সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি : গুয়াহাটির উপকণ্ঠে একটি হোমস্টেকে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Gauhati University) তরুণী ছাত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ২২ বছর বয়সী নিমিশা ঠাকুরিয়ার (Nimisha Thakuria) মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিচিত যুবক আশিক আলিকে (Ashiq Ali) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মৃত্যুর আগে পরিবারের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথোপকথন, সেখানে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ, তার পরেই মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার, পরপর এই ঘটনাগুলিই তদন্তকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। অন্য দিকে, পুলিশের কাছে আশিকের দাবি, নিমিশা নিজেই সিলিং ফ্যানে গলায় ফাঁস দিয়েছিলেন। সেই বক্তব্য এখনও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিমিশা বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধারাপুর এলাকার ‘রুদ্রাস কিচেন’ (Rudra’s Kitchen) নামে একটি হোমস্টেতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে আশিক আলিও ছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। শনিবার ভোরের দিকে গারাল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছে নিমিশাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। আশিক এবং আরও দু’জন তাঁকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে গুরুতর অবস্থায় তাঁকে গৌহাটি মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে (Gauhati Medical College and Hospital) পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিমিশা গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিদ্যার ছাত্রী ছিলেন এবং পাঁচ বছরের ইন্টিগ্রেটেড কোর্সে পড়াশোনা করছিলেন। ধারাপুরের বাসিন্দা এই তরুণী পরিবারের বড় মেয়ে ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এলাকায় ক্ষোভ ছড়াতে শুরু করে। পুলিশের হাতে আটক আশিকের সঙ্গে নিমিশার পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বর্তমানে তাঁর বক্তব্য, হোমস্টের পরিস্থিতি এবং ঘটনার আগে ও পরে তাঁর গতিবিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিমিশার শেষ ফোনালাপ। পরিবারের দাবি, রাত প্রায় ২টার দিকে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন তিনি। সেই কথোপকথনে তিনি শারীরিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে তাঁর বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তাঁর শরীরে আঘাতের কথা বলার পাশাপাশি শ্বাসকষ্টের কথাও তিনি জানিয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি। ফোন কেটে যাওয়ার পর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পরে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের তরফে বিষয়টি আজারা থানায় জানানো হলে পুলিশ তাঁর খোঁজ শুরু করে। কিছু সময় পর গারাল এলাকায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।
অন্য দিকে, পুলিশের কাছে আশিকের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর দাবি, হোমস্টের ঘরে নিমিশা সিলিং ফ্যানে গলায় ফাঁস দিয়েছিলেন। পুলিশের ডেপুটি কমিশনার বলিন দেওরি (Bolin Deuri) জানিয়েছেন, এই বক্তব্য তদন্তের অংশ হিসেবেই যাচাই করা হচ্ছে। কোনও একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রমাণ সামনে আসার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কথা জানিয়েছে পুলিশ। মৃতদেহের প্রাথমিক পরীক্ষায় আঘাতের চিহ্নের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে আত্মহত্যার দাবি, পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগ ও শারীরিক অবস্থার মধ্যে কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় এসেছে। এই মুহূর্তে নিমিশার মৃত্যু আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা না অন্য কোনও কারণে, তা সরকারি ভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি। ময়নাতদন্তের ফল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ঘটনার পর তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে ওই হোমস্টেটিও। পুলিশ ‘রুদ্রাস কিচেন’ সিল করে দিয়েছে। তদন্তকারীরা সেখানে থাকা রেজিস্টার, অতিথিদের নথি ও অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করছেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অতিথিদের পরিচয় সংক্রান্ত নথি সংরক্ষণে ঘাটতির অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, নিমিশা ও আশিক কখন সেখানে পৌঁছেছিলেন, কতক্ষণ ছিলেন এবং সেই সময় হোমস্টেতে আর কারা উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য নথিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। হোমস্টেতে নিমিশা ও আশিকের আগেও যাতায়াত ছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওই দু’জন এক মাসে প্রায় পাঁচ বার সেখানে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে। তবে এই তথ্যের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের মূল লক্ষ্য, মৃত্যুর আগে শেষ কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী ঘটেছিল, তার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করা।
নিমিষার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শনিবার আজারা এলাকায় জাতীয় সড়ক ১৭-এ বিক্ষোভ হয়। ওই রাস্তা গুয়াহাটি বিমানবন্দরমুখী গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হওয়ায় অবরোধের প্রভাব পড়ে যান চলাচলে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ঘটনাটিকে ‘লাভ জিহাদ’ বলে দাবি করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে ‘লাভ জিহাদ’ অভিযোগকে পুলিশের প্রমাণিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে না। পুলিশ কোনও নির্দিষ্ট তত্ত্বকে সামনে রেখে তদন্ত না চালিয়ে ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছে। এই ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াও ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। এক দিকে নিমিশার পরিবারের অভিযোগ, অন্য দিকে আটক যুবকের বক্তব্য, দুইয়ের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ফলে তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হল প্রত্যেকটি দাবির সঙ্গে বাস্তব প্রমাণের মিল খুঁজে দেখা। মোবাইল ফোনের তথ্য, কলের বিবরণ, হোমস্টের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের ফল, সবকিছুকে পাশাপাশি রেখে তদন্ত এগোনোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিমিশার পরিবারের তরফে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, পুলিশ আশিক আলিকে হেফাজতে রেখে তাঁর বক্তব্য যাচাই করছে। এই ঘটনায় এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো সব তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ‘আত্মহত্যা’ থেকে ‘হত্যা’ কিংবা বিক্ষোভকারীদের তোলা ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগ, কোনওটিকেই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। গুয়াহাটির এই ঘটনায় তাই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তথ্যের দিকে নজর রয়েছে। নিমিশার শেষ ফোনালাপের বিষয়বস্তু, হোমস্টের ঘরের পরিস্থিতি, তাঁর শরীরে আঘাতের প্রকৃতি ও আশিকের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য প্রমাণের মিল, প্রতিটি দিকই তদন্তের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিমিশা ঠাকুরিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam Child Marriage News, Himanta Biswa Sarma Child Marriage Action | অসমে বাল্যবিবাহ রুখতে কড়া অভিযান, রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে নতুন গুরুত্ব পেল হিমন্ত সরকারের উদ্যোগ




