সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পহেলগাম হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor) নিয়ে দীর্ঘ সময় পরে প্রকাশ্যে মুখ খুললেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval)। এই অভিযানকে ঘিরে ভারতের প্রস্তুতি, লক্ষ্য, কৌশল ও পাকিস্তানের উদ্দেশ্য দেওয়া বার্তা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সামনে আসতে চলেছে ডিসকভারি চ্যানেলের (Discovery) নতুন তথ্যচিত্রে। ‘ডিক্লাসিফায়েড: অপারেশন সিঁদুর’ (Declassified: Operation Sindoor) নামে ওই ডকু-সিরিজে অভিযানের নেপথ্যের একাধিক দিক রয়েছে বলে উল্লেখ। স্বাধীনতা দিবস ১৫ অগস্ট রাতে তথ্যচিত্রটি সম্প্রচার হয়। ডিসকভারি এবং ডিসকভারি প্লাসে (Discovery+) রাত ৯টা থেকে এটি দেখা যায় বলে খবর। ফলে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে এত দিন যে প্রশ্নগুলি ঘুরছিল, তার কিছু উত্তর এবার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ কর্তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে সামনে আসে।
অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গে ডোভালের বক্তব্যে উঠে এসেছে পাকিস্তানের সেনা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের অবস্থান। তাঁর কথায়, পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না করার বিষয়টি ভারত মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের সেনাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, সন্ত্রাসবাদে তাদের মদত দেওয়া বা সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না করতে পারার বিষয়টি আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।’ ডোভালের এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য যথেষ্ট। কারণ, অপারেশন সিঁদুরকে ভারত কেবল সীমান্তপারের একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখেনি। এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানও যুক্ত ছিল। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্যে সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ভারত কতটা কঠোর হতে পারে, সেই বিষয়েও দোভালের বক্তব্য যথেষ্ট দৃঢ়। তিনি জানান, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে ভারত দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য, ‘একবার কোনও কিছু শুরু হলে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করব। এর জন্য আমরা যে কোনও দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত, এর কোনও সীমা নেই।’
ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সংযমকে ভারত গুরুত্ব দিলেও সেই সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তাঁর কথায়, ‘ভারতের উদারতা বা সহনশীলতাকে যেন ভুলবশত দুর্বলতা হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়।’ অপারেশন সিঁদুরের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁয়ের বাইসরন উপত্যকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর। পর্যটকদের লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ২৫ জন ভারতীয় ও এক জন নেপালের নাগরিক ছিলেন। হামলার পর থেকেই সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হয়। ভারতের দাবি অনুযায়ী, হামলার সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির যোগ ছিল। তদন্তের পর হামলার নেপথ্যে থাকা সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক এবং তাদের পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। এর পরেই শুরু হয় অপারেশন সিঁদুর।
২০২৫ সালের ৭ মে ভারতীয় সামরিক বাহিনী অভিযানের কথা ঘোষণা করে। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ করা হয়েছিল। অভিযানের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি এবং তাদের পরিকাঠামো। ভারতীয় সামরিক নেতৃত্ব বারবার জানিয়েছিল, অভিযানটি সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি এড়ানোই ছিল অন্যতম বিবেচনা। এই অভিযানের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। পাল্টাপাল্টি হামলা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলার পর দুই দেশের মধ্যে সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে সংঘাত থামানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
উল্লেখ্য যে, অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারত কেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ রেখেছিল, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে আরও ভিতরে কেন অগ্রসর হয়নি, এই প্রশ্নও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে বারবার উঠেছে। ডিসকভারির নতুন তথ্যচিত্রে সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ নিয়েও আলোচনা উল্লেখ। তথ্যচিত্রটির অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে ভারতের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ আধিকারিকদের বক্তব্য। অভিযানের সিদ্ধান্ত কী ভাবে নেওয়া হয়েছিল, কোন পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেওয়া হয়, কী ধরনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং অভিযানের সময় কী কী চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছিল, এসব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
অপারেশন সিঁদুরের নেপথ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভূমিকা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সামরিক অভিযানের সময় নির্ভুলতা বজায় রাখা, প্রতিটি স্তরেই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন তথ্যচিত্রে এই প্রক্রিয়ার কিছু অংশ সামনে আসতে পারে। ডোভালের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে, ভারতের কৌশলগত ধৈর্য। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এসেছে। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। পহেলগাম হামলার পর পরিস্থিতি বদলায় আর ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবস্থান আরও কঠোর হয়। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলগাঁও হামলায় নিহতদের পরিবার, বিশেষ করে তাঁদের স্ত্রী ও পরিজনদের যন্ত্রণা এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবেই অভিযানের নামকরণ করা হয়েছিল বলে ভারতীয় মহলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আবেগের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
অভিযানের পর ভারত সরকার একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, সন্ত্রাসবাদী হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার দেশের রয়েছে ও সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া হবে না। এবার প্রায় এক বছর পর অপারেশন সিঁদুরের নেপথ্যের বিভিন্ন তথ্য জনসমক্ষে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অজিত দোভালের বক্তব্য সামনে আসায় তথ্যচিত্রটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সাধারণত শীর্ষ আধিকারিকদের প্রকাশ্য বক্তব্য সীমিত থাকে। সেই কারণে তাঁর সরাসরি বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের রাতে এই তথ্যচিত্র সম্প্রচার হওয়ার কথা। ভারতের স্বাধীনতার ৭৯ বছর পূর্তির আবহে জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের সামরিক অবস্থান নিয়ে তৈরি এই ডকু-সিরিজ তাই দর্শকদের কাছে আলাদা আগ্রহ তৈরি করে। অপারেশন সিঁদুরের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কী ছিল, অভিযান কতটা পরিকল্পিত ছিল ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর ছিল ‘ডিক্লাসিফায়েড: অপারেশন সিঁদুর’-এর দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi, Independence Day 2026 : তরুণদের হাতেই বিকশিত ভারতের স্বপ্ন, বছরে ১ কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




