সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা: ভারতীয় ক্রিকেটে আবারও একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব সামলানোর পথে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly)। ২০২৭ সালের আইপিএলে (IPL 2027) দিল্লি ক্যাপিটালসের (Delhi Capitals) প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। নতুন দায়িত্বের ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই ক্রিকেটমহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, আইপিএলের একটি দলের কোচ হওয়ার পরে কি ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল বা সিএবির (Cricket Association of Bengal) সভাপতির পদ ছাড়তে হবে সৌরভকে? সূত্রের খবর, আপাতত তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচ হওয়ার পাশাপাশি সিএবি সভাপতির দায়িত্বও পালন করবেন তিনি। এই দুই দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে না বলেই সংশ্লিষ্ট মহলে খবর। অন্যদিকে, সৌরভের নতুন দায়িত্ব ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত নিয়ম। ক্রিকেট প্রশাসনে কোনও ব্যক্তি একাধিক পদে থাকলে সেই পদগুলির মধ্যে দায়িত্বগত বিরোধ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। লোধা কমিটির (Lodha Committee) সুপারিশের পর ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে একাধিক পদে থাকা মানেই যে নিয়মভঙ্গ, এমন ধারণাও প্রযোজ্য নয়। আসল বিষয় হল, দুটি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি এমন কোনও অবস্থানে থাকছেন কি না, যেখানে একটি দায়িত্বের কারণে অন্য দায়িত্বের নিরপেক্ষতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে।
সৌরভের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আগেও উঠেছিল। তিনি যখন দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি লিগের দল প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের (Pretoria Capitals) কোচ ছিলেন ও জেএসডব্লিউ স্পোর্টসের (JSW Sports) ক্রিকেট বিভাগের দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ তুলেছিলেন সঞ্জীব গুপ্ত (Sanjeev Gupta)। সেই অভিযোগে সৌরভের একাধিক ক্রিকেট-সম্পর্কিত দায়িত্ব একই সময়ে পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বিসিসিআইয়ের এথিক্স ব্যবস্থার আওতায় যায়। এই অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অরুণ মিশ্র (Justice Arun Mishra), তিনি বিসিসিআইয়ের এথিক্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারির নির্দেশে অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সৌরভের বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে বাস্তবে কী ধরনের সংঘাত তৈরি হয়েছে, তার পর্যাপ্ত তথ্য অভিযোগে পাওয়া যায়নি। কোনও একটি পদে কাজ করার কারণে অন্য পদে থাকা দায়িত্ব কী ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তা দেখানোর মতো প্রয়োজনীয় উপাদানও অভিযোগে ছিল না।
স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু একজন ব্যক্তির একাধিক পদে থাকা যথেষ্ট কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এথিক্স অফিসারের নির্দেশের মূল বক্তব্য ছিল, দুটি আলাদা দায়িত্ব থাকা মাত্রেই তা স্বয়ংক্রিয় ভাবে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করে না। দেখতে হবে, সেই দায়িত্বগুলির মধ্যে এমন কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, যার ফলে একজনের সিদ্ধান্ত অন্য পদে তাঁর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে বিরোধে চলে যায়। সৌরভের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে ‘রোল কমপ্রোমাইজ’ বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপসের কথাও বলা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে অরুণ মিশ্রের নির্দেশে বলা হয়েছিল, কোনও ব্যক্তির দুটি পৃথক দায়িত্ব তখনই সংঘাতের জায়গায় পৌঁছতে পারে, যখন একটি পদে তাঁর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অন্য পদের কর্তব্যের বিরোধ তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে তখন স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সৌরভের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করার মতো তথ্য অভিযোগে পাওয়া যায়নি।
নির্দেশে আরও বলা হয়েছিল, বিসিসিআইয়ের কাঠামোয় দুটি পৃথক পদে থাকা নিজে থেকেই নিষিদ্ধ নয়। বিধি ৩৮-এ যে ধরনের দায়িত্বগত সংঘাত বা ভূমিকার আপসের পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই বিবেচনার বিষয়। সৌরভের ক্ষেত্রে সেই ধরনের সংঘাতের প্রমাণ না থাকায় অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সৌরভের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা, নিরপেক্ষতার অভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক অথবা অন্য কোনও অনুচিত সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। কিন্তু আগের সিদ্ধান্তে এমন কোনও তথ্য সামনে আসেনি, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে তাঁর বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে গোপন যোগাযোগ বা পারস্পরিক সুবিধা নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সিএবি সভাপতি হিসেবে সৌরভের দায়িত্ব ও জেএসডব্লিউ স্পোর্টসের ক্রিকেট সংক্রান্ত দায়িত্বকে পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। একই ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি দলের কোচের দায়িত্বও আলাদা পরিসরের কাজ বলে ধরা হয়েছিল।
এই পুরনো সিদ্ধান্তই এখন সৌরভের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে বলে জানা যাচ্ছে। দিল্লি ক্যাপিটালসের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে সিএবি সভাপতি পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই আগের এথিক্স সিদ্ধান্তের দিকে তাকানো হচ্ছে। সূত্রের খবর, বিসিসিআইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার কারণে সিএবি সভাপতি পদ ছাড়ার কোনও পরিকল্পনা সৌরভের নেই। দিল্লি ক্যাপিটালসের তরফে ২০২৭ আইপিএলের জন্য সৌরভকে প্রধান কোচ করার ঘোষণা হওয়ার পর বিষয়টি আরও সামনে আসে। হেমাঙ্গ বাদানি (Hemang Badani) গত দুই মরসুম, অর্থাৎ ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব সামলেছেন। এবার তাঁর জায়গায় কোচিংয়ের দায়িত্বে আসছেন সৌরভ। জেএসডব্লিউ এবং জিএমআর (GMR) -এর যৌথ মালিকানাধীন দিল্লি ক্যাপিটালস নতুন মরসুমের আগে দলের নেতৃত্ব কাঠামোয় এই বড় পরিবর্তন করল।
দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে অবশ্য সৌরভের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শুধু নতুন করে প্রধান কোচের দায়িত্ব নেওয়াই নয়, এর আগেও তিনি ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ক্রিকেট পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলের মালিকপক্ষ, সাপোর্ট স্টাফ ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে নতুন দায়িত্ব তাঁর কাছে একেবারে অপরিচিত নয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও ক্রিকেটীয় পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি পূর্ব অভিজ্ঞ। প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরে সৌরভ নিজেও দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আইপিএলে প্রধান কোচের দায়িত্ব নিতে আমি দারুণ আগ্রহী। দিল্লি ক্যাপিটালস এমন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি, যা আমার হৃদয়ের খুব কাছের। বিগত বছরগুলিতে এই দলের সঙ্গে আমার সম্পর্কও অত্যন্ত ভালো। মালিকপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ, সাপোর্ট স্টাফ এবং ক্রিকেটারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। ফলে নতুন দায়িত্ব আমার কাছে আরও আকর্ষণীয়।’
সৌরভ আরও জানিয়েছেন, দলের বর্তমান শক্তি ও গত কয়েক বছরের ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন মরসুমে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তুলতে চান তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমাদের একটি দারুণ দল রয়েছে। গত কয়েক বছরে আমরা ভাল ক্রিকেট খেলেছি। এবার দলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করা, নতুন মরসুমের পরিকল্পনা তৈরি করা এবং একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলাই লক্ষ্য।’ সৌরভের সামনে এখন একদিকে যেমন দিল্লি ক্যাপিটালসকে আইপিএলে সাফল্য এনে দেওয়ার দায়িত্ব, অন্য দিকে রয়েছে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সিএবি সভাপতি হিসেবে তাঁকে রাজ্যের ক্রিকেট কাঠামো, ঘরোয়া ক্রিকেট, পরিকাঠামো এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় সামলাতে হয়। আর দিল্লি ক্যাপিটালসের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন, দলের ক্রিকেটীয় পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, কৌশল নির্ধারণ এবং ম্যাচের পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়া। দুই দায়িত্বের প্রকৃতি আলাদা হওয়ায় আপাতত সৌরভকে কোনও একটি পদ ছাড়তে হচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে। তবে আগামী দিনে এই দুই দায়িত্বের মধ্যে বাস্তবে কোনও সংঘাত তৈরি হয় কি না, সেটি নিয়ে নজর থাকবে ক্রিকেটমহলের। কারণ আইপিএলের মতো বড় প্রতিযোগিতায় কোচ হিসেবে সৌরভের সিদ্ধান্ত ও সিএবি সভাপতি হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা, দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে আলাদা দায়িত্বের সীমারেখা বজায় রাখতে হবে।
সৌরভের ক্রিকেটজীবন শেষ হওয়ার পর প্রশাসক হিসেবে তাঁর উত্থান ভারতীয় ক্রিকেটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সিএবি সভাপতি থেকে বিসিসিআই সভাপতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি সামলেছেন। এবার আবার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের কোচিংয়ে সরাসরি ফিরছেন। ফলে প্রশাসক সৌরভের পাশাপাশি কোচ সৌরভকেও নতুন ভূমিকায় দেখবে আইপিএল। ২০২৭ আইপিএল শুরু হওয়ার আগে দিল্লি ক্যাপিটালসকে নিয়ে তাই আগ্রহ বাড়ছে। দলের কোচ হিসেবে সৌরভের পরিকল্পনা কী হবে, নিলামের আগে দল গঠনে তাঁর মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে, কোন ধরনের ক্রিকেটারকে নিয়ে তিনি এগোতে চাইবেন, এসব প্রশ্ন সামনে আসবে। একই সঙ্গে সিএবি সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অব্যাহত থাকায় ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনেও তাঁর ভূমিকা থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দিল্লি ক্যাপিটালসের প্রধান কোচ হওয়ার পরেও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সিএবি সভাপতির চেয়ার ছাড়ছেন না। আগের এথিক্স সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান ছাড়পত্রের ভিত্তিতে আপাতত দুই দায়িত্বই তাঁর হাতে থাকছে। ফলে ২০২৭ সালের আইপিএলে একদিকে দিল্লি ক্যাপিটালসের ড্রেসিংরুমে কোচ সৌরভকে দেখা যাবে, অন্য দিকে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনে তাঁর সভাপতির ভূমিকাও বহাল থাকবে। ক্রিকেট প্রশাসন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট, দুই ভিন্ন ক্ষেত্রের এই দ্বৈত দায়িত্ব কী ভাবে সামলান ‘দাদা’, এখন সেদিকেই নজর ক্রিকেটমহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Saurav Das Opens Up About Marriage With Darshana Banik, Says ‘Work Never Enters Our Bedroom’ | ‘বেডরুমে কাজ ঢোকে না’! দাম্পত্য জীবন নিয়ে খোলামেলা সৌরভ দাস, স্ত্রী দর্শনা বণিকের প্রশংসা




