সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকেই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসাবে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষপূর্তিতে শনিবার দিল্লির লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে দেশের যুবসমাজের উপর তাঁর আস্থার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তিতে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে বড় কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করেন তিনি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশের এক কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে এবার উন্নত ভারতের লক্ষ্য, আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং যুবসমাজকে কেন্দ্র করে একাধিক পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বার বার উঠে এসেছে ২০৪৭ সালের ভারতকে বর্তমান প্রজন্মের হাত ধরে গড়ে তোলার প্রসঙ্গ। তাঁর কথায়, দেশের তরুণদের সামর্থ্যের উপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। যুবসমাজের দক্ষতা, প্রযুক্তি-জ্ঞান ও কর্মক্ষমতাকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হবে। প্রতি বছর এক কোটি যুবক-যুবতীকে এআই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি থেকে উৎপাদন, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, পরিষেবা কিংবা নতুন ধরনের শিল্প, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগামী দিনে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। ফলে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের তরুণদের প্রস্তুত করতেই এই উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের উপর তাঁর আস্থা রয়েছে। তাঁর মতে, ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শুধু তরুণদের নয়, দেশের নারীশক্তি, কৃষক, শ্রমিক-সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের কথাও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন। দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর ভাষণে উঠে আসে।
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের শুরুতে রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধী -এর (Mahatma Gandhi) সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে লালকেল্লায় পৌঁছে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। সেনাবাহিনীর তরফে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের পর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। এ বছর জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্বাধীনতা দিবসের আয়োজনেও তার বিশেষ উপস্থিতি ছিল। লালকেল্লার দর্শকাসনে তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে শুধু যুবসমাজকে নিয়ে কর্মসূচির কথাই নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সাতটি শক্তির উপর নির্ভর করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘শক্তির সপ্তধারা’ হিসাবে তিনি উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, যোগাযোগ পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও ভারতের সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন।
দেশের শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তাঁর বক্তব্য, ভারত কেবল বিশ্বের বড় বাজার হয়ে থাকলে চলবে না। দেশীয় শিল্পকে এমন জায়গায় পৌঁছতে হবে, যাতে ভারত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যও তুলে ধরেছেন তিনি। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকেও উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সেই পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করার পরিকাঠামো উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও ভারতের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাটি সেই বৃহত্তর প্রযুক্তিনির্ভর ভাবনারই অংশ। আগামী দিনে এআই, নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে কেন্দ্রের। যোগাযোগ পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে দ্রুতগতির পরিবহণ ও উন্নত সংযোগ ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তকে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে ব্যবসা, শিল্প, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার কথাও উঠে এসেছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রসারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পাশাপাশি জলসম্পদ ও সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। গ্রীন ইকোনমির মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। অন্য দিকে ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে সমুদ্র, নদী এবং জলসম্পদকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
ভারতের সাংস্কৃতিক শক্তিকেও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। যোগ, আয়ুর্বেদ, পর্যটন এবং ভারতের ঐতিহ্যকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। সামরিক ক্ষমতার বাইরে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ৬জি প্রযুক্তি নিয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ৬জি যোগাযোগ ব্যবস্থা আগামী দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর ফলে দ্রুতগতির ডিজিটাল যোগাযোগের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প ও পরিষেবার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২২ সালে ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ‘পাঁচ প্রতিজ্ঞা’-র কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল উন্নয়নের সাতটি ক্ষেত্র ও তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার নতুন পরিকল্পনা। ফলে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে এবার দেশের যুবসমাজ, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতার উপরই জোর সবচেয়ে বেশি দেখা গেল। দেশের তরুণদের জন্য বছরে এক কোটি এআই প্রশিক্ষণের ঘোষণা তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচী নয়, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মানবসম্পদ তৈরির বড় পরিকল্পনা হিসাবেও দেখা হচ্ছে। ২০৪৭ সালের লক্ষ্যে পৌঁছতে গিয়ে তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা কতটা কাজে লাগানো যায়, আগামী দিনে তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের এই পরিকল্পনার সাফল্য।
ছবি : সংগৃহীত




