সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিমলা: বর্ষার শুরু থেকেই একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হিমাচল প্রদেশ (Himachal Pradesh Monsoon)। প্রবল বৃষ্টি, পাহাড় ধস, হড়পা বান ও বর্ষাজনিত দুর্ঘটনায় গত ৬৪ দিনে রাজ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৯ জন। ৩০ জুন থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া সরকারি হিসাবেই উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র। বিপর্যয়ের অভিঘাত এখনও কাটেনি। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ১৫০টি রাস্তা বন্ধ রয়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবাও ব্যাহত হয়েছে। স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার (SEOC) -এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ জুনের পর থেকে বর্ষা ও তার জেরে তৈরি পরিস্থিতিতে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড় ধসে প্রাণ গিয়েছে ১৮ জনের। জলের প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া এবং জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া পাথর কিংবা উপড়ে যাওয়া গাছের নীচে চাপা পড়েও প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনাও মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বর্ষাকালে দুর্ঘটনায় ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানেও বিপর্যয়ের ব্যাপকতা ধরা পড়েছে। শিমলা (Shimla) ও সিরমৌর (Sirmaur) দুই জেলাতেই সর্বাধিক ১৯ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, ভারী বৃষ্টি এবং রাস্তার দুরবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বর্ষার সময়ে পর্যটননির্ভর এই রাজ্যে যান চলাচলের উপরেও তার বড় প্রভাব পড়েছে। সূত্রের খবর, গত ৬৪ দিনে আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন। এখনও তিন জনের খোঁজ মেলেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩৪টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। আরও ৪৫১টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে গবাদি পশুরও। সরকারি হিসাবে ৪৫০টি পশুর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।
রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি রাস্তা বন্ধ রয়েছে মান্ডী (Mandi) জেলায়। সেখানে ৭৮টি রাস্তা এখনও যান চলাচলের জন্য বন্ধ। দ্বিতীয় স্থানে শিমলা, যেখানে ৩০টি রাস্তা বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ধস নামা, রাস্তার উপর পাথর পড়া এবং জলের স্রোতে রাস্তার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সমস্যা তৈরি হয়েছে। যোগাযোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিষেবাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। রাজ্যজুড়ে ৩৭৪টি বিদ্যুৎ ট্রান্সফর্মার বিকল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে মন্ডীতে ১২৮টি, শিমলায় ৮৪টি এবং কুল্লুতে ৮১টি ট্রান্সফর্মার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস। শিমলার আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চম্বা (Chamba), কাংড়া (Kangra), মন্ডী, বিলাসপুর (Bilaspur) ও সিরমৌরে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ। ফলে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস ও হড়পা বানের আশঙ্কা থাকছে। পরপর দুর্যোগের কারণে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপরেও চাপ বাড়ছে। রাস্তা পরিষ্কার করা, বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ, একাধিক কাজ একসঙ্গে চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনও রাস্তা বন্ধ রয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় পরিষেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।
হিমাচল প্রদেশে বর্ষা মানেই পাহাড়, নদী ও পর্যটনের টানে মানুষের ভিড়। কিন্তু এ বছরের টানা বৃষ্টি সেই পরিচিত ছবিকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। একের পর এক ধস, হড়পা বান এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক দিন ফের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় প্রশাসনের নজর এখন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা, নদী সংলগ্ন অঞ্চল এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে। সরকারি পরিসংখ্যানের ২৫৯টি প্রাণহানি এবারের বর্ষায় হিমাচলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৈরি হওয়া বিপর্যয়ের গভীরতার একটি ছবি। ১৫০টি রাস্তা এখনও বন্ধ থাকা ও শতাধিক বিদ্যুৎ ট্রান্সফর্মার বিকল হয়ে থাকার কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে। এর মধ্যেই আগামী ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পাহাড়ি রাজ্যে সতর্কতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Himachal Landslide | হিমাচল প্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টি, বিপর্যস্ত জনজীবন




