শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রেম, সম্পর্ক ও বিয়েকে ঘিরে সমাজের প্রচলিত ধারণা গত কয়েক দশকে অনেকটাই বদলেছে। একসময় যে সম্পর্ককে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হত, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তার সংজ্ঞা অনেকটাই বিস্তৃত। প্রেমের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব বেড়েছে। বিয়ের আগে দু’জন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া নিয়েও আগের মতো একই ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। সম্পর্কের এই পরিবর্তিত চেহারা নিয়েই নিজের মত প্রকাশ করেছেন পরিচালক কিরণ রাও (Kiran Rao)। নতুন প্রজন্মের প্রেমের ধরন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কিরণের বক্তব্য, সময় বদলানোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভাবনাতেও পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন। সামাজিক প্রত্যাশার নির্দিষ্ট ছক মেনে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও আগের মতো নেই। ব্যক্তিগত পছন্দ এবং নিজেদের সিদ্ধান্তকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা।

আরও পড়ুন : Sonali Kulkarni Aamir Khan | কেন ‘দঙ্গল’-এর আমিরকে আসল হিরো বললেন সোনালী?
সম্প্রতি ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ (Lust Stories 3)-এর প্রচারের সময় এক সাক্ষাৎকারে সম্পর্কের এই পরিবর্তিত সমীকরণ নিয়ে কথা বলেন কিরণ। তাঁর পরিচালিত গল্পে আধুনিক প্রজন্মের প্রেম, আকর্ষণ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। সেই প্রসঙ্গেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান প্রজন্ম কি প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন? তরুণদের সম্পর্ককে তিনি পরিচালক হিসেবে কীভাবে দেখেন? উত্তরে কিরণ জানান, তাঁর চোখে নতুন প্রজন্মকে অনেক বেশি স্বাধীনচেতা বলেই মনে হয়। তাঁর মতে, নিজেদের অনুভূতি, পছন্দ কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রকাশের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের তরুণদের সামনে আগের তুলনায় বেশি সুযোগ রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমাদের প্রজন্মের সময়ের তুলনায় এখনকার তরুণেরা নিজেদের কথা বলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন। পৃথিবীর কাঠামোটাও বদলেছে। সেই পরিবর্তনই গল্পের মধ্যে ধরার চেষ্টা করেছি।’
কিরণের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি নতুন প্রজন্মের সম্পর্ককে শুধুমাত্র প্রেম বা বিয়ের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে দেখছেন না। তাঁর মতে, দু’জন মানুষের মধ্যে আকর্ষণ তৈরি হলেই তার পরিণতি যে বিয়ে হতে হবে, এমন ধারণা বর্তমান সময়ে অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কোনও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বেড়েছে। ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’-এর গল্পের প্রসঙ্গ টেনে কিরণ এমন একটি পরিস্থিতির কথা বলেন, যেখানে দু’জন তরুণ-তরুণী একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হলেও তাঁরা প্রচলিত অর্থে কোনও সম্পর্কে আবদ্ধ নন। এই অবস্থান থেকেই গল্পের নানা মোড় তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে সম্পর্কটি কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারিত নয়। পরিস্থিতি, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের সঙ্গে গল্প এগিয়ে যায়।
কিরণের মতে, এই অনিশ্চয়তার জায়গাটিই আধুনিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আগে যেখানে প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করত, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্কের ধরনও একরকম থাকছে না। একই সঙ্গে মানসিক ঘনিষ্ঠতা, শারীরিক আকর্ষণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলিও সম্পর্কের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। নিজেদের প্রজন্মের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করতে গিয়ে কিরণ জানান, তাঁদের সময়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়মের প্রভাব অনেক বেশি ছিল। বিয়ের আগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সমাজের বড় অংশ সহজভাবে নিত না। এমনকি বিয়ের পরেও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে আবেগের যোগাযোগ তৈরি হলে সেটিকে ভালো চোখে দেখা হত না। বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি সেই জায়গা থেকে অনেকটাই তিনি আলাদা বলে মনে করেন।
কিরণের কথায়, ‘আমাদের সময়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করা হত। বিয়ের আগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি সহজভাবে নেওয়া হত না। বিয়ের পরেও দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে আবেগের যোগ তৈরি হলে সেটি মেনে নেওয়ার প্রবণতা ছিল কম। এখন সেই সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গিয়েছে।’ তাঁর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিরণ মনে করেন, বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ বিয়েকে সম্পর্কের একমাত্র পরিণতি হিসেবে দেখেন না। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন এবং সেই সম্পর্ক মানসিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও ধারণ করতে পারে। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জায়গাটি আগের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে।
পরিচালকের মতে, এই পরিবর্তনকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখার পরিবর্তে সময়ের পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখা দরকার। কারণ সমাজের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধরনও বদলায়। নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেম মানেই যে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া, এমন ধারণা আর সর্বত্র কার্যকর নয়। সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতি, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের গুরুত্ব বেড়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন কিরণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে স্বাধীন মানসিকতা দেখা যাচ্ছে, সেটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে আধুনিক প্রেমের গল্পে শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার প্রচলিত সম্পর্ক দেখালেই বর্তমান সময়ের পুরো ছবিটা ধরা যায় না। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আকর্ষণ, দ্বিধা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক প্রত্যাশা এবং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
কিরণের এই বক্তব্য ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’-এর বিষয়বস্তুর সঙ্গেও সম্পর্কিত। নেটফ্লিক্স (Netflix)-এ সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এই অ্যান্থলজি সিরিজে একাধিক পরিচালকের তৈরি আলাদা গল্প রয়েছে। কিরণ রাওয়ের পাশাপাশি আরও তিন জন পরিচালক এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেকটি গল্পে সম্পর্কের ভিন্ন পরিস্থিতি এবং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। কিরণের পরিচালিত অংশে নতুন প্রজন্মের সম্পর্কের যে জায়গাটি উঠে এসেছে, তার সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যের যোগ রয়েছে। প্রেমের ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ম কতটা কার্যকর, ব্যক্তিগত আকর্ষণ কীভাবে সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিতে পারে এবং দু’জন মানুষের সিদ্ধান্ত কীভাবে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে, এই প্রশ্নগুলিই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু, কিরণের বক্তব্য শুধুমাত্র তরুণ প্রজন্মকে প্রশংসা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একটি সামাজিক পরিবর্তনের দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর নিজের প্রজন্ম এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিই তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়। একসময় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যেখানে সম্পর্কের বড় নিয়ামক ছিল, এখন সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দের ভূমিকা বেড়েছে। সমাজে সম্পর্কের এই বদল নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কেউ এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসার হিসেবে দেখেন, আবার কারও কাছে বিষয়টি সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কিরণের বক্তব্যে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা হল, সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রেমের ভাষাও বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম নিজেদের সম্পর্ককে আগের প্রজন্মের নির্ধারিত কাঠামোয় সবসময় আটকে রাখতে চাইছে না।
আরও পড়ুন : Aamir Khan, Kiran Rao | বিচ্ছেদের পরও একইরকম ঘনিষ্ঠতা! কিরণ ও আমিরের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন পরিচালক
‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ সেই পরিবর্তিত সম্পর্কের জগতেরই একটি চলচ্চিত্রভিত্তিক উপস্থাপনা। আর সেই কাজের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিরণ রাও যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বিয়ের আগে সম্পর্ক, মানসিক ঘনিষ্ঠতা ও শারীরিক সম্পর্কের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, আজকের পৃথিবী আগের সময়ের মতো নেই; তাই বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ককে বোঝার ক্ষেত্রেও পুরনো মাপকাঠি সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। কিরণের কথায়, ‘আজকের পৃথিবীতে সম্পর্কের ধরন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আমরা যে সময়ে বেঁচে আছি, সেই সময়ের বাস্তবতাকে গল্পে তুলে ধরাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য।’ তাঁর বক্তব্যে তাই শুধু একটি ওয়েব সিরিজের প্রচার নয়, বদলে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কের ছবিও উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amir Khan : কিরণ রাওয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে মুখ খুললেন আমির খান




