সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : দেশজুড়ে ডিজিটাল পেমেন্টের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা UPI, সেই UPI ব্যবহারের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে কেন্দ্র। ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা MDR চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলেও আপাতত সেই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার পথে কোনও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল না শীর্ষ আদালত। ফলে কেন্দ্রের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন MDR কাঠামো চালু হওয়ার সম্ভাবনাই থাকছে। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনাকে (V. Mohana) নিয়ে গঠিত বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। আইনজীবী অঞ্জন দত্ত (Anjan Datta) কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেছিলেন। তাঁর আবেদনে ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট UPI ব্যবসায়িক লেনদেনে MDR বসানোর সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মামলাটি শুনতে গিয়ে শীর্ষ আদালত কেন্দ্রের কাছে এই ব্যবস্থার ভিত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

শুনানিতে কেন্দ্রের হয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এন বেঙ্কটরামন (N Venkataraman)। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় UPI ব্যবহারের অধিকাংশ লেনদেনের উপর MDR কার্যকর হবে না। কেন্দ্রের তরফে আদালতকে জানানো হয়েছে, UPI গেটওয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশ লেনদেন এই চার্জের আওতার বাইরে থাকবে। ফলে সাধারণ ছোট অঙ্কের ডিজিটাল লেনদেনে নতুন নিয়মের প্রভাব পড়বে না বলেই কেন্দ্রের বক্তব্য। কেন্দ্রের ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট Person-to-Merchant বা P2M UPI লেনদেনে ২,০০০ টাকার বেশি অর্থ পাঠানো হলে ০.৪ শতাংশ হারে MDR ধার্য করা হবে। তবে বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে এই মাশুলের সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের লেনদেনে MDR-এর সর্বোচ্চ অঙ্ক ৩০০ টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়লেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এই সীমার বেশি MDR নেওয়ার কথা নয়।
কিন্তু, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এই MDR সরাসরি UPI ব্যবহারকারী সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়ার কথা নয়। এটি মূলত মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ীর লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত কাঠামো। পেমেন্ট গ্রহণের জন্য যে অ্যাকোয়ারিং ব্যাঙ্ক (Acquiring Bank) ব্যবহৃত হয়, সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে MDR আদায় করা হবে। ফলে কোনও দোকানে ২,৫০০ টাকার পণ্য কিনে UPI-তে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে আলাদা করে ১০ টাকা বা অন্য কোনও অঙ্ক কেটে নেওয়ার কথা নয়। কেন্দ্রের কাঠামোয় MDR ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না। অর্থাৎ P2P UPI লেনদেন আগের মতোই বিনা মাশুলে চালু থাকার কথা। ছোট অঙ্কের দৈনন্দিন লেনদেনও নতুন MDR কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যকে টাকা পাঠানো, বন্ধুকে অর্থ দেওয়া কিংবা অন্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনে UPI ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবিত MDR কার্যকর হবে না।
রুপে ডেবিট কার্ডের (RuPay Debit Card) লেনদেন নিয়েও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি কাঠামো অনুযায়ী, রুপে ডেবিট কার্ডের লেনদেন এই MDR-এর আওতায় পড়বে না। একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কম মার্জিনের পরিষেবার জন্য আলাদা হারে MDR নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। রেল পরিষেবা, জ্বালানি, টেলিকম, বিমা ও কৃষি-উপকরণের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত MDR রাখার কথা রয়েছে। পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রেও আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড, সিকিউরিটিজ এবং স্টকব্রোকার বা ডিলারের মাধ্যমে হওয়া নির্দিষ্ট লেনদেনে ০.০২ শতাংশ MDR প্রযোজ্য হতে পারে। এখানেও সর্বোচ্চ সীমা ৩০০ টাকা রাখা হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতে মূল প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থ আদায়ের আইনি ভিত্তি কী। শুনানিতে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানতে চায়, এটি কর, ফি, না কি অন্য কোনও ধরনের আর্থিক মাশুল। আদালত কেন্দ্রকে হলফনামার মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দিয়েছে। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মামলাটির একটি বড় অংশ প্রযুক্তিগত ও নীতিগত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলেও, চার্জ আরোপের আইনগত ভিত্তিও আদালতের বিবেচনার বিষয়।
মামলাকারীর তরফে অবশ্য এই পর্যায়ে MDR চালুর উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়েছিল। যুক্তি ছিল, আদালতে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়ম কার্যকর না করা হোক। কিন্তু প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। ফলে অন্তত এই মুহূর্তে ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর করার ক্ষেত্রে আদালতের কোনও অন্তর্বর্তী বাধা নেই। মামলা এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। কেন্দ্র, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India বা RBI), ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (National Payments Corporation of India বা NPCI) ও সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলিকে নোটিস দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ MDR কাঠামোর আইনি ভিত্তি, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশ্ন আদালতের পরবর্তী শুনানিতে আরও বিস্তারিত ভাবে উঠতে পারে।
UPI-এর ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ কারণ গত কয়েক বছর ধরে এই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত হয়েছে। এত দিন UPI ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলাদা MDR না থাকায় ছোট দোকান থেকে বড় ব্যবসা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে QR কোডের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এবার নির্দিষ্ট উচ্চমূল্যের ব্যবসায়িক লেনদেনে MDR যুক্ত হলে ব্যবসায়ীদের পেমেন্ট ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নতুন নিয়মের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে তা কার্যকর হওয়ার পরেই। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে ২,০০০ টাকার সীমা সব ধরনের UPI লেনদেনের জন্য নয়। প্রস্তাবিত কাঠামো মূলত নির্দিষ্ট Person-to-Merchant বা ব্যবসায়ীর কাছে করা পেমেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফলে ‘২,০০০ টাকার বেশি UPI করলেই চার্জ’ এমন সরল ব্যাখ্যা পুরো ব্যবস্থাকে প্রকাশ করে না। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির লেনদেন এবং নির্দিষ্ট ছোট অঙ্কের পেমেন্টের ক্ষেত্রে আগের মতোই মাশুলমুক্ত ব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছে কেন্দ্র। ফলে আপাতত UPI ব্যবহারকারীদের সামনে ছবিটা এমন, ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক UPI লেনদেনে ১৫ অক্টোবর থেকে ০.৪ শতাংশ MDR চালুর প্রস্তুতি রয়েছে, কিন্তু এই মাশুল সরাসরি গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানোর কথা নয়। ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লেনদেনে সাধারণ MDR-এর সর্বোচ্চ সীমা ৩০০ টাকা। অন্য দিকে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন নতুন ব্যবস্থার বাইরে। একই সঙ্গে এই পুরো কাঠামোর আইনি ভিত্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে।
অতএব, সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের শুনানির পর আপাতত কেন্দ্রের MDR চালুর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পথেই রয়েছে। তবে আদালতের পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রের হলফনামা আর অন্যান্য পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থার আইনি বৈধতা নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। ১৫ অক্টোবরের আগে সেই আইনি লড়াই কোন দিকে যায়, এখন লক্ষ্য থাকবে সেদিকেই।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : ISRO satellite monitoring, Himalayan glacial lakes | হিমালয়ের ২৮ হাজার হিমবাহ হ্রদে নজরদারি, সিকিমের বিপর্যয়ের পর আরও কড়া হচ্ছে ভারতের প্রস্তুতি




