Jogen Chowdhury Death News | থামল যোগেন চৌধুরীর তুলির আঁচড়, শিল্পীর প্রয়াণে শোকের ছায়া শিল্পজগতে

SHARE:

প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, তাঁর জীবন, শিল্পকর্ম এবং আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় অবদান

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ২৫ ডিসেম্বর ২০২৬ : ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জগতে নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী (Jogen Chowdhury)। রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। সকাল ১০টা ১৫ মিনিট নাগাদ তাঁর জীবনাবসান হয় বলে সূত্রের খবর। দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণ ও শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার উল্লেখযোগ্য পর্বের অবসান ঘটল।

আরও পড়ুন : India Women cricket score Pratika Rawal 100 not out | প্রতীকার দুরন্ত শতরান, শ্রী চরণীর চার উইকেট! জিম্বাবোয়েকে ৯ উইকেটে উড়িয়ে এক দিনের সিরিজে দুর্দান্ত শুরু ভারতের

যোগেন চৌধুরীর পরিচয় একজন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। রেখার স্বতন্ত্র ব্যবহার, মানুষের শরীরের গঠনে অভিনবত্ব ও দৈনন্দিন জীবনের অন্তর্লীন টানাপোড়েনকে ছবিতে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা তাঁকে ভারতীয় শিল্পজগতে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। তাঁর ছবিতে মানুষের অবয়ব কখনও পরিচিত, কখনও অস্বস্তিকর, আবার কখনও গভীর আবেগে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত। শরীরের ভাঁজ, মুখের অভিব্যক্তি, হাতের অবস্থান কিংবা বসে থাকা কোনও মানুষের অবয়বের মধ্যেও তিনি খুঁজে নিতেন জীবনের জটিল অভিজ্ঞতা। তাঁর শিল্পের ভাষা ছিল নিজস্ব, যার মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা একই সঙ্গে ধরা দিত। বাংলা তথা ভারতের শিল্প-ইতিহাসে যোগেন চৌধুরীর অবদান মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর রেখার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা অনিবার্য। প্রচলিত বাস্তববাদী অঙ্কনের বাইরে গিয়ে তিনি রেখাকে শুধু অবয়ব তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেননি। রেখার ওঠানামা, ঘনত্ব, বক্রতা ও পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতের মধ্য দিয়ে ছবিতে তৈরি করেছেন আলাদা আবহ।

যোগেন চৌধুরীর কাজে মানুষের শরীর উঠে আসে নিছক দৃশ্যমানতা হিসেবে না। গভীর অনুভূতি, অসহায়তা, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অবস্থানের বাহক তাঁর সৃষ্টি চিত্রকর্ম। এই বৈশিষ্ট্যই যোগেন চৌধুরীকে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছিল। ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর জন্মের সময় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অস্থির ছিল। পরবর্তী সময়ে দেশভাগের অভিঘাত তাঁর পরিবারের জীবনেও প্রভাব ফেলে। পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে আসার পর এই শহরই হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তা গড়ে ওঠার প্রধান ক্ষেত্র। দেশভাগের অভিজ্ঞতা, শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা ও নতুন পরিবেশে জীবন গড়ে তোলার বাস্তবতা তাঁর প্রজন্মের বহু মানুষের মতোই তাঁর জীবনপরিসরকে প্রভাবিত করেছিল। শিল্পীর কাজের মধ্যে সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতার যে উপস্থিতি দেখা যায়, তা তাঁর সময়ের বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহকে নিয়মিত শিল্পচর্চার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে শিল্পশিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর তাঁর সামনে খুলে যায় বৃহত্তর শিল্পজগতের দরজা। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের বিকাশ শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পর্যবেক্ষণ, নিজস্ব পরীক্ষানিরীক্ষা ও শিল্পের ভাষা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধান তাঁর কাজকে ক্রমশ স্বতন্ত্র করে তোলে।

আরও পড়ুন : Ranbir Kapoor Yash | Suvendu Adhikari : রাবণ দহনের মঞ্চে রাম-রাবণ একসঙ্গে! সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে রণবীর-যশের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি’

পরবর্তী সময়ে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে যাওয়ার সুযোগ পান যোগেন চৌধুরী। সেখানে বিখ্যাত Ecole Nationale Superieure des Beaux-Arts-এ শিল্পচর্চা করেন। ইউরোপের শিল্পপরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক শিল্পের নানা ধারা ও প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হলেও নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি বর্ষীয়ান শিল্পী। ভারতীয় জীবন, মানুষের শরীরী ভাষা ও পরিচিত সামাজিক পরিসরকে নিজের শিল্পের কেন্দ্রে রেখে গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি। যোগেন চৌধুরীর ছবিতে মানুষের শরীরের উপস্থাপনা বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর আঁকা অবয়ব অনেক সময় প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে মেলে না। শরীরের অনুপাত, ভাঁজ কিংবা মুখের গঠনে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন ছবিকে দেয় অন্য মাত্রা। এই ধরনের অঙ্কন দর্শককে ছবির বাহ্যিক রূপ দেখতেই বাধ্য করে না, অবয়বের পিছনে থাকা মানসিক অবস্থার দিকেও দর্শকের মনোযোগ টানে। তাঁর ছবির মানুষ কখনও নিঃসঙ্গ, কখনও উদ্বিগ্ন, কখনও দৈনন্দিন জীবনের ভারে ক্লান্ত। এই অবয়বগুলির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।

শিল্পীর কাজের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, পরিচিত জীবনকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, শরীরের ভাষা, সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা ও সময়ের পরিবর্তন তাঁর ছবিতে নানা ভাবে ফিরে এসেছে। তিনি সরাসরি কোনও ঘটনার বিবরণ দেওয়ার বদলে ছবির গঠন ও রেখার সাহায্যে দর্শকের সামনে অভিজ্ঞতার একটি পরিসর তৈরি করতেন। ফলে তাঁর কাজের অর্থ একমাত্রিক থাকত না। দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়ে ছবির সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেন। ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যোগেন চৌধুরীর অবস্থান বুঝতে গেলে তাঁর শিল্পভাষার এই বৈশিষ্ট্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শিল্পীরা যখন নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি নির্মাণের নানা পথ খুঁজছিলেন, তখন যোগেন চৌধুরীর মতো শিল্পীরা দেশীয় অভিজ্ঞতা ও আধুনিক শিল্পভাবনার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পাশ্চাত্য শিল্পের পদ্ধতি সম্পর্কে পরিচিতি থাকলেও তিনি অনুকরণের পথে হাঁটেননি। মানুষের অবয়ব, রেখার গঠন ও সামাজিক অভিজ্ঞতার নিজস্ব পাঠের মাধ্যমে তৈরি করেছেন আলাদা শিল্পভাষা।

যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শিল্পজগতের ক্ষতি শুধু একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ না। লম্বা কর্মজীবনে গড়ে ওঠা তাঁর শিল্পভাবনা, রেখা নিয়ে নিরীক্ষা ও মানুষের জীবনকে দেখার পদ্ধতি আগামী প্রজন্মের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। ওঁর কাজ নতুন করে দেখার প্রয়োজনও এখানেই। শিল্পীর নাম ও খ্যাতির বাইরে গিয়ে ছবির গঠন, বিষয় নির্বাচন ও প্রকাশভঙ্গির গভীরে পৌঁছলে তাঁর শিল্পের বহুমাত্রিক দিকগুলি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। উল্লেখ্য, একজন শিল্পীর মৃত্যুর পর তাঁর কাজকে ঘিরে স্মৃতিচারণ স্বাভাবিক। কিন্তু যোগেন চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেই স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তাঁর শিল্পকর্ম সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় কিংবা প্রতিষ্ঠিত সংগ্রহের মধ্যে আটকে থাকলে বৃহত্তর দর্শকের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাঁর ছবির নিয়মিত প্রদর্শনী, গবেষণামূলক আলোচনা ও শিল্পশিক্ষার পরিসরে কাজগুলির অন্তর্ভুক্তি ভবিষ্যতের দর্শকদের কাছে তাঁর অবদান পৌঁছে দিতে পারে।

যোগেন চৌধুরীর জীবন ছিল দীর্ঘ শিল্পসাধনার। ফরিদপুরের গ্রাম থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে প্যারিস বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তা। সেই যাত্রাপথে তিনি এমন এক একটি প্রকাশভঙ্গি নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে রেখা শুধু ছবির সীমারেখা নয়, মানুষের অন্তর্জগতেরও ভাষা হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রয়াণে সেই শিল্পীজীবনের সমাপ্তি ঘটলেও ছবির মধ্যে ধরে রাখা মানুষের অভিজ্ঞতা, সময়ের ছাপ ও সমাজের নানা দ্বন্দ্ব দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবে। ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যোগেন চৌধুরীর নাম তাই দীর্ঘদিন আলোচিত হবে তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা ও সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্যের কারণেই।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on West Bengal Government Scheme | কলেজে ভর্তি হলেই ৫০ হাজার টাকা! প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে কত অনুদান, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন