সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ব্যাঙ্কে কোনও কাজ আটকে রয়েছে, রেলে পরিষেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, ডাকঘরে সরকারি কাজ করাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে কিংবা কোনও কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরের আধিকারিক কোনও বেআইনি সুবিধা চাইছেন, এমন পরিস্থিতিতে আর চুপ করে না থেকে সরাসরি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের (CBI) কাছে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তা জানাতে সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করেছে সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখা। নিজাম প্যালেসের সিবিআই দফতর-সহ কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়েছে সূত্রের খবর। বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি তিন ভাষাতেই সাধারণ মানুষকে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর বা প্রতিষ্ঠানের কোনও আধিকারিক ঘুষ চাইলে কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে দ্রুত সিবিআইয়ের কলকাতাস্থিত দুর্নীতিদমন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলা হয়েছে।
সিবিআইয়ের এই উদ্যোগের ফলে ব্যাঙ্ক, রেল, ডাকঘর, কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর এবং কেন্দ্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সাধারণ মানুষের কাছে অভিযোগ জানানোর একটি সরাসরি পথ সামনে এল। দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তিকে নিজে থেকে ঘুষ দেওয়ার পথে না গিয়ে আইন মেনে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার দ্বারস্থ হওয়ার আবেদনও করা হয়েছে। অভিযোগ জানানোর জন্য দু’টি যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে: ০৩৩-২২৮৯-৪৪০৩ এবং ৯০৫১৬১৩৪৫৬। কলকাতায় সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখার দফতর নিউ টাউনের অখণ্ডকেশরী রোডে অবস্থিত। এনবিসিসি স্কোয়্যারের ১৩ তলায় রয়েছে দুর্নীতিদমন শাখার ডিআইজির দফতর। ফলে কোনও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী বা আধিকারিকের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়া কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নাগরিক এই শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
কিন্তু, অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য তথ্য রাখা জরুরি। কোনও আধিকারিক বা কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ঘটনার তারিখ, সময়, দফতরের নাম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় এবং কী ধরনের ঘুষ বা বেআইনি সুবিধা চাওয়া হয়েছে, এই ধরনের তথ্য তদন্তের ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে। অভিযোগের সঙ্গে থাকা নথি, যোগাযোগের তথ্য বা অন্য কোনও প্রাসঙ্গিক উপাদান থাকলে তা তদন্তকারী সংস্থার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখা মূলত ঘুষ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মতো অভিযোগ নিয়ে কাজ করে। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে এই শাখার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি অভিযোগ জানানোর আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই উদ্যোগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর সিবিআইয়ের কাজের পরিধি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুন মাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নেতৃত্বাধীন নতুন রাজ্য সরকার সিবিআইকে রাজ্যের মধ্যে তদন্ত চালানোর ক্ষেত্রে সাধারণ সম্মতি পুনর্বহাল করে। এর ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থাটির তদন্ত সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় প্রশাসনিক বাধা কমেছে। সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ সম্মতির প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের বিষয় ছিল। ২০১৮ সালে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকার সিবিআইকে দেওয়া সাধারণ সম্মতি প্রত্যাহার করেছিল। ফলে রাজ্যে নতুন তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজন পড়ত। ২০২৬ সালের জুনে সেই সাধারণ সম্মতি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে।
নতুন সরকারের সময়ে সিবিআই-সংক্রান্ত একাধিক পদক্ষেপও সামনে এসেছে। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত নয় জন সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেয়। তাঁদের মধ্যে আটজন শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় ও একজন পুরসভা নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আদালতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য রাজ্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজনীয়তা তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পুরনো একাধিক মামলাতেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরে ঘুষের অভিযোগ জানানোর আবেদনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ব্যাঙ্ক, রেল, ডাকঘর, কেন্দ্রীয় সরকারি হাসপাতাল, আয়কর দফতর, পাসপোর্ট সংক্রান্ত পরিষেবা কিংবা অন্য কোনও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত বিভিন্ন পরিষেবা নিতে হয়। সেই পরিষেবা পাওয়ার বিনিময়ে যদি কেউ বেআইনি ভাবে টাকা দাবি করেন, তা হলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাঙ্ক ও ডাকঘরের মতো প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কর্মীদের। পেনশন, সঞ্চয়, ঋণ, অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত কাজ, ডাকঘরের বিভিন্ন পরিষেবা কিংবা সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও কর্মী অতিরিক্ত টাকা চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনেক সময় কোথায় অভিযোগ করবেন তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখার তরফে প্রকাশ্য ভাবে যোগাযোগের নম্বর দেওয়ার ফলে সেই দ্বিধা কিছুটা কাটতে পারে। রেলের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। রেল পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কোনও কেন্দ্রীয় কর্মীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তকারী সংস্থার কাছে জানানোর সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের ধরন অনুযায়ী কোন সংস্থা তদন্ত করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখার ভূমিকা রয়েছে, অন্য দিকে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে রাজ্যের নিজস্ব দুর্নীতিদমন ব্যবস্থাও রয়েছে।
সিবিআইয়ের আবেদন তাই শুধু অভিযোগ করার আহ্বান নয়, ঘুষ না দেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। কোনও সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য বেআইনি টাকা দাবি করা হলে তা মেনে নেওয়ার বদলে আইনসঙ্গত পথে অভিযোগ জানানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত এগিয়ে নিতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাধিক প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি সিবিআইকে জানানোর আবেদন নতুন করে নজর কেড়েছে। এখন নজর, এই উদ্যোগের পরে কতগুলি অভিযোগ সিবিআইয়ের কাছে পৌঁছয় এবং সেই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে কী ধরনের তদন্ত শুরু হয়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ থেকে যদি নির্দিষ্ট তথ্য উঠে আসে, তা হলে কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি আরও বাড়তে পারে। আপাতত সিবিআইয়ের আহ্বান একটাই, কেউ ঘুষ চাইলে চুপ করে না থেকে অভিযোগ জানান, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ayushman Bharat Name Mismatch, Ayushman Bharat Card West Bengal | ‘মুখার্জি-মুখোপাধ্যায় হলেও আয়ুষ্মান ভারত থেকে নাম কাটবে না!’ SIR -এর অভিজ্ঞতার পর নবান্নের বড় নির্দেশ




