সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : এশিয়ান গেমসে (Asian Games) ক্রিকেট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে অবশেষে মুখ খুলল আয়োজক দেশ জাপান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) প্রত্যাশিত মানের পরিকাঠামো ও থাকার ব্যবস্থা না পেলে প্রথম সারির ক্রিকেটারদের না পাঠানোর ইঙ্গিত দেওয়ার পরই নিজেদের অবস্থান জানাল অলিম্পিক কাউন্সিল অফ এশিয়া (Olympic Council of Asia) ও আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের আয়োজক কমিটি। আয়োজকদের দাবি, এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাঁদের নাম নথিভুক্ত হয়েছে, তাঁদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। ফলে শ্রেয়স আয়ার (Shreyas Iyer), জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah), হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur), স্মৃতি মান্ধানাদের (Smriti Mandhana) মতো ভারতীয় তারকাদের নিয়ে তৈরি হওয়া আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমল।
আগামী এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটকে ঘিরে শুরু থেকেই আগ্রহ রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের মতো শক্তিশালী ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলি অংশ নিলে প্রতিযোগিতার আকর্ষণ অনেকটাই বাড়বে। সেই কারণে প্রথম সারির ক্রিকেটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা আয়োজকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেলোয়াড়দের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তরফে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বোর্ডের কর্তাদের বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারদের উপযোগী পরিকাঠামো না থাকলে সেরা দল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। আয়োজকদের পরিকল্পনায় এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া ক্রীড়াবিদদের থাকার জন্য একাধিক ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি ব্যবস্থায় মূল শহরে থাকার পরে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য বুলেট ট্রেন ব্যবহার করার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ব্যবস্থায় গেমস সেন্টারের কাছাকাছি বন্দরে নোঙর করা জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করা হবে। তৃতীয় বিকল্প হিসেবে রয়েছে গেমস সেন্টারের কাছে বিশেষ তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা। এই তিন ধরনের ব্যবস্থার মধ্যে শেষ দু’টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে।
ক্রিকেটারদের জন্য জাহাজ বা তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম সারির তারকারা যে ধরনের হোটেল, প্রশিক্ষণ আর বিশ্রামের পরিবেশে অভ্যস্ত, এশিয়ান গেমসের এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলি তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শুধু ভারত নয়, এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) তরফেও আয়োজকদের কাছে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের আশঙ্কা, থাকার ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কিংবা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলির প্রথম সারির ক্রিকেটারদের প্রতিযোগিতায় পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে বড় তারকাদের উপস্থিতিই দর্শক ও সম্প্রচারকারীদের আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম কারণ। ফলে আবাসন সংক্রান্ত বিষয়টি শুধুমাত্র ক্রিকেটারদের আরামের প্রশ্ন নয়, গোটা প্রতিযোগিতার আকর্ষণের সঙ্গেও জড়িত।
বিতর্ক যখন ক্রমশ বাড়ছিল, তখনই পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে অলিম্পিক কাউন্সিল অফ এশিয়া। তাদের বক্তব্য, এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণকারী ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাদের আবাসন নিয়ে কিছু ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। ওসিএ এবং আইচি নাগোয়া গেমস আয়োজক কমিটির দাবি, জুলাইয়ের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এশিয়ান গেমসের জন্য নথিভুক্ত ১৭ হাজারের বেশি খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আয়োজকদের তরফে আরও জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়সীমার পরে নতুন করে নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া নতুন কাউকে তালিকায় যুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়েছে। আয়োজকদের বক্তব্য, এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং প্রতিযোগিতাকে বড় আকারে আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
আয়োজকদের এই ব্যাখ্যার মূল জায়গায় রয়েছে নাম নথিভুক্তির সময়সীমা। জাপানের তরফে আগে জানানো হয়েছিল, একসঙ্গে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই অংশগ্রহণকারী দেশগুলিকে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত খেলোয়াড় বা কোচের নাম তালিকাভুক্ত না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। ওই সময় থেকেই জাহাজ ও বিশেষ তাঁবুতে থাকার বিকল্পের কথা সামনে আসে। কিন্তু ক্রিকেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। ক্রিকেটে একটি দলের সঙ্গে শুধু খেলোয়াড়ই থাকেন না, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ, ফিজিয়ো, ট্রেনার আর অন্যান্য কর্মকর্তারাও থাকেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় তারকাদের উপস্থিতির প্রশ্ন। ভারতীয় দলে শ্রেয়স আয়ার, জসপ্রীত বুমরাহ, হরমনপ্রীত কৌর কিংবা স্মৃতি মান্ধানার মতো ক্রিকেটাররা থাকলে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত বলে মনে করছে বিসিসিআই।
বোর্ডের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসার পরই আয়োজকদের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাঁদের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের জন্য আগে থেকেই আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে সেই তালিকায় থাকা ক্রিকেটারদের থাকার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পরবর্তী সময়ে যাঁদের নাম যোগ করা হয়েছে, তাঁদের জন্য নতুন করে আবাসন তৈরি করা কঠিন। আয়োজকদের মতে, এই নিয়ম ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ ভারতের প্রথম সারির ক্রিকেটারদের নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই নির্ভর করছে তাঁদের নাম কখন নথিভুক্ত হয়েছে তার উপর। যদি শ্রেয়স, বুমরাহ, হরমনপ্রীত, স্মৃতি-সহ ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের নাম নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জমা পড়ে থাকে, তা হলে তাঁদের জন্য আগে থেকেই আবাসন বরাদ্দ থাকার কথা। ফলে জাহাজ বা তাঁবুতে থাকতে বাধ্য হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা সব ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই আয়োজকদের বক্তব্য।
এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এশিয়ার দেশগুলির আধিপত্যের কারণে এই প্রতিযোগিতায় ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে দর্শকদের আগ্রহও বেশি। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সম্ভাবনা থাকলে প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আয়োজকদের আবাসন সংক্রান্ত সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ক্রিকেটে পুরুষ ও মহিলা এই দুই দলেই একাধিক বড় তারকা রয়েছেন। পুরুষদের দলে বুমরাহ, শ্রেয়সদের মতো ক্রিকেটার এবং মহিলাদের দলে হরমনপ্রীত, স্মৃতি-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক তারকা রয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মান ও আকর্ষণ দুই-ই বাড়বে। বিপরীতে দ্বিতীয় সারির দল পাঠানো হলে ক্রিকেটের দর্শক আগ্রহে তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে জাপানের আয়োজকদের নতুন বক্তব্য ভারতীয় ক্রিকেট মহলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, সময়সীমার মধ্যে নথিভুক্ত হওয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে আবাসনের কোনও সমস্যা নেই। ফলে বিসিসিআইয়ের সঙ্গে আয়োজকদের আলোচনার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। এখন দেখার, ভারত শেষ পর্যন্ত কোন দলকে এশিয়ান গেমসে পাঠায় এবং প্রথম সারির ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হয়। এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে তাই ক্রিকেটের মাঠের লড়াইয়ের আগেই শুরু হয়েছে পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা। ভারতীয় বোর্ডের আপত্তির পরে আয়োজকদের ব্যাখ্যায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। জাপানের দাবি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকাভুক্ত খেলোয়াড়দের থাকার ব্যবস্থা তৈরি রয়েছে। ফলে শ্রেয়স আয়ার, জসপ্রীত বুমরাহ, হরমনপ্রীত কৌর কিংবা স্মৃতি মান্ধানাদের এশিয়ান গেমসে পাঠানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখন অনেকটাই নির্ভর করবে ভারতীয় বোর্ডের মূল্যায়ন এবং আয়োজকদের সঙ্গে পরবর্তী সমন্বয়ের উপর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women Lords Test win, Harmanpreet Kaur Test victory | লর্ডসে ইতিহাস ভারতের: হরমনপ্রীতদের ২৭০ রানের দাপট, মহিলাদের প্রথম টেস্টেই ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে নজির




