তন্ময় দত্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ : মুর্শিদাবাদের বহরমপুর ভাগীরথীর বুকে ফের ইতিহাসের সাক্ষী থাকল বাংলা। বিশ্বের দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতা ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে (Bhagirathi River Swimming Competition)। তার আগে শনিবার আয়োজিত হয় শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠান। নদী, সাঁতারু, দর্শক ও আয়োজকদের উপস্থিতিতে উৎসবের আবহ তৈরি হয় ভাগীরথীর তীরে। দীর্ঘ জলপথ পেরিয়ে প্রতিযোগীদের লড়াই শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রের ঘটনা নয়, বাংলার নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ভাগীরথী নদীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই দীর্ঘ সাঁতার প্রতিযোগিতা বহু বছর ধরে ক্রীড়াপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। নদীর স্রোত, জলের গভীরতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরকে সক্রিয় রাখার চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি সবকিছুকে সামলে প্রতিযোগীদের এগিয়ে যেতে হয়। ফলে পুকুর বা সুইমিং পুলে প্রশিক্ষণের সঙ্গে নদীতে এমন দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারের মধ্যে রয়েছে বড় পার্থক্য। প্রতিযোগীদের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা নেয় ভাগীরথীর জল।

২০২৬ সালের প্রতিযোগিতাকে ঘিরেও কয়েক দিন আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল আগ্রহ। শনিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় প্রতিযোগিতা ঘিরে কর্মসূচি। নদীর তীরে উপস্থিত ক্রীড়াপ্রেমী এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছিল উৎসাহ। বহু মানুষের কাছে এই আয়োজন কেবল একটি সাঁতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং নদীকে ঘিরে বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে মূল প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ায় সকাল থেকেই ভাগীরথীর নির্দিষ্ট অংশে তৈরি হয় ক্রীড়ামঞ্চের পরিবেশ। নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একের পর এক সাঁতারু জলে নামেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি মুহূর্তেই থাকে কঠিন লড়াই। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পরিবেশের পরিবর্তন প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তোলে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা হিসেবে এই আয়োজনের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। দীর্ঘ দূরত্বের কারণে প্রতিযোগীদের প্রস্তুতিও সাধারণ সাঁতার প্রতিযোগিতার তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। নদীতে সাঁতারের ক্ষেত্রে জলের স্রোত কোন দিকে যাচ্ছে, কতটা জোরে বইছে, জলের তাপমাত্রা কেমন, এসব বিষয় প্রতিযোগিতার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সাঁতারুদের কৌশল এবং গতি নিয়ন্ত্রণের উপরও নির্ভর করে সাফল্য। ভাগীরথীর সঙ্গে বাংলার ইতিহাসের সম্পর্ক বহু পুরনো। এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জনপদ, বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা। সেই নদীর বুকেই যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাঁতারুরা দীর্ঘ পথ পেরোনোর পরীক্ষায় নামেন, তখন ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলার নদীমাতৃক পরিচয়। প্রতিযোগিতার ঐতিহ্য তাই বছরের পর বছর ধরে মানুষের আগ্রহ ধরে রেখেছে।
এই ধরনের নদীভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আয়োজকদের কাছেও নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ জলপথে সাঁতারুদের নজরদারি, তাঁদের গতিবিধির উপর নজর রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়। নদীতে হঠাৎ স্রোতের পরিবর্তন কিংবা আবহাওয়ার পরিস্থিতি বদলে গেলে প্রতিযোগিতার গতিপথেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হয়। গত শনিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে স্থানীয় এলাকায় তৈরি হয় আলাদা উন্মাদনা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সাঁতারুদের জলে নামার দৃশ্য দেখার জন্য বহু মানুষ অপেক্ষা করেন। অনেকের কাছে এটি বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্রীড়া আয়োজন।
প্রতিযোগিতার গুরুত্বের আর একটি দিক হল দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরি করা। আধুনিক সময়ে সুইমিং পুলকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা বেশি পরিচিত হলেও নদীতে দীর্ঘ পথ সাঁতার কাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ভাগীরথীর মতো নদীতে আয়োজিত এমন প্রতিযোগিতা সাঁতারকে একটি বৃহত্তর ক্রীড়া পরিসরে নিয়ে আসে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন ও নদীর পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, সাঁতারুদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ -এর প্রতিযোগিতাকে ঘিরে তাই ক্রীড়ামহলে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। কে কত দ্রুত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করবেন, কার কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজে দেবে, নদীর স্রোত কে সবচেয়ে ভাল ভাবে সামলাতে পারবেন, এমন নানা প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রতিযোগিতা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে। তবে ফলাফলের পাশাপাশি প্রতিযোগীদের এই কঠিন যাত্রাই আয়োজনের অন্যতম বড় আকর্ষণ।
ভাগীরথীর জলে এমন একটি ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলার ক্রীড়া সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই আয়োজন সময়ের সঙ্গে একটি নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছে। প্রতি বছর প্রতিযোগিতা ঘিরে তৈরি হওয়া আগ্রহ দেখায়, নদীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া এখনও মানুষের মনে জায়গা করে রয়েছে। শনিবারের উদ্বোধন থেকে রবিবারের মূল প্রতিযোগিতা, দুই দিন ধরেই ভাগীরথীর তীরে ছিল ক্রীড়া আবহ। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জলে নামা সাঁতারুরা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন না, তাঁরা দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার অংশ হচ্ছেন। নদীর স্রোতকে সঙ্গী করে তাঁদের এগিয়ে চলার দৃশ্য তাই ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত ভাগীরথীর এই আয়োজন ভবিষ্যতেও তার ঐতিহ্য ধরে রাখবে কি না, তা সময় বলবে। তবে ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিযোগিতা ফের মনে করিয়ে দিল, বাংলার নদী এখনও কেবল জলধারা নয়, তার বুকেই তৈরি হতে পারে এমন এক ক্রীড়াক্ষেত্র, যেখানে সহনশীলতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘ পথ পেরোনোর লড়াই একসঙ্গে ধরা দেয়। ভাগীরথীর স্রোতে সাঁতারুদের এই যাত্রা তাই ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই বাংলার নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Uzbekistan Uranium Deal, PM Narendra Modi Tashkent | তাসখন্দে বড় চুক্তি মোদীর, উজবেকিস্তান থেকে দীর্ঘস্থায়ী ইউরেনিয়াম আনবে ভারত! সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী



