সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে প্রায় এক শতাব্দী পুরনো একটি চিঠি সামনে এনে দেয় ঔপনিবেশিক ভারতের এক বিস্মৃত ছবি। সময়টা ১৯৩০ সাল। দেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল। শহরের সভা, মিছিল কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি স্বাধীনতার ভাবনা পৌঁছে গিয়েছিল স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও। তারই একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ নজির পাওয়া যায় দিল্লির একটি স্কুলকে ঘিরে ব্রিটিশ প্রশাসনের তৈরি নথিতে। স্কুলের নবম শ্রেণির কয়েক জন ছাত্রের জামার বোতামে দেখা গিয়েছিল বিপ্লবী ভগত সিং (Bhagat Singh) ও বটুকেশ্বর দত্তের (Batukeshwar Dutt) ছবি। শুধু তাই নয়, স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও টাঙানো হয়েছিল রাজনৈতিক ও বিপ্লবী নেতাদের ছবি। বিষয়টি ব্রিটিশ প্রশাসনের নজর এড়ায়নি। প্রায় ৯৬ বছর আগের সেই চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৩০ সালের ৫ নভেম্বর। তৎকালীন দিল্লি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট বা CID -এর পুলিশ সুপার চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন দিল্লির ডেপুটি কমিশনার জে এন জি জনসন (J N G Johnson), ICS-এর কাছে। চিঠিতে দিল্লির এম বি হাই স্কুলের (M B High School) ছাত্রদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে প্রশাসনিক উদ্বেগের কথা উঠে আসে। ব্রিটিশ পুলিশের ধারণা ছিল, স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যথেষ্ট উদ্যোগী হচ্ছে না। বরং কর্তৃপক্ষের কোনও কোনও অংশের কাছ থেকে পরোক্ষ প্রশ্রয়ও মিলতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।
চিঠিটির বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন ঔপনিবেশিক সরকার স্কুলের ভিতরে ছাত্রদের রাজনৈতিক মনোভাব প্রকাশের ঘটনাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখত। নবম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রের পোশাকে ভগত সিংহ ও বটুকেশ্বর দত্তের ছবি-যুক্ত বোতাম ব্যবহার করার বিষয়টি বিশেষ ভাবে পুলিশের নজরে আসে। আজকের দিনে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি-যুক্ত ব্যাজ বা বোতাম পরা হয়তো নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে এমন প্রতীকও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে দেখা হত। চিঠিতে স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ভিতরে রাজনৈতিক ও বিপ্লবী নেতাদের ছবি টাঙানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। দিল্লির তৎকালীন পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং দ্বিতীয় শিক্ষক দোলা রাম (Dola Ram) এই পরিস্থিতির জন্য অনেকটাই দায়ী। যদিও নথি অনুযায়ী, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ৩ নভেম্বর শ্রেণিকক্ষ থেকে ওই ছবিগুলি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবু তার আগের ঘটনাগুলি নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরদারি যে কতটা গভীর ছিল, পুরনো চিঠিটি তারই একটি দলিল।
এই নথির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, স্বাধীনতার আন্দোলনকে শুধু বড় রাজনৈতিক সভা কিংবা রাজপথের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে সেই সময়ের সমাজচিত্রের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কী ভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল, স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও তার প্রকাশ ঘটছিল, এই চিঠি তার একটি ছোট ছবি তুলে ধরে। ছাত্রদের পোশাকে বিপ্লবীদের ছবি এবং শ্রেণিকক্ষে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিকৃতি ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে নিছক সাজসজ্জার বিষয় ছিল না। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ভগত সিংহ এবং বটুকেশ্বর দত্তের নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা ওই কর্মকাণ্ড করেছিলেন। ঘটনার পর তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। আদালতের বিচারপর্বও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে ওঠে। ভগত সিংহের লেখা, তাঁর বিচার এবং পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড তাঁকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় বিপ্লবী চরিত্রে পরিণত করে।
বটুকেশ্বর দত্তও দীর্ঘ কারাবাসের শিকার হন। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ‘transportation for life’ দেওয়া হয়েছিল। বছরের পর বছর কারাবন্দী থাকার ফলে তাঁর জীবনও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত হয়ে যায়। দুই বিপ্লবীর নামই তৎকালীন তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফলে দিল্লির একটি স্কুলের ছাত্রদের পোশাকে তাঁদের ছবি দেখা যাওয়ার ঘটনা সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ছিল না। ১৯৩০ সালের ভারত ছিল প্রবল রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নানা পথে এগোচ্ছিল। কোথাও সভা, কোথাও মিছিল, কোথাও অসহযোগ, আবার কোথাও বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড, স্বাধীনতার দাবি ক্রমশ বৃহত্তর জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই আবহে স্কুলের ছাত্রদের মধ্যেও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার উপস্থিতি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। CID-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থার নজর যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছেছিল, চিঠিটি তার প্রমাণ বহন করছে।
চিঠির ভাষা আরও একটি বিষয় সামনে আনে। ব্রিটিশ প্রশাসন শুধু প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখত না; ছাত্রদের পোশাক, শ্রেণিকক্ষের দেওয়ালে টাঙানো ছবি কিংবা স্কুল কর্তৃপক্ষের আচরণও তাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শ কী ভাবে তরুণদের মধ্যে প্রবেশ করছে, তা বোঝার চেষ্টা প্রশাসনের নজরদারির একটি অংশ ছিল। এখানে স্কুলটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। পুলিশি চিঠিতে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের কেউ কেউ ছাত্রদের কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিচ্ছেন কি না, সেই সন্দেহও প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও প্রধান শিক্ষক ছবি সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তবু CID বিষয়টি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেছিল। ফলে ঘটনাটি স্থানীয় স্কুল-শৃঙ্খলার গণ্ডি পেরিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের রাজনৈতিক নজরদারির অংশ হয়ে উঠেছিল।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। তার আগে কয়েক দশক ধরে চলেছে রাজনৈতিক আন্দোলন, গণপ্রতিবাদ, কারাবাস ও অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ। সেই দীর্ঘ ইতিহাসের বৃহৎ ঘটনাগুলির পাশে ১৯৩০ সালের এই স্কুল-সংক্রান্ত চিঠিটি হয়তো খুব ছোট একটি দলিল। কিন্তু তার মধ্যেই ধরা পড়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কী ভাবে সমাজের নানা স্তরে পৌঁছে যাচ্ছিল।
১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তি হল। তার আগে ১৯৩০ সালের ওই চিঠি নতুন করে ইতিহাসের একটি দরজা খুলে দেয়। যে ছাত্রদের জামায় ভগত সিংহ ও বটুকেশ্বর দত্তের ছবি ছিল, তাঁরা হয়তো ইতিহাসের বড় কোনও চরিত্র হয়ে ওঠেননি। তাঁদের নামও জানা যায় না। কিন্তু তাঁদের পোশাকের সেই ছোট প্রতীকই দেখিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ধারণা তখন আর কেবল রাজনৈতিক নেতাদের সভামঞ্চে আটকে ছিল না। তা ঢুকে পড়েছিল স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও। একটি স্কুল, কয়েক জন ছাত্র, কয়েকটি ছবি ও পুলিশের একটি চিঠি, ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পরে সেই নথি পড়লে বোঝা যায়, স্বাধীনতার আন্দোলন কী ভাবে সমাজের ভিতরে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখে যে ছবি ছিল উদ্বেগের কারণ, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সেটিই আজ হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মারক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi, Independence Day 2026 : তরুণদের হাতেই বিকশিত ভারতের স্বপ্ন, বছরে ১ কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




