সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেঙ্গালুরু: ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)-কে ঘিরে বেসরকারিকরণের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এবার মুখ খুললেন সংস্থার চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন (V. Narayanan)। কর্মীদের উদ্বেগের আবহে তাঁর বক্তব্য, ইসরোকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। বরং আগামী দিনে দেশের মহাকাশ কর্মসূচি আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসরোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত ‘স্পেস এক্সপো’ (Space Expo) অনুষ্ঠানে গিয়ে সংস্থার কর্মী ও মহাকাশ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মহলের উদ্দেশে কার্যত আশ্বাসের সুরেই বক্তব্য রাখেন ইসরো চেয়ারম্যান। ইসরোকে কেন্দ্র করে বেসরকারিকরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল কয়েক দিন আগেই। গত ৪ সেপ্টেম্বর সংস্থার কর্মীদের ন’টি সংগঠন ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণনকে চিঠি দিয়ে এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়ছে। তার ফলে ভবিষ্যতে ইসরোর দায়িত্ব ও গুরুত্ব কমে যাবে কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছিল। একই সঙ্গে মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্রে সরকারের নীতি কী, তা জানতে চেয়েছিল কর্মী সংগঠনগুলি।
এই পরিস্থিতিতে ইসরোর তরফে রবিবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বেসরকারিকরণ সংক্রান্ত যাবতীয় আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘ইসরোর বেসরকারিকরণ করা হবে না এবং প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বও কমানো হবে না।’ ইসরোর চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থানই আরও একবার উঠে এল। অর্থাৎ মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং ইসরোর দায়িত্ব কমে যাওয়া, দু’টিকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই বলেই কেন্দ্রীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার বক্তব্য। বেঙ্গালুরুর অনুষ্ঠানে ভি নারায়ণন বলেন, ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসরোর বেসরকারিকরণ হচ্ছে না।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচিতে বেসরকারি শিল্প সংস্থাগুলি বহুদিন ধরেই নানা ভাবে সহযোগিতা করে আসছে। মহাকাশযান, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি তৈরির কাজে ইতিমধ্যেই দেশের বহু সংস্থা যুক্ত হয়েছে। ফলে বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশগ্রহণকে ইসরোর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে দেশের মহাকাশ-বাস্তুতন্ত্রের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার কথাই তিনি বলেছেন।
ইসরো চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে সংস্কারের প্রক্রিয়া নতুন নয়। প্রায় ছ’বছর আগে থেকেই মহাকাশ ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বেসরকারি শিল্পক্ষেত্রকে মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে দেশের মহাকাশ-বাস্তুতন্ত্রকে বড় করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি উপগ্রহ, উৎক্ষেপণ যান এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশের শিল্প সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ বাড়ানো হচ্ছে। নারায়ণন বলেন, ‘ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে বেসরকারি সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ইতিমধ্যেই কয়েকশো ভারতীয় সংস্থা মহাকাশযান তৈরির বিভিন্ন কাজে যুক্ত।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। নিজেদের নিজস্ব দক্ষতা অনুযায়ী দু’টি ক্ষেত্রকে কাজে লাগিয়েই ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরোর সাম্প্রতিক বিবৃতিতেও একই অবস্থানের কথা জানানো হয়েছিল। সংস্থার দাবি, মহাকাশ ক্ষেত্রে নতুন নতুন স্টার্ট আপ ও বেসরকারি সংস্থা যুক্ত হওয়ায় ইসরোর দায়িত্ব কমছে না। সাধারণ ধরনের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কাজের একটি অংশ অন্য সংস্থার হাতে গেলে ইসরো আরও জটিল মহাকাশ গবেষণা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক অভিযানে মন দিতে পারবে। অর্থাৎ সংস্কারের লক্ষ্য ইসরোর ক্ষমতা কমানো নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের মূল গবেষণামূলক ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা। এই প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথরাইজ়েশন সেন্টার বা ইন-স্পেস (IN-SPACe)-এর চেয়ারম্যান পবন গোয়েন্কা (Pawan Goenka) -এর বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি ইসরোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানটির রূপান্তরের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তাঁর মতে, ইসরোর সামনে এখন আরও জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি, মহাকাশ অভিযান ও পরিকাঠামো তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তাই তুলনামূলক সাধারণ ধরনের উপগ্রহ বা উৎক্ষেপণ যান তৈরির কাজের একটি অংশ বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পবন গোয়েন্কার সেই মন্তব্যের পরেই ইসরোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়। মহাকাশ গবেষণার সরকারি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব কি ধীরে ধীরে অন্য সংস্থার হাতে চলে যাচ্ছে, এমন আশঙ্কাও সামনে আসে। সেই বিতর্কের মধ্যেই সমাজমাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ইন-স্পেস চেয়ারম্যান। তিনি জানান, ‘ইসরোর ভূমিকা কোনও ভাবেই কমছে না। ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্রে ইসরোই মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে।’ উল্লেখ্য যে, ইন-স্পেস মূলত মহাকাশ দফতরের অধীন একটি স্বশাসিত সংস্থা। মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলির কার্যক্রমকে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার দায়িত্ব এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের প্রসার নিয়ে ইন-স্পেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, গবেষণা, প্রযুক্তি তৈরি ও দেশের মহাকাশ কর্মসূচীর মূল দায়িত্ব ইসরোর কাছেই থাকছে বলে জানানো হয়েছে। বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে ইসরোর কাজের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। আগে যে ধরনের কাজের বড় অংশ সরাসরি ইসরোর বিভিন্ন কেন্দ্র ও ইউনিটের মাধ্যমে সম্পন্ন হত, তার কিছু অংশ এখন শিল্পক্ষেত্রের সংস্থাগুলির হাতে যেতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কাজের চাপ কিছুটা ভাগ হয়ে ইসরোর বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদেরা আরও কঠিন গবেষণামূলক প্রকল্পে সময় দিতে পারবেন, এমনটাই জানাচ্ছে সংস্থা।
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচী গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। চন্দ্রযান (Chandrayaan), মঙ্গলযান (Mangalyaan), সূর্য পর্যবেক্ষণ মিশন আদিত্য-এল১ (Aditya-L1) থেকে শুরু করে মানব মহাকাশযাত্রার পরিকল্পনা গগনযান (Gaganyaan) একাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পে ইসরোর ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ এবং মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে আগামী দিনে গবেষণা ও প্রযুক্তির আরও উন্নত স্তরে পৌঁছতে ইসরোর মূল ভূমিকা ধরে রাখার পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রের অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতি নেওয়া হয়েছে। কর্মীদের সংগঠনগুলির উদ্বেগের পর চেয়ারম্যানের বক্তব্য তাই তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরোকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না, এই আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি ভি নারায়ণন বোঝাতে চেয়েছেন, বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের বিস্তার আসলে দেশের সামগ্রিক মহাকাশ পরিকাঠামোকে বড় করার পরিকল্পনার অংশ। সংস্থার গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দায়িত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে বলেই তাঁর বক্তব্য।
ফলে আপাতত ইসরোর বেসরকারিকরণ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে। সামনে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ইসরো থাকবে মূল গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায়, আর বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি উৎপাদন, উৎক্ষেপণ ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে কাজ করবে, এমন কাঠামোর দিকেই এগোচ্ছে দেশের মহাকাশ কর্মসূচী।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Solar eclipse India date, longest solar eclipse 2027 | আগস্টে পরপর দুই গ্রহণ, সামনে ২০২৭-এর দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণ, ভারতের জন্য কবে দেখা যাবে



