সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ডিজিটাল পেমেন্টে নতুন খরচের আশঙ্কার মধ্যেই আপাতত স্বস্তি পেলেন ব্যবসায়ীরা। ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই (Unified Payments Interface বা UPI) -এর নির্বাচিত মার্চেন্ট লেনদেনে ০.৪ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (Merchant Discount Rate বা MDR) চালুর যে পরিকল্পনা ছিল, তা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানানো হয়েছে। ১৫ অক্টোবর থেকে এই চার্জ কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও উৎসবের মরসুমের কথা মাথায় রেখে আপাতত সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হচ্ছে। নতুন চার্জ চালুর দিনক্ষণ পরে জানানো হবে বলে ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (National Payments Corporation of India বা NPCI) -এর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দিওয়ালির আগে ইউপিআই লেনদেনে নতুন মার্চেন্ট চার্জ চালুর বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কিছুটা কমতে পারে। উল্লেখ্য, ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ইউপিআই। ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় বিপণি, রেস্তোরাঁ, অনলাইন কেনাকাটা ও বিভিন্ন পরিষেবার মূল্য মেটাতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেন। মোবাইল ফোনে কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডে টাকা পাঠানোর সুবিধা নগদ টাকার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই কমিয়েছে। তাই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চার্জ নেওয়ার পরিকল্পনা সামনে আসতেই তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে দুর্গাপুজো, দিওয়ালি ও অন্যান্য উৎসবের সময়ে কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ায়, এই সময় নতুন খরচ চালু হলে ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত মাসে এনপিসিআইয়ের তরফে ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের নির্বাচিত পার্সন-টু-মার্চেন্ট বা ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ীর লেনদেনে ০.৪ শতাংশ এমডিআর চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার্জ ৩০০ টাকায় সীমাবদ্ধ রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এই নিয়ম সব ধরনের ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা পাঠানো এবং ছোট অঙ্কের লেনদেনকে এই প্রস্তাবিত চার্জের বাইরে রাখার কথা সূত্রের খবর।
এমডিআর আসলে কী? কোনও গ্রাহক ডিজিটাল মাধ্যমে কোনও ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ মেটালে সেই লেনদেন প্রক্রিয়াকরণের জন্য যে মার্চেন্ট ফি নেওয়া হয়, তাকে সাধারণভাবে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বলা হয়। পেমেন্ট ব্যবস্থার ধরন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এই খরচের পরিমাণ নির্ধারিত হতে পারে। ইউপিআইয়ের নির্বাচিত লেনদেনে এই ধরনের চার্জ চালুর পরিকল্পনা সামনে আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, নতুন খরচ তাঁদের লাভের অঙ্কে কতটা প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যেসব দোকানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ছোট ও মাঝারি অঙ্কের ডিজিটাল লেনদেন হয়, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য শতাংশের চার্জও দীর্ঘস্থায়ী উল্লেখযোগ্য খরচ তৈরি করতে পারে। উৎসবের মরসুমে খুচরো ব্যবসার গুরুত্ব যথেষ্ট। নতুন পোশাক, জুতো, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, গয়না, গৃহস্থালির জিনিসপত্র থেকে শুরু করে খাবার ও বিভিন্ন পরিষেবা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেনাকাটা বেড়ে যায়। এই সময়ে দোকানগুলিতে গ্রাহকের আনাগোনা বাড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। ফলে লেনদেনের উপর অতিরিক্ত চার্জ চালু হলে ব্যবসায়ীদের মোট খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এই ধরনের খরচ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির একাংশ প্রস্তাবিত এমডিআর চালুর সময় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ রয়েছে। অল ইন্ডিয়া মোবাইল রিটেইলার্স অ্যাসোসিয়েশন (All India Mobile Retailers Association) ও অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠন উৎসবের আগে চার্জ চালুর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছিল। ছোট ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ যাতে না পড়ে, সে জন্য আরও সুবিধাজনক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছিল। বিশেষ করে ছোট অঙ্কের লেনদেন ও ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড়ের পরিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। এনপিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত ১৫ অক্টোবর থেকে প্রস্তাবিত চার্জ কার্যকর হচ্ছে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিওয়ালির ঠিক পরে নির্বাচিত পার্সন-টু-মার্চেন্ট লেনদেনে এমডিআর চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। নতুন তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে। ফলে ব্যবসায়ীদের আপাতত অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী নির্দেশের জন্য। চার্জের চূড়ান্ত কাঠামো, কোন ধরনের লেনদেনে তা প্রযোজ্য হবে এবং ব্যবসায়ীদের কীভাবে তা জানানো হবে, এই বিষয়গুলিও পরবর্তী ঘোষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইউপিআইয়ের বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত লেনদেনের জন্য সাধারণত আলাদা চার্জ নেওয়া হয় না। প্রস্তাবিত এমডিআর মূলত নির্বাচিত ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই চার্জ চালু হলে গ্রাহকদের সরাসরি কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে নিয়মের চূড়ান্ত রূপ এবং ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়ার উপর। কোনও ব্যবসায়ী নিজের লাভের অঙ্ক থেকে চার্জের খরচ বহন করতে পারেন, আবার কোনও ক্ষেত্রে সেই খরচ সামলানোর জন্য ব্যবসার অন্যান্য ব্যয় কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। পণ্যের দাম বা পরিষেবা মূল্য বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। এমডিআর চালুর পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়, তার মধ্যে অন্যতম হল ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামো পরিচালনার খরচ। ইউপিআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাঙ্ক, প্রযুক্তি সংস্থা ও পেমেন্ট পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো প্রয়োজন। সার্ভার, নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ আর লেনদেন প্রক্রিয়াকরণের জন্য নিয়মিত বিনিয়োগ করতে হয়। সেই খরচ কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন অংশে আলোচনা চলছে। ২০২০ সালে ইউপিআই ও রুপে ডেবিট কার্ডের লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট শূন্য রাখার নীতি কার্যকর হওয়ার পরেও এই প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু, কোনও নির্দিষ্ট চার্জ চালু করার ক্ষেত্রে গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারীদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইউপিআই দেশের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাজারে কেনাকাটা, খাবারের দাম মেটানো, পরিবহণের খরচ দেওয়া কিংবা অনলাইনে পণ্য কেনা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। নগদ টাকা সঙ্গে রাখার প্রয়োজন কমানো এবং দ্রুত অর্থপ্রদানের সুবিধা ইউপিআইকে জনপ্রিয় করেছে। তাই নতুন কোনও চার্জের ঘোষণা হলে তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও গ্রাহকদের অভ্যাস নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দিওয়ালির পর ঠিক কবে ও কী নিয়মে এমডিআর চালু হবে। চার্জের হার ০.৪ শতাংশই থাকবে কি না, ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লেনদেনে ৩০০ টাকার সর্বোচ্চ সীমা বহাল থাকবে কি না এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা ছাড়ের ব্যবস্থা করা হবে কি না এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা রয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের পেমেন্ট ব্যবস্থার খরচ সম্পর্কে আগাম ধারণা থাকা প্রয়োজন। অন্য দিকে, সাধারণ গ্রাহকদেরও বুঝতে হবে প্রস্তাবিত চার্জ তাঁদের ব্যক্তিগত ইউপিআই লেনদেনে সরাসরি প্রযোজ্য কি না!
আপাতত ১৫ অক্টোবর থেকে ইউপিআইয়ের নির্বাচিত মার্চেন্ট লেনদেনে নতুন ০.৪ শতাংশ এমডিআর চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়ার খবর ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি আনতে পারে। তবে চার্জ পুরোপুরি বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। দিওয়ালির পরে এনপিসিআইয়ের পরবর্তী ঘোষণা ও চূড়ান্ত নির্দেশই ঠিক করবে, ব্যবসায়িক ডিজিটাল লেনদেনের খরচে কী পরিবর্তন আসতে চলেছে। উৎসবের কেনাকাটার মরসুমে তাই গ্রাহক ও ব্যবসায়ী, দু’পক্ষের নজর থাকবে ইউপিআইয়ের নতুন নিয়মের দিকেই।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill 2027 World Cup, Kohli Rohit Shubman Gill | কোহলি-রোহিতের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চান শুভমন, বিশ্বকাপের আগে বড় লক্ষ্য ভারতীয় অধিনায়কের




