সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি হওয়া নিম্নচাপ ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসছে। এর জেরে দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় ফের বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কলকাতা-সহ একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। রবিবার ভারতের আবহাওয়া দফতর (India Meteorological Department বা IMD) জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর ওড়িশা উপকূলে অবস্থান করা নিম্নচাপটি আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আরও শক্তিশালী হয়ে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোতে পারে। এর প্রভাবে ৩০ ও ৩১ অগস্ট গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জায়গায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে।
বর্ষার মরসুমে বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় বৃষ্টির দাপট কমার সুযোগ মিলছে না। নতুন করে তৈরি হওয়া এই নিম্নচাপও আগামী কয়েক দিন দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়াতে পারে। ইতিমধ্যেই কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আলিপুরে রবিবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়েছে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২৭.৬ ডিগ্রি। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিমবঙ্গ-উত্তর ওড়িশা উপকূল সংলগ্ন এলাকায় থাকা নিম্নচাপের সঙ্গে একটি ঘূর্ণাবর্তও রয়েছে। সেই ঘূর্ণাবর্ত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭.৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নিম্নচাপটি আরও শক্তিশালী হয়ে উত্তর ওড়িশা এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোতে পারে।
এই আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। রবিবার ও সোমবার পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের কিছু জায়গায় ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং কলকাতাতেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। উপকূলের দিকে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার দাপটও বাড়তে পারে। কলকাতার ক্ষেত্রেও স্বস্তির সুযোগ কম। শহরে আগামী কয়েক দিন আকাশ মূলত মেঘলা থাকতে পারে। দফায় দফায় বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩০ ও ৩১ আগস্ট কলকাতায় বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়া হতে পারে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটারে পৌঁছতে পারে। ফলে শহরের নিচু এলাকাগুলিতে জল জমার আশঙ্কা থাকছে। টানা বৃষ্টি হলে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে। অফিসপাড়া, বাজার এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল এবং নিচু রাস্তার অংশে সাময়িক জলমগ্ন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। শহরে বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ এবং ঝোড়ো হাওয়া থাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুধু কলকাতা নয়, দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকাতেও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলবর্তী এলাকায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাস বইতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া দেখা দিতে পারে। নিম্নচাপের পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে বর্ষাকালীন অক্ষরেখাও। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড হয়ে অক্ষরেখাটি পশ্চিমবঙ্গের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। পুরুলিয়ার দিক থেকে দক্ষিণে বাঁক নিয়ে সেটি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প দক্ষিণবঙ্গের দিকে প্রবেশ করছে। নিম্নচাপ এবং সক্রিয় বর্ষাকালীন অক্ষরেখার যৌথ প্রভাবে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আগামী কয়েক দিনে দক্ষিণবঙ্গের বৃষ্টির ছবিতে জেলার ভিত্তিতে পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক ভাবে ভেজা আবহাওয়া বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা বেশি থাকতে পারে। পশ্চিম বর্ধমান ও বীরভূমেও পরবর্তী সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গেও বর্ষার প্রভাব থাকবে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি আরও কয়েক দিন চলতে পারে। পাহাড় ও ডুয়ার্স এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে রাস্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকছে।
সমুদ্রও এই নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূলের মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপকূলের কাছে বাতাসের গতি বাড়লে ছোট নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলারগুলির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রশাসনের তরফেও উপকূলবর্তী এলাকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। এদিকে বৃষ্টির দাপট বাড়লে কৃষিক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত জল জমে নিচু জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহরাঞ্চলে জল জমা এবং গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় নদী-নালা ও খালের জলস্তর বাড়ার বিষয়টিও নজরে রাখতে হবে। ভারী বৃষ্টির সময় নিচু রাস্তা, নদীর ধারের এলাকা এবং জল জমে থাকা জায়গায় অযথা যাতায়াত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতার আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও আগামী কয়েক দিন মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়ার পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। ১ সেপ্টেম্বরও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তার পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিচ্ছিন্ন বৃষ্টি চলতে পারে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে তাই এখনই দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জন্য পুরোপুরি বর্ষার বিরতি আসছে না। বরং বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ শক্তি বাড়িয়ে স্থলভাগের দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কলকাতা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলিতে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় সাধারণ মানুষকে আবহাওয়ার আপডেট নজরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের গতিপথ এবং শক্তির পরিবর্তনের উপরই আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টির তীব্রতা অনেকটা নির্ভর করবে। বর্তমানে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩০ ও ৩১ অগস্ট গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে আগামী কয়েক দিন ফের ছাতা, জলজমা রাস্তা এবং ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেই চলতে হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nepal Flash Flood | ভূমিকম্প নয়, হিমবাহধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! মৃত ২৮৯, নিখোঁজ বহু, আতঙ্ক ভারত-তিব্বত সীমান্তেও




