সম্পাদকীয়
মন এই এক শব্দের ভিতরেই মানুষের সমগ্র জগৎ গুটিয়ে থাকে। বাইরে যে, পৃথিবী আমরা দেখি তা আসলে ভেতরের প্রতিফলন। সেই ভেতরের আয়নাই আমাদের মানসিকতা। মানুষ তার মন দিয়েই বাঁচে। হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, ভেঙে পড়ে, আবার নতুন করে গড়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখে। মন সমগ্র অস্তিত্বের ভাষা শেখা। মানসিকতা তৈরি হয় সময়, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক আর পরিবেশের অদৃশ্য বুননে। একেকজন মানুষ একেক রকমভাবে পৃথিবীকে দেখে। কেউ একই ঘটনায় আশার আলো খুঁজে পায়। কেউ বা অন্ধকারে ডুবে যায়। এই পার্থক্যের মূলেই রয়েছে মন। আমরা প্রায়ই ভাবি। পরিস্থিতি আমাদের গড়ে তোলে। অথচ সত্যি হলো, আমাদের মানসিকতাই পরিস্থিতিকে অর্থ দেয়। একটুখানি ব্যর্থতা কারও কাছে শেষ। আবার কারও কাছে শুরু। এ পার্থক্য বাইরের মনে অদৃশ্য অন্তরের। এই সময় সমাজে মানসিকতার সংকট যেন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। দ্রুততার যুগে আমরা সবকিছুই তাড়াহুড়োয় পেতে চাই সাফল্য বা স্বীকৃতি ও ভালোবাসা। কিন্তু এটাই সত্য যে মন তার নিজস্ব ছন্দে চলে। তাকে জোর করে তাড়ানো যায় না। ফলে ভেতরে জমতে থাকে অস্থিরতা উদ্বেগ একাকিত্ব।

মানুষের ভিড়ের মাঝেও মানুষ একা হয়ে যায়। কারণ উল্লেখ করলে বলতে হয় যে, সে নিজের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। নিজের মনের সঙ্গে কথা বলা। নিজেকে শোনা এই সহজ কাজগুলোই আজ সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।তবুও আশার জায়গা আছে। মনকে চেনা মানেই তাকে বদলানোর প্রথম পদক্ষেপ। যখন মানুষ নিজের ভয়, দুর্বলতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছুকে স্বীকার করতে শেখে তখন তার মানসিকতা ধীরে ধীরে পরিণত হয়। তখন সে বুঝতে পারে মনের শক্তি দ্বারা নমনীয় হওয়া, ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানো। একটি সুস্থ মানসিকতা মানুষকে সফল করে তাকে মানবিকও করে তোলে। আজ প্রয়োজন এমন এক সমাজ যেখানে মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ঠিক শারীরিক সুস্থতার মতোই। যেখানে মানুষ বিচার ও বোঝাপড়ার আশা করতে পারবে। যেখানে দুর্বলতা সৃষ্টি হয় বরং তা থেকেই শক্তি খোঁজার পথ তৈরি হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম পৃথিবী পৃষ্ঠা বেঁচে থেকে নিজের ভেতরের অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই। মনকে জানার যাত্রা কখনো শেষ হয় না। প্রতিদিন একটু একটু করে আমরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করি। আর সেই আবিষ্কারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য। মানুষ তার মনকেই গড়ে ভাঙে। আবার সেই মনই মানুষকে গড়ে তোলে। এ এক অদ্ভুত খেলা। শরীরকে শুদ্ধ করে মন। মন স্থির রেখে নিজের ওড়া কে পরিষ্কার করে শান্তির পথ পরিষ্কার করতে পারে।
🍂মহামিলনের কথা
কিরূপে কোথায় দেখব? ক্ষিতি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ— এই পঞ্চভূত আমি, এই পঞ্চভূতে আমায় দেখ্। শ্রোত্র-ত্বক্-জিহ্বা-চক্ষু-ঘ্রাণ- বাক্-পাণি-পাদ-পায়ু-উপস্হ-মন এই একাদশ ইন্দ্রিয়ে আমায় দেখ্। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ—এই পঞ্চ তন্মাত্রে আমায় দেখ্। প্রাণাদি পঞ্চ বায়ুতে আমায় দেখ্।

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
শান্তিলাভের উপায়
শান্তি কি পাব না? আসক্তির হাত হতে নিস্তার কি হবে না?
হবে রে, হবে৷
বল, কি করে আমি শান্ত হব; বল বল, কি করে আমার সর্ব্বদুঃখ-নিবৃত্তি হবে, তোমায় নিয়ে দিবানিশি থাকতে পারব, কবে আমার সেদিন হবে?
যেদিন তোর মনের মৃত্যু হবে।
মনের মৃত্যু কেমন করে হবে, বলে দাও। মনের মৃত্যুতে তোমায় পাব বলছ— আজ, আজ আমি মনকে মারবার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছি। উপায় বলে দাও, শক্তি দাও, তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। মন্ত্রের সাধন অথবা শরীর-পতন —এ স্হির করে আমি তোমার কাছে এসেছি৷
প্রণাম—প্রণাম! উর্ধ্বে অধে, সম্মুখে পশ্চাতে—প্রণাম, প্রণাম। হে রাম! প্রণাম— প্রণাম।
আর একটু মনে রেখে প্রণাম করবি। কি জানিস্— রাম রাম করবি আর প্রণাম করবি। যা দেখবি, যা শুনবি, যাতে আকৃষ্ট হবি বা যাতে বিরক্ত হবি— অবিচারে সকলে রাম রাম জপে দিবি, আর জপতে জপতে প্রণাম করবি। করে দেখ্ হবেই রে!পারবি? তবে শোন—
‘যো মাং পশ্যতি সর্ব্বত্র সর্ব্বঞ্চ ময়ি পশ্যতি ‘ —বুঝলি ?
কি বললে স্পষ্ট করে বল। সর্ব্বত্র আমায় দেখ্ এবং আমাতে সব দেখ্— তাহলেই শান্তি লাভ করতে পারবি, মনের মরণ হবে।
কিরূপে কোথায় দেখব? ক্ষিতি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ— এই পঞ্চভূত আমি, এই পঞ্চভূতে আমায় দেখ্। শ্রোত্র-ত্বক্-জিহ্বা-চক্ষু-ঘ্রাণ- বাক্-পাণি-পাদ-পায়ু-উপস্হ-মন এই একাদশ ইন্দ্রিয়ে আমায় দেখ্। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ—এই পঞ্চ তন্মাত্রে আমায় দেখ্। প্রাণাদি পঞ্চ বায়ুতে আমায় দেখ্।
আমি তোমার সব কথা ধারণা করতে পারছি না।
দেখ্, যা দেখছিস— সব আমি। দেব দানব, যক্ষ রক্ষ, গন্ধর্ব্ব কিন্নর, নর নারী, পশু পক্ষী, কীট পতঙ্গ, জল স্হল, অনিল অনল— সব আমি। দ্বিপদ, চতুষ্পদ, বহুপদ, অপদ— সব আমি। সমস্ত শব্দ, সমস্ত রূপ— আমি। রোগ শোক, মান অপমান, হাসি কান্না, শান্তি অশান্তি,শত্রু মিত্র, তিরস্কার পুরস্কার— সব আমি। আমি ছাড়া জগতে আর কিছু নাই। কি রে তুই অবাক হয়ে রইলি?
সব তুমি? ওগো কি আনন্দ!
দৃশ্যতে শ্রূয়তে যদ্ যদ্ স্মর্য্যতে যৎ রঘূত্তম৷
ত্বমেব সর্ব্বমখিলং ত্বদ্ বিনা নান্যকিঞ্চন।। —শ্রীঅধ্যাত্মরামায়ণ।
যা দেখা যায়, বা শোনা যায়—- সব তুমি! অখিল জগৎ— সবই তুমি! তুমি ভিন্ন অন্য কিছু নাই। এখনও আমি সর্ব্বত্র তোমায় প্রত্যক্ষ করতে পারি নাই, তথাপি যেন শান্তির সাগরে ডুবে যাচ্ছি— সব তুমি! সব তুমি!! সব তুমি!!!
হাঁ, সব আমি— সব আমি —সব আমি।
—প্রণাম—প্রণাম! উর্ধ্বে অধে, সম্মুখে পশ্চাতে—প্রণাম, প্রণাম। হে রাম! প্রণাম— প্রণাম।
আর একটু মনে রেখে প্রণাম করবি। কি জানিস্— রাম রাম করবি আর প্রণাম করবি। যা দেখবি, যা শুনবি, যাতে আকৃষ্ট হবি বা যাতে বিরক্ত হবি— অবিচারে সকলে রাম রাম জপে দিবি, আর জপতে জপতে প্রণাম করবি। করে দেখ্ হবেই রে!
🍁মহারসায়ন | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
🍂স্মরণ
গ্রামীণ ভূগোল, লোকসংস্কৃতি, পালাগান, সুফি ও সহজিয়া সঙ্গীত পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতি ও লেখার ভেতরে ফিরে এসেছে। দেশভাগের পরে পরিবারের ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু সেই বদল তাঁর ভাষাকে ভেঙে দিতে পারেনি। পড়াশোনায় কেতকীর সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেন। ১৯৬০ সালে বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন ব্রিটেনে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১৯৬৩ সালে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ভারতীয় নারী হিসেবে অক্সফোর্ডে ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর এই সাফল্য ছিল বিরলই না দৃষ্টান্তমূলকও।
দেশ ছেড়েছিলেন, বাংলা নয়: কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্যজীবনই ছিল সীমানা ভাঙার

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী
দেশ বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, জীবনের পরিসর বদলেছে একের পর এক। কিন্তু ভাষা বদলায়নি। কলকাতা থেকে অক্সফোর্ড, ইংল্যান্ড থেকে কানাডা! এই দীর্ঘ দেশান্তরেও বাংলা তাঁর লেখার কেন্দ্র থেকে সরে যায়নি। দূরত্ব যত বেড়েছে, শিকড়ের স্মৃতি তত ফিরে এসেছে অন্য রূপে। কেতকী কুশারী ডাইসন (Ketaki Kushari Dyson) -এর সাহিত্যজীবন ভাষা, পরিচয়, মানবসত্তা ও দেশছাড়ার অভিজ্ঞতাকে নতুন করে দেখার দীর্ঘ লড়াই। কলকাতার সাহিত্যপরিসরে তাঁকে নিয়ে এক সময় রসিক ছড়াও চালু ছিল : ‘গদ্যে পদ্যে ধোপদুরস্ত / কেতকী কুশারী ডাইসন, / ফেমিনিস্ট তিনি জবরদস্ত; / ত্রস্ত পুরুষ বাইসন।’ ছড়াটির রসিকতা আজ হয়ত সময়ের সঙ্গে ম্লান, কিন্তু কেতকীকে নিয়ে তার একটি ইঙ্গিত এখনও প্রাসঙ্গিক। লেখক কেতকী শুধু সুন্দর ভাষায় লিখতেন না, লেখার বিষয়, অবস্থান নিয়েও আপস করতেন না। তাঁর সাহিত্য পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো, প্রবাসী পরিচয়, বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রচলিত ধারণাকে একাধিক বার ধাক্কা দিয়েছে।
১৯৪০ সালে কলকাতায় জন্ম কেতকীর। বাবা অবনীমোহন কুশারী, মা অমিতা কুশারী। পরিবারের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশ তাঁর শৈশবেই তৈরি হয়েছিল। বাবার ঘনিষ্ঠ পরিসরে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে-এর মতো সাহিত্যিকেরা। পিতামহও ছিলেন খ্যাতনামা শিক্ষক। পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁর পরিচিতি ছিল ‘শেক্সপিয়র কুশারী’ নামে। তবে কেতকীর শৈশব শুধু কলকাতার শহুরে পরিসরে আটকে থাকেনি। বাবার কর্মসূত্রে বর্তমান বাংলাদেশের মেহেরপুরে তাঁর বেড়ে ওঠার একটি বড় সময় কেটেছে। সেই গ্রামীণ ভূগোল, লোকসংস্কৃতি, পালাগান, সুফি ও সহজিয়া সঙ্গীত পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতি ও লেখার ভেতরে ফিরে এসেছে। দেশভাগের পরে পরিবারের ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু সেই বদল তাঁর ভাষাকে ভেঙে দিতে পারেনি। পড়াশোনায় কেতকীর সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেন। ১৯৬০ সালে বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন ব্রিটেনে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১৯৬৩ সালে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ভারতীয় নারী হিসেবে অক্সফোর্ডে ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর এই সাফল্য ছিল বিরলই না দৃষ্টান্তমূলকও।
কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়ত এখানেই যে, বাংলা ভাষাকে কোনও ভূখণ্ডের সীমানায় আটকে রাখেননি। বিদেশে বসে বাংলা লিখেছেন, আবার বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি ভাষার বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিয়েছেন। দুই দিকের এই যাতায়াত ছিল তাঁর সাহিত্যিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সেই সমস্ত লেখায় তাই শিকড় এবং ডানা দুই শব্দই পাশাপাশি বসে। শিকড় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় মেহেরপুর, কলকাতা, বাংলার গান ও স্মৃতির কাছে। ডানা তাঁকে নিয়ে যায় অক্সফোর্ড, বিশ্বসাহিত্য অথবা বহুভাষিক সংস্কৃতির দিকে। এই দুই বিপরীত টানকে একসঙ্গে ধরে রাখাই ছিল লেখকের অন্যতম সাহিত্যিক কৃতিত্ব।
দেশে ফিরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন কিছু সময়। কিন্তু স্থায়ীভাবে কলকাতায় থিতু হননি। ১৯৬৪ সালে রবার্ট ডাইসনকে বিয়ে করার পর তাঁর জীবন আরও গভীরভাবে বিদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। ইংল্যান্ডের পাশাপাশি কানাডাতেও ছিলেন। পরে আবার অক্সফোর্ডে ফিরে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন ও ১৯৭৫ সালে ডক্টরেট অর্জন করেন। এই জীবনপথই হয়ত লেখক কেতকী-এর সাহিত্যকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কারণ কেতকী একই সঙ্গে ছিলেন বাংলা ও ইংরেজি ভাষার লেখক। বাংলা তাঁর কাছে শুধু জন্মভূমির ভাষা ছিল না, আবার ইংরেজিও কেবল পেশাগত বা শিক্ষার ভাষা ছিল না। দুই ভাষাকেই তিনি সৃষ্টিশীলতার নিজস্ব ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাংলায় তাঁর কবিতার বইয়ের তালিকায় রয়েছে ‘বল্কল’, ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডর ধরে’, ‘কথা বলতে দাও’, ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’। ইংরেজিতেও তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে : ‘Sapwood’, ‘Hibiscus in the North’, ‘Space I Inhibit’, ‘In That Sense You Touched It’। অর্থাৎ প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলা লিখছেন, এমন সরল পরিচয়ে তাঁকে ধরা যায় না। লেখক একই সময়ে দুই ভাষায় সাহিত্য সাধনা করেছেন।
কবিতা পরিধি ছাড়াও উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদেও তাঁর কলম চলেছে। ‘জল ফুঁড়ে আগুন’, ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’, ‘তিসিডোর’ তাঁর উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য নাম। ‘রাতের রোদ’ এবং ‘মোৎসার্ট চকোলেট’ নাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর বহুমুখী লেখকসত্তার পরিচয় বহন করে। কিন্তু, কেতকী কুশারী ডাইসনের নাম উচ্চারিত হলে রবীন্দ্র-গবেষণার প্রসঙ্গ এড়ানো যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলা পাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ বইটিতে তিনি শুধুই দুই ব্যক্তিত্বের সম্পর্কের ঘটনাপঞ্জি সাজান তা কিন্তু নয়; সেই সম্পর্কের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক তাৎপর্যও অনুসন্ধান করেছেন। ইংরেজি ভাষায় ‘In Your Blossoming Flower Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’ বইটির মাধ্যমে সেই গবেষণা আরও বৃহৎ পাঠকসমাজে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির যোগাযোগ কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেই প্রশ্নকে ঘিরে।
রবীন্দ্রনাথের রঙ-ভাবনা নিয়েও কেতকীর গবেষণা উল্লেখযোগ্য। সুশোভন অধিকারী, অ্যাড্রিয়ান হিল এবং রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে যৌথ গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয় ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। এই বইয়ের জন্য ১৯৯৭ সালে সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে যৌথভাবে আনন্দ পুরস্কার পান লেখক। এর আগে ১৯৮৬ সালে ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ -এরর জন্যও আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন। একই বছরে বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী মেডেল পান। কিন্তু পুরস্কার দিয়ে কেতকীর সাহিত্যিক গুরুত্ব মাপা কঠিন। তাঁর আসল লড়াই ছিল অন্য জায়গায়। একজন বাঙালি লেখক বিদেশে গিয়ে কীভাবে নিজের ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন, প্রবাসী পরিচয়কে কীভাবে সাহিত্যিক শক্তিতে পরিণত করবেন ও একই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের পরিসরে নিজের জায়গা তৈরি করবেন, কেতকীর লেখায় সেই প্রশ্নগুলিই বারবার ফিরে এসেছে।
কেতকী তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যে নিছক দেশস্মৃতির আশ্রয় নেননি। মেহেরপুরের স্মৃতি যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে অক্সফোর্ডের বৌদ্ধিক পরিবেশ। বাংলার লোকসঙ্গীত যেমন জায়গা পেয়েছে, তেমনই পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ। এই দুই জগতের সঙ্ঘাত ও সহাবস্থানই তাঁর লেখার অন্যতম শক্তি। অন্যদিকে, প্রবাসী সাহিত্য নিয়ে বাংলা পাঠে দীর্ঘদিন যে আবেগপ্রবণ ধারণা ছিল, কেতকী তার বাইরে দাঁড়িয়েছেন। বিদেশে থেকেও তিনি শুধু ‘ফেলে আসা দেশ’-এর কথা লেখেননি। প্রশ্নও তুলেছেন, দেশ আসলে কোথায়? ভাষার মধ্যে, স্মৃতির মধ্যে, নাকি মানুষের চলমান পরিচয়ের মধ্যে? তাঁর লেখার উত্তর কখনও একরৈখিকতায় স্থির নয়।
নারীসত্তা নিয়েও কেতকী কুশারী ডাইসন-এর অবস্থান ছিল আপসহীন। লেখক হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করার পাশাপাশি নারীকে ঘিরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে তাঁর লেখায় প্রতিবাদের সুর এসেছে। ফলে তাঁকে শুধু প্রবাসী সাহিত্যিক বললে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়ত এখানেই যে, বাংলা ভাষাকে কোনও ভূখণ্ডের সীমানায় আটকে রাখেননি। বিদেশে বসে বাংলা লিখেছেন, আবার বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি ভাষার বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিয়েছেন। দুই দিকের এই যাতায়াত ছিল তাঁর সাহিত্যিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সেই সমস্ত লেখায় তাই শিকড় এবং ডানা দুই শব্দই পাশাপাশি বসে। শিকড় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় মেহেরপুর, কলকাতা, বাংলার গান ও স্মৃতির কাছে। ডানা তাঁকে নিয়ে যায় অক্সফোর্ড, বিশ্বসাহিত্য অথবা বহুভাষিক সংস্কৃতির দিকে। এই দুই বিপরীত টানকে একসঙ্গে ধরে রাখাই ছিল লেখকের অন্যতম সাহিত্যিক কৃতিত্ব।
কেতকী কুশারী ডাইসনকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর বইয়ের তালিকা মনে করা বা মনে রাখা না। মনে করা সেই লেখককে, যে দেশান্তরকে পরাজয় হিসেবে দেখেননি, ভাষাকে ভূগোলের বন্দী হতে দেননি এবং অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের পরিচিত সীমানার বাইরে গিয়ে নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন। কেতকীর জীবন দেখিয়ে যায়, দেশ ছেড়ে যাওয়া আর শিকড় ছেড়ে যাওয়া এক কথা নয়! একজন মানুষ বহু দূরে চলে গিয়েও নিজের ভাষার ভিতর একটি সম্পূর্ণ ভূগোল বহন করতে পারেন। কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্য সেই বহন করে চলারই দলিল, যেখানে কলকাতা ও অক্সফোর্ড পাশাপাশি, মেহেরপুর ও বিদেশ পাশাপাশি, বাংলা ও ইংরেজি পাশাপাশি। আর সেই কারণেই তাঁর সাহিত্যকে শুধু প্রবাসের সাহিত্য বলে চিহ্নিত করা তাঁর কাজের প্রতি অবিচার।🍁
🍂গদ্য
শিক্ষার ভাষা নিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি শেখার বিরোধিতা তিনি করেননি। কিন্তু বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষায় মাতৃভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত কমিশনের সঙ্গে আলোচনাতেও তিনি এই মত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইংরেজি ভালভাবে শেখা প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার জায়গা অটুট থাকা উচিৎ। এর পেছনে ছিল মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও প্রকাশক্ষমতার বিকাশের প্রশ্ন।
বর্তমান সময়ে প্রকৃত শিক্ষা ও মানুষ : সঙ্কটকালে নতুন করে প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা

প্রফুল্ল কুমার মিত্র
স্কুল আছে, কলেজ আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বই আছে, পরীক্ষা আছে, ডিগ্রি আছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার আয়োজনও কম নয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে, বর্তমান সময়ের শিক্ষা কী সত্যিই মানুষ তৈরি করছে? জ্ঞান বাড়ছে, তথ্যের নাগাল সহজ হচ্ছে, পেশার সুযোগও বদলাচ্ছে। তবু হিংসা, অসহিষ্ণুতা, সঙ্কীর্ণতা কিংবা উগ্রতার ছায়া যখন তরুণ সমাজের একাংশে দেখা যায়, তখন শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ঠিক এই জায়গাতেই এক শতাব্দীরও বেশি আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) যে শিক্ষাভাবনার কথা বলেছিলেন, তা নতুন করে আলোচনায় আসে। এবং তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই।
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা ছিল না, পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর তোলার কৌশল অর্জন। কিংবা শিক্ষার কাজ শুধু মস্তিষ্কে তথ্য জমা করা নয়, মানুষের ভিতরের জগৎকে প্রসারিত করা। প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প, শ্রম ও মানবিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীর যোগাযোগ তৈরি না হলে শিক্ষার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না, তাঁর চিন্তার নানা স্তরে এই ধারণাই ফিরে এসেছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক ও মননজগতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে মিশে আছেন যে তাঁকে বাদ দিয়ে বাঙালির আধুনিক চিন্তার ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন। সাহিত্য, সঙ্গীত, সমাজভাবনা থেকে শিক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর চিন্তার পরিধি ছিল বিস্তৃত। ফলে তাঁর শিক্ষাদর্শকে শুধু শান্তিনিকেতনের পাঠপদ্ধতি হিসেবে দেখলে তাঁর মূল বক্তব্যের একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়।
শিক্ষার শেষ সাফল্য যদি শুধু একজন পরীক্ষার্থী তৈরি করা হয়, তবে রবীন্দ্রনাথের কাছে তা যথেষ্ট ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন এমন মানুষ, যে সত্যকে খুঁজবে, নিজের ভুল নিয়ে ভাববে, অন্যকে সম্মান করবে, সমাজের দায়িত্ব নেবে এবং নিজের স্বাধীন চিন্তাকে মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করবে। এখন যখন শিক্ষার কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন সেই পুরনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে আসে, আমরা কী শুধু শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি মানুষও তৈরি করছি? রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা হয়ত সেই প্রশ্নের সরল উত্তর দেয় না।
রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার কথা ভাবছেন, তখনও ঔপনিবেশিক শিক্ষার কাঠামো অনেকাংশে বই, পরীক্ষা ও আনুষ্ঠানিকতার উপর নির্ভরশীল। সেই ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, শিশুকে কী প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিক্ষা দেওয়া যায়? তাঁর ধারণা ছিল, মানুষ জন্ম থেকেই প্রকৃতি ও মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত। তাই শিক্ষার পরিবেশও সেই সম্পর্ককে স্বীকার করবে। প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা, নিজের চারপাশকে দেখা, মানুষের সঙ্গে মেশা আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া দরকার। এই চিন্তার বাস্তব পরীক্ষা হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। খোলা পরিবেশে পাঠ, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, সঙ্গীত, সাহিত্য, অভিনয়, হাতের কাজ ইত্যাদি সবকিছুকে শিক্ষার পরিসরের মধ্যে আনতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক শিক্ষাপদ্ধতি, যেখানে ছাত্র শুধু বই পড়বে না, সেখানে জীবনকেও পড়তে শিখবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা মানেই যে সহজ শিক্ষা, এমন ধারণারও অবকাশ নেই। তিনি শিক্ষার্থীর সামনে কঠিন বিষয় তুলে ধরতেন। বড় চিন্তা বোঝার ক্ষমতা তৈরি করতে চাইতেন। কঠিন বই পড়তেও ছাত্রদের উৎসাহিত করতেন। শুধু তা-ই নয়, ছোট শ্রেণির ছাত্রদেরও অপেক্ষাকৃত কঠিন সাহিত্য পড়ানোর নজিরও রয়েছে। তাঁর কাছে ছাত্রকে সবসময় সহজ রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া শিক্ষার কাজ ছিল না; কঠিন বিষয়কে বুঝে নেওয়ার শক্তি তৈরি করাই ছিল শিক্ষার বড় সাফল্য। এই সময় শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে এই জায়গাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তথ্যের অভাব এখন আর প্রধান সমস্যা নয়। একটি মোবাইল ফোনেই বিপুল তথ্য পাওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন শিক্ষার ফলে জ্ঞানের দরজা আগের তুলনায় অনেক বেশি খোলা।
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। আরও বড় প্রশ্ন, জ্ঞান থাকা আর বিবেচনাবোধ থাকা কি একই কথা? রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন এই পার্থক্যের দিকেই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। শান্তিনিকেতনকে তিনি শুধু বাঙালির জন্য একটি বিদ্যালয় হিসেবেও ভাবেননি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিশ্বের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ১৯১৬ সালে আমেরিকার শিকাগো থেকে রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে তিনি শান্তিনিকেতনকে ভারত ও বিশ্বের যোগসূত্রে পরিণত করার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনায় এমন একটি শিক্ষাকেন্দ্রের ভাবনা ছিল, যেখানে জাতীয় সঙ্কীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হবে। এই ভাবনার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। নিজের সংস্কৃতির ভিত মজবুত রেখে বিশ্বের দিকে তাকানো। ভারতীয় ঐতিহ্যকে জানার পাশাপাশি পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়া। অর্থাৎ নিজের পরিচয় হারিয়ে বিশ্বজনীন হওয়া নয়, আবার নিজের গণ্ডিতে আটকে থাকাও নয়।
শিক্ষার ভাষা নিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি শেখার বিরোধিতা তিনি করেননি। কিন্তু বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষায় মাতৃভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত কমিশনের সঙ্গে আলোচনাতেও তিনি এই মত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইংরেজি ভালভাবে শেখা প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার জায়গা অটুট থাকা উচিৎ। এর পেছনে ছিল মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও প্রকাশক্ষমতার বিকাশের প্রশ্ন। নিজের ভাষায় ভাবতে পারা, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারা আর জ্ঞানকে নিজের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাষা যদি শিক্ষার্থী ও জ্ঞানের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করে, তাহলে শিক্ষার বিস্তারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গীত, অভিনয়, গল্প, কবিতা ও হাতের কাজকে যুক্ত করার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের একই উদ্দেশ্য কাজ করেছে। তিনি মানুষের কল্পনা ও সৃজনশীলতাকে শিক্ষার বাইরে রাখেননি। তাঁর কাছে একজন শিক্ষার্থীর বিকাশ মানে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করা নয়। তার অনুভূতি, কল্পনা, প্রকাশক্ষমতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও তৈরি হওয়া দরকার। আবার শিক্ষক সম্পর্কেও তাঁর ভাবনা ছিল ব্যতিক্রমী। শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানের অধীন কর্মচারী হিসেবে দেখার বদলে স্বাধীন চিন্তার মানুষ হিসেবে দেখার কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শিক্ষক নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলবেন ও প্রতিষ্ঠানকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করবেন, এমন পরিবেশ চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষাকে কর্তৃত্বের একমুখী সম্পর্কের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। ছাত্রজীবন নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা ছিল কঠোর। আত্মসংযম, পরিচ্ছন্নতা, পরিশ্রম, শিক্ষককে সম্মান, নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর ভাবনায় শিক্ষা ছিল, চরিত্র গঠনেরও প্রক্রিয়া। সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি না হলে ব্যক্তিগত জ্ঞান বা সাফল্যকে তিনি শিক্ষার চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখেননি।
এই জায়গাতেই বর্তমান সময়ের শিক্ষা সঙ্কটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সংঘাত সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। যখন শিক্ষার সাফল্য ক্রমশ নম্বর, র্যাঙ্ক, ডিগ্রী, চাকরি কিংবা বাজারমূল্যের সঙ্গে মাপা হয়, তখন মানুষ হয়ে ওঠার প্রশ্নটি পিছিয়ে যেতে পারে। শিক্ষিত একজন মানুষ যদি অন্যের জীবন, মত বা অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন, তাহলে তাঁর শিক্ষার সামাজিক মূল্য কতটা এই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উগ্রতা বা হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্রের খবর সামনে এলে তাই শুধু নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তরুণদের কী শেখানো হচ্ছে, কীভাবে শেখানো হচ্ছে এবং শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মূল্যবোধ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেও যান্ত্রিক শিক্ষার বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ রয়েছে। ‘তোতাকাহিনী’ তার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলির একটি। সেখানে পাখিকে শিক্ষিত করার নামে তার স্বাভাবিক জীবনকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বইয়ের পাতা তার পেটে ঢোকানো হয়, কিন্তু তার ডানা, গান, ক্ষুধা কিংবা স্বাধীনতার প্রয়োজনকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। শেষ পর্যন্ত পাখিটি বেঁচে থাকে না, অথচ প্রশাসনিক বিচারে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। এই ব্যঙ্গ আজও শিক্ষাব্যবস্থার সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষায় ভাল করে কিন্তু প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, যদি বইয়ের উত্তর মুখস্থ করে কিন্তু নিজের মত তৈরি করতে না পারে, যদি তথ্য জানে কিন্তু সত্য-মিথ্যা বিচার করতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষাকে কতটা পূর্ণ বলা যাবে? রবীন্দ্রনাথের উত্তর ছিল মানুষের আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে। সত্যকে নিজের ভিতরে উপলব্ধি করা আর নিজের কাজ ও চিন্তার মাধ্যমে তা প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জন করাই শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষা মানুষের আত্মাকে ময়লা থেকে মুক্ত করবে, তাকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাবে, অন্য মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করার ক্ষমতা তৈরি করবে এই ছিল তাঁর বৃহত্তর প্রত্যাশা।
এই সময়ে প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে শিক্ষা ভাবা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য ও বিস্তৃত করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যেন শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে না ওঠে, সেটিও মনে রাখা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে, ইন্টারনেট তথ্য দিতে পারে, ডিজিটাল মাধ্যম অসংখ্য বই সামনে এনে দিতে পারে। কিন্তু কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য, কোন সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত এবং কোন কাজ মানুষের জন্য কল্যাণকর, এই বিচার শিক্ষাকেই শেখাতে হবে। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর শিক্ষাভাবনা অতীতের কোনও স্মৃতিচিহ্ন নয়। তা দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি দরজা। তাঁর শিক্ষা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর শিক্ষা মানুষ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না।
শিক্ষার শেষ সাফল্য যদি শুধু একজন পরীক্ষার্থী তৈরি করা হয়, তবে রবীন্দ্রনাথের কাছে তা যথেষ্ট ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন এমন মানুষ, যে সত্যকে খুঁজবে, নিজের ভুল নিয়ে ভাববে, অন্যকে সম্মান করবে, সমাজের দায়িত্ব নেবে এবং নিজের স্বাধীন চিন্তাকে মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করবে। এখন যখন শিক্ষার কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন সেই পুরনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে আসে, আমরা কী শুধু শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি মানুষও তৈরি করছি? রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা হয়ত সেই প্রশ্নের সরল উত্তর দেয় না। কিন্তু প্রশ্নটিকে আরও গভীর করে তোলে। আর সেখানেই ওঁর শিক্ষাদর্শের আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৪১.
অম্লানের শহর
রাত গভীর হলে শহরটির কিছু পুরনো শব্দ এখনও ফিরে আসে। দিনের বেলা তাদের দেখা যায় না। দিনের আলোয় নতুন শহর তাদের ঢেকে রাখে গাড়ির শব্দ, বহুতলের লিফট, দোকানের কাচের দরজা, মোবাইলের রিং, ব্যস্ত মানুষের দ্রুত পায়ের শব্দ। কিন্তু রাত বাড়লে, একে একে সব শব্দ যখন নিজেদের ঘরে ফিরে যায়, তখন কোথা থেকে যেন পুরনো শহরের কয়েকটি শব্দ উঠে আসে। একটি কেতলির ঢাকনা নড়ার শব্দ। দূরের কোনো সাইকেলের ঘণ্টি। দামোদর নদীর জল কেটে নৌকা যাওয়ার শব্দ। আর একটি কণ্ঠস্বর, “হিরণ্য, একটু শোন না।”
হিরণ্য জানে, সেই কণ্ঠস্বর আর কোনওদিন সত্যি সত্যি শোনা যাবে না। তবু শোনা যায়, স্মৃতির নিজস্ব শ্রবণশক্তি আছে। তার কাছে মৃত মানুষদেরও কণ্ঠ থাকে। অম্লানের কণ্ঠ ছিল গভীর, একটু সান্দ্র। কথা বলার সময় সে কখনও তাড়াহুড়ো করত না, অথচ তার কথার মধ্যে সবসময় যেন একটা অদৃশ্য তাড়া থাকত, এই কথাটা এখনই বলতে হবে, এই গল্পটা এখনই শোনাতে হবে, এই মানুষটাকে এখনই কোনও একটি অচেনা রাস্তার দিকে নিয়ে যেতে হবে।
জীবন অবশ্য কখনও সামনে পড়ে থাকে না। মানুষ শুধু মনে করে থাকে। কলেজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরা ছড়িয়ে গেল। চাকরি। বিয়ে। সংসার। বদলি। নতুন শহর।নতুন ঘর। নতুন দায়িত্ব।প্রথম কয়েক বছর অম্লানের চাতালে আগের মতোই ভিড় হত।পুজোয় সবাই ফিরত। শীতের সন্ধ্যায় আড্ডা বসত।কারও বিয়ে হলে অম্লান সারারাত হইচই করত। কারও সন্তান হলে সে শিশুটিকে নিজের মানুষ বলে দাবি করত।কোনো বন্ধুর বাড়িতে অসুখ হলে রাত জেগে থাকত। তার নিজের জীবন নিয়ে কেউ খুব বেশি জানত না। অম্লান অন্যদের জীবন সম্পর্কে অসীম কৌতূহলী ছিল।
হিরণ্যর সঙ্গে অম্লানের বন্ধুত্বের শুরুটাও হয়েছিল এমনই এক অকারণ কথায়। কলেজের সেই দুপুরে হিরণ্য পরীক্ষার নোট নিয়ে বসেছিল ক্যান্টিনের এক কোণে। সামনে খাতা, হাতে কলম, মাথার ভিতর পরের দিনের পরীক্ষার চিন্তা। অম্লান এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
“কী পড়ছিস?”
হিরণ্য মাথা না তুলেই বলেছিল, “যা পড়ার।”
“কেন পড়ছিস?”
হিরণ্য এবার তাকিয়েছিল।
“পরীক্ষা আছে।”
অম্লান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “মানুষ সবসময় পরীক্ষার জন্য পড়ে কেন?”
হিরণ্য বিরক্ত হয়েছিল।
“তুই কি কোনও দিন সিরিয়াস হতে পারিস?”
অম্লান চেয়ার টেনে বসেছিল।
“খুব পারি।”
“কখন?”
“যখন কেউ দেখে না।”
হিরণ্য হেসে ফেলেছিল। সেই প্রথম।
তারপর অম্লান বলেছিল,
“একটা গল্প শোনাব?”
“না।”
“খুব ছোট।”
“কত ছোট?”
“পাঁচ মিনিট।”
অম্লানের পাঁচ মিনিট যে ঘড়ির পাঁচ মিনিট নয়, সেটা হিরণ্য তখন জানত না।
গল্প শুরু হয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর হিরণ্য খেয়াল করেছিল, অম্লান গল্প পড়ছে না, গল্পটাকে অভিনয় করছে। চরিত্রের গলা বদলে যাচ্ছে। কোথাও থেমে যাচ্ছে। কোথাও চোখ তুলে তাকাচ্ছে। কোথাও একটি শব্দকে এমনভাবে উচ্চারণ করছে যেন শব্দটির ভিতরে আরেকটি গল্প লুকিয়ে আছে। পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল। দশ মিনিট। পনের… হিরণ্য ঘড়ি দেখেছিল।
অম্লান বলেছিল,
“ঘড়ি দেখিস না। গল্পের সময় নষ্ট হয়।”
শেষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা পর বই বন্ধ হয়েছিল।
হিরণ্য বলেছিল, “এটা তোর পাঁচ মিনিট?”
অম্লান নির্বিকার।
“গল্পের সময় আর ঘড়ির সময় এক নয়।”
সেদিনই বন্ধুত্বের প্রথম দরজা খুলেছিল। অম্লানের বাড়ি ছিল অভিরামপুরের প্রথম গলিতে। ছোট্ট একতলা বাড়ি। সামনে চাতাল। ভিতরে দুটি ঘর। একটি ছোট তক্তপোষ। একটি টেবিল। দু-তিনটি চেয়ার। আর বুক সেলফ। হিরণ্যর কাছে সেই বুক সেলফই ছিল অম্লানের আসল পরিচয়। বইগুলো সেখানে সাজানো থাকত না। ছড়িয়ে থাকত। কোনওটা টেবিলে, কোনওটা তক্তপোষে, কোনওটা জানলার ধারে। কিছু বইয়ের পাতা ভাঁজ করা, কোথাও পেন্সিলের দাগ, কোথাও লাল কালিতে মন্তব্য। অম্লান শুধু বই পড়ত না। বইয়ের সঙ্গে তার কথাবার্তা ছিল। কোনও লেখককে নিয়ে সে তর্ক করত। কোনও চরিত্রকে নিয়ে রাগ করত। কোনও কবিতাকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক চুপ করে থাকতে পারত। আর হিরণ্য অবাক হয়ে দেখত, কীভাবে একটি বই একটি ঘরকে বদলে দিতে পারে।
অম্লান বলত, “বই ঘরে থাকে না, হিরণ্য। বই ঘরকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।”
তখন কথাটা সুন্দর লেগেছিল।
আজ তার গভীরতা বোঝা যায়। অম্লানের আর একটি নেশা ছিল শব্দ নিয়ে খেলা। একদিন হঠাৎ হিরণ্যকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “গবেষণা মানে কী?”
হিরণ্য বলেছিল,
“গভীর এষণা। এই জাতীয় কিছু।”
অম্লান মাথা নাড়ল।
“না।”
“তাহলে?”
“গরু অন্বেষণ।”
হিরণ্য হেসে উঠেছিল।
“এটা আবার কী?”
অম্লান খুব গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “গরু হারিয়ে গেলে তার ক্ষুরের দাগ ধরে ধরে তাকে খুঁজে বের করতে হত। নতুন তথ্য খুঁজতে হলেও অতীতের চিহ্ন অনুসরণ করতে হয়। সুতরাং গবেষণা।”
হিরণ্য বলেছিল, “তুই এসব বানাস কোথা থেকে?”
অম্লান বলেছিল, “সব সত্যি কথা কেউ আগে থেকে লিখে রাখে না।” তারপর একটু থেমে যোগ করেছিল, “মিথ্যেরও একটা গবেষণামূল্য আছে।”
হিরণ্য হেসেছিল।
এইসব কথার অর্ধেক সত্যি, অর্ধেক মজা, কোনটা কোনটি, তা বোঝা অম্লানের সঙ্গে থাকার সবচেয়ে কঠিন ও সবচেয়ে আনন্দের কাজ ছিল। অম্লানের চাতাল ধীরে ধীরে হিরণ্যদের আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানে বয়সের কোনও সীমা ছিল না। কলেজের বন্ধুরা ছিল। বড় দাদারা আসতেন। কখনও কোনও শিক্ষক। কখনও কবি। কখনও রাজনীতির লোক। কখনও এমন কেউ, যাকে কেউ আগে চিনত না। অম্লানের কাছে পরিচয়ের চেয়ে গল্প গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে মানুষকে তার পেশা দিয়ে চিনত না। সে জানতে চাইত,
“কী ভাবিস?” “কী পড়িস?”
“কী নিয়ে রাগ হয়?” “কী নিয়ে স্বপ্ন দেখিস?” তারপর কথাবার্তা ছড়িয়ে পড়ত। সাহিত্য থেকে রাজনীতি। রাজনীতি থেকে ইতিহাস। ইতিহাস থেকে প্রেম। প্রেম থেকে দর্শন। দর্শন থেকে ভূত। ভূত থেকে ভগবান। তারপর আবার চা। কেউ কখনও বুঝতে পারত না, কথাটা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল। অম্লানও সম্ভবত জানত না। তার কথার কোনো সোজা রাস্তা ছিল না। ছিল অসংখ্য গলি। সেই গলিগুলোই একসময় শহরের মানচিত্র হয়ে উঠেছিল। অভিরামপুরের প্রথম গলি থেকে বিমল দাস মোড়। সেখান থেকে বাসস্ট্যান্ড। স্টেশন রোড। কলেজের পেছনের মাঠ। দামোদরের পাড়। আরও কত ছোট রাস্তা, মেঠো পথ, বাঁক, অন্ধকার গলি। অম্লান কথার ভিতর দিয়ে সব জায়গায় যেতে পারত। হিরণ্যরা শুধু তার সঙ্গে হাঁটত। তখন শহরটাও তাদের সঙ্গে কথা বলত। বিকেলের মাঠে ফুটবল। পাড়ার ছেলেমেয়েদের এক্কাদোক্কা।গাছ থেকে পেয়ারা পাড়া।সাইকেল নিয়ে শহর ঘোরা। কলেজের প্রাচীর পেরিয়ে দামোদর নদীর দিকে চলে যাওয়া।চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পাঁচ কাপ চা। এসবের কোনওটাই তখন বিশেষ ঘটনা ছিল না।জীবন তখন বড় ঘটনাগুলির জন্য অপেক্ষা করত না। ছোট ঘটনাগুলিই জীবন ছিল। এক সন্ধ্যায় হিরণ্য, অম্লান আর আরও কয়েকজন মহানন্দার ধারে বসেছিল। আকাশে তখন আলো কমে এসেছে। অম্লান বলেছিল, “শহরকে মনে রাখতে হলে তার রাস্তা মনে রাখিস না। তার শব্দ মনে রাখিস।” হিরণ্য বলেছিল, “কেন?”
“রাস্তা বদলে যায়।”
“শব্দ?”
অম্লান নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “শব্দ মানুষের ভিতর থেকে যায়।”
হিরণ্য উত্তর দেয়নি। দূরে কোথাও একটি নৌকা যাচ্ছিল। জলের শব্দ হচ্ছিল। পাখি ডাকছিল। চায়ের দোকানের কাপে চামচ ঠোকাঠুকি।কেউ একজন দূর থেকে অম্লানকে ডাকল। সে হাত তুলে উত্তর দিল। সেদিন হিরণ্য বুঝতে পারেনি, একদিন এইসব শব্দই তার কাছে শহরের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। অম্লান তখন পত্রিকা করার কথা বলছিল।নাম ঠিক হয়ে গেল, “অঙ্গন”।
হিরণ্য জিজ্ঞাসা করেছিল, “এই নাম কেন?”
অম্লান বলেছিল, “উঠোন।”
“উঠোন তো জানি।”
“উঠোন শুধু জায়গা নয়।”
“তাহলে?”
অম্লান বলেছিল, “ঘরের ভিতর মানুষ নিজের নিজের থাকে। উঠোনে এসে সবাই একসঙ্গে হয়।”
এই কথার পর আর কেউ নাম বদলানোর কথা বলেনি। অঙ্গনের কয়েকটি রোগা সংখ্যা বেরল। কবিতা। গল্প। প্রবন্ধ। ছোট ছোট আয়োজন। কবিতা পাঠ। প্রতিযোগিতা। আড্ডা। কোনও সংখ্যার কাগজের মান ভাল নয়। কোনও সংখ্যায় ছাপার ভুল। কোথাও লেখা কম। তবু অম্লানের চোখে অঙ্গন ছিল এক বিশাল পৃথিবী।
হিরণ্য তাকে বলেছিল, “এতে টাকা হবে না।”
অম্লান বলেছিল, “সবকিছুর টাকা হয় না।”
“তাহলে?”
“কিছু জিনিসের মানুষ হয়।”
হিরণ্য হেসেছিল। অম্লানও হেসেছিল। তখনও তাদের সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিল। জীবন অবশ্য কখনও সামনে পড়ে থাকে না। মানুষ শুধু মনে করে থাকে। কলেজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরা ছড়িয়ে গেল। চাকরি। বিয়ে। সংসার। বদলি। নতুন শহর।নতুন ঘর। নতুন দায়িত্ব।প্রথম কয়েক বছর অম্লানের চাতালে আগের মতোই ভিড় হত। পুজোয় সবাই ফিরত। শীতের সন্ধ্যায় আড্ডা বসত।কারও বিয়ে হলে অম্লান সারারাত হইচই করত। কারও সন্তান হলে সে শিশুটিকে নিজের মানুষ বলে দাবি করত।কোনো বন্ধুর বাড়িতে অসুখ হলে রাত জেগে থাকত। তার নিজের জীবন নিয়ে কেউ খুব বেশি জানত না। অম্লান অন্যদের জীবন সম্পর্কে অসীম কৌতূহলী ছিল। কিন্তু নিজের কথা এড়িয়ে যেত। হিরণ্য একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, “তোর নিজের কী ইচ্ছে?” অম্লান বলেছিল, “অনেক।”
“কী কী?”
“একটা স্কুল।”
“আর?”
“একটা বাগান।”
“আর?”
“একটা লাইব্রেরি।”
“আর?”
“একটা বড় উঠোন।”
হিরণ্য হেসে বলেছিল, “আর?”
অম্লান কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর বলেছিল, “মানুষ।”
“মানুষ?”
“হ্যাঁ। এমন মানুষ, যারা সন্ধ্যায় এসে বসবে। কারও কোথাও যাওয়ার তাড়া থাকবে না।”
হিরণ্য বলেছিল, “এটা সম্ভব?”
অম্লান বলেছিল, “সম্ভব জিনিসের জন্য এত স্বপ্ন দেখতে হয় না।”
এরপর খুব ধীরে ধীরে শহরের ভিতর কাচ ঢুকতে শুরু করল। পুরনো বাড়ি ভাঙল। বহুতল উঠল। মাঠের পাশে আবাসন। চায়ের দোকানের জায়গায় দোকানঘর। রকের জায়গায় গাড়ি। পুকুরের জায়গায় নির্মাণসামগ্রী। শহর উন্নত হচ্ছিল।শুধু তার স্মৃতিগুলো একে-একে উচ্ছেদ হচ্ছিল।হিরণ্য দূরে থাকলেও খবর পেত। অম্লানের সঙ্গে ফোনে কথা হত। কিন্তু অম্লান ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলতে চাইত না।
একদিন হিরণ্য জিজ্ঞাসা করেছিল, “কী হল? কথা বলিস না কেন?”
অম্লান বলেছিল, “ফোনে কথা হয় না।”
“তাহলে?”
“ফোনে কথার খবর দেওয়া হয়।”
হিরণ্য হেসেছিল।
“এ আবার কী?”
অম্লান বলেছিল, “কথা বলতে চোখ লাগে, মুখ লাগে, বিরতি লাগে। কখনও চুপ করেও থাকতে হয়। ফোনে শুধু শব্দ যায়।”
“শব্দই তো কথা।”
“না।”
“তাহলে?”
অম্লান বলেছিল, “শব্দেরও শরীর আছে।”
হিরণ্য তখন চুপ করে গিয়েছিল।
এই প্রথম অম্লানের কোনও কথাকে মজা বলে মনে হয়নি।
তারপর অম্লানের চুল পাতলা হতে লাগল। ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটি ধীরে ধীরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক শান্ত মানুষ হয়ে উঠল। কিন্তু চোখের ভিতরকার আলো পুরো নিভল না। শুধু কথা কমে গেল। আগে যে মানুষকে চুপ করানো যেত না, সে এখন মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময় জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকত। বন্ধুরা আসত। চা হত। কথা হত। অম্লান শুনত বেশি। বলত কম।
হিরণ্য একদিন বলেছিল, “তুই বদলে গেছিস।”
অম্লান বলেছিল, “শহর বদলেছে।”
“সেটা তো সবাই বলছে।”
“সবাই শহরকে বাইরে থেকে দেখে।”
“আর তুই?”
অম্লান উত্তর দেয়নি। জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সন্ধ্যা নামছিল। একসময় খুব আস্তে বলেছিল, “যে শহরে রক নেই, সেই শহরে কথারা কোথায় বসবে, হিরণ্য?”
হিরণ্যর কোনও উত্তর ছিল না।
তারপরও বন্ধুত্ব ছিল। দূরত্বের মধ্যেও। ব্যস্ততার ভিতরেও। কখনও ফোনে। কখনও চিঠিতে। কখনও হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে এক কাপ চায়ে। হিরণ্য বুঝত, অম্লানের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব কোনও সাধারণ বন্ধুত্ব নয়। অম্লান তার জীবনের একজন মানুষই শুধু নয়। সে হিরণ্যর যৌবনের একটি ভূগোল। একটি সময়ের গন্ধ। একটি শহরের ভাষা। একটি হারিয়ে যাওয়া অঙ্গন।
আর হয়ত সেই কারণেই অম্লানের কথা মনে পড়লেই হিরণ্যর মনে প্রথমে কোনও মুখ ভেসে ওঠে না। শুধু একটি শব্দ ভেসে ওঠে।
“শোন।”
তারপর আরেকটি, “একটু।”
তারপর, “আয়।” এই তিনটি শব্দের ভিতরেই যেন অম্লানের সমগ্র জীবন। আয়। বস। শোন। কিছুক্ষণ পৃথিবীকে ভুলে থাক। সেই সময় হিরণ্য জানত না, সামনে আরও একটি দীর্ঘ নীরবতা অপেক্ষা করছে। জানত না, একদিন অম্লানের কণ্ঠস্বরকে সত্যি সত্যি খুঁজতে হবে স্মৃতির ভিতর। জানত না, যে শহরটিকে তারা এত ভালোবেসেছিল, তার সঙ্গে অম্লানের অনুপস্থিতিরও একদিন অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হবে। শুধু সেই রাতগুলোর কথা মনে আছে, চাতালে বসে থাকা কয়েকজন মানুষ। একটা বই খোলা। চায়ের কাপ।
দামোদরের দিকে চলে যাওয়া অন্ধকার। আর অম্লানের কণ্ঠস্বর। “হিরণ্য, একটু শোন না।” হিরণ্য শুনত। সেদিন তার কোনও তাড়া ছিল না। আজও সেই ডাকের ভিতর হিরণ্যর কাছে সময় থেমে আছে। কারণ কিছু বন্ধুত্বের কোনও শেষ দৃশ্য থাকে না। থাকে শুধু একটি অসমাপ্ত বাক্য। আর সেই বাক্যের শেষ শব্দটি বহু বছর ধরে রাত্রির ভিতর জেগে থাকে। 🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
অভিনন্দন চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

যাওয়া
মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে দরজার বাইরে
অচেনা অতিথির মতো
নির্বাক, ধৈর্যশীল ভাঁজে হাত রেখে।
সব আলো নিভে এলে
শরীরের ভেতর যে ক্ষুদ্র কণ্ঠস্বর
কাঁপতে থাকে ; তাকে শোনার জন্যই
মৃত্যু এগিয়ে আসে ধীরে ধীরে।
ভালবাসার শেষ শব্দে অর্ধেক লেখা চিঠির ভাঁজ;
অসমাপ্ত সুরের টানাপোড়েনে
মৃত্যু নিজের ছাপ রেখে গিয়েছে।
আমি জানি মৃত্যু মুছে ফেলে না কিছুই
থামিয়ে দেয়।
নদী যেমন একদিন সমুদ্রে মিলিয়ে যায়।
পাতা যেমন মাটিতে ঝরে গিয়ে
অন্য জীবনের জন্ম দেয়…
তেমনি মৃত্যুও অস্তিত্বের আরেকটি দিক,
যেখানে নীরবতা আর শূন্যতা
অভিন্ন ও চিরন্তন।
আনন্দরূপা দাশগুপ্ত -এর একটি কবিতা

স্টেশনটি অচেনা
ভোরের অন্ধকার। স্টেশনজুড়ে চায়ের বাষ্প।
ঘুমঘুম চোখে কিছু মানুষের ডাকাডাকি।
আমি নেমে এলাম। অচেনা স্টেশনে।
রাস্তার দু’পাশে দোকান খোলার শব্দ। তাজা রুটি আর দুধের গন্ধ। শীতল বাতাস। কেমন হাহাকার মেশানো।
কুয়াশার বুক চিরে উঠে আসছে সূর্য।
কারও কোনও পুরনো প্রেমিকার চোখে হঠাৎ নতুন জ্বলে উঠে যেমন!
অচেনা অচেনা স্টেশনে আমি হঠাৎ টের পেলাম
আমাদের সমস্ত জীবন একধরনের পালানো।
নিজের থেকে, সম্পর্ক থেকে, এমনকী নিজের ছায়া থেকেও।
তথাপি, এখানে আমি যেন আবার দেখেছি
একটি পাখি, শিশুটির র হাসি,
এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আমাকে শিখিয়ে দিল,
যা হারিয়ে যায়, তারও রূপ আছে, তারও অনন্ত সিগ্ধতা।
শর্বাণীরঞ্জন কুণ্ডু -এর দু’টি কবিতা

একটি পরাবাস্তব কাহিনি
আমার এক বন্ধু এসেছে আমার বাড়িতে।
আমার অবিবাহিতা ভগিনী গান গাইতে গাইতে
হেঁটে চলে যায় ওধার দিয়ে।
আমার বন্ধু ভাবছে
রাতে তাকে কোথায় শুতে দেব আমি।
এদিকে আমি আমার মোবাইল ফোনটা খুঁছছি
তাকে কটা কবিতা শোনাবো বলে।
আর তখনই ইলেক্ট্রিশিয়ান এসেছে
গ্যাঙ্গবক্সটা কোথায় জানতে চেয়ে।
আমার বোন এসে তাকে গ্যঙ্গবক্সটা দেখিয়ে দিয়ে গেল।
দেখলাম বাথরুমগুলোতে বড় বেশি ঝুল।
চুনকামওয়ালাকে ডেকে
সব ঝুল ঝেড়েঝুড়ে
রং করাতে হবে।
কি করে এতদিন চোখে পরে নি সেসব ভাবি।

ঈশ্বর ও বুদ্ধি
প্রত্যেক বুদ্ধিমান মানুষের ভেতরে
একটি নির্বোধ মানুষ থাকে।
বুদ্ধিমান অনেক কিছু প্রশংসাযোগ্য করে।
ফলে প্রভুত মানুষ বিস্ময়াভূত হয়।
কত করতালি জোটে।
কিন্তু সেই বিশিষ্ট মানুষটি জানে না
গোপনে বেড়েছে এক নির্বোধের ভ্রুণ।
কেন এমন হয়
কেউ বলতে পারে না।
এ এক প্রকৃতির জটিল পরিকল্পনা।
সে জানে সে কী করছে।
মানুষ জানে না।
তাই তো মানুষের ঈশ্বর কল্পনা।
রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ -এর একটি কবিতা

আরও দাও
দেবার মরসুমে
বদলে যায় প্রচ্ছদের রামধনু
বীর্য পতনের শব্দ
শুনতে পায়
ঋতুর অহঙ্কার
বল্লরী ঘোষ -এর একটি কবিতা

উৎসবে
প্রাণের মেলায় জীবনের রঙে ভরে ওঠে সবকিছু। আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায় মন, ছড়িয়ে পড়ে নতুন স্বপ্নের বীজ। উৎসবের দিনে মানুষের হৃদয়ে জাগে এক অনন্য অনুভূতি, যা সবাইকে একত্রিত করে। এই সময়ে জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। উৎসবের আলোকিত হয় চারপাশ, সৃষ্টি হয় নতুন আশার। ভালবাসা প্রেম থেকে অনন্ত তখন।
বসন্ত পরামাণিক -এর একটি কবিতা

স্বাধীনতার কথা
যখন আমার প্রাণের স্বদেশ অন্ধকারে ভরা
দেশজননী বাঁধা যখন শৃঙ্খলে শৃঙ্খলে,
সেই সে বাঁধন খোলার জন্য দেশের ছেলে-মেয়ে
বুকের রক্ত ঢেলে দিল মায়ের চরণতলে।
সূর্য সেনের কঠিন লড়াই কিংবা ক্ষুদিরাম
বিনয় বাদল দীনেশ -এমন হাজার হাজার নাম–
ছড়িয়ে আছে এই ভারতের ইতিহাসের বুকে
ভুলব না কেউ বিপ্লবীদের কঠিন সে সংগ্রাম।
প্রীতিলতা, কল্পনা আর বীণা দাশের কথা
ছড়িয়ে আছে লক্ষ কোটি ভারতবাসীর বুকে,
শান্তি কিংবা সুনীতিদের আত্মদানের কথা
ঘুরে ফেরে আজো দেশের সবার মুখে মুখে।
মাতঙ্গিনী, মহাত্মাজী দেশপ্রেমের আকর
বিপ্লবী বীর সুভাষ বোসের নাম তো হিরন্ময়,
রাসবিহারী, অরবিন্দ, চন্দ্রশেখর, ভগৎ
হৃদয় জুড়ে থাকবে এ নাম মুছে যাবার নয়।
আমার ভারত ধারণ করে বিপ্লবী মন্ত্র-কে
দৃপ্ত প্রতিবাদেই ভাঙে স্বৈরাচারীর ঘর,
আমার ভারত মানবতার মূর্ত প্রতীক, তাই
ভালোবাসা প্রাণে প্রাণে ছড়ায় পরস্পর।
বন্দেমাতরম্-এর সুরে এ দেশ মাতোয়ারা
তাইতো আকাশ বাতাস জুড়ে একরাশ শুদ্ধতা,
সুসম্প্রীতির সুরে সুরে সবার হৃদয় ছুঁয়ে
ঢেউ তুলে যায় নদীর মতো প্রিয় স্বাধীনতা।।
চন্দনকৃষ্ণ পাল -এর একটি কবিতা

মেঘ কন্যার জন্য
শারদ আকাশে নীল
দেখেছো কি মেঘ কন্যা তুমি,
দেখেছো কি দৃঢ় বাহু
গহীন অনন্ত মনোভূমি?
আকাশের নীলে রাখো
তোমার বর্ণিল দুটো চোখ,
যুবকের দুই বাহু এনে দিক
অনিন্দ্য স্বপ্নীল আলোক।
ভাগ্যধর মণ্ডল -এর একটি কবিতা

স্বর্গাদপি গরীয়সী
মায়ের ভালবাসাই যেমন শ্রেষ্ঠ জানি
মাতৃদুগ্ধ জীবন সবার, সেটাই মানি।
মায়ের হাসি ঘোচায় যত দুঃখ শোক
তাঁরই চরণতলে আছে অমর লোক।
আজও খুঁজি মায়ের স্পর্শ গন্ধ তার
আকাশ যেমন হারিয়ে তারা দুঃখে ভার।
গড়েই জীবন মূল্যবোধের শান্তি চাই
শিখিয়ে গেছো করুণা যে চাইতে নাই।
স্বদেশ মাতার ঋণ তো জানি হয়না শোধ
দেশপ্রেমের মন্ত্র হলেও জীবন বোধ।
শিরদাঁড়াটা হয়তো আছে বীর তো নই,
স্বাধীন হয়েও শঙ্কিত আজ, একলা রই।
ভুলছি সুভাষ আর বিবেকের সেই বাণী
রবীন্দ্র আর নজরুল পথ দেখান জানি।
কান পেতে আজ শুনি যদি সেই সে গান
লক্ষ কোটি বছর অটুট থাকবে মান।
যতন কুমার দেবনাথ -এর একটি কবিতা

নদী
সুনয়না নদীর বয়নশিল্পে খরার অন্ধত্ব
অন্তরঙ্গে কথা বলছে মরুভূমি
পায়ে পা মিলিয়ে পাড় ধরে হেঁটে যাচ্ছি আমি
অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিতেই হিতে বিপরীত
শীত কুয়াশার হালকা জালে সূর্যের উঁকি
মুখ ফিরিয়ে নিলে নাব্যতা সঙ্কট
নরমেধ যজ্ঞের ভোগ্যপণ্য মরা ?
চোখে চোখ রেখে ইশারায় চাঁদকে ডাকে নদী
বালির বিছানায় জ্যোৎস্নার সুগন্ধি ঢেলে
গল্পে গল্পে ঘন হয় রাত।
বৃন্দাবন দাস -এর দু’টি কবিতা

আমার বিদ্যাসাগর
ভারতবর্ষ চিরকাল ঋষিকল্প মাধুর্য চায়
ভারতবর্ষ চিরন্তন ধ্যানমগ্ন কর্মযোগী চায়
ভারবর্ষ আপামর নরের মধ্যে সাধকের মূর্তি চায়
তুমি ঋষিকল্প মূর্তিতে ভেঙে দিলে
যাবতীয় ক্লেদের সংস্কার
তুমি মিথ্যাচারের অবগুন্ঠন টেনে হিঁচড়ে
কর্মের গোপন সোপান তৈরি করে দিলে
আপামর সাধারণের
তুমি স্বয়ংবরায় খুলে দিলে
জ্ঞানচক্ষু
কুসংস্কারের কুটিল চোখ কীভাবে বন্ধ করতে হয়
দেখিয়ে দিলে তীব্র তর্জনী তুলে
তুমিই আমার নদের নিমাই
তুমিই অমলিন অবধূত নিতাই গোঁসাই
তুমিই ভক্তির পরাকাষ্ঠা যবন হরিদাস
তুমিই শ্রীরামকৃষ্ণের’মহাসাগর’
তুমিই রবিঠাকুরের’চারিত্রপূজা’
তুমিই আমার ‘জাতির জনক’
বর্ণমালা সর্বপ্রথম ভাগ
তুমি এই পামর জাতির চক্ষুদান
চক্ষুষ্মান পরম্পরা
তোমাকে প্রণাম
প্রণাম
প্রণাম—

একমাত্র রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ যেখানেই থাক
রবীন্দ্রনাথ
এক অকালকুষ্মাণ্ড মূর্তি ভেঙে দিল
রবীন্দ্রনাথ মরে গেল
পাশাপাশি আর এক নির্বোধ
ভস্ম করে ফেলল
ফোটোর পর ফোটো সার দিয়ে
ব্যস্
শেষ হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথ
এদের কোনো পূর্বপুরুষ ভেবেছে
এমন কথা
পৃথিবীর ধ্বংসের পরও যে লোকটার
ভগ্নাবশেষ পাওয়া যাবে—
একমাত্র রবীন্দ্রনাথ—
ভোলা দেবনাথ -এর একটি কবিতা

কালান্তর
নিকষ কালো আঁধারে
চাঁদ বুড়িটা
ফোকলা দাঁতে
ভুতুড়ে কুয়াশায়।
আধামাখা লালাভ
বাতির ঝিলিকে
কুরে কুরে খায়
এক ঝাঁক সর্বভুক আরশোলা।
ক্রিসমাস বৃক্ষের ছায়াঘন
আঁধারের ছায়ায়
শেয়াল হাঁকে।
স্যাঁতসেঁতে ভেজা গন্ধ এখানে,
নিমিষে নেমে আসে অশরীরী
নিঃসঙ্গরা চলে যায় নিঃসঙ্গে।
আকাশের সীমানা গুণে তারারা
হাঁটে শতাব্দীর কুঁজো বুড়ি
রাতের নেশায়।
জেগে থাকা ঘুমন্ত প্রাণে
উল্লাস অন্য শিহরণে
মরমর শব্দে-
ভেঙে যাওয়া গাছের
যুগ যুগ স্বপ্নের ছন্দপতন,
তারকার ভিড়ে
বেজায় হাসে চাঁদ বুড়িটা।
কৌশিক রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা

বাক ও স্তব্ধতা
মেঘ দিও, বৃষ্টি নামাব
খেয়াঘর, আর কিছু নিঃসৃত নিঃশ্বাস
প্রতিদিন চেয়ে নিই, তোমার থেকে, তারপর
আমাদের বজ্রযান কেঁপে ওঠে
এমন একদা ছিল…
কিন্তু এখন ‘আমি’ ‘তুমি’ সর্বত্র ‘আমরা’
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
২৮.
লতাদি
ঘড়ির অ্যালার্মের শব্দে ঘুম বেগে ভেঙে যায় পবিত্র চোখ বুঝেই সে হাতড়াতে থাকে অ্যালার্ম ঘড়িটা কোনও রকমে বন্ধ করে যেই চোখটা খুলে দেখলো তিথি তখনও শুয়ে আছে মনের ভেতরে খটকা লাগল। কী ব্যাপার এ সময় তো তিথি ঘুমায় না! ওর কি শরীর খারাপ? ডাকতে গিয়েও হাতটা সরিয়ে নিল। তারপর কী মনে হল, একবার ডেকেই দিই স্কুল আছে তো! গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, কি গো এখনও ঘুমাচ্ছ উঠবে না?
তিথি চোখ খুলে দেখল, পবিত্র।
তারপর বলল, হ্যাঁ যাব তো।
ধড়ফড় করে উঠে পড়ল
বাপরে আজকে কি দেরি হয়ে গেল! কি করে সব পেরে উঠব কে জানে! হাই তুলে তিথি ব্যালকনিতে এসে দেখল, কাগুজে মাসি উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। ভাগ্যিস কাগুজে মাসি ছিল। উপর থেকে হাঁক দিল,
—ও মাসি কত তাড়াতাড়ি উঠেছ!
—ঘুম ভেঙে গেল।
—আমারই দেরি হয়ে গেল।
—আজ তোমার স্কুল ছুটি তো আরেকটু পরে উঠতে পারতে।
—কেন?
—আজকে রাখি তো!
—হ্যাঁ তাই তো, তবে ছুটির কথা তো কিছু বলেনি।
—ওওওও আমি তো একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম।
না একবার দেখি তো গ্রুপটা খুলে, হ্যাঁ তাই তো ছুটি দিয়েছে।
ওদিকে বুবুন বায়না ধরেছে, ভাল রাখি কিনে দিতে হবে, —মাম মাম আমার রাখি কোথায়?
—এই তো বাবা, বাপি বাজার থেকে এনে দেবে।
—কিন্তু তুমি রাখি দিয়ে কি করবে?
—আমি পুচুকে বাঁধব।
—বাহ খুব ভাল।
—কেন এরকম করছ লতা দি? জানোই তো, আমাদের জীবনটা এরকম! শুধু শুধু মারটা খেলে।
—তোরা সব বেইমান।
—লে হালুয়া আমি আবার কী করলাম?
—ভাগ আমার সামনে থেকে।
—তুমি মাসিকে কিছু বলতে পারো না, আর আমরা কিছু বলতে গেলে আমাদেরকে উল্টোপাল্টা শোনাও।
—যা মাসিকে গিয়ে বল আমি রেডি।
চারিদিকে যখন অবলা জীবগুলোর কিছু মানুষের মনুষ্যত্বহীন কাজকর্ম বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষক নাড়া দেয় আজ এই রকম ছোট্ট শিশুর মন যখন অবলা জীবগুলোকে নিজের আপনজন পরিবারের একজন বলে থাকে তিথির গর্ব অনুভব হয় সন্তানের প্রতি। বুবুনকে কাছে টেনে অনেকক্ষণ আদর করল ওদিকে পুচুও লেজ নাড়ছে আদর খাবার জন্য তিথি দু’জনকেই আগলে ধরল।
বলল,
—আজ অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছে চল, তোমাদেরকে খাবার দেবো।
—আমরা খেয়েছি তো
খেয়েছ!
তিথি বেশ অবাক হল।
—কে খাইয়েছে?
—বাপি।
—ও তাই। বেশ তাহলে খেলা কর।
—কিন্তু মাম মাম আমাযর রাখি?
—-যা বাপীকে গিয়ে বল। বুবন ছুটল, সঙ্গী পুচু।
তিথি রান্নাঘরে ঢুকল, একি চা রেডি। অবাক হয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে কাগুজে মাসি বাসন নিয়ে ঢুকল।
—ও মাসি চা কে করল?
—পবিত্র বাবা করেছে।
—বাবা আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম!
তিথি ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে মাসিকে দিল।
—আমি চা খেয়েছি গো।
—ঠিক আছে খেয়েছ আর এক কাপ খাও।
—কি গো বাজারে যাচ্ছি। মাসি ব্যাগটা দাও তো হাত বাড়িয়ে।
আজ রাখি মটন হবে। খুব ভাল করে রান্না ক’রো তিথি কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া হবে।
—হ্যাঁ এরকম যদি রোজই কিছু না কিছু লেগে থাকে তাহলে রোজই মটন খেলে কী ভাল হয় না?
—মেলা বকো না। বাজারে যাচ্ছি।
—ও হ্যাঁ শোনো শোনো পিছু ডাকলাম… বুবুনের জন্য রাখি কিনে এনো ভাল।
—হ্যাঁ, ও-আমাকে বলেছে।
—ও-মাসি লতাদির কথা বলো।
—কী বলি বলত, আজ রাখি পূর্ণিমাতেও জড়িয়ে আছে এক কালো দিন!
তিথি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কি হয়েছে?
—জানো তো, আমাদের গলিতে কত ধরনের লোক আসে তাই না, তবে সবাই যে খারাপ অনুভূতি নিয়ে আসে তা নয়। কেউ কেউ কিন্তু টাইম পাস করার জন্য, অনেকে কষ্ট, দুঃখ যন্ত্রণা ভোলার জন্য। এরকমই একটি ঘটনা।
—বেশ ইন্টারেস্টিং।
—হ্যাঁ গো শোনো…
—একবার এক ভদ্রলোক… প্রায়শই আসতেন, প্রথম দিন লতাকে দেখেই ভাল লেগে গেছিল এবং মাসিকে বলেছিলেন, আমার ওই মেয়েটিই চাই।
—মাসি তো খুব খুশি।
মাসি খুশি, কিন্তু সেদিন লতার খুব শরীর খারাপ। কাজেই সে বলে পাঠায় মাসিকে, কোনও কাস্টমারকে সে অ্যাটেন্ড করতে পারবে না।
তিথি অবাক হয়ে যায়, কাগজি মাসি এরকম ভাল ইংরেজি বলে কি করে?
—তারপর?
—তারপর মাসি লতাকে ডেকে পাঠায়, তার কাছে কারণ জিজ্ঞেস করে। লতা বলে তার শরীর খারাপ। মাসি প্রথম দিকে ভাল ব্যবহার করে লতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে তাই বলে, আচ্ছা তুই আগে দেখ কাস্টমারকে। তারপরে না হয় বলিস, অন্য কথা। লতার উত্তর দেবার আগেই সেই কাস্টমার এসে হাজির।
মাসি বলে, এই যে সাব ইনি সেই লতা। ভদ্রলোক দু’চোখে লতার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন হাজার প্রশ্ন কুরে কুরে খায়।
লতা একবার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে চোখটা নামিয়ে নেয়। লতা যেন এক নিমিষে মনটা পড়ে ফেলে। মাসি বলল,
তাহলে যা তুই রেডি হয়ে নে। তারপর ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল যে, রেট অনেক বেশি সাব। উনি বললেন,
তুমি রেটের জন্য চিন্তা করো না।
—বেশ তাই হবে।
—আরে জবা যারে, জলদি জলদি করতে বল লতাকে।
লতার সেই একই কথা, সে আজ কোনও কাস্টমার অ্যাটেন্ড করবে না। এর ফলে কি হল, সে কি বলবো বৌমা? লতাকে চাবুক দিয়ে পেটানো হল।
—মাসি!
—মাসির চোখে জল। সেকি অত্যাচার! তারপরেও না।
—লতাদির তাহলে ভীষণ জেদ আছে। তারপর?
—তারপর মাসি আসে ওষুধ লাগাতে। খুব পেয়ারসে কথা বলে, দেখ লতা আমাকে শুধু শুধু মেজাজ খারাপ করাস তোরা। এটা বুঝিস না ধান্দা না হলে আমাদের চলে না। আহারে! খুব লেগেছে না।
লতা ছিটকে বেরিয়ে আসে।
কিন্তু মাসি লতার জেদের কাছে হার মানে। শুধু বলে একবারটা কথা বল না ভদ্রলোকের সঙ্গে। তারপর না হয় আমি বুঝিয়ে ভাজিয়ে ঠিক একটা কিছু বলে দেব। তোকে কিছু করতে হবে না, শুধু তুই অ্যাটেন্ড কর। বিশ্বাস কর, আমি এইটুকু তোকে সাহায্য করতে পারি।
এটুকু বলে চলে যায় মাসি।
জবা গিয়ে বলে,
—কেন এরকম করছ লতা দি? জানোই তো, আমাদের জীবনটা এরকম! শুধু শুধু মারটা খেলে।
—তোরা সব বেইমান।
—লে হালুয়া আমি আবার কী করলাম?
—ভাগ আমার সামনে থেকে।
—তুমি মাসিকে কিছু বলতে পারো না, আর আমরা কিছু বলতে গেলে আমাদেরকে উল্টোপাল্টা শোনাও।
—যা মাসিকে গিয়ে বল আমি রেডি।
—সেকি! এই অবস্থাতে?
কী অবস্থাতে? তুই তো বললি আমাদের জীবনটা এরকম!
—হ্যাঁ, কিন্তু তোমাকে তো সময় দিয়েছে এখনই তোমাকে যেতে হবে, এমন কে মাথার দিব্যি দিয়েছে?
—হ্যাঁ আমি এখনই যাব, তুই মাসিকে গিয়ে বল লতা রেডি। জবার একবার বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু লতার চোখের দিকে তাকিয়ে আর সাহস পায় না। তারপর বলে, ঠিক আছে… ঠিক আছে… আমি যাচ্ছি।
—মাসি!
মাসি পানের পিকটা ফেলে বলে,
—বল কিছু খবর?
—হ্যাঁ, মাসি…
—লতা আসবে না তাইত?
—না, মাসি লতা দি বলল কাস্টমারকে পাঠাতে।
—কী বললি? কানে আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি না, আর একবার বল…
—কাস্টমারকে রেডি করতে…
—এত তাড়াতাড়ি।
মাসি জানে, লতা ভীষণ জেদী কি করে বসবে তার ঠিক নেই।
মাসি নিজেই ছুটল লতার কাছে। কারণ লতা তখন মাসির কাছে গলির লক্ষ্মী স্বরূপা। ওকে চটালে তো চলবে না।
—কী বলছ মাসি?
তিথি বলল।
—ওদিকে বেল বাজছে, ‘হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমো…’
—-থাক আজকে লতার প্রসঙ্গ তুমি রান্নাবান্না করে নাও গো বৌমা, বোধহয় দেখ ছেলে আসলো। 🍁(ক্রমশঃ)
🍂গ্রন্থ সমালোচনা
সমরেশ মজুমদারের লেখায় পরিবেশ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, চা-বাগান, ছোট শহর ও নির্জনতার আবহ তাঁর লেখায় আলাদা মাত্রা তৈরি করে। ‘ছায়ার শরীর’-এও পরিবেশের ব্যবহার রয়েছে, কিন্তু পৃথার মানসিক অবস্থার সঙ্গে সেই পরিবেশকে আরও নিবিড়ভাবে জুড়ে দেওয়া যেত। তা হলে উপন্যাসের অস্বস্তির আবহ আরও ঘন হতো। বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবশ্য সমাপ্তিতে। কাহিনি যত এগোয়, পৃথার বিপদ অস্বাভাবিকতার রহস্য নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে।
পৃথার লড়াই যতটা তীব্র, সমরেশ মজুমদার -এর ‘ছায়ার শরীর’ ততটাই অসম্পূর্ণ

দেবব্রত সরকার
সমরেশ মজুমদারের ‘ছায়ার শরীর’ শুরু হয় পৃথাকে দিয়ে। স্বাধীনচেতা, রবীন্দ্রনাথ-অনুরাগী একজন তরুণী, যাকে বাবা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া, জীবনকে নিজের চোখে দেখা, সম্পর্কের মধ্যে আত্মসম্মান ধরে রাখার শিক্ষা পেয়েই সে বড় হয়। কিন্তু বিয়ের পর সেই পৃথাকেই ঢুকে পড়তে হয় শিলচরের একটি সংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারে। এখান থেকেই উপন্যাসের মূল সংঘাত। পৃথার মা মায়াবতী মেয়ের স্বাধীন মানসিকতাকে স্বস্তির চোখে দেখেন না। তাই দ্রুত তার বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী প্রণবকুমারের সঙ্গে পৃথার মানসিক দূরত্বও শুরু থেকেই লক্ষ্যণীয়। বাংলা সাহিত্য কিংবা রবীন্দ্রনাথের জগৎ তার কাছে মূল্যহীন; দাম্পত্যকে সে অনেক বেশি শরীরের চাহিদার জায়গা থেকে দেখে। ফলে পৃথার কাছে বিয়ে যেখানে সম্পর্ক ও সহাবস্থানের প্রশ্ন, প্রণবের কাছে তা ক্রমশ অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে ওঠে।
বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবশ্য সমাপ্তিতে। কাহিনি যত এগোয়, পৃথার বিপদ অস্বাভাবিকতার রহস্য নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু শেষ পর্বে এসে সেই রহস্যের ব্যাখ্যা প্রত্যাশা মতো বিস্তৃত হয় না। যে প্রশ্নগুলি গল্প তৈরি করেছে, তার কয়েকটির উত্তর না মেলায় পরিণতিটি খানিক অসম্পূর্ণ লাগে। এখানে আরও কয়েকটি স্তর যোগ হলে উপন্যাসের অভিঘাত অনেক বেশি জোরাল হতে পারত। ভাষা পাঠযোগ্য, কিন্তু গতি সর্বত্র সমান নয়।
এই সংঘাতটিই উপন্যাসের অন্যতম শক্তি। সমরেশ মজুমদার দাম্পত্যকে রোমান্টিক মোড়কে ঢেকে রাখেননি। নারীর ইচ্ছা, শরীরের উপর তার অধিকার, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে গল্পের কেন্দ্রে এনেছেন। পৃথার বিপন্নতা শুধু ব্যক্তিগত না, তার মধ্যে বৃহত্তর সামাজিক সঙ্কটও ধরা পড়ে। উপন্যাসে কুসংস্কারের উপস্থিতি বইটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। একটি পরিবারের প্রচলিত বিশ্বাস কীভাবে ব্যক্তির জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার আবহ তৈরি করেছেন লেখক। বাস্তবতার সঙ্গে ভয় ও অস্বাভাবিকতার মিশ্রণ উপন্যাসের কাহিনিকে অন্য মাত্রা দেয়। ‘ছায়ার শরীর’ নামটিও সেই অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ। অদৃশ্য ভয়, মানসিক চাপ ও অজানা বিপদের উপস্থিতি যেন পুরো কাহিনির উপর পড়ে থাকে।
এখানেই উপন্যাসটির সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে। পৃথার চরিত্রে যে সম্ভাবনা তৈরি করা হয়েছে, তার পুরোটা বিকশিত হয়নি। তার স্বাধীন মানসিকতা, দাম্পত্যের চাপ ও পারিবারিক সঙ্ঘাত আরও গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দাবি করেছিল। একইভাবে মায়াবতী কিংবা প্রণবকুমারের চরিত্রও অনেক ক্ষেত্রে একমাত্রিক থেকে যায়। তাঁদের আচরণের সামাজিক ও মানসিক কারণ নিয়ে আরও অনুসন্ধান থাকলে কাহিনি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠতে পারত। আবার, সমরেশ মজুমদারের লেখায় পরিবেশ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, চা-বাগান, ছোট শহর ও নির্জনতার আবহ তাঁর লেখায় আলাদা মাত্রা তৈরি করে। ‘ছায়ার শরীর’-এও পরিবেশের ব্যবহার রয়েছে, কিন্তু পৃথার মানসিক অবস্থার সঙ্গে সেই পরিবেশকে আরও নিবিড়ভাবে জুড়ে দেওয়া যেত। তা হলে উপন্যাসের অস্বস্তির আবহ আরও ঘন হতো। বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবশ্য সমাপ্তিতে। কাহিনি যত এগোয়, পৃথার বিপদ অস্বাভাবিকতার রহস্য নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু শেষ পর্বে এসে সেই রহস্যের ব্যাখ্যা প্রত্যাশা মতো বিস্তৃত হয় না। যে প্রশ্নগুলি গল্প তৈরি করেছে, তার কয়েকটির উত্তর না মেলায় পরিণতিটি খানিক অসম্পূর্ণ লাগে। এখানে আরও কয়েকটি স্তর যোগ হলে উপন্যাসের অভিঘাত অনেক বেশি জোরাল হতে পারত। ভাষা পাঠযোগ্য, কিন্তু গতি সর্বত্র সমান নয়। কোথাও ঘটনা দ্রুত এগিয়েছে, আবার কোথাও বর্ণনা প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ হয়েছে। ফলে ছোট পরিসরের কাহিনিতে কিছু অংশ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। এই অসম ছন্দও বইটির সামগ্রিক টান কিছুটা কমিয়েছে।
এটা ঠিক ‘ছায়ার শরীর’কে সমরেশ মজুমদার -এর ব্যর্থ উপন্যাস বলা যাবে না। পৃথা চরিত্রটি পাঠককে ধরে রাখে। তার দুঃসময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বাধীনতা, বিবাহ, নারীর ইচ্ছা, পরিবার ও কুসংস্কারের প্রশ্ন। বই শেষ করার পরও সেই প্রশ্নগুলি মাথায় ঘোরে যে, একজন মেয়েকে স্বাধীনভাবে বড় করার পর সমাজ তাকে কতটা নিজের মতো থাকতে দেয়? দাম্পত্যে তার ইচ্ছার মূল্য কতখানি? আর পরিবার কখন সুরক্ষার অজুহাতে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করে? এখানে উল্লেখ করা অবশ্য প্রয়োজন, সমরেশ মজুমদারের ‘ছায়ার শরীর’-এর সাফল্য এখানেই যে, এটি পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে। আর ব্যর্থতা হল, সেই অস্বস্তিকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ সাহিত্যিক গভীরতায় নিয়ে যেতে পারে না। পৃথা যতটা শক্তিশালী চরিত্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করে, উপন্যাস ততটা দূর যেতে পারে না। ফলে বইটি একই সঙ্গে আকর্ষণীয় তেমনি অসম্পূর্ণ। আবার পাঠযোগ্য, কিন্তু নিঃশর্ত প্রশংসার যোগ্য নয়।🍁
বই: ছায়ার শরীর
লেখক: সমরেশ মজুমদার
প্রকাশক: আনন্দ প্রকাশনী

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




