সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ তাসখন্দ : তাসখন্দ সফরে গিয়ে কূটনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা করল ভারত। উজবেকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। ভারতের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইউরেনিয়াম আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করার লক্ষ্যেই এই চুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হাতে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান তুলে দিলেন প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ (Shavkat Mirziyoyev)।
দু’দিনের উজবেকিস্তান সফরে শনিবার তাসখন্দে পৌঁছন নরেন্দ্র মোদী। বিমানবন্দরেই তাঁকে স্বাগত জানান শাভকাত। রবিবার দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, পরমাণু শক্তি, পর্যটন, শিক্ষা, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নগর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী জানান, আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হল উজবেকিস্তান থেকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের চুক্তি। ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পারমাণবিক জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় ইউরেনিয়াম সরবরাহের জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে নতুন দিল্লি। কোনও একটি উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন উৎপাদনকারী দেশের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের নীতি নিয়েছে ভারত। ইউরেনিয়াম উৎপাদনের ক্ষেত্রে উজবেকিস্তানের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাসখন্দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ভারতের কাছে কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
এর আগে ২০১৯ সালেও ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত একটি চুক্তি হয়েছিল। নতুন দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা সেই সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করল। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘আজকের আলোচনার প্রধান প্রাপ্তিগুলির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের চুক্তি।’ তবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করেই থেমে থাকার পক্ষপাতী নন তিনি। তাঁর বক্তব্য, স্বাক্ষরিত সমঝোতাগুলিকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করতে প্রয়োজন নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন।
দুই দেশের সম্পর্কের আর্থিক দিকটিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত ও উজবেকিস্তান ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে। শাভকাত মিরজিয়োয়েভ জানান, গত বছর দুই দেশের বাণিজ্য ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে। আগামী চার বছরের মধ্যে সেই অঙ্ক পাঁচ গুণ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চায় তাসখন্দ ও নতুন দিল্লি। বাণিজ্যের পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে তিনটি ‘সিস্টার-সিটি’ এবং ‘সিস্টার-স্টেট’ সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলের মধ্যে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নগর পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং পরিষেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরাসরি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।
নগর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার সময় উঠে আসে ‘নিউ তাসখন্দ’ -এর প্রসঙ্গ। উজবেকিস্তানের রাজধানীর কাছেই নতুন করে একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার কাজ চলছে। কার্যত নতুন পরিকাঠামোর উপর দাঁড় করানো হচ্ছে সেই শহরকে। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারতের গুজরাতের ‘গিফ্ট সিটি’ (GIFT City) -এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে বলে আলোচনায় উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গুজরাতের গিফ্ট সিটি ঘুরে দেখার জন্য উজবেকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আধুনিক নগর পরিকল্পনা, আর্থিক পরিষেবা, প্রযুক্তিনির্ভর পরিকাঠামো এবং স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারতের অভিজ্ঞতা তাসখন্দের নতুন শহর তৈরির কাজে কাজে লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উজবেকিস্তান যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা বোঝা গিয়েছে শাভকাত মিরজিয়োয়েভের বক্তব্যেও। তিনি ভারতকে ‘নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নেই; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ছে। পর্যটন ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাসখন্দ নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ৩০ দিনের ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন উজবেক প্রেসিডেন্ট। পর্যটন এবং ব্যবসায়িক সফর সহজ করার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবাও বেড়েছে। বর্তমানে ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে ১৪টি সরাসরি বিমান চলাচল করছে বলে জানানো হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি এখন বাণিজ্য বা কূটনীতির মধ্যে আটকে নেই। শিক্ষা, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা রয়েছে। মোদীর এবারের সফরে তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক শক্তি ও নগর পরিকল্পনা। ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ইউরেনিয়াম চুক্তির বিষয়টি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারতের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক বিদ্যুতের ভূমিকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত পারমাণবিক জ্বালানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইউরেনিয়াম সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসের বৈচিত্র্য ভারতের অন্যতম লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির কারণে কোনও একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। উজবেকিস্তানের সঙ্গে নতুন চুক্তি সেই নীতিরই একটি অংশ। তাসখন্দ সফরের আর একটি বড় মুহূর্ত ছিল নরেন্দ্র মোদীর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রাপ্তি। উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ওলি দরাজলি দোস্তলিক’ (Oliy Darajali Do’stlik) প্রদান করা হয় তাঁকে। প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ নিজে এই সম্মান প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
সম্মান গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উজবেকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ‘দোস্তলিক’ শব্দটির অর্থ বন্ধুত্ব। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়া তাঁর কাছে গর্বের বিষয়। ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতিকে তিনি দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসাবেও তুলে ধরেন। তাসখন্দে মোদী-শাভকাত বৈঠকের ফলে একাধিক ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার দরজা খুলেছে। এক দিকে পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ, অন্য দিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা, শহর উন্নয়ন থেকে পর্যটন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নতুন সমঝোতার পথে এগিয়েছে দুই দেশ। ভারতের জন্য এই সফরের অন্যতম বড় দিক তাই কেবল একটি ইউরেনিয়াম চুক্তি নয়। মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ উজবেকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ হিসাবেও দেখা হচ্ছে মোদীর তাসখন্দ সফরকে। আর প্রধানমন্ত্রীর হাতে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান তুলে দেওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে এল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Uzbekistan Visit 2026: উজবেকিস্তানে যোগের প্রসারে নতুন নজির, তাশখন্দে যোগাসনে প্রধানমন্ত্রী মোদী




