সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ব্যাট হাতে প্রতীকা রাওয়ালের (Pratika Rawal) দুরন্ত শতরান, বল হাতে শ্রী চরণীর (Shree Charani) চার উইকেট। দুই তরুণ ক্রিকেটারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে জিম্বাবোয়ের (Zimbabwe) বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৯ উইকেটে জয় তুলে নিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল (India Women’s Cricket Team)। বরোদার কোটাম্বি স্টেডিয়ামে শুক্রবার ব্যাটে-বলে দাপট দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে কার্যত কোনও সুযোগই দেয়নি ভারত। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে জ়িম্বাবোয়ের ইনিংস বড় হতে দেননি ভারতীয় বোলারেরা। পরে রান তাড়া করতে নেমে মাত্র একটি উইকেট হারিয়ে অনায়াসে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana) দল। প্রতীকার অপরাজিত ১০০ রান ও শেফালি বর্মার (Shafali Verma) ঝোড়ো ৬৪ রানের ইনিংস ভারতের জয়কে আরও সহজ করে দেয়। অন্য দিকে, শ্রী চরণীর চার উইকেটের পাশাপাশি ক্রান্তি গৌড় (Kranti Gaud) ও দীপ্তি শর্মার (Deepti Sharma) কার্যকর বোলিংয়ে বড় রান তুলতে ব্যর্থ হয় জিম্বাবোয়ে।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাফল্যের পর একদিনের সিরিজ়েও জয় দিয়ে অভিযান শুরু করল ভারত। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের পারফরম্যান্সে ব্যবধান চোখে পড়েছে। জিম্বাবোয়ের ব্যাটারেরা নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারিয়ে বড় জুটি গড়তে পারেননি। অন্য দিকে, রান তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ওপেনারেরা শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাট করেছেন। জিম্বাবোয়ের বোলারদের পক্ষে ভারতীয় ব্যাটারদের চাপে ফেলা সম্ভব হয়নি। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত শুরু থেকেই ভারতের হাতে ছিল। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জিম্বাবোয়ের অধিনায়ক নোমভেলো সিবান্দা (Nomvelo Sibanda)। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে কাজে লাগিয়ে বড় রান তোলার সুযোগ পায়নি দল। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই প্রথম ধাক্কা খায় জিম্বাবোয়ে। মাত্র ৩ রান করে ক্রান্তি গৌড়ের বলে ফিরে যান ওপেনার লোরিন ফিরি (Lorine Phiri)। শুরুতেই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় জ়িম্বাবোয়ে। এরপর দলের রান এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মডেস্টার মুপাচিকাওয়া (Modester Mupachikwa) ও চিপো মুগেরি-তিরিপানো (Chipo Mugeri-Tiripano)। দুই ব্যাটারের জুটি কিছুটা স্থিতি ফেরালেও ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেনি ম্যাচ।
দ্বিতীয় উইকেটের জুটিতে ৪৩ রান যোগ করেন মুপাচিকাওয়া ও তিরিপানো। এই জুটি ভাঙার পরেই জ়িম্বাবোয়ের ইনিংসে ধস নামে। শ্রী চরণী গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিরিপানোকে ২১ রানে ফিরিয়ে দিয়ে ভারতকে সাফল্য এনে দেন। এরপর থেকে নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট পড়তে থাকে জ়িম্বাবোয়ের। একের পর এক ব্যাটার ফিরে যাওয়ায় বড় রান তোলার পরিকল্পনা প্রায় ভেস্তে যায়। ভারতীয় বোলারেরা ধারাবাহিক ভাবে চাপ বজায় রাখেন এবং প্রতিপক্ষকে বড় জুটি গড়ার সুযোগ দেননি। জিম্বাবোয়ের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লড়াই করেন বিলাভের বিজা (Beloved Biza)। দলের অন্য ব্যাটারেরা রান তুলতে সমস্যায় পড়লেও তিনি এক দিকে দাঁড়িয়ে ৬২ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের সুবাদেই কিছুটা সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছনোর চেষ্টা করে জিম্বাবোয়ে। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় ইনিংসকে বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে জ়িম্বাবোয়ের ব্যাটিং লাইনআপ প্রত্যাশিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ভারতের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল শ্রী চরণী। ১০ ওভার বল করে মাত্র ২৩ রান দিয়ে তিনি চারটি উইকেট তুলে নেন। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটিই তাঁর সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিয়ে জ়িম্বাবোয়ের রান তোলার গতি থামিয়ে দেন তিনি। তাঁর বোলিংয়ে ছিল নিয়ন্ত্রণ ও ধারাবাহিকতা। ক্রান্তি গৌড়ও দুর্দান্ত ভূমিকা পালন করেন। ৪২ রান খরচ করে তিনটি উইকেট নেন। দীপ্তি শর্মার ঝুলিতে আসে দু’টি উইকেট। শেফালি বর্মাও বল হাতে একটি উইকেট তুলে নেন। ভারতীয় বোলারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সের ফলেই জ়িম্বাবোয়ে বড় স্কোর গড়তে পারেনি।

কিন্তু ম্যাচটিতে জয় এলেও ভারতীয় দলের ফিল্ডিং নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। জিম্বাবোয়ের ইনিংসে তিনটি ক্যাচ ফেলেছেন ভারতীয় ফিল্ডারেরা। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সেই ভুল বড় ক্ষতি না করলেও শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে এমন সুযোগ নষ্ট করলে ম্যাচের ফল অন্য দিকে যেতে পারে। তাই পরের ম্যাচের আগে ফিল্ডিংয়ের ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার দিকে নজর দিতে হবে ভারতীয় দলকে। বোলিং ও ব্যাটিংয়ে দাপট থাকলেও ক্যাচ ধরার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। রান তাড়া করতে নেমে ভারতকে অবশ্য কোনও বড় সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। ওপেনিং জুটিতে স্মৃতি মন্ধানা ও প্রতীকা রাওয়াল শুরু থেকেই স্বচ্ছন্দে ব্যাট করেন। জ়িম্বাবোয়ের বোলারদের বিরুদ্ধে দু’জনেই নিয়মিত রান তুলতে থাকেন। প্রথম উইকেটের জুটি ভারতকে জয়ের ভিত তৈরি করে দেয়। স্মৃতি ৩৪ বলে ৩২ রান করে ফিরে গেলেও ততক্ষণে ভারতের রান তোলার গতি যথেষ্ট ভাল ছিল। ওলিন্ডার চার (Olynder Chare) -এর বলে আউট হন ভারতীয় অধিনায়ক। তাঁর বিদায়ের পর তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামেন শেফালি বর্মা।
শেফালি ক্রিজে এসেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাঁর পরিচিত আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ছাপ দেখা যায় এক দিনের ম্যাচেও। মাত্র ৩৩ বলে অপরাজিত ৬৪ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও চারটি ছয়। দ্রুত রান তুলে জিম্বাবোয়ের বোলারদের উপর চাপ বাড়িয়ে দেন শেফালি। এক দিকে প্রতীকা নিজের শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন, অন্য দিকে শেফালির ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ভারতের জয়ের পথ আরও সহজ হয়ে ওঠে। রান তোলার গতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, প্রতীকার শতরান হবে কি না, তা নিয়েই শেষ দিকে আগ্রহ তৈরি হয়। প্রতীকা শুরু থেকেই ধৈর্য ধরে ব্যাট করেন। এক দিনের ক্রিকেটের উপযোগী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি মেরে রান বাড়িয়েছেন তিনি। ইনিংসের শেষ ভাগে তাঁর শতরান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৭তম ওভারের শেষ বলে চার মেরে ৯৬ বলে নিজের শতরান পূর্ণ করেন প্রতীকা। শতরান পূর্ণ করার পরও তিনি অপরাজিত থাকেন ১০০ রানে। তাঁর ইনিংস ভারতের রান তাড়াকে শুধু সহজ করেনি, দলের ব্যাটিং গভীরতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতাও তুলে ধরেছে।
এই জয়ের ফলে এক দিনের সিরিজ়ের শুরুতেই আত্মবিশ্বাস পাবে ভারতীয় মহিলা দল। ব্যাটিংয়ে প্রতীকা ও শেফালির পারফরম্যান্স ও বোলিংয়ে শ্রী চরণীর সাফল্য দলের কাছে বড় প্রাপ্তি। স্মৃতি মন্ধানার নেতৃত্বে দল যে সাদা বলের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইছে, প্রথম ম্যাচের ফল তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ফিল্ডিংয়ে তিনটি ক্যাচ পড়ে যাওয়ার ঘটনা পরের ম্যাচের আগে দলের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও থাকছে। ভারত ও জিম্বাবোয়ের মহিলা দলের দ্বিতীয় এক দিনের ম্যাচ হবে রবিবার, ২৫ অক্টোবর। প্রথম ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারের পর ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে জ়িম্বাবোয়ে। অন্য দিকে, সিরিজ়ে ব্যবধান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে ভারত। প্রতীকা রাওয়ালের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা, শ্রী চরণীর বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের উন্নতি, পরের ম্যাচে ভারতীয় দলের নজর থাকবে এই দিকগুলিতেই। প্রথম ম্যাচের মতো দ্বিতীয় ম্যাচেও যদি ব্যাটে-বলে একই রকম দাপট বজায় রাখতে পারে ভারত, তা হলে সিরিজ়ে আরও একটি বড় জয় তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকবে স্মৃতি মন্ধানাদের সামনে।
সব ছবি: সংগৃহীত



