সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২২সেপ্টেম্বর ২০২৬ : এশিয়ান গেমস -এ (Asian Games) ভারতের সোনার খাতা খুলল মহিলা ক্রিকেট দল। নিশিনের করোগি স্পোর্টস পার্কে (Nishinno Korogi Sports Park) ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে (Sri Lanka) ১৪৭ রানে হারিয়ে সোনা জিতে নিল হরমনপ্রীত কৌরের (Harmanpreet Kaur) নেতৃত্বাধীন ভারত (India)। ব্যাট হাতে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল ভারতীয় দল। পরে বল হাতে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংকে মাত্র ৬৯ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয় নিশ্চিত করেন ভারতের স্পিনারেরা। চলতি এশিয়ান গেমসে ভারতের জন্য এটাই প্রথম সোনার পদক। ফাইনালের আগে দুই দলের সাম্প্রতিক লড়াইয়ের ইতিহাসও ভারতের আত্মবিশ্বাসের পক্ষে ছিল। এশিয়া কাপের ফাইনালের পর এশিয়ান গেমসের সোনার লড়াইয়েও একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও শ্রীলঙ্কা। তবে এবার লড়াই প্রায় একপেশে হয়ে যায়। ভারতের ২১৬ রানের জবাবে ২০ ওভারও ব্যাট করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। ১৫.৪ ওভারে মাত্র ৬৯ রানে শেষ হয়ে যায় তাদের ইনিংস। অর্থাৎ ভারতের জয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ১৪৭ রান।

টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েই আক্রমণাত্মক মেজাজে ইনিংস শুরু করেন শেফালি বর্মা (Shafali Verma) ও স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana)। প্রথম থেকেই শ্রীলঙ্কার বোলিংয়ের উপর চাপ তৈরি করতে থাকেন দুই ওপেনার। মাঠের ছোট বাউন্ডারির সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকে ভারত। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই স্কোরবোর্ডে উঠে যায় ৬৭ রান। সেই শুরুতেই ফাইনালের রূপরেখা অনেকটাই তৈরি হয়ে যায়। আগের ম্যাচে শতরান করে নজর কাড়া শেফালি এদিনও শুরু করেছিলেন আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে। তাঁর ব্যাট থেকে একের পর এক বড় শট আসছিল। শেষ পর্যন্ত ২৯ বলে ৪৮ রান করে থামেন ভারতীয় ওপেনার। তাঁর ইনিংসে ছিল তিনটি চার ও তিনটি ছক্কা। চামুদি প্রবোদার (Chamudi Prabodha) বলে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে তাঁর ইনিংস শেষ হয়। অর্ধশতরান থেকে মাত্র দুই রান দূরে থামলেও শেফালির আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ভারতের বড় স্কোরের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।
এই ইনিংসের মধ্যেই চলতি বছরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন রেকর্ড গড়েন শেফালি। ২০২৬ সালে ছোট ফরম্যাটে তাঁর রানসংখ্যা পৌঁছে যায় ৮৬৩-তে। দক্ষিণ আফ্রিকার লরা উলভার্টের (Laura Wolvaardt) রেকর্ডকে পেরিয়ে এক বছরে সবচেয়ে বেশি টি-টোয়েন্টি রান করা ব্যাটারদের তালিকায় নতুন জায়গা করে নেন তিনি। চলতি বছরে ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে শেফালির রান ৮৬৩। তাঁর ব্যাটিং গড় ৩৯.২২ এবং স্ট্রাইক রেট ১৬২.৮৩। একটি শতরান এবং সাতটি অর্ধশতরানও রয়েছে তাঁর নামের পাশে। শেফালি ফিরে গেলেও ভারতের রান তোলার গতি থামেনি। স্মৃতি মন্ধানা দায়িত্ব নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যান। বাঁহাতি এই ব্যাটারকে দেখে মনে হচ্ছিল, ফাইনালের বড় মঞ্চে আরও একটি বড় ইনিংসের পথে এগোচ্ছেন তিনি। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর অবশ্য এদিনও বড় রান পাননি। ১৭ বলে ১৯ রান করে ফেরেন ভারতীয় অধিনায়ক। স্মৃতির ব্যাট অবশ্য তখনও ভারতকে বড় লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ৪৫ বলে তিনি ৭৯ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার এবং সাতটি ছক্কা। স্মৃতি ফিরে যাওয়ার পর ভারতের স্কোর ২০০ পেরোবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনও ক্রিজে ছিলেন রিচা ঘোষ (Richa Ghosh)।
বাংলার এই উইকেটকিপার-ব্যাটার আবারও দেখিয়ে দেন, ইনিংসের শেষ দিকে কীভাবে ম্যাচের গতি বদলে দিতে হয়। মাত্র ২২ বলে ৪৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন রিচা। ছ’টি চার ও তিনটি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংস ভারতের রানকে দ্রুত ২০০-র গণ্ডি পার করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ২১৬ রান করে ভারত। বড় স্কোরের ভিত তৈরি করে দিয়ে তখনই ফাইনালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ভারতীয় দল। উল্লখ্য, ২১৭ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। তৃতীয় ওভারে ইমিশা দুলানিকে (Imesha Dulani) ফিরিয়ে প্রথম আঘাত করেন শেফালি। পরের ওভারেই হাসিনি পেরেরাকে (Hasini Perera) শূন্য রানে ফেরান তিনি। মাত্র কয়েক বলের ব্যবধানে দুই উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কার শুরুটা বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তু (Chamari Athapaththu) কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে কয়েকটি বড় শটও খেলেন তিনি। কিন্তু সেই লড়াইও বেশি দূর এগোয়নি। দীপ্তি শর্মার (Deepti Sharma) বলে ২৯ রান করে ফিরে যান শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক। তাঁর উইকেট পড়ার পর শ্রীলঙ্কার ইনিংসে আর কোনও ব্যাটার কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। ভারতের চার স্পিনারের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে শ্রীলঙ্কা। দীপ্তি শর্মা চার ওভারে মাত্র ছয় রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন। শ্রী চরণি (Shri Charani) চার ওভারে ১৩ রান দিয়ে দুটি উইকেট পান। শেফালি ও শ্রেয়াঙ্কা পাটিল (Shreyanka Patil) নেন দু’টি করে উইকেট। ভারতের স্পিন আক্রমণের সামনে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইন-আপ কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, শ্রীলঙ্কার ১০টি উইকেটই ভারতের স্পিনারদের দখলে যায়। পেসারদের উপর নির্ভর না করেও ভারত যে ভাবে প্রতিপক্ষের ব্যাটিংকে আটকে দিল, তা ফাইনালের নিয়ন্ত্রণ আরও একতরফা করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৫.৪ ওভারে মাত্র ৬৯ রানে অলআউট হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ১৪৭ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় নিয়ে এশিয়ান গেমসের সোনার পদক নিশ্চিত করে ভারত।
এই জয়ের মধ্যে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ব্যাটিং গভীরতার ছবিও ফুটে উঠেছে। ওপেনিংয়ে শেফালি ও স্মৃতির আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, মাঝের দিকে হরমনপ্রীতের উপস্থিতি এবং শেষ দিকে রিচা ঘোষের বিস্ফোরক ব্যাটিং—তিনটি ভিন্ন পর্যায়ে ভারতের রান তোলার গতি বজায় ছিল। শেফালির ৪৮, স্মৃতির ৭৯ এবং রিচার ৪৯ রান মিলিয়ে ভারতের মোট ২১৬ রানের ভিত তৈরি হয়। অন্য দিকে বল হাতে দীপ্তি, শ্রী চরণি, শেফালি এবং শ্রেয়াঙ্কার সম্মিলিত আক্রমণে শ্রীলঙ্কা কোনও সময়ই ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ পায়নি। বিশেষ করে দীপ্তির নিয়ন্ত্রিত বোলিং শ্রীলঙ্কার রান তোলার রাস্তা আরও কঠিন করে দেয়। ৪ ওভারে মাত্র ছয় রান দিয়ে তিন উইকেট নেওয়া তাঁর বোলিং ফাইনালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স হয়ে ওঠে।
ভারতের জন্য এই সোনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের মঞ্চে শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিপক্ষকে বড় ব্যবধানে হারিয়েই পদক এসেছে। ২০২৩ সালের এশিয়ান গেমসেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল সোনা জিতেছিল। এবারও সেই ধারাই ধরে রাখল দল। ব্যাটিংয়ে বড় রান এবং স্পিন আক্রমণে দ্রুত উইকেট, ফাইনালে ভারতের দুই দিকই একসঙ্গে কার্যকর হয়েছে। ফাইনালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারতের নিয়ন্ত্রণ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমে ২০ ওভারে ২১৬ রান, পরে ১৫.৪ ওভারে প্রতিপক্ষকে ৬৯ রানে অলআউট, স্কোরবোর্ডই ম্যাচের ছবিটা বলে দিচ্ছে। শেফালি-স্মৃতির আগ্রাসী শুরু, রিচার ঝোড়ো সমাপ্তি ও দীপ্তিদের স্পিন আক্রমণ মিলিয়ে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল এশিয়ান গেমসে আরও এক বার সোনার পদক তুলে নিল।
এই জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ধারাবাহিক সাফল্যের আরও একটি পর্ব যোগ হল। এশিয়ান গেমসের আসরে ভারতের প্রথম সোনা এল ক্রিকেট থেকেই। আর সেই সোনার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অবদান রাখলেন ব্যাট হাতে শেফালি বর্মা, স্মৃতি মন্ধানা ও রিচা ঘোষ ও বল হাতে ভারতের স্পিন ত্রয়ী-সহ পুরো বোলিং ইউনিট।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal CM Suvendu Adhikari and Mukesh Ambank meeting | অ্যান্টিলিয়া থেকে বাংলার শিল্পের সম্ভাবনা, আম্বানী-সাক্ষাৎ নিয়ে বড় দাবি শুভেন্দু অধিকারীর




