সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে জেলায় জেলায় সফর করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নবমীর দুপুরে পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, নদীয়া ও হাওড়ার একাধিক এলাকায় গিয়ে মৃতদের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। আর্থিক সহায়তা হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরির সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী। কোথাও এক পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু হওয়ায় আর্থিক সাহায্যের অঙ্ক বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রবীণ বাবা-মায়ের জন্য বার্ধক্য ভাতা চালু করা এবং তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও চাকরির আশ্বাস দেওয়ার এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে আলোচনা।
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার তাঁর সফরের প্রথম গন্তব্য ছিল পূর্ব বর্ধমানের বীরপুর। সেখানে গিয়ে সঞ্জয় বেজের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। কলকাতায় পুজোর ঠাকুর দেখতে এসে সঞ্জয় তাঁর স্ত্রী টগর বেজ এবং ১৪ বছরের ছেলে সন্দীপ বেজকে হারিয়েছেন। টগরের বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। পরিবারের দুই সদস্যের মৃত্যুতে শোকাহত সঞ্জয়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পর তাঁকে স্ত্রী ও ছেলের মৃত্যুর জন্য মোট ৫০ লক্ষ টাকার চেক দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর সঞ্জয় বেজ জানান, পুজোর সময়ে স্ত্রী ও সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে তাঁদের বাড়িতে এসে কথা বলবেন, তা তিনি ভাবতে পারেননি। সঞ্জয়ের কথায়, ‘পুজোয় ঠাকুর দেখতে গিয়ে আমার স্ত্রী, পুত্রকে হারাতে হয়েছে। এই পুজোর মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন, সান্ত্বনা দিলেন। এটা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। সব রকম সাহায্যের আশ্বাস উনি আমাদের দিয়েছেন।’ পরিবারের ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়, তবে প্রশাসনের তরফে পাশে থাকার আশ্বাস কিছুটা হলেও তাঁদের ভরসা জোগাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বীরপুর থেকে মুখ্যমন্ত্রী যান হুগলির আরামবাগে। সেখানে বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা পিয়ালি প্রামাণিকের পরিবারের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী দেখা করেন। চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো পিয়ালি সঞ্জয় বেজের আত্মীয় ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুজো দেখতে কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দের সফরই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। পিয়ালির বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিজনদের সমবেদনা জানান মুখ্যমন্ত্রী এবং ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন। পরিবারের সদস্যরা এই সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। চাকদহের বাসিন্দা আরতি সরকারও চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর বাড়িতেও যান শুভেন্দু। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের হাতে তিনি আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই জেলা সফরে মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক পরিবারের কাছে পৌঁছে যাওয়াকে প্রশাসনের তৎপরতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ করা হবে, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এরপর হাওড়ার লিলুয়ার আনন্দনগর বিদ্যাসাগর পল্লিতে আকৃতি রাউতের বাড়িতে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। চোরবাগানের দুর্ঘটনায় আকৃতির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন শুভেন্দু। আর্থিক সহায়তা হিসেবে ২৫ লক্ষ টাকার চেকও তুলে দেওয়া হয়। আকৃতির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের শোকের কথা শুনে তাঁদের প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনকে উদ্যোগী হওয়ার বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। মৃতদের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া প্রশাসনের কর্তব্য। তাঁর বক্তব্য, ‘যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের তো ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু তার পরের দায়িত্বটা পালন করতে হবে। এটা আমাদের কর্তব্য। চোরবাগানের অঘটনে যে সমস্ত পরিবারের চোখে জল, তাদের দুঃখ আমাদেরও দুঃখ।’ দুর্ঘটনার পর উৎসবের আনন্দে অংশ নেওয়ার বদলে শোকাহত পরিবারগুলির পাশে থাকার বিষয়টিকেই তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে জানান। তাঁর মতে, মানুষের দুঃসময়ে প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক সমবেদনা জানানো নয়, প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করা।
এই সফরেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আগের সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া কয়েকটি দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বর্তমান প্রশাসনের পদক্ষেপের সঙ্গে তার তুলনা করেন তিনি। ২০২৫ সালে কলকাতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা ও দার্জিলিঙের নাগরাকাটায় হড়পা বানে প্রাণহানির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, ওই সব ঘটনার পরেও বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান হয়েছে। চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর বর্তমান সরকার শোকাহত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এই তুলনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, সে দিকেও নজর রয়েছে। চাকদহে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, চোরবাগানের ঘটনার তদন্তের জন্য কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পুলিশ বা কলকাতা পুরসভার কোনও প্রতিনিধিকে ওই কমিটিতে রাখা হবে না বলে তাঁর বক্তব্য। দুর্ঘটনার পিছনে কোনও প্রশাসনিক বা অন্য কোনও ধরনের গাফিলতি থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
আরও পড়ুন : Durga Puja 2026 Photo Album | শারদীয় উৎসবের শেষ লগ্নে বঙ্গবাসী
তদন্তের প্রসঙ্গে বিরোধীদের আক্রমণ করে শুভেন্দু বলেন, ‘আগের সরকারের সময়ে হাঁসখালি বলুন বা অন্য যে কোনও ঘটনা, আমাদের সিবিআই তদন্ত চেয়ে, বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়ে আদালতে যেতে হত। আমি সেই সুযোগ দিইনি। গাফিলতি থাকলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তাঁর এই বক্তব্যে দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে তদন্তের গুরুত্ব এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত কমিটির গঠন, কাজের পরিধি, সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া ও রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রীর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল হুগলির বৈদ্যবাটীতে শ্রীপর্ণা পোদ্দারের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ২৭ বছরের শ্রীপর্ণাও চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তাঁর বাবা-মা শোকের মধ্যে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান শুভেন্দু। শ্রীপর্ণার পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মায়ের চাকরির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের বার্ধক্য ভাতা চালু করার জন্য জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শ্রীপর্ণা রাজারহাটের একটি ক্যানসার হাসপাতালে কাজ করতেন। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর তাঁর বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। শ্রীপর্ণার মা আগে নার্স হিসেবে কাজ করতেন। তাঁকে ফের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় বিধায়ককে উদ্যোগী হতে বলেছেন বলে জানান শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, কাজের সুযোগ পেলে শ্রীপর্ণার মা আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন এবং কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগও পাবেন। পাশাপাশি, শ্রীপর্ণার বাবা ও মায়ের জন্য বার্ধক্য ভাতা চালু করার বিষয়ে জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। শ্রীপর্ণার মা স্বপ্না পোদ্দার বলেন, ‘উনি যতটুকু সাধ্য, চেষ্টা করেছেন। আমরা অনেক সাহায্য পেয়েছি। আমাদের ক্ষতি তো পূরণ করা যাবে না। কিন্তু উনি পাশে আছেন। আমরা কোনও দাবি করিনি।’ তাঁর বক্তব্যে পরিবারের গভীর শোকের পাশাপাশি প্রশাসনের সহায়তা পাওয়ার অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে।
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য, কর্মসংস্থানের আশ্বাস ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ, দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণও সমান জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত তদন্ত কমিটি কত দ্রুত কাজ শুরু করে এবং তার সুপারিশের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ করা হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। শোকাহত পরিবারগুলির কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছনোর পাশাপাশি চোরবাগানের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chorbagan Stampede: 19 Dead, Autopsy Reveals Causes | চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, ময়নাতদন্তে ভয়াবহ তথ্য




