সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দুর্গাপুজোর আগে বাজারে চিনি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। একদিকে উৎসবের মরসুমে মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। ফলে খুচরো বাজারে চিনির দাম ও সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে চাপ। তবে দেশে আদৌ চিনির ঘাটতি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে এবার বড়সড় ব্যাখ্যা দিল ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ISMA)। সংগঠনের বক্তব্য, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও মজুতের পরিমাণ বিবেচনা করলে এখনই চিনির প্রকৃত ঘাটতির কথা বলা যায় না। কিন্তু উৎসবের আগে বাড়তি চাহিদা, আগেভাগে বেশি পরিমাণে চিনি কিনে রাখার প্রবণতা ও বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাবেই বর্তমান বাজারে টান তৈরি হয়েছে।
পুজোর মরসুম যত এগিয়ে আসছে, ততই চিনির চাহিদা বাড়ছে। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি দীপাবলি ও পরবর্তী উৎসবগুলিকে সামনে রেখে মিষ্টির দোকান, বেকারি, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ সংস্থা ও অন্যান্য বড় ক্রেতাদের চিনি কেনার প্রয়োজন বেড়ে যায়। সাধারণ সময়ে যে পরিমাণ চিনি ধাপে ধাপে কেনা হয়, উৎসবের আগে তার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে আগাম কেনাকাটা শুরু হয়। বাজারে বর্তমান চাপের অন্যতম কারণ হিসেবেই এই প্রবণতাকে দেখছে ISMA। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নীরজ শিরগাঁওকর (Neeraj Shirgaokar) জানিয়েছেন, উৎসবের মরসুম সামনে থাকায় চিনির সরবরাহ নিয়ে বাজারে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই আশঙ্কা থেকে বড় ক্রেতাদের একটি অংশ প্রয়োজনের সময় অনুযায়ী চিনি কেনার বদলে আগেভাগেই বেশি পরিমাণে মজুত করছেন। ফলে বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। কিন্তু, দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কার কারণ নেই বলেই দাবি ISMA -র। চলতি মরসুমে ভারতে প্রায় ২৭৯ লাখ টন নেট চিনি উৎপাদনের অনুমান করা হয়েছে। একই সঙ্গে মরসুম শেষে প্রায় ৩৫ লাখ টন চিনি মজুত থাকতে পারে বলে সংগঠনের হিসাব। অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ এবং অবশিষ্ট মজুত দুই দিক থেকেই বাজারের প্রয়োজন মেটানোর মতো জোগান রয়েছে বলে মনে করছে চিনি শিল্প।
তাহলে বাজারে টান কেন? ISMA–র ব্যাখ্যায় এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। উৎসবের মরসুমে স্বাভাবিক নিয়মেই চিনির ব্যবহার বাড়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ক্রেতাদের আগাম মজুত করার প্রবণতা। বাজারে ভবিষ্যতে চিনি পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলে অনেক ক্রেতাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে পণ্য কিনে রাখেন। এর ফলে কোনও একটি সময়ে বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। তখন সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও সাময়িকভাবে পণ্য কম পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। সংগঠনটি এই পরিস্থিতিকে ‘আর্টিফিশিয়াল টাইটনেস’ বা কৃত্রিম বাজার-চাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চিনির বাজারের পরিস্থিতিও বর্তমান দামের উপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্ববাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক দামে বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের উৎপাদন নিয়ে প্রত্যাশা বদলানোর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের হিসাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিনি উৎপাদক দেশ ব্রাজিলের উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উপর তার প্রভাব পড়েছে।
ISMA-র দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম প্রতি টনে প্রায় ৪৭৪ ডলার ছিল। আগস্টে সেই দাম বেড়ে প্রায় ৫৫২ ডলার প্রতি টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তন ভারতের বাজারকেও প্রভাবিত করছে। ফলে দেশের ভিতরে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামা স্থানীয় বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। চিনি শিল্পের বক্তব্য অনুযায়ী, পুজোর সময় এই পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসার কারণ হল মিষ্টি তৈরির ক্ষেত্রে চিনির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। দুর্গাপুজোর সময় বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু, জিলিপি, মিষ্টি দই-সহ অসংখ্য মিষ্টির উৎপাদন বাড়ে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয় তৈরির ক্ষেত্রেও চিনির ব্যবহার রয়েছে। উৎসবের সময়ে মানুষের কেনাকাটা বাড়লে খাদ্যশিল্পের চাহিদাও সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়। ফলে চিনির বাজারে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর দিকেও নজর দিচ্ছে চিনি শিল্প। ISMA জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ সালের আখ মাড়াইয়ের মরসুম কিছুটা এগিয়ে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে নতুন মরসুমের কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যেই তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) ও কর্ণাটক (Karnataka) -এর কিছু এলাকায় বিশেষভাবে আখ মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে। নতুন মরসুমের উৎপাদন দ্রুত শুরু হলে বাজারে অতিরিক্ত চিনি আসার সুযোগ তৈরি হবে। ISMA-র হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে প্রায় ১০ লাখ টন চিনি উৎপাদিত হতে পারে। সাধারণ সময়ে এক মাসে প্রায় ৪ লাখ টন চিনি উৎপাদিত হয়। সেই তুলনায় অক্টোবরের সম্ভাব্য উৎপাদন অনেকটাই বেশি। ফলে নতুন মরসুমের শুরুতেই যদি উৎপাদন বাড়ে, তা হলে বাজারে সরবরাহের চাপ কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বর্তমানে যে পরিমাণ চিনি মজুত রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন মরসুমের উৎপাদন যুক্ত হলে বাজারে সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে উৎসবের সময়ে চাহিদা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম বলেই মনে করছে ISMA। অক্টোবর থেকে নতুন উৎপাদন বাজারে আসতে শুরু করলে সরবরাহের পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। উল্লেখ্য, চিনির দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ অবশ্য এর মধ্যেই বাড়ছে। পুজোর আগে মিষ্টির দাম বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ চিনির দাম মিষ্টি তৈরির মোট খরচের একটি অংশকে প্রভাবিত করে। কাঁচামালের দাম বাড়লে মিষ্টির দোকানগুলির উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। তবে চিনির বর্তমান বাজার-চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে উৎসবের সময়ে প্রকৃত চাহিদা, বড় ক্রেতাদের মজুতের প্রবণতা ও নতুন মরসুমের উৎপাদন কত দ্রুত বাজারে পৌঁছয় তার উপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও মজুতের হিসাব অনুযায়ী এখনই চিনির বড় ধরনের ঘাটতির ছবি উঠে আসছে না। ২৭৯ লাখ টন সম্ভাব্য উৎপাদন এবং মরসুম শেষে প্রায় ৩৫ লাখ টন মজুতের অনুমান থাকায় দেশের সরবরাহ কাঠামো নিয়ে বড়সড় সংকটের আশঙ্কা করছে না ISMA। উৎসবের আগে অতিরিক্ত কেনাকাটা ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের চাপ মিলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংগঠনের বক্তব্য। অক্টোবরে নতুন মরসুমের উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সময় আগাম মজুতের প্রবণতা কমে এলে ও নতুন চিনি বাজারে নিয়মিত পৌঁছতে শুরু করলে চিনির বাজারের চাপও কমতে পারে। ফলে পুজোর আগে বাজারে চিনির দাম নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দেখে দেশে দীর্ঘস্থায়ী চিনি-সংকট তৈরি হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনোর কারণ নেই বলেই মনে করছে চিনি শিল্প। আপাতত লক্ষ্য থাকবে নতুন মরসুমের উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং উৎসবের সময়ে দেশের প্রকৃত চাহিদার দিকে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Northern Sea Route India, India Russia Maritime Trade | ২০২৭-এই রাশিয়ামুখী ভারতের নতুন সমুদ্রপথ! নর্দার্ন সি রুটে প্রথম কার্গো জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি




