Nandigram Election 2026, Suvendu Adhikari Nandigram | নন্দীগ্রামে উন্নয়নের একগুচ্ছ ঘোষণা, ভোটের ময়দানে শুভেন্দুর বড় চ্যালেঞ্জ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নন্দীগ্রাম : নন্দীগ্রামকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক লড়াই প্রায় শুরু করে দিল বিজেপি। সোমবার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় একাধিক সরকারি প্রকল্পের সূচনা ও ঘোষণা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) শুধু উন্নয়নের খতিয়ানই তুলে ধরলেন না, একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপির জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ানোর ডাকও দিলেন। নিজের ছেড়ে যাওয়া এই বিধানসভা কেন্দ্রেই একসময় তৃণমূলের হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে ফের বড় ব্যবধানে বিজেপিকে জয়ী করার আহ্বান তিনি জানালেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রায় ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়কে সামনে রেখেই নন্দীগ্রামে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রকাশ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, ফলতায় বিজেপি যে ব্যবধান তৈরি করেছে, নন্দীগ্রামেও তার চেয়ে বেশি ভোটে জয় নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে নন্দীগ্রামকে ২০২৬ সালের নির্বাচনী লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন বিজেপির এই নেতা।

আরও পড়ুন : Rajnath Singh West Bengal, Suvendu Adhikari defence project | ৩৪০০ কোটির প্রকল্পে বাংলায় তৈরি হবে যুদ্ধজাহাজ! কী পরিকল্পনা রাজনাথ ও শুভেন্দুর?

রেয়াপাড়ার সভায় উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, নন্দীগ্রাম তাঁর কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাঁর কথায়, ‘নন্দীগ্রাম ভাল থাকলে আমি ভাল থাকব।’ এরপরই স্থানীয় মানুষের উদ্দেশে তিনি আগের নির্বাচনের ফলের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকেই তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জিতেছিলেন শুভেন্দু। পরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামেই তৃণমূল নেত্রী তথা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) ১,৯৫৬ ভোটে হারান শুভেন্দু। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এদিনের সভা থেকে কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।২০১৬ সালের নিজের জয়ের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু বলেন, ‘একবার ৮২ হাজার ভোটে জিতিয়েছিলেন। মনে আছে তো? ফলতার উপরে যাবেন তো? দু’হাত তুলে কথা দিন।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে নন্দীগ্রামের উন্নয়নকে নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও। তিনি জানান, তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে নন্দীগ্রাম অগ্রাধিকার পাবে।

নন্দীগ্রামে উন্নয়নের প্রশ্নে আগের তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের শেষ পাঁচ বছরে নন্দীগ্রাম যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের পর রাজনৈতিক কারণে নন্দীগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ থমকে গিয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর এই অভিযোগ ঘিরে অবশ্য রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নন্দীগ্রামে দীর্ঘদিনের রেল পরিষেবার দাবিও এদিনের সভায় উঠে আসে। নন্দীগ্রাম-বটতলা রেলস্টেশন তৈরির জন্য জমি হস্তান্তরের প্রসঙ্গে শুভেন্দু জানান, প্রকল্পের জন্য প্রায় ছয় একর জমির প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, আগের সরকার প্রয়োজনীয় জমি রেলের হাতে তুলে দেয়নি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে তিনি সাড়ে তিন একর জমি রেলের হাতে দিয়েছেন এবং বাকি জমির প্রক্রিয়াও আগামী মার্চের মধ্যে সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান।

রেল পরিষেবা চালু হলে নন্দীগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে বলেও দাবি করেন তিনি। স্থানীয় মানুষকে আশ্বস্ত করে শুভেন্দু বলেন, ‘নন্দীগ্রাম-বটতলা রেলস্টেশনে উঠব। বাজকুলে গিয়ে নামব। প্রথম ট্রেনে আমিই চড়ব আপনাদের নিয়ে।’ তাঁর বক্তব্যে নন্দীগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা উঠে আসে। শুধু রেল নয়, সরকারি বাস পরিষেবা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নন্দীগ্রামে নতুন পরিকাঠামো তৈরির কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রামে সরকারি বাস চলাচলের সুবিধার জন্য একটি বাসস্ট্যান্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে গত সাড়ে তিন মাসে তাঁর সরকারের আমলে নন্দীগ্রামে হওয়া বিভিন্ন কাজের হিসাবও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই সময়ের মধ্যে বিধানসভা এলাকায় ৩২টি নতুন রাস্তা তৈরির পাশাপাশি একাধিক রাস্তা মেরামতের কাজ হয়েছে।

নন্দীগ্রামের হরিপুরে নতুন দমকল কেন্দ্রের উদ্বোধনও এদিনের কর্মসূচীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবা আরও সহজে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন কেন্দ্রটি কার্যকর ভূমিকা নেবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জরুরি পরিষেবার বিস্তারকেও সরকারের কাজের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। মহিলাদের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও এ দিনের বক্তব্যে তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের ৬৭ হাজার মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় ইতিমধ্যে ৩ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। আরও প্রায় সাত হাজার মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন বলে জানান তিনি। নির্বাচনের আগে এই ধরনের সরকারি প্রকল্প ও সরাসরি আর্থিক সহায়তার বিষয়কে সামনে রেখে গ্রামীণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর পরিকল্পনাই বিজেপির রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়েও নন্দীগ্রামের জন্য সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। রেয়াপাড়া ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শয্যার সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমবে বলে প্রশাসনের আশা। উন্নয়নমূলক প্রকল্পের তালিকা তুলে ধরার পাশাপাশি নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসও নিজের বক্তব্যে বার বার ফিরিয়ে আনেন শুভেন্দু। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর প্রসঙ্গ যেমন তাঁর বক্তব্যে ছিল, তেমনই নন্দীগ্রাম আন্দোলনের শহিদ পরিবারের বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার নন্দীগ্রামের নয়টি শহিদ পরিবারের সদস্যকে চাকরি দেয়নি। ক্ষমতায় আসার পরে তাঁর সরকার সেই নয়টি পরিবারের সদস্যকে চাকরি দিয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে নন্দীগ্রামে সোমবারের কর্মসূচী শুধু সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন বা নতুন কাজের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকল না। উন্নয়ন, পুরনো নির্বাচনী ফল, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্মৃতি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের জয়, সবকিছুকেই একসঙ্গে সামনে রেখে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জমি তৈরির চেষ্টা করলেন শুভেন্দু। বিশেষ করে ফলতা উপনির্বাচনে বিজেপির বড় ব্যবধানের জয়কে নন্দীগ্রামের সঙ্গে তুলনা করে স্থানীয় ভোটারদের কাছে আরও বড় ব্যবধানে পদ্মফুলকে জেতানোর আহ্বান রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২১ সালের নির্বাচনে যে নন্দীগ্রাম রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল, ২০২৬ সালেও সেই কেন্দ্রের গুরুত্ব কমেনি। বরং মুখ্যমন্ত্রীর একের পর এক প্রকল্প ঘোষণা এবং ভোটের ব্যবধান বাড়ানোর ডাকের ফলে নন্দীগ্রাম ফের রাজ্যের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। উন্নয়নমূলক কাজের হিসাব দেখিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা এক দিকে, অন্য দিকে অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতকে সামনে রেখে তৃণমূলকে আক্রমণ, এই দুই কৌশলেই আগামী দিনে নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রচার এগোবে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের এখনও সময় থাকলেও সোমবারের সভা থেকে শুভেন্দুর বক্তব্যে নন্দীগ্রামকে ঘিরে বিজেপির নির্বাচনী প্রস্তুতির দিকটি যথেষ্ট জোরাল হয়ে উঠল।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nepal Flash Flood | ভূমিকম্প নয়, হিমবাহধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! মৃত ২৮৯, নিখোঁজ বহু, আতঙ্ক ভারত-তিব্বত সীমান্তেও

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন