মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কার্গিল যুদ্ধের পটভূমি। এক দিকে সীমান্তে ভারতীয় বায়ুসেনার লড়াই, অন্য দিকে ব্যক্তিগত জীবনে প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা। যুদ্ধের গল্প সাধারণত যেখানে গুলির শব্দ, দেশপ্রেম আর জয়-পরাজয়ের হিসাবকে কেন্দ্র করে এগোয়, সেখানে ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ (Operation Safed Sagar) সেই পরিচিত ছকের বাইরে গিয়ে মানুষের গল্পকেও সামনে এনেছে। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিরিজ়ে কার্গিল যুদ্ধে শহিদ বায়ুসেনা আধিকারিক অজয় আহুজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিদ্ধার্থ। তাঁর স্ত্রী অলকা আহুজার ভূমিকায় দেখা গিয়েছে কলকাতার অভিনেত্রী অমৃতা বাগচীকে (Amrita Bagchi)। চরিত্রটি করতে গিয়ে বাস্তবের অলকা আহুজার সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা অভিনেত্রীর কাছে হয়ে উঠেছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। অমৃতার কাছে এই চরিত্রটি শুধুমাত্র কোনও সেনা আধিকারিকের স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় ছিল না।

বাস্তব জীবনে স্বামীকে হারিয়েও যে নারী নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, তাঁর মানসিক অবস্থাকে পর্দায় তুলে ধরা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই কারণেই শুটিংয়ের আগে বাস্তবের অলকা আহুজার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী। সেই সাক্ষাৎ তাঁকে চরিত্রটি বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।

অলকার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে অমৃতা জানিয়েছেন, ‘ভেবেছিলাম ওঁর সঙ্গে দেখা করার মুহূর্তটা খুবই গুরুগম্ভীর হবে। ওঁর মনের মধ্যে যন্ত্রণা রয়েছে। কিন্তু বাইরে থেকে হালকা।’ অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে স্বামীকে হারানোর বেদনা বয়ে নিয়ে চললেও অলকার ব্যক্তিত্বের মধ্যে শুধু শোকের ছাপ নেই। বরং নিজের মতো করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি শক্ত মানসিকতাও রয়েছে। চরিত্রটি পর্দায় ফুটিয়ে তোলার সময় এই দুই বিপরীত অনুভূতিকে একসঙ্গে ধরার চেষ্টা করেছেন অমৃতা। উল্লেখ্য, অজয় আহুজার মৃত্যুর পরেও তাঁর দেহ অলকা দেখেননি। সেই কারণেই দীর্ঘ ২৫ বছর পরেও তাঁর মনে একটি প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে। অমৃতার কাছে অলকার এই মানসিক অবস্থাই চরিত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি। তাঁর কথায়, ‘২৫ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু দেহ দেখেননি। মনে করেন, হয়তো ফিরে আসতেও পারেন স্বামী। তাই নিজের মনের মধ্যেও সেই ২৫ বছর আগের যুবতীকে সযত্নে ধারণ করে রেখেছেন অলকা আহুজা।’ পর্দায় চরিত্রটি উপস্থাপনের সময় এই অনুভূতিকে মাথায় রেখেছিলেন অভিনেত্রী।

‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর গল্প অবশ্য শুধু অজয় ও অলকার ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কার্গিল যুদ্ধের পাশাপাশি সেই সময়ের পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিও সিরিজ়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ (Nawaz Sharif) ও সেনাপ্রধান পরভেজ মুশারফ (Pervez Musharraf) -এর মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপড়েনও গল্পে জায়গা পেয়েছে। ফলে যুদ্ধের ঘটনাকে শুধু ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়নি, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও তুলে ধরা হয়েছে। এই জায়গাটিই অমৃতাকে সিরিজটির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাঁর মতে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতকে শুধু ‘আমরা’ ও ‘ওরা’-র সরল বিভাজনে দেখলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ পড়ে যায়। অমৃতা বলেন, ‘কোনও কিছুকেই সাদা-কালোর গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। আসলে সঠিক তথ্যকেই তুলে ধরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিজ়ের নির্মাতারা দর্শকের উপর কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। বরং ঘটনাগুলিকে সামনে রেখে দর্শককেই নিজের বিচার তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

পরিচালক ওনি সেন (Ony Sen) এবং স্রষ্টা কুশল শ্রীবাস্তব (Kushal Shrivastava) ও অভিজিৎ সিংহ পরমার (Abhijit Singh Parmar)-এর কাজের ধরনও অমৃতার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কোথায় দর্শক আবেগপ্রবণ হবেন বা কোন মুহূর্তে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে জয়ের অনুভূতি তৈরি হবে, তা নির্মাতারা আলাদা করে নির্দেশ করেননি। বরং বাস্তব ঘটনাকে যথাসম্ভব তার নিজস্ব গতিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অমৃতার কথায়, ‘বাস্তবের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করলে তা হত না।’ তাঁর মতে, যুদ্ধের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়কে পর্দায় তুলে ধরতে গেলে আবেগের পাশাপাশি তথ্যের দিকটিও গুরুত্ব পায়। তাই সিরিজে যুদ্ধের দৃশ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক টানাপড়েন, ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের মানসিক অবস্থার জায়গাটিও রাখা হয়েছে।

সিরিজের শুটিংয়ের সময় বাস্তব বায়ুসেনা আধিকারিকদের উপস্থিতিও ছিল বলে জানিয়েছেন অমৃতা। ভারতীয় বায়ুসেনাকে কেন্দ্র করে তৈরি গল্পে সামরিক প্রেক্ষাপট ও কাজের পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাঁদের সহায়তা পাওয়া গিয়েছে। ফলে চরিত্র এবং পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে অভিনেতাদের সামনে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেনা আধিকারিকদের স্ত্রীদের চরিত্র সিনেমা বা সিরিজে অনেক সময় সংসারকেন্দ্রিকভাবেই দেখানো হয়। স্বামীর পেশাগত জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষাই হয়ে ওঠে তাঁদের গল্পের প্রধান অংশ। তবে অমৃতার মতে, বিষয়টি আরও বড় পরিসরে দেখা দরকার। সেনাদের স্ত্রীদের নিজেদের জীবন, পেশা, সামাজিক কাজ এবং ব্যক্তিগত লড়াইও গল্পের অংশ হতে পারে। বাস্তবের অলকা আহুজার জীবন সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে অমৃতাকে। স্বামীকে হারানোর পরেও তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে একটি পেট্রল পাম্প সামলাচ্ছেন। অভিনেত্রীর মতে, সেই জীবনও আলাদা করে একটি গল্প হয়ে উঠতে পারে। অমৃতা বলেন, ‘২৫ বছর একা একটি পেট্রল পাম্প সামলাচ্ছেন অলকা আহুজা। সেটা নিয়েও একটা গল্প তৈরি হতে পারে। এমন বহু সেনা-স্ত্রী রয়েছেন, যাঁরা নানা রকমের কাজ করে চলেছেন, সমাজকর্ম করছেন, তাঁদের তুলে ধরাও দরকার।’

অমৃতার নিজের অভিনয়জীবনও কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে বহু দূর এগিয়েছে। অভিনেত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি পরিচালক এবং মঞ্চশিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন।
কলকাতা ছাড়াও শ্রীরামপুর ও জলপাইগুড়িতে তাঁর শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। শিশুসাহিত্য পড়ার অভ্যাসও তৈরি হয়েছিল সেই সময়। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেন অমৃতা। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যান আহমেদাবাদে। সেখান থেকে তাঁর কর্মজীবনের পরবর্তী অধ্যায় মুম্বইকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে মুম্বইয়ে কাজ করছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি গল্প বলা ও পরিচালনার প্রতিও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। মুম্বাইয়ের কাজের পরিবেশ নিয়ে অভিনেত্রীর বক্তব্য, ‘এই শহরে মেধা ও পরিশ্রমের দাম আছে। অনেকেই ভাবেন, শিল্প ও উপার্জন হাত ধরাধরি করে চলতে পারে না। তবে মুম্বই শহর আমাকে সেই জায়গা দিয়েছে।’ নিজের অভিনয়জীবনে মুম্বইয়ের ভূমিকা তাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর আগে একাধিক জনপ্রিয় কাজেও দেখা গিয়েছে অমৃতা বাগচীকে। ‘হাসমুখ’, ‘শুবক্স’, ‘ফোবিয়া’ ও ‘দো অউর দো পেয়ার’-এর মতো কাজের পর এবার অজয় আহুজার স্ত্রী অলকার চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে। সিরিজে অমৃতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন জিমি শেরগিল (Jimmy Sheirgill), দিয়া মির্জা (Dia Mirza), আদিল হুসেন (Adil Hussain), অভয় বর্মা (Abhay Verma) এবং প্রাজক্তা কোহলি (Prajakta Koli)-র মতো অভিনেতারাও। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের পরিচালিত প্রথম ছবির প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অমৃতা। ফলে ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর চরিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলেও সামনে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে পরিচালনার নতুন অধ্যায়। আর অলকা আহুজার মতো বাস্তব চরিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা সেই পথচলায় নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করল বলেই মনে করছেন অভিনেত্রী।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonakshi Sinha Maldives Vacation | স্বপ্নের গন্তব্য মালদ্বীপে রোম্যান্টিক ছুটির মেজাজে সোনাক্ষী সিনহা ও জাহির ইকবাল



