সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নাগোয়া: তিন বছর আগে একটা দুর্ঘটনা তাঁর জীবনটাই বদলে দিয়েছিল। অনুশীলন সেরে অটোয় চেপে বাড়ি ফেরার পথে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন কমলজিৎ (Kamaljeet)। অটোর দুই সহযাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর নিজের ঊরুর হাড় ভেঙে গিয়েছিল, শরীরের আরও কয়েকটি জায়গায় লেগেছিল চোট। প্রায় এক মাস হাসপাতালের বিছানায় কাটাতে হয়েছিল ২৩ বছরের তরুণকে। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি আদৌ আগের মতো হাঁটতে পারবেন কি না। সেই জায়গা থেকে ফিরে শুক্রবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে দেশের হয়ে সোনা জিতলেন হরিয়ানার এই শুটার। সুরুচি সিংহ ইন্দর (Suruchi Singh Inder) -এর সঙ্গে জুটি বেঁধে ১০ মিটার এয়ার পিস্তল মিক্সড টিম ইভেন্টে সোনা এনে দিলেন ভারতকে। এশিয়ান গেমস ২০২৬-এ এটি ভারতের দ্বিতীয় সোনা এবং শুটিংয়ে দেশের প্রথম সোনা।
কমলজিতের সাফল্যের পিছনে তাই শুধু কয়েকটি নিখুঁত শটের গল্প নেই। রয়েছে হাসপাতালের দীর্ঘ দিন, চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পরিবারের দুশ্চিন্তা, পুরনো পিস্তল দিয়ে অনুশীলন, বাড়িতে ইট ও ডাম্বল নিয়ে শরীরচর্চা ও নিজের স্বপ্নকে বার বার নতুন করে সাজানোর কাহিনি। যে তরুণ এক সময় অ্যাথলেটিক্সে দৌড়তেন এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, দুর্ঘটনার পরে সেই দৌড়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শুটিংই তাঁকে অন্য একটি রাস্তা দেখায়। সেই পথ ধরে শুক্রবার এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে উঠে দেশের পতাকা উঁচু করলেন তিনি। ২০২৩ সালে অনুশীলন শেষে গ্রামের বাড়ি সুলখার দিকে অটোয় ফিরছিলেন কমলজিৎ। পথেই দুর্ঘটনা। ঘটনাটি শুধু তাঁর শরীরেই চোট দেয়নি, পরিবারকেও প্রবল আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। গুরগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ঊরুর ফিমার হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য চিকিৎসা চলে দীর্ঘ সময়। প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকার পরে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য প্রায় চার লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা রতিরাম (Ratiram)। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে সেই খরচ মেটাতে হয়েছিল পরিবারকে।
কমলজিতের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব স্বচ্ছল ছিল না। যৌথ পরিবারের হাতে প্রায় দুই একর কৃষিজমি থাকলেও সেই জমির আয় দিয়ে সংসারের সব খরচ সামলানো কঠিন। তাঁর বাবা রতিরাম স্থানীয় একটি রঙের কারখানায় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এমন একটি পরিবারের পক্ষে শুটিংয়ের মতো খরচসাপেক্ষ খেলায় ছেলের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু কমলজিতের প্রতিভা এবং আগ্রহ দেখে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর কাকা দীনেশ সোহলট (Dinesh Sohlot) এবং প্রশিক্ষক শক্তিপাল (Shaktipal)। মজার বিষয় হল, কমলজিতের প্রথম স্বপ্ন শুটার হওয়া ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি অ্যাথলেটিক্স করতেন। শরীরকে শক্তিশালী রাখার জন্য দৌড়ঝাঁপ ছিল তাঁর নিত্যদিনের অনুশীলনের অংশ। ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পরে দৌড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কার্যত শেষ হয়ে যায়। তখন জীবনের নতুন রাস্তা খুঁজতে গিয়ে শুটিংকে বেছে নেন তিনি। পরে খেলোয়াড় কোটায় ভারতীয় সেনায় হাবিলদার পদেও যোগ দেন।
শুটিংয়ের সঙ্গে কমলজিতের পরিচয় অবশ্য দুর্ঘটনার পরে নয়। ২০১৯ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে কাকা দীনেশ তাঁকে একটি শুটিং অ্যাকাডেমিতে নিয়ে যান। সেই অ্যাকাডেমি চালাতেন দীনেশের বন্ধু শক্তিপাল। প্রথম দেখাতেই তরুণ কমলজিতের শরীরের গঠন আর সহনশীলতা নজর কাড়ে প্রশিক্ষকের। কিন্তু পরিবার থেকে দামি পিস্তল কেনা বা নিয়মিত প্রশিক্ষণের খরচ বহন করার সামর্থ্য ছিল না। তাই শক্তিপাল নিজের দায়িত্বে তাঁকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। কাকা দীনেশও ভাইপোর জন্য অর্থ জোগাড় করতে ধার করেছিলেন। প্রথম দিকে শুটিং ছিল অনেকটা নতুন অভিজ্ঞতা। কমলজিতের নিজের কোনও পিস্তলও ছিল না। অ্যাকাডেমিতে অন্যদের ব্যবহৃত অস্ত্র দিয়েই অনুশীলন করতে হত। প্রশিক্ষক শক্তিপাল তাঁর শরীরের গঠন, কনুইয়ের স্বাভাবিক অবস্থান, ধৈর্য এবং লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা দেখে ধীরে ধীরে তাঁকে তৈরি করতে থাকেন। দিনে ৫০ থেকে ৬০টি শট নেওয়ার অনুশীলনেও কমলজিৎ বিরক্ত হতেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রশিক্ষক। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে ধৈর্য ও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণের কথাই উঠে এসেছে।
কমলজিতের উন্নতির প্রমাণ মিলতে শুরু করে কয়েক বছরের মধ্যেই। তিনি ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু করেন। ২০২৩ সালে জুনিয়র পর্যায়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য পান। একই বছরে চাংওয়ান (Changwon) আইএসএসএফ বিশ্বকাপে ৫০ মিটার পিস্তল দলগত ইভেন্টে সোনা জেতেন এবং ব্যক্তিগত ফাইনালে সপ্তম হন। বাকুতে জুনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও ৫০ মিটার পিস্তলে ১১তম স্থান অর্জন করেন। পরে জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এর মধ্যেই আসে দুর্ঘটনা। যে সময় তাঁর ক্রিকেট বা অ্যাথলেটিক্স নয়, শুটিংয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই চলছিল, ঠিক তখনই গুরুতর চোট সবকিছু থামিয়ে দেয়। ভাঙা ফিমার নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা কমলজিতের সামনে তখন শুটিংয়ে ফিরে আসার প্রশ্নই ছিল সবচেয়ে বড়। পরিবারও জানত না, চিকিৎসার পরে তাঁর স্বাভাবিক জীবন কতটা ফিরবে। কিন্তু সেই কঠিন সময় পেরিয়ে তিনি আবার অনুশীলনে ফিরলেন।
নিজের শরীরকে আগের অবস্থায় ফেরাতে বাড়িতেও অনুশীলন করতেন কমলজিৎ। দামি জিমের সরঞ্জাম ছিল না। কয়েকটি ডাম্বল ছিল। আর ছিল ইট। পিস্তল ধরে রাখার মতো ভঙ্গি তৈরি করতে ইট তুলে হাতের শক্তি বাড়াতেন তিনি। প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। শুটিংয়ের আর্থিক চাপের কথাও কমলজিতের পরিবারের গল্পে বার বার ফিরে আসে। গত বছর পর্যন্ত নিজের পিস্তলও ছিল না তাঁর। অন্যদের ব্যবহৃত অস্ত্র দিয়েই অনুশীলন করেছেন। পরে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে নিজের পিস্তল কেনেন। সেই অস্ত্র দিয়েই আরও নিয়মিত অনুশীলন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জোগাড় করাও যে তাঁর যাত্রার বড় অংশ ছিল, পরিবারের বক্তব্যে তা উঠে এসেছে।
এশিয়ান গেমসের মঞ্চে তাঁর সাফল্য অবশ্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ মিটার এয়ার পিস্তল মিক্সড টিম ইভেন্টে সুরুচি সিংহ ইন্দরের সঙ্গে তাঁর জুটি তৈরি হয়েছিল এমন একটি সময়ে, যখন ব্যক্তিগত ইভেন্টে দু’জনেরই প্রত্যাশামতো ফল আসেনি। কিন্তু দলগত ইভেন্টে নিজেদের ছন্দ ফিরে পান তাঁরা। যোগ্যতা পর্বে শীর্ষে থাকার পর ফাইনালেও ভারতীয় জুটি প্রথম থেকেই এগিয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত ৪৮৪.৬ পয়েন্ট নিয়ে সোনা নিশ্চিত করে ভারত। দক্ষিণ কোরিয়া রুপো ও ইরান ব্রোঞ্জ পায়। উল্লেখ্য, কমলজিতের জন্য এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় তাঁর ব্যক্তিগত পথের দিকে তাকালে। কয়েক দিন আগেও তিনি পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার পিস্তল ব্যক্তিগত ইভেন্টের ফাইনালে উঠতে পারেননি। শুটিংয়ে একটি খারাপ ফল যে পরের ইভেন্টের সম্ভাবনা শেষ করে দেয় না, তার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। হতাশা সামলে মিক্সড টিমে নতুন করে মনোযোগ দিয়েছেন। শুক্রবার সেই সিদ্ধান্তই সোনার পদকে বদলে গেল।
এশিয়ান গেমসের এই সোনা তাই কমলজিতের কাছে শুধু একটি পদক নয়। তিন বছর আগে যে ঊরুর হাড় তাঁকে হাসপাতালের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল, সেই চোটের পর আবার শুটিংয়ে ফেরা ছিল এক দীর্ঘ লড়াই। অর্থের অভাব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, নিজের অস্ত্র না থাকা, দুর্ঘটনার ধাক্কা, কিছুই তাঁর পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। আজ সেই কমলজিৎই ভারতীয় শুটিংয়ের নতুন সাফল্যের অংশ। তাঁর বাবা রতিরামের মতো পরিবারের মানুষদের কাছে এই সোনা তাই বহু বছরের অপেক্ষা, ভয়, ধারদেনা এবং পরিশ্রমের পর পাওয়া এক বিরাট স্বস্তির মুহূর্ত। আর কমলজিতের নিজের খেলাটাও যেন একটি সহজ শিক্ষা সামনে আনে, শুটিংয়ে প্রতিটি লক্ষ্য বুলস আইয়ে পৌঁছয় না। সামান্য বিচ্যুতিই ফল বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিটি শটের পর আবার পরের শটের দিকে তাকাতে হয়। তিন বছর আগে দুর্ঘটনার পরে কমলজিৎও যেন ঠিক সেটাই করেছেন। জীবন থমকে যাওয়ার পর আবার নিজের লক্ষ্য ঠিক করেছেন, নতুন খেলা বেছে নিয়েছেন, নতুন করে শরীর তৈরি করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসের সোনার মঞ্চে পৌঁছে গেছেন। শুক্রবার তাঁর হাতে ওঠা পদক তাই ভারতের দ্বিতীয় সোনার পাশাপাশি এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তনেরও কাহিনি হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Fariba Hashimi Asian Games 2026, Fariba Hashimi silver medal | Afghan cyclist Fariba Hashimi : যে রাস্তায় মেয়ের সাইকেল নিষিদ্ধ ছিল, সেখান থেকেই এশিয়াডের রুপো ফারিবার




