সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বাবা দেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম পরিচিত ওপেনার। তাঁর ব্যাটিংয়ের আগ্রাসী ধরন এক সময় ভারতীয় ক্রিকেটে আলাদা ছাপ ফেলেছিল। এবার সেই পরিবারেরই পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটার হিসেবে জাতীয় দলের জার্সিতে পা রেখেছেন বীরেন্দ্র সহবাগ (Virender Sehwag) -এর ছেলে আর্যবীর সহবাগ (Aryavir Sehwag)। ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন তিনি। ফলে ক্রিকেট যে এখন সহবাগ পরিবারের দৈনন্দিন আলোচনার অন্যতম বিষয়, তা বলাই যায়। তবে ছেলেকে ক্রিকেট শেখানোর ক্ষেত্রে বীরেন্দ্র সহবাগের পদ্ধতি যে প্রচলিত ‘বাবা কোচ’ ধরনের নয়, তাঁর সাম্প্রতিক কথাতেই তার ইঙ্গিত মিলেছে। আর্যবীরের ব্যাটিংয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে বাবা সাধারণত খুব বেশি আলোচনা করেন না। বিশেষ করে টেকনিকের প্রতিটি দিক ধরে ধরে নির্দেশ দেওয়ার পথে হাঁটেন না সহবাগ। তাঁর কাছে ক্রিকেটে মানসিক প্রস্তুতি এবং ইনিংসের শুরুটা কী ভাবে করা হচ্ছে, সেই বিষয়গুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনার ধরন জানাতে গিয়ে সহবাগ বলেছেন, তিনি মূলত আর্যবীরকে ব্যাটিংয়ের সময় নিজের মানসিক অবস্থান ঠিক রাখার বিষয়ে কথা বলেন। সহবাগের বক্তব্য, ক্রিকেটারের দক্ষতা থাকাটা জরুরি হলেও একই ধরনের দক্ষতা অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু চাপের মুহূর্তে কে কী ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, ইনিংসের শুরুতে নিজের খেলা কী ভাবে গড়ে তুলছেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী মানসিকতা বদলাতে পারছেন কি না, সেটাই একজন ক্রিকেটারকে আলাদা করে দিতে পারে। তাই ছেলের টেকনিক নিয়ে বেশি কাটাছেঁড়া না করে মানসিক প্রস্তুতির জায়গাটিকে তিনি গুরুত্ব দেন।
এখানেই বাবা হিসেবে সহবাগের পরামর্শ দেওয়ার ধরন কিছুটা আলাদা। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ছেলের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন না তিনি। বরং আর্যবীরকে নিজের খেলা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেন। কারণ, মাঠে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ক্রিকেটারকেই। বাইরে থেকে পাওয়া পরামর্শের সংখ্যা যতই হোক, নিজের জন্য কোনটি কার্যকর তা বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব খেলোয়াড়ের নিজের, এই ধারণাটিই ছেলেকে বোঝান সহবাগ। মজার বিষয় হল, আর্যবীরও সব সময় বাবার মতামতকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেন না। দলের কোচ, ট্রেনার কিংবা ফিজিয়োর পরামর্শ সামনে রেখে বাবার সঙ্গে আলোচনা করেন। সহবাগ নিজেই জানিয়েছেন, বাড়িতে অনেক সময় তাঁর পরামর্শকে ছেলের কাছে অন্যদের দেওয়া নির্দেশের মতোই মনে হয়। অর্থাৎ বাবা বলে যে তাঁর কথাই শেষ কথা হবে, এমন কোনও পরিস্থিতি তাঁদের পরিবারে নেই।
এই জায়গাটিই হয়ত সহবাগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট এখন এমন একটি দলগত খেলা, যেখানে একজন তরুণ ক্রিকেটারকে কোচ, ফিটনেস ট্রেনার, ফিজিয়ো এবং দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ নিতে হয়। প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা। ফলে একজন খেলোয়াড়ের কাছে বিভিন্ন দিক থেকে একাধিক মত আসাটাই স্বাভাবিক। আর্যবীরের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। সহবাগ তাই ছেলেকে সব পরামর্শ শুনতে বলেন, কিন্তু সেগুলির মধ্যে কোনটি নিজের খেলার সঙ্গে মানানসই তা বেছে নেওয়ার বোধ তৈরি করার কথাও বলেন। উল্লেখ্য, আর্যবীরের ক্রিকেট-যাত্রা এখনও একেবারে শুরুর পর্যায়ে। অনূর্ধ্ব-১৯ স্তরে ভারতের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পাওয়া তাঁর কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। তবে বাবার পরিচয় যে তাঁর উপর বাড়তি আলো ফেলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বীরেন্দ্র সহবাগের মতো প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনারের ছেলে হিসেবে মাঠে নামার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর ব্যাটিং নিয়ে আগ্রহ থাকবে। সেই পরিস্থিতিতে নিজের পরিচয় তৈরি করাই তরুণ ক্রিকেটারের সামনে বড় কাজ।
সহবাগের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সেই জায়গায় তিনি ছেলেকে নিজের ছায়ায় আটকে রাখতে চান না। বরং আর্যবীরকে নিজের ক্রিকেটীয় বোধ তৈরি করার সুযোগ দিতে চান। বাবা নিজে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তার সবটা ছেলের খেলায় সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ক্রিকেট বদলেছে, প্রশিক্ষণের ধরন বদলেছে, খেলার গতি বদলেছে এবং তরুণ ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। তাই নিজের অভিজ্ঞতা জানালেও শেষ সিদ্ধান্তটি আর্যবীরের উপরেই ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে সহবাগের কথায়। অন্য দিকে, শুধু আর্যবীরই যে বাবার কাছ থেকে পরামর্শ পান, এমন নয়। সম্প্রতি নিজের জন্য একটি নতুন কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ছেলের মতামত শুনতে হয়েছে সহবাগকে। ক্রিকেট মাঠের বাইরে অনুষ্ঠান সঞ্চালনার কাজে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্তে আর্যবীর নাকি বেশ অবাকই হয়েছিল। বাবার মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার কেন আবার সঞ্চালনার কাজে যাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছিল সে। বিষয়টি নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে কিছুটা তর্কও হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সহবাগ। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে তিনি অনড় থাকেন। তাঁর কাছে সঞ্চালনার কাজটি নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই পরিচিত ক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগকে তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। ছেলের আপত্তি থাকলেও সেই নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়া থেকে পিছিয়ে যাননি।
এই ঘটনা বাবা-ছেলের সম্পর্কের অন্য একটি দিকও সামনে আনে। মাঠে আর্যবীরের ক্ষেত্রে সহবাগ যেমন নিজের মত চাপিয়ে দিতে চান না, তেমনই নিজের ক্ষেত্রেও ছেলের মতামত শুনে শেষ সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কটি শুধু প্রাক্তন তারকা ক্রিকেটার এবং উঠতি ক্রিকেটারের নয়; সেখানে পরস্পরের মতামত শোনা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটিও রয়েছে। আর্যবীরের সামনে এখন দীর্ঘ ক্রিকেটপথ। অনূর্ধ্ব-১৯ স্তরে ভারতের হয়ে খেলার পর পরবর্তী ধাপে ঘরোয়া ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক আরও প্রতিযোগিতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পরীক্ষা আসবে। সেখানে বাবার নাম এক দিকে যেমন পরিচিতি এনে দিতে পারে, তেমনই প্রত্যাশার চাপও তৈরি করতে পারে। সহবাগের কথায় অন্তত যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা হল নিজের ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে শেখা।
একইভাবে, বীরেন্দ্র সহবাগের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে আগ্রাসী ব্যাটিং ছিল তাঁর পরিচয়ের বড় অংশ। কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে তিনি নিজের খেলার ধরন নকল করানোর চেষ্টা করছেন না। আর্যবীর কীভাবে নিজের ইনিংস সাজাবে, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেবে এবং বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শের মধ্যে নিজের জন্য উপযোগী পথটি কী ভাবে খুঁজে নেবে, সেই জায়গাতেই বাবার কথাবার্তা বেশি কেন্দ্রীভূত। ফলে সহবাগ পরিবারের ক্রিকেটকথায় এখন শুধু অতীতের স্মৃতি নেই, রয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের প্রস্তুতিও। এক সময় বীরেন্দ্র সহবাগ ভারতীয় দলের হয়ে নতুন বল সামলেছেন। এখন তাঁর ছেলে আর্যবীর ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জার্সিতে নিজের পথ তৈরি করছেন। বাবা পাশে রয়েছেন, পরামর্শও দিচ্ছেন, কিন্তু সেই পরামর্শ গ্রহণ করবেন কীভাবে ও মাঠে তার প্রয়োগ করবেন কী ভাবে, সেই সিদ্ধান্ত তরুণ আর্যবীরেরই। ক্রিকেটে নিজের পরিচয় গড়ার ক্ষেত্রে সম্ভবত সেটিই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Samantha Ruth Prabhu pregnancy | ‘সন্তান হবে না’ ভেবেই নিয়েছিলেন! হঠাৎ প্রেগন্যান্সি, রাজের সঙ্গে নতুন জীবনের প্রস্তুতিতে সামান্থা রুথ প্রভু




