Nepal Flash Flood | ভূমিকম্প নয়, হিমবাহধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! মৃত ২৮৯, নিখোঁজ বহু, আতঙ্ক ভারত-তিব্বত সীমান্তেও

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কাঠমান্ডু : নেপালের ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বানের (Nepal Flash Flood) নেপথ্যে ভূমিকম্প নয়, রয়েছে হিমবাহধস! প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর এমনই তথ্য সামনে এনেছে আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (USGS)। বুধবার রাতের ওই পর্যবেক্ষণ ঘিরে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে যে ভূকম্পনকে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়েছিল, মার্কিন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী তা আসলে হিমবাহধসের ঘটনা। বরফ, পাথর ও কাদামাটির বিশাল স্তর নদীর দিকে নেমে আসার পর জলপ্রবাহের গতিপথে বড় পরিবর্তন ঘটে, আর তার ফলেই আচমকা ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন : Rajnath Singh DRDO missile technology transfer | রাজনাথের বড় সিদ্ধান্ত, ভারতীয় সংস্থার হাতে DRDO-র ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি

সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই নেপালে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৯ হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় এখনও অনেক মানুষের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। ফলে আগামী সময়ে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলা। পাশাপাশি নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাতেও হড়পা বানের প্রভাব পড়েছে। নেপালের পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর বহু পর্যটকেরও কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বুধবার রাত পর্যন্ত কয়েকশো পর্যটকের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাও যথেষ্ট। জানা গিয়েছে, তাঁদের একটি বড় অংশ কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলের পথে ছিলেন। পাহাড়ি রাস্তা, নদীর উপর সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতি হওয়ায় তাঁদের খোঁজে উদ্ধারকারী দলকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।

রাসুয়া জেলা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে। তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশের পর ভোটেকোশী নদী এই জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার পর আচমকাই নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। প্রবল গতিতে কাদামাটি, পাথর ও জল নেমে এসে নদী সংলগ্ন এলাকার বাড়িঘর, রাস্তা ও পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রাথমিক ভাবে নেপালের প্রশাসনের তরফে মনে করা হয়েছিল, সীমান্তের ওপার থেকে বন্যার জল এসে ভোটেকোশীর জলস্তর বাড়িয়ে দিয়েছে। পরে নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানান, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ একটি ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর তুষারধস হয় এবং তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হড়পা বান নামে। সেই প্রাথমিক ব্যাখ্যার সঙ্গে অবশ্য মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।

আরও পড়ুন : Mobility City India, Kolkata transport | দেশে ১০১ মোবিলিটি সিটি প্রকল্প, তালিকায় কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের ৫ শহর

ইউএসজিএস-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই সময়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ৪.৪ মাত্রার কোনও ভূমিকম্প হয়নি। ভূকম্পন বলে যে ঘটনাটি প্রথমে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহধস হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পাহাড়ের ঢাল থেকে বরফ, পাথর ও কাদামাটির বড় অংশ নিচে নেমে এসে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা তৈরি করে থাকতে পারে। সেই বাধার পিছনে বিপুল পরিমাণ জল জমে যাওয়ার পর চাপ বেড়ে গেলে আচমকা তা ভেঙে যায়। আর তখনই প্রবল গতিতে জল ও কাদার স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে। উল্লেখ্য যে, পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ নদীর গতিপথে বরফ, পাথর বা ধসের মাটি জমে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে প্রথম দিকে বাইরে থেকে বিপদের মাত্রা বোঝা কঠিন হতে পারে। কিন্তু সেই বাধা ভেঙে পড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল জলরাশি নিচের জনবসতিতে পৌঁছে যেতে পারে। ভোটেকোশীর ক্ষেত্রেও এমন কোনও প্রক্রিয়া কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে আরও বিশদ অনুসন্ধান চলছে।

এই বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু নেপালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিব্বতের সীমান্তবর্তী জিরং এলাকাতেও কাদামাটির প্রবল স্রোতের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির খবর এসেছে। চিনা তিব্বতে অন্তত তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার অভিযান চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোটেকোশী নদী নেপালে প্রবেশের পর ত্রিশুলি নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রশাসনের উদ্বেগের বড় অংশ এখন ত্রিশুলি নদীকে ঘিরেও। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান ও গোর্খা জেলার নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজন হলে নিচু এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হড়পা বানের পরে নদীর জলপ্রবাহে ফের কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয় কি না, তার উপর নজর রাখা হচ্ছে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই ঘটনার সঙ্গে হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। ভারত, নেপাল, চিন, ভুটান এবং তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে উপগ্রহচিত্র পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা দেখেছিলেন, ২০০০ সালের পর হিমবাহের বরফ গলার গতি আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন পাহাড়ি নদীগুলিতে আচমকা জলপ্রবাহ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।হিমবাহের পিছনে তৈরি হওয়া জলাধার বা বরফ-পাথরের অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে গেলে যে বিপুল জলরাশি নেমে আসতে পারে, তার উদাহরণ বিশ্বের বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে দেখা গিয়েছে। ফলে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর হিমালয়ের নদীগুলির গতিপথ, হিমবাহের অবস্থা ও পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠছে।

এর পাশাপাশি তিব্বতের জলসম্পদ নিয়েও ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশের পর ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এই নদীর নাম হয় যমুনা। ফলে তিব্বত অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা জলপ্রবাহের আকস্মিক পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারত ও বাংলাদেশেও পৌঁছতে পারে।কিন্তু, নেপালের বর্তমান হড়পা বানকে সরাসরি তিব্বতে কোনও বাঁধের সঙ্গে যুক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনও সামনে আসেনি। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের প্রাথমিক কারণ হিসেবে ইউএসজিএস হিমবাহধসের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কীভাবে পরিবর্তন ঘটেছিল, কোথা থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল ও কতটা জল একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে এসেছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন।

এদিকে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদার স্তর এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নিখোঁজদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু পুনরুদ্ধারের কাজও শুরু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ২৮৯-এ পৌঁছনোয় নেপাল প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রসঙ্গত যে, সূত্রের খবর অনুযায়ী ভূমিকম্পের বদলে হিমবাহধস থেকে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাতের তথ্য সামনে আসায় হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু ও হিমবাহের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। নেপালের ভোটেকোশী উপত্যকার ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশ, পাহাড়ি নদীর আচরণ এবং সীমান্তবর্তী বহু দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ajit Doval China visit, Ajit Doval Wang Yi meeting | অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে চিনের বার্তা, ‘দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিকোণে’ ভারত-চিন সম্পর্ক চান হান

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন