সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারতের সভাপতিত্বে এ বছর অনুষ্ঠিত হতে চলা ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। সেই আবহেই আগামী সেপ্টেম্বরে নতুন দিল্লিতে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের (Masoud Pezeshkian)। ভারতের আয়োজনে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতেই তাঁর এই সফর বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। সফরটি চূড়ান্ত হলে একদিকে যেমন বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারত ও ইরানের যোগাযোগ আরও বাড়বে, তেমনই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। ব্রাজিলের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন দিল্লি যে সম্মেলনের আয়োজন করছে, তার মূল ভাবনা হিসেবে রাখা হয়েছে ‘রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কোঅপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’। অর্থাৎ স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব এই চারটি ক্ষেত্রকে সামনে রেখেই এবারের ব্রিকস কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ বৈঠনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও উন্নয়ন, বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে ব্রিকস সদস্যপদ তুলনামূলক ভাবে নতুন। ২০২৪ সালে ইরান আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য হয়। সেই সময় মিশর, ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল। পরে ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্তির ফলে জোটের পরিসর আরও বেড়েছে। ফলে ইরানের রাষ্ট্রপতির দিল্লি সফর শুধু ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের দিক থেকেই নয়, ব্রিকসের ভিতরে পশ্চিম এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব ও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পেজেশকিয়ানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। দুই নেতার এর আগে সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে। সেই আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়েছিল। এবার দিল্লির মাটিতে তাঁদের ফের বৈঠক হলে ভারত-ইরান সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চবাহার বন্দর। ইরানের চবাহার বন্দর (Chabahar Port) ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগ প্রকল্প। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই বন্দর ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বন্দরটির উন্নয়ন ও পরিচালনা নিয়ে ভারত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সহযোগিতা রয়েছে। ফলে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে চবাহার নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ আলোচনায় আসতে পারে। জ্বালানি ক্ষেত্রও দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সেখানে কোনও ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়তে পারে। ভারতও তার প্রভাব থেকে বাইরে নয়। তাই ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক, দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও পেজেশকিয়ানের সফরকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। অঞ্চলটিতে একাধিক সংঘাত এবং উত্তেজনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত বরাবরই সংযত কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে নয়াদিল্লি অবস্থান নিয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi) এর আগে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমাতে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উঠে এসেছিল। পেজেশকিয়ানের দিল্লি সফর হলে সেই প্রেক্ষাপটে ভারত-ইরান আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরান ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থের পাশাপাশি মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়েও দুই পক্ষের মতবিনিময় হতে পারে।
ব্রিকসের মঞ্চও এই আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলির বাইরে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস এখন আগের তুলনায় অনেক বড় আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির ফলে সংগঠনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। ইরানের মতো পশ্চিম এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ সেই পরিসর আরও বাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের কাছে ব্রিকস সম্মেলন তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক নয়। এই মঞ্চে বাণিজ্য, উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকট নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগও তৈরি হয়। ইরানের রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি সেই আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্ব দিতে পারে। ভারত-ইরান সম্পর্কের ইতিহাসও দীর্ঘ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরনো। আধুনিক সময়ে জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সেই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
চবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের দীর্ঘ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হল মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডরের (INSTC) সঙ্গেও ইরানের ভূমিকা যুক্ত। ফলে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ভারতীয় নেতৃত্বের আলোচনায় আঞ্চলিক সংযোগ এবং পণ্য পরিবহণের বিষয়টি উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে, ইরানের জন্যও ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইরান দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে ভারত-ইরান বাণিজ্য এবং সংযোগ প্রকল্পগুলিকে কার্যকর রাখার প্রশ্ন তেহরানের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ। দিল্লিতে পেজেশকিয়ানের সফর চূড়ান্ত হলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে। ব্রিকসের বহুপাক্ষিক পরিসরের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হতে পারে। বিশেষ করে চবাহার, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এই চারটি ক্ষেত্র আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন লক্ষ্য, সেপ্টেম্বরের দিকে। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি নিশ্চিত হলে দিল্লির কূটনৈতিক ব্যস্ততাও বাড়বে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের সঙ্গে সরাসরি উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ ভারতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ব্রিকসের বিস্তৃত পরিসরে নতুন সমীকরণ তৈরির ক্ষেত্রেও এই সফর তাৎপর্য বহন করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi, Independence Day 2026 : তরুণদের হাতেই বিকশিত ভারতের স্বপ্ন, বছরে ১ কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




