সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি রাস্তায় নেমে একাধিক কর্মসূচীতে দেখা যাচ্ছিল তাঁদের। কখনও ফুটপাত পরিদর্শন, কখনও সরকারি হাসপাতাল আচমকা ঘুরে দেখা, কখনও আবার স্থানীয় সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, দুই মন্ত্রীর এই সক্রিয়তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা কম হয়নি। এবার সেই কাজের ধরনেই কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বুধবার নবান্নে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে (Sharadwat Mukhopadhyay) নিজেদের দফতরের প্রশাসনিক কাজে আরও বেশি মন দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি বলে সূত্রের খবর।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানো। সূত্রের খবর, মাঠে ঘুরে পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি মন্ত্রীদের নিজেদের দফতরের ফাইল, পরিকল্পনা, নিয়োগ এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্লেখ্য, অগ্নিমিত্রা পাল দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই কলকাতা-সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পুর পরিষেবা, ফুটপাত, বেআইনি দখল ও পথ চলাচল নিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেছেন। তাঁর একাধিক পথ-পরিদর্শনের ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও ফুটপাত দখল নিয়ে বিক্রেতার সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়েছে, কোথাও রাস্তার ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। আবার পথ নিরাপত্তা কিংবা শহরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মাইক হাতে প্রচার করতেও দেখা গিয়েছে নগরোন্নয়নমন্ত্রীকে। এসব ঘটনাকে ঘিরে যেমন রাজনৈতিক আলোচনা হয়েছে, তেমনই তৈরি হয়েছে নানা বিতর্কও।
অগ্নিমিত্রার কাজের এই ধরন যে প্রশাসনের অন্দরেও আলোচনায় এসেছে, বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শের অর্থ, রাস্তায় যাওয়া বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং মন্ত্রী হিসেবে দফতরের নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্বের উপর আরও বেশি সময় দেওয়াই এখন অগ্রাধিকার, এমনটাই সরকারি সূত্রের বক্তব্য। অর্থাৎ জনসংযোগ এবং মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের পাশাপাশি দফতর পরিচালনার কাজেও সমান নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য দিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কেও সাম্প্রতিক সময়ে রাস্তায় ও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সক্রিয়ভাবে দেখা যাচ্ছিল। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল আচমকা পরিদর্শন করে পরিষেবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছিলেন তিনি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখার এই উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাঁর উপস্থিতি বেড়েছিল। কিন্তু বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিনই তাঁকে ঘিরে আর একটি রাজনৈতিক ঘটনা সামনে আসে।
বিধাননগরের বিজেপি বিধায়ক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের আয়োজিত ‘বিধায়ক দরবারে’ রাজারহাট-নিউটাউন কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক পীযূষ কানোরিয়া (Piyush Kanoria) উপস্থিত হলে দু’জনের মধ্যে প্রকাশ্য বাদানুবাদ হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি নিয়ে দলের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়। সেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নবান্নের মন্ত্রিসভার বৈঠকে শারদ্বতকে দফতরের প্রশাসনিক কাজে আরও মন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বুধবারের বৈঠকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু দুই মন্ত্রীর কাজের ধরন ছিল না। রাজ্য সরকারের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে সূত্রের খবর। দফতরভিত্তিক নিয়োগের যে সমস্ত প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, সেগুলি দ্রুত মেটানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সূত্রের দাবি, বিভিন্ন দফতরে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি পরিষেবা আরও দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এই প্রসঙ্গে কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্য পুলিশের নিয়োগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। সূত্রের খবর, কলকাতা পুলিশে প্রায় ২,০০০ এবং রাজ্য পুলিশে প্রায় ৬,০০০ পদে নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়টির একটি অংশ আদালতের বিচারাধীন হলেও প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহের কথা বৈঠকে জানানো হয়েছে বলে খবর। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রীদের বলেছেন, যে উদ্দেশ্যে যে দফতরকে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই অর্থ কাজে লাগাতে হবে। বরাদ্দ অর্থ সময়মতো ব্যবহার না হলে ভবিষ্যতে দফতরভিত্তিক বাজেট পরিকল্পনায় তার প্রভাব পড়তে পারে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। ফলে আগামী দিনে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি বা মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি নয়, প্রশাসনিক কাজের পরিমাপযোগ্য ফলাফলের দিকেও মন্ত্রীদের নজর দিতে হবে, এমনই অবস্থান উঠে এসেছে বৈঠকের আলোচনায় বলে উল্লেখ।
এরই মধ্যে প্রশাসনিক মহলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। রাইটার্স বিল্ডিং (Writers’ Building)-এ মুখ্যমন্ত্রী-সহ কয়েক জন মন্ত্রীর দফতর ফেরানোর কাজ এগোচ্ছে। পূর্ত দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি অগ্নিমিত্রা পাল ও শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের দফতরও সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনায় রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কাজের পরিকাঠামো বদলের সময়েই দুই মন্ত্রীকে দফতরমুখী হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার ঘটনা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। উল্লেখ্য, রাজ্য সরকারের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় নগরোন্নয়ন, পুর পরিষেবা এবং স্বাস্থ্য, এই দুই মন্ত্রীর হাতেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সেই কারণে তাঁদের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ, আধিকারিকদের সঙ্গে সমন্বয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাজেট বাস্তবায়নের উপর নজর রাখাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে সূত্রের খবর। মাঠে গিয়ে কাজ দেখা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ প্রশাসনের একটি অংশ হলেও, তার সঙ্গে দফতরের নিয়মিত কাজের ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই বুধবারের বৈঠকে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক মহলের লক্ষ্য এখন অগ্নিমিত্রা পাল আর শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শের পরে দুই মন্ত্রীর কাজের ধরনে কতটা পরিবর্তন আসে, তাঁরা দফতরকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাজে কতটা সময় দেন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির সঙ্গে সেই দায়িত্ব কী ভাবে মিলিয়ে নেন, তা আগামী দিনে নজরে থাকবে। একই সঙ্গে নিয়োগ, সরকারি পরিষেবা এবং বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যে অগ্রাধিকারের কথা উঠে এসেছে, তার বাস্তব প্রয়োগও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on Annapurna Diwas | West Bengal Annapurna Yojana : ভাতা নয়, এবার সংস্কারের সরকার! অন্নপূর্ণা দিবসে শুভেন্দুর নিশানায় মমতা, মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা




