইলিশ দেওয়ার পিছনে একাধিক লোকবিশ্বাস রয়েছে। ইলিশ মাছ প্রচুর ডিম দেয়। সেই কারণে মাছটিকে অনেকেই প্রজনন, উর্বরতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে যেহেতু শস্য, সমৃদ্ধি এবং সংসারের শ্রীবৃদ্ধির ধারণা জড়িত, তাই ইলিশ নিবেদনকে শুভ বলে মনে করেন কিছু পরিবার। একটি মাছের বদলে জোড়া মাছ দেওয়ার মধ্যে দ্বিগুণ মঙ্গল ও সমৃদ্ধির কামনাও প্রতীকী ভাবে প্রকাশ পায় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যা মূলত আঞ্চলিক রীতি ও পারিবারিক বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত, লক্ষ্মীপুজোর সর্বজনীন বা বাধ্যতামূলক শাস্ত্রীয় বিধান হিসেবে একে দেখা যায় না। কিছু পরিবারে জোড়া ইলিশকে যুগল জীবনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অটুট থাকা, সংসারে শান্তি বজায় থাকা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হওয়ার কামনায় দেবীর সামনে মাছের জোড়া নিবেদন করা হয় বলে প্রচলিত ধারণা। আবার কোথাও জোড়া মাছকে লক্ষ্মী-নারায়ণ কিংবা শিব-পার্বতীর যুগল সত্তার সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত করা হয়। অঞ্চলভেদে এই বিশ্বাসের ধরন আলাদা হতে পারে। ফলে একই রীতির ব্যাখ্যা একেক পরিবারে একেক রকম শোনা যায়। এই বৈচিত্র্যই বাঙালির পুজোকে কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, তাকে পারিবারিক স্মৃতি ও লোকসংস্কৃতির অংশ করে তোলে।

ইলিশের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের মানুষের সম্পর্কও এই প্রথার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে মাছ ছিল দৈনন্দিন খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষাকালে ইলিশের প্রাচুর্য, নদীর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার যোগ ও মাছ ঘিরে নানা উৎসব ও পারিবারিক রীতি একে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। আশ্বিন মাসে ইলিশের মরশুমের শেষ পর্বকে ঘিরেও কিছু পরিবারে মাছ নিবেদনের ঐতিহ্য প্রচলিত আছে। বর্ষা জুড়ে নদী থেকে পাওয়া খাদ্যসম্পদের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাবনাও এই প্রথার সঙ্গে জড়িত বলে অনেকে মনে করেন। তবে সব অঞ্চলে ইলিশের মরশুম বা পুজোর সময় একই রকম না হওয়ায় এই ব্যাখ্যাও মূলত লোকাচারনির্ভর। জোড়া ইলিশ কেনার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবারের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। বাজার থেকে এমন দু’টি মাছ বেছে নেওয়া হয়, যাদের আকার ও ওজন প্রায় সমান। একটি বড় আর অন্যটি অনেক ছোট হলে সেই জোড়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে কোনও কোনও বাড়িতে মনে করা হয়। মাছ কেনার পর পুজোর আগে সেগুলি যত্ন করে রাখা হয়। কোথাও নতুন কাপড়, সিঁদুর, চন্দন, পান-সুপারি দিয়ে মাছ দু’টিকে বরণ করার রীতি রয়েছে। তার পর লক্ষ্মীদেবীর সামনে নিবেদন করা হয়। পুজো শেষ হলে সেই মাছ রান্না করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে ভাগ করে নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন : Laxmipuja : আজ সন্ধেয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। বাংলার ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মীর আরাধনা।

এই রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, কিছু পরিবারে মাছের জোড়াকে একসঙ্গে রান্না করার নিয়ম মানা হয়। একটি মাছ আলাদা করে অন্য কাজে ব্যবহার না করে দু’টিকেই ভোগের জন্য রান্না করা হয়। এই নিয়মের পিছনেও রয়েছে যুগল নিবেদনের ভাবনা। যদিও পরিবার ও অঞ্চলভেদে রীতি বদলাতে পারে, তাই জোড়া ইলিশ নিবেদনের ক্ষেত্রে কোনও একটিমাত্র নিয়মকে সব পরিবারের জন্য প্রযোজ্য বলা যায় না। লক্ষ্মীপুজোর ভোগের ইলিশ রান্নার পদ্ধতিও সাধারণ বাঙালি রান্নার থেকে আলাদা। ইলিশ মানেই সর্ষে বাটা দিয়ে ভাপা, কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাতলা ঝোল কিংবা সর্ষের তেলে কড়া করে ভাজা, এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু কিছু পূর্ববঙ্গীয় পরিবারের লক্ষ্মীপুজোর ভোগে ইলিশ রান্না করা হয় একেবারে সাদামাটাভাবে। ব্যবহার করা হয় না সর্ষে বাটা, পেঁয়াজ-রসুন কিংবা ভারী মশলা। রান্নায় তেলও দেওয়া হয় না। মাছের নিজস্ব স্বাদ বজায় রাখার জন্য জল, নুন, হলুদ, বেগুন ও সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়েই তৈরি হয় পাতলা ঝোল।

আরও পড়ুন : Priyanka Chopra Kanya Puja | Nick Jonas Dussehra celebration : মেয়ের পা ধুয়ে কন্যাপুজো প্রিয়াঙ্কা-নিকের! লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে ভারতীয় রীতিতে মাতলেন তারকাদম্পতি

এই রান্নায় উপকরণের সংখ্যা কম হলেও পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রথমে দু’টি ইলিশ মাছ গোল গোল টুকরো করে কেটে ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। মাছের টুকরোগুলিতে নুন ও হলুদ মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া যায়। পাশাপাশি দু’টি বেগুন বড় টুকরো করে কেটে রাখতে হবে। এ বার একটি বড় কড়াইয়ে পরিমাণমতো জল গরম করে তাতে নুন ও হলুদ দিতে হবে। জল ফুটতে শুরু করলে বেগুনের টুকরোগুলি দিয়ে ঢেকে রান্না করতে হবে। বেগুন কিছুটা নরম হয়ে এলে তাতে ইলিশের টুকরো যোগ করতে হবে। এর পর কড়াই ঢেকে মাঝারি আঁচে মাছ সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে। ইলিশ খুব বেশি সময় ধরে ফুটিয়ে রাখলে মাছের টুকরো ভেঙে যেতে পারে, তাই রান্নার সময় নজর রাখা দরকার। মাছ সেদ্ধ হয়ে গেলে ঝোলে গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে হবে। ক’য়েক মিনিট ফুটিয়ে আঁচ বন্ধ করলেই তৈরি হবে তেল-মশলাহীন লক্ষ্মীপুজোর ইলিশের ঝোল। মাছের নিজস্ব তেল ও স্বাদ ঝোলকে আলাদা মাত্রা দেয়। বেগুন ঝোলের সঙ্গে মিশে স্বাদে ভারসাম্য আনে। ভোগের এই রান্না সাধারণত ভাতের সঙ্গে খাওয়া যায়, যদিও পরিবেশনের রীতি পরিবারভেদে বদলাতে পারে।

এই রান্নার বৈশিষ্ট্য শুধু স্বাদে নয়, তার সরলতায়ও। প্রতিদিনের রান্নায় যেখানে নানা মশলা ও তেল ব্যবহার করা হয়, সেখানে পুজোর ভোগে উপকরণ কমিয়ে মাছের স্বাভাবিক স্বাদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধর্মীয় নিবেদন হিসেবে রান্না করার কারণে অনেক পরিবারে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে চলা হয়। ফলে রান্নাটি পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বাড়ির প্রবীণদের কাছ থেকে ছোটরা এই রন্ধনপ্রণালী শিখে নেয়, আর তার সঙ্গে পরিচিত হয় পরিবারের পুরনো রীতির। বর্তমানে শহুরে জীবনে বহু পুরনো আচার বদলে যাচ্ছে। বাজারে মাছের দাম, সহজে উপকরণ পাওয়া, পরিবারের সদস্যদের খাদ্যাভ্যাস ও সময়ের অভাব, সবই পুজোর আয়োজনকে প্রভাবিত করে। তবু যেসব পরিবারে জোড়া ইলিশের চল রয়েছে, সেখানে এই প্রথা ধরে রাখার চেষ্টা দেখা যায়। কারও কাছে এটি দেবীর প্রতি নিবেদন, কারও কাছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, আবার কারও কাছে শৈশবের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত অনুভূতি।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় জোড়া ইলিশের প্রচলন তাই শুধু মাছ কেনা বা বিশেষ রান্না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রাচুর্যের ধারণা, দাম্পত্য ও পারিবারিক মঙ্গলের কামনা, পূর্ববঙ্গের খাদ্যসংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসের দীর্ঘ ইতিহাস। সব পরিবারে এই রীতি পালিত না হলেও যাঁরা পালন করেন, তাঁদের কাছে এর মূল্য আলাদা। লক্ষ্মীপুজোর ভোগে তেল-মশলাহীন ইলিশের ঝোল সেই ঐতিহ্যেরই এক স্বাদ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতিতে জায়গা করে রেখেছে।

ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী 
আরও পড়ুন : Rashmika Mandanna on MS Subbulakshmi biopic | সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রে রশ্মিকা, প্রথম দিনেই আবেগে আপ্লুত! বললেন, ‘যেন ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি’

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন