সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নাগোয়া : নাগোয়া এশিয়ান গেমসে (Nagoya Asian Games 2026) ভারতের অ্যাথলেটিক্সে অবশেষে এল সোনার সাফল্য। মহিলাদের ৪x৪০০ মিটার রিলেতে দুরন্ত দৌড়ে সোনা জিতল ভারতীয় দল। একই দিনে পুরুষদের ৪x৪০০ মিটার রিলেতে ব্রোঞ্জ এবং মিক্সড ৪x১০০ মিটার রিলেতেও ব্রোঞ্জ এসেছে ভারতের ঝুলিতে। এর সঙ্গে পুরুষদের ৫০০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জিতে গুলবীর সিং (Gulveer Singh) নিজের পদকের সংখ্যা তিনে নিয়ে গেলেন। এক এশিয়ান গেমসে তিনটি ব্যক্তিগত পদক জয়ের কীর্তিতে তাঁর নাম উঠে এল ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে। মহিলাদের ৪x৪০০ মিটার রিলেতে বিথ্যা রামরাজ (Vithya Ramraj), কিরণ পাহল (Kiran Pahal), মাচেত্তিরা পূভাম্মা (Machettira Poovamma) এবং প্রাচী চৌধুরী (Prachi Choudhary) -এর ভারতীয় দল ফাইনালে ৩ মিনিট ২৯.৬৯ সেকেন্ড সময় করে প্রথম স্থান দখল করে। এশিয়ান গেমসের চলতি আসরে অ্যাথলেটিক্সে ভারতের প্রথম সোনার পদকও এল এই ইভেন্ট থেকেই। একই সঙ্গে এটি ভারতের ষষ্ঠ সোনা। ফাইনালের শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত লড়াই ঘুরিয়ে দিয়ে সোনা ছিনিয়ে নেয় ভারত।
ফাইনালের শুরুটা অবশ্য ভারতীয় দলের পক্ষে খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। প্রথম ল্যাপ শেষে ভারত ছিল চতুর্থ স্থানে। কিন্তু পরের ল্যাপগুলিতে ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে থাকে দল। একে একে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছনে ফেলে সামনের দিকে উঠে আসে ভারত। শেষ পর্যন্ত ৩:২৯.৬৯ সময়ে দৌড় শেষ করে সোনা নিশ্চিত করে ভারতীয় চতুষ্টয়। বাহরাইন ৩:৩০.২১ সময়ে রুপো এবং চিন ৩:৩১.০২ সময়ে ব্রোঞ্জ পায়। ভারতের জন্য এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এশিয়ান গেমসের অ্যাথলেটিক্সে সোনা জয়ের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকল। ১৯৯৮ সালের পর থেকে এশিয়ান গেমসের প্রতিটি আসরেই ভারত অন্তত একটি অ্যাথলেটিক্স সোনা জিতেছে। নাগোয়ায় মেয়েদের ৪x৪০০ মিটার রিলের সাফল্য সেই ধারাই ধরে রাখল।
মহিলাদের রিলেতে সোনার পর পুরুষদের ৪x৪০০ মিটার রিলের দিকে তাকিয়েছিল ভারতীয় শিবির। হিটে ভাল দৌড়ের পর ফাইনালেও পদকের প্রত্যাশা ছিল। ধর্মবীর চৌধুরী (Dharmveer Chaudhary), মনু থেক্কিনিল (Manu Thekkinalil), জয় কুমার (Jai Kumar) ও বিশাল থেনারসু (Vishal Thennarasu) -এর দল শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ জেতে। ফাইনালে ভারতীয় দলের সময় ছিল ৩ মিনিট ১.৬১ সেকেন্ড। হিটে তারা ৩ মিনিট ০.৩২ সেকেন্ড সময় করেছিল। ফলে যোগ্যতা পর্বের তুলনায় ফাইনালে কিছুটা ধীর হয়ে যায় ভারতের দৌড়। হিটে যে সময় করেছিল ভারত, ফাইনালেও কাছাকাছি সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে সোনার লড়াই আরও কঠিন হতে পারত। কারণ যোগ্যতা পর্বে ভারতীয় দল নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছিল। ফাইনালে অবশ্য সেই গতি পুরোপুরি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত সোনা হাতছাড়া হলেও ব্রোঞ্জ নিয়ে মঞ্চে উঠেছে ভারত।
এর মধ্যেই চমক দিয়েছে ভারতের মিক্সড ৪x১০০ মিটার রিলে দল। এই ইভেন্টে বড় পদকের প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ফাইনালে নিজেদের মরসুমের সেরা সময় করে ব্রোঞ্জ জিতে নেয় ভারত। হরিতা ভদ্র (Harita Bhadra), অনিমেষ কুজুর (Animesh Kujur), স্নেহা সত্যনারায়ণ (Sneha Sathyanarayana) এবং গুরবিন্দর সিং (Gurindervir Singh)-এর দল ৪১.০৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে তৃতীয় হয়। চিন ৪০.৭৮ সেকেন্ডে সোনা এবং থাইল্যান্ড ৪০.৮৭ সেকেন্ডে রুপো জেতে। মিক্সড রিলের এই ব্রোঞ্জ ভারতের অ্যাথলেটিক্সে নতুন ধরনের সাফল্যের ইঙ্গিতও দিয়েছে। পুরুষ ও মহিলা অ্যাথলেটদের একসঙ্গে নিয়ে গড়া এই দল ফাইনালে নিজেদের মরসুমের সেরা সময় করেছে। ফলে প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফল এনে দিয়েছে ভারতীয় দল।
কিন্তু, দিনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত নজির গড়েছেন গুলবীর সিং। পুরুষদের ৫০০০ মিটার দৌড়ে ১৩ মিনিট ৩২.৭৫ সেকেন্ড সময় করে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি। এর আগে চলতি এশিয়ান গেমসে ১০,০০০ মিটার এবং ১৫০০ মিটারে রুপোর পদক জিতেছিলেন গুলবীর। ৫০০০ মিটারের ব্রোঞ্জ তাঁর এশিয়ান গেমসের মোট পদকসংখ্যা তিনে নিয়ে গেল। একই এশিয়ান গেমসে ১০,০০০ মিটার, ১৫০০ মিটার এবং ৫০০০ মিটারে পদক জেতা গুলবীরের জন্য বড় কৃতিত্ব। তিনটি আলাদা ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জিতে তিনি ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ঐতিহাসিক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। ১৯৮৬ সালের এশিয়ান গেমসে পি টি উষা (P T Usha) চারটি পদক জিতেছিলেন। গুলবীরের তিনটি ব্যক্তিগত পদকের কীর্তি সেই পুরনো সাফল্যের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। উষার ১৯৮৬ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসের পারফরম্যান্স ছিল ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তিনি ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার ও ৪০০ মিটার হার্ডলসে সোনা জিতেছিলেন। ১০০ মিটারে পেয়েছিলেন রুপো। পাশাপাশি সোনাজয়ী ৪x৪০০ মিটার রিলে দলেরও সদস্য ছিলেন তিনি। ফলে একটি এশিয়ান গেমসে তাঁর পদকের সংখ্যা হয়েছিল চার। গুলবীর এবার তিনটি ব্যক্তিগত পদক জিতে সেই ঐতিহাসিক কীর্তির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের একটি যোগসূত্র তৈরি করলেন।
গুলবীরের পদকযাত্রা শুরু হয়েছিল ১০,০০০ মিটার দিয়ে। সেই ইভেন্টে রুপো জেতার পর ১৫০০ মিটারেও রুপো পান তিনি। এরপর ৫০০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জয় তাঁর নাগোয়া অভিযানকে আরও সমৃদ্ধ করল। একই আসরে মাঝারি ও দীর্ঘ দূরত্বের একাধিক ইভেন্টে ধারাবাহিক ভাবে পদক জেতা ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সে বিরল কৃতিত্বের মধ্যে পড়ে। অ্যাথলেটিক্সের পদকের তালিকায় আরও একটি ব্রোঞ্জ যোগ হয়েছে মেয়েদের হাই জাম্পে। পূজা সিং (Pooja Singh) ১.৮৪ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর এই পদকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এশিয়ান গেমসে মেয়েদের হাই জাম্পে ভারতের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ২০০২ সালের পর এই ইভেন্টে ভারতের প্রথম পদক এল পূজার হাত ধরে। মেয়েদের হ্যামার থ্রোতেও ভারতীয় অ্যাথলেটদের লড়াই ছিল। তন্যা চৌধুরী (Tanya Chaudhary) ৬৫.৩৫ মিটার দূরত্বে হ্যামার ছুড়ে নিজের কেরিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স করেন। কিন্তু সেই পারফরম্যান্স তাঁকে পদক এনে দিতে পারেনি। অনুষ্কা যাদবও (Anushka Yadav) ৬৪.৫৬ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত পদকের বাইরে থাকেন।
নাগোয়া এশিয়ান গেমসের এই পর্ব তাই ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের জন্য একসঙ্গে একাধিক সাফল্য নিয়ে এল। মেয়েদের ৪x৪০০ মিটারে সোনা, পুরুষদের ৪x৪০০ মিটারে ব্রোঞ্জ, মিক্সড ৪x১০০ মিটারে ব্রোঞ্জ, গুলবীর সিংয়ের ৫০০০ মিটারে ব্রোঞ্জ এবং পূজা সিংয়ের হাই জাম্পে ব্রোঞ্জ—এক দিনে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে ভারতের পদকের ঝুলি ভারী হয়েছে। তার মধ্যে গুলবীরের তিন ব্যক্তিগত পদকের নজির এবং মেয়েদের ৪x৪০০ মিটারে সোনা দিনের সাফল্যের তালিকায় আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। নাগোয়ায় অ্যাথলেটিক্সে ভারতের প্রথম সোনা এল মেয়েদের রিলের হাত ধরে। আর গুলবীর সিংয়ের তিন পদকের কীর্তি দেখিয়ে দিল, ব্যক্তিগত ইভেন্টেও ভারতীয় অ্যাথলেটরা দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে এক দিনের এই সাফল্য তাই ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের পদকযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Asian Games 2026 Cricket, India vs Sri Lanka | এশিয়ান গেমসে বৃষ্টির দাপট, ভারতের সেমিফাইনাল প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা




