সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দুর্গাপুর: কারও বয়স ১৬, কারও ১৭। স্কুলের গণ্ডি পেরনোর আগেই তাদের সামনে রাখা হচ্ছে নগদ টাকার প্রলোভন। অভিযোগ, ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক স্কুলপড়ুয়াকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে রক্তদান করানো হয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ, রক্তদানের ক্ষেত্রে বয়সের নিয়ম এড়াতে সরকারি নথিতে পড়ুয়াদের বয়স বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। দুর্গাপুরে এমন অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট। নাবালক পড়ুয়াদের ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে কড়া অবস্থান নিয়েছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী তথা আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)। অভিযোগের সূত্রপাত একটি বেসরকারী স্কুলের উঁচু শ্রেণির কয়েক জন পড়ুয়াকে ঘিরে। তাঁদের বয়স ১৮ বছরের কম। অথচ অভিযোগ, বেশ কিছু দিন ধরে তাঁদের রক্তদানের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছিল। সেই উৎসাহের পিছনে ছিল নগদ টাকার প্রস্তাব। পড়ুয়াদের বলা হত, রক্ত দিলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাবে। অভিযোগ, সরাসরি হাসপাতাল থেকে নয়, এক জন পরিচিত ‘দাদা’ বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হত হাসপাতালে। সেখানে রোগীর আত্মীয় বা পরিচিত হিসাবে পরিচয় দিয়ে রক্তদান করানোর অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার আরও একটি দিক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, যে পড়ুয়াদের প্রকৃত বয়স ১৮ বছরের কম, তাঁদের বয়স সরকারী নথিতে বেশি দেখানো হয়েছিল। অর্থাৎ বয়সের বাধা এড়াতে নথিপত্রে কারচুপি করা হয়েছিল কি না, এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম বিষয়। সম্প্রতি তিন নাবালক পড়ুয়াকে দুর্গাপুরের বিধাননগর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। তাঁদের দিয়ে রক্তদান করানো হয় বলে দাবি। পরে বিষয়টি জানাজানি হতেই অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ায়। কয়েক জন পড়ুয়ার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে অভিযোগ। একাধিক রক্তদাতা পড়ুয়ার দাবি, রক্ত দেওয়ার পরে তাঁদের হাতে ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। অন্য দিকে, তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজে যুক্ত এক প্রাক্তন ছাত্র প্রায় ১০০ টাকা করে কমিশন নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে শুধু নাবালকদের রক্তদান করানো নয়, গোটা প্রক্রিয়াটির পিছনে আর্থিক লেনদেনের একটি কাঠামো ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সন্তানরা কী ভাবে আর কার সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবারকে আগে কিছু জানানো হয়নি। তাঁদের কাছে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে রক্তদানের নথি বা হাসপাতালের কাগজপত্র থেকে। কবিতা দাস নামে একজন অভিভাবিকার কথায়, ‘কিছু দিন আগে ছেলের ব্যাগ থেকে একটি হাসপাতালের রক্তদানের কাগজ পাই। ছেলের তো রক্তদানের বয়স হয়নি। জিজ্ঞাসা করায় সে জানায়, এক জন খুব অসুস্থ ছিলেন, তাই রক্ত দিয়েছে।’ ওই অভিভাবিকার দাবি, তিনি ছেলেকে বুঝিয়েছেন যে বয়স না হওয়া সত্ত্বেও রক্ত দেওয়া ঠিক নয়। ছেলেটি নাকি জানিয়েছে, সে এক বারই রক্ত দিয়েছে। তবে তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা প্রথমে পরিবার জানত না। পরে একই স্কুলের আরও কয়েক জন পড়ুয়ার অভিভাবকের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ শোনা যায় বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার।’
এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই হাসপাতাল, সংশ্লিষ্ট রক্তদান প্রক্রিয়া ও পড়ুয়াদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। প্রশ্ন উঠছে, হাসপাতালের রক্ত সংগ্রহের সময়ে নাবালক দাতাদের পরিচয় ও বয়স যাচাই করা হয়েছিল কি না। যদি বয়স সংক্রান্ত নথিতে কোনও অসঙ্গতি থেকে থাকে, তা হলে সেই নথি কে তৈরি করেছিল এবং কী ভাবে তা গ্রহণ করা হল, তাও খতিয়ে দেখবে পুলিশ। ঘটনার পিছনে বৃহত্তর কোনও চক্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুধুই টাকার বিনিময়ে কয়েক জন কিশোরকে রক্তদানে রাজি করানো হয়েছিল, নাকি এর পিছনে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহকে ঘিরে কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ অবশ্য সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না প্রশাসন।
আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনার প্রণব কুমার (Pranab Kumar) জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরে তদন্ত শুরু হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি পড়ুয়াদের কারা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এবং টাকা লেনদেন কী ভাবে হয়েছিল, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার সঙ্গে স্কুলের একজন প্রাক্তনীর নাম জড়ানোয় তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা ছিল। রক্তদানের পরে পড়ুয়াদের দেওয়া টাকার একটি অংশ তাঁর কাছে কমিশন হিসাবে গিয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। পুলিশ সংশ্লিষ্ট পড়ুয়া, অভিভাবক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার পূর্ণ ছবি পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কাছেও পৌঁছেছে। তিনি জানিয়েছেন, শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য, নাবালকদের শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের রক্তদান করানো হয়ে থাকলে তার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
রক্তদান একটি স্বেচ্ছামূলক মানবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু দাতার বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই না করে রক্ত সংগ্রহ করলে দাতা এবং রক্তগ্রহীতা, দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নাবালকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ১৮ বছরের কম বয়সি কোনও পড়ুয়াকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে রক্তদানে রাজি করানোর অভিযোগ উঠলে তার সঙ্গে শিশু সুরক্ষা, চিকিৎসা-নিয়ম এবং রক্ত সংগ্রহের বিধি, একাধিক বিষয় জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, দুর্গাপুরের ঘটনাটি তাই শুধুমাত্র কয়েক জন পড়ুয়ার কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে উঠে আসছে রক্তদান শিবির বা হাসপাতালভিত্তিক রক্ত সংগ্রহ ব্যবস্থার নজরদারি, দাতার পরিচয় যাচাই এবং বয়স নিশ্চিত করার প্রশ্ন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল, রক্ত সংগ্রহের আগে কী কী নথি যাচাই করা হয়েছিল, নাবালকরা কী পরিচয়ে রক্ত দিয়েছিল এবং তাঁদের বয়স কী ভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল, তদন্তে তার উত্তর খোঁজা হবে।
উল্লেখ্য যে, পড়ুয়াদের পরিবারের কাছেও এই ঘটনা নতুন করে সতর্কতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের হাতে নগদ টাকার প্রলোভন দিয়ে কোনও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অভিভাবকদের একাংশ। একই সঙ্গে স্কুলের বাইরে পড়ুয়াদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং কী উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এখন সবার লক্ষ্য তদন্তের দিকে। পুলিশ যদি প্রমাণ পায় যে বয়স লুকিয়ে বা নথিতে কারচুপি করে নাবালকদের রক্তদান করানো হয়েছিল, তা হলে ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়বে। আর যদি এর পিছনে সংগঠিত কোনও আর্থিক চক্রের অস্তিত্ব মেলে, তা হলে দুর্গাপুরের এই ঘটনা আরও বড় তদন্তের দিকে যেতে পারে। আপাতত পুলিশ অভিযোগের প্রতিটি দিক যাচাই করছে। তবে ৩০০-৪০০ টাকার লোভ দেখিয়ে স্কুলপড়ুয়াদের রক্তদান করানোর অভিযোগ যে ভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে রক্তদান ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং নাবালকদের সুরক্ষা, দুই নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rishabh Pant 100 Sixes, Rishabh Pant Test Record | পন্থের বিশ্বরেকর্ড! টেস্টে দ্রুততম ১০০ ছক্কা, গিলক্রিস্ট-স্টোকসদের পিছনে ফেললেন ভারতীয় তারকা




