সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: অশুভ শক্তির বিনাশ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। বিজয়া দশমী (Vijaya Dashami) উপলক্ষ্যে দিল্লির রামলীলা ময়দানে (Ramlila Maidan) রাবণ বধের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রামরাজ্যের আদর্শ তুলে ধরলেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের সম্মান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলিকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল আত্মনির্ভর ভারত (Atmanirbhar Bharat), বিকশিত ভারত (Viksit Bharat) ও নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রসঙ্গও। দশেরার মঞ্চ থেকে তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় উৎসবের তাৎপর্যের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেল। বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উৎসব কেবল একটি বার্ষিক ধর্মীয় আয়োজন নয়, ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক ও মানসিক শক্তির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রামায়ণের (Ramayana) কাহিনিতে রাবণের পরাজয় ও শ্রীরামচন্দ্রের বিজয়কে সামনে রেখে তিনি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়কে উৎসবের প্রধান শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সংকল্পই দশেরার মূল তাৎপর্য বহন করে। সেই আদর্শকে সামনে রেখে তিনি দেশের মানুষকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
রামলীলা ময়দানে আয়োজিত রাবণ বধের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্রীরামচন্দ্র, মা সীতা ও বজরংবলীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দেশবাসীর উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বিজয়া দশমীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। রামায়ণের কাহিনি ভারতীয় সমাজে ন্যায়, কর্তব্য, আত্মবিশ্বাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে শিক্ষা দিয়ে এসেছে, তা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। রামরাজ্যের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন এক শাসনব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে ধর্ম, জাতি, পরিচয় কিংবা অন্য কোনও কারণে নাগরিকদের বৈষম্যের মুখে পড়তে হবে না। প্রত্যেকের জন্য ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই সেই শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ক্ষমতা অর্জন কিংবা প্রশাসন পরিচালনাই শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণ করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রামরাজ্য মানে এমন শাসন, যেখানে কাউকে ভেদাভেদের শিকার হতে হয় না, সকলে ন্যায়বিচার পান। সকলের জন্য সমান সুযোগ থাকবে।’ শ্রী রামচন্দ্রের আদর্শের উল্লেখ করে তিনি জনসেবাকে শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। নাগরিকদের মর্যাদা দেওয়া ও তাঁদের সমস্যার সমাধানে প্রশাসনকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। ‘নাগরিক দেবো ভব’ নীতিকে সামনে রেখে তিনি কাজ করার আহ্বান জানান। অর্থাৎ, নাগরিকের অধিকার, সম্মান ও প্রয়োজনকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দশেরার মঞ্চ থেকে আত্মনির্ভরতার প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন মোদী। রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় সঙ্কট কিংবা কঠিন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও লক্ষ্য থেকে সরে আসা উচিত নয়। তাঁর মতে, শ্রীরামচন্দ্রের লঙ্কা অভিযানের কাহিনি সংকল্প, সাহস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরে। সামনে সমুদ্র, দূরে লঙ্কা প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন, রামায়ণের সেই ঘটনাকে তিনি বর্তমান ভারতের উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, দেশের উন্নয়নের পথে বাধা আসতে পারে, কিন্তু সেই কারণে লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে থাকা চলবে না। নিজেদের ক্ষমতার উপর আস্থা রেখে জনগণের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার পাশাপাশি বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে দেশবাসীর অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে ও নাগরিকদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করা যাবে। বক্তব্যে ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি আক্রমণ, লুঠপাট এবং নানা ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও ভারত নিজের পরিচয় ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিজয়া দশমীর মতো উৎসবকে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখান।
আরও পড়ুন : Durga Puja 2026, Shubho Bijoya | শুভ বিজয়া ২০২৬: বঙ্গে বিষাদের সুর, আবার অপেক্ষা আগামী বছরের
এদিনের বক্তব্যে রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল। দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলিকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে পিছনে রেখে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করা কিংবা সংস্কৃতির ক্ষতি করার চেষ্টা করে, এমন শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন। দেশের শত্রুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের হিতের জন্য একসঙ্গে আসুক। এটাই লক্ষ্য হোক।’ দেশের মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘যারা দেশের সম্মান নষ্ট করে, সংস্কৃতিকে নষ্ট করার চেষ্টা করে, তারাই দেশের শত্রু। এদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু, রামরাজ্যের ধারণা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, সমান সুযোগ ও জনকল্যাণের যে আদর্শ তিনি তুলে ধরেছেন, তা প্রশাসনের কার্যকারিতা ও নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই আদর্শ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে সরকারি নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাবের উপর। ফলে রামরাজ্যের উল্লেখের পাশাপাশি সমান অধিকার ও জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতিগুলিও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে, ভারতে দশেরা বা বিজয়া দশমী বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রীতিতে পালিত হয়। কোথাও রাবণ দহন, কোথাও দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপিত হয়। এই উৎসবের সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধারণা দীর্ঘ দিন ধরে যুক্ত। দিল্লির রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং তাঁর বক্তব্য সেই সাংস্কৃতিক আবহেই নতুন করে জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতা ও সুশাসনের প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। দশেরার মঞ্চ থেকে মোদীর বক্তব্যে তাই এক দিকে ছিল শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ অনুসরণ করে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান, অন্য দিকে দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা। আত্মনির্ভর ভারত ও বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার ডাকের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলিকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। উৎসবের আবহে দেওয়া এই বক্তব্য আগামী দিনে সরকারের উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত রাজনৈতিক আলোচনায় কী ভাবে প্রভাব ফেলে, সে দিকেই নজর থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Durga Puja 2026, Shubho Bijoya | শুভ বিজয়া ২০২৬: বঙ্গে বিষাদের সুর, আবার অপেক্ষা আগামী বছরের



