PM Narendra Modi | মোদীর ১০ বছর পর ভারত কতটা বদলেছে? অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল বিপ্লব, তৃতীয় শক্তি থেকে বিশ্বশক্তির পথে কতটা এগোল দেশ

SHARE:

মোদী সরকারের ১০ বছরে অর্থনীতি, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, UPI, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও বিশ্বকূটনীতিতে ভারতের কতটা পরিবর্তন হয়েছে? তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
ভারতের বিপুল যুব জনসংখ্যার জন্য প্রতি বছর কত নতুন মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখনও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে মোদী সরকারের পরবর্তী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির একটি হতে পারে, পরিকাঠামো বিনিয়োগকে কীভাবে বৃহৎ কর্মসংস্থানে পরিণত করা যায়।… আজ দ্বিতীয় কিস্তি। 

 

মোদীর ১০ বছর পর ভারত কতটা বদলেছে?

মোদী সরকারের ১০ বছরে অর্থনীতি, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, UPI, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও বিশ্বকূটনীতিতে ভারতের কতটা পরিবর্তন হয়েছে? তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
মোদী সরকারের ১০ বছরে ভারতের পরিবর্তন। ছবি : সংগৃহীত

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: নরেন্দ্র মোদী  সরকারের (PM Narendra Modi) এক দশকের রাজনৈতিক যাত্রাকে শুধু নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করলে ভারতের পরিবর্তনের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনীতি, পরিকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের দাবি করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিবর্তনগুলি কি ভারতকে আগামী দশকের বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে সত্যিই এগিয়ে দিয়েছে?

মোদী সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবে সামনে এসেছে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ (Digital India)। সরকারি পরিষেবা, আধার (Aadhaar), UPI (Unified Payments Interface), সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিয়েছে। UPI-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা এখন ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। ভারতের এই ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নজরকাড়া মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনধন (Jan Dhan), আধার ও মোবাইল। এই তিন ব্যবস্থার সমন্বয়ে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমানো ও সরকারি ভর্তুকি সরাসরি নাগরিকের অ্যাকাউন্টে পাঠানোকে মোদী সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।

মোদীর নেতৃত্বে ভারতের গত দশককে এক কথায় ‘সাফল্য’ বা ‘ব্যর্থতা’ বলে চিহ্নিত করা কঠিন। ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিকাঠামো, কূটনীতি, প্রতিরক্ষা ও মহাকাশে দৃশ্যমান অগ্রগতি যেমন রয়েছে, তেমনই কর্মসংস্থান, বৈষম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো প্রশ্নও রয়েছে। আগামী দশকে ভারতের সামনে আরও কঠিন প্রতিযোগিতা। চিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, আমেরিকার প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, ইউরোপের শিল্পনীতি ও AI-নির্ভর নতুন বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যে ভারতকে নিজের জায়গা আরও শক্ত করতে হবে।

পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও গত এক দশকে বড় পরিবর্তনের দাবি করা হয়েছে। জাতীয় সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দে ভারত (Vande Bharat) ট্রেন, বিমানবন্দর, মেট্রো এবং মাল্টিমোডাল পরিবহণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি, উন্নত পরিকাঠামো শুধু যাতায়াত সহজ করে না, শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত করে।

আরও পড়ুন : Narendra Modi Seychelles, India Seychelles relations | সেশেলসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত, স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধান অতিথি নরেন্দ্র মোদী, ভারত-সেশেলস সম্পর্কে নতুন গতি

কিন্তু, এখানেই রয়েছে বড় পরীক্ষা। রাস্তা বা রেললাইন তৈরি হওয়া ও সেই পরিকাঠামোর মাধ্যমে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়। ভারতের বিপুল যুব জনসংখ্যার জন্য প্রতি বছর কত নতুন মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখনও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে মোদী সরকারের পরবর্তী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির একটি হতে পারে, পরিকাঠামো বিনিয়োগকে কীভাবে বৃহৎ কর্মসংস্থানে পরিণত করা যায়। উৎপাদন ক্ষেত্রেও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India), ‘আত্মনির্ভর ভারত’ (Atmanirbhar Bharat) এবং Production Linked Incentive বা PLI প্রকল্পকে সামনে রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন উৎপাদন থেকে ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভারতের লক্ষ্য শুধু বিশ্বের বড় বাজার হওয়া নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ manufacturing hub হয়ে ওঠা।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও আত্মনির্ভরতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশীয় যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশে প্রতিরক্ষা রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের এই পরিবর্তনকে সমর্থকরা কৌশলগত স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বিশ্বরাজনীতিতে মোদী সরকারের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয় ভারতের ‘strategic autonomy’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে। আমেরিকার সঙ্গে QUAD-এ সহযোগিতা যেমন বাড়ানো হয়েছে, তেমনই রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে। ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং Global South-এর দেশগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্ঘাতের সময় ভারতের অবস্থান এই কূটনীতির বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা দেশগুলির চাপের মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। একই সঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়েছে। এই ভারসাম্য ভারতের কূটনৈতিক স্বাধীনতার উদাহরণ বলে মোদী সরকারের সমর্থকদের দাবি। G20 (G20) সভাপতিত্ব ও Global South-এর নেতৃত্বের প্রচেষ্টার মাধ্যমেও ভারতের আন্তর্জাতিক ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভারতের বার্তা ছিল, বিশ্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

মহাকাশ ক্ষেত্রেও গত এক দশকে ভারতীয় সাফল্য আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। চন্দ্রযান-৩ (Chandrayaan-3)-এর চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে সফল অবতরণ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিকে নতুন মর্যাদা দিয়েছে। একই সঙ্গে মহাকাশযান (Gaganyaan), বেসরকারি মহাকাশ শিল্প এবং মহাকাশ-ভিত্তিক প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল বড় অর্থনীতি হিসেবে উঠে এসেছে। IMF-এর মূল্যায়নগুলিতে ভারতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী বলে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনসংখ্যা, পরিষেবা খাত এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে ভারতের শক্তির জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির এই সাফল্যের পাশাপাশি প্রশ্নও রয়েছে। মাথাপিছু আয়, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের গুণমান, গ্রামীণ অর্থনীতি আর আয়বৈষম্য এসব ক্ষেত্রে আরও কাজ প্রয়োজন। একটি দেশের GDP বাড়লেই প্রত্যেক পরিবারের আয় একই হারে বাড়ে না। তাই মোদী সরকারের পরবর্তী দশকের আসল পরীক্ষা হতে পারে ‘GDP growth’ থেকে ‘inclusive growth’-এ পৌঁছনো।

আর এখানেই যুবসমাজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ভারতের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এই তরুণ প্রজন্মকে শুধু ভোটার হিসেবে দেখা হলে চলবে না; তাদের দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, গবেষণা, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। AI (Artificial Intelligence), robotics, semiconductor এবং green energy-এর মতো নতুন শিল্পে ভারত কত দ্রুত নিজের workforce প্রস্তুত করতে পারে, তার উপর আগামী দশকের অর্থনৈতিক শক্তি অনেকটাই নির্ভর করবে।

মোদী সরকারের সমর্থকদের যুক্তি, ধারাবাহিক নেতৃত্ব থাকলে দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন আরও সহজ হতে পারে। বিরোধীদের পাল্টা বক্তব্য, গণতন্ত্রে কোনও সরকারের সাফল্য শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না; প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের গত দশককে এক কথায় ‘সাফল্য’ বা ‘ব্যর্থতা’ বলে চিহ্নিত করা কঠিন। ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিকাঠামো, কূটনীতি, প্রতিরক্ষা ও মহাকাশে দৃশ্যমান অগ্রগতি যেমন রয়েছে, তেমনই কর্মসংস্থান, বৈষম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো প্রশ্নও রয়েছে। আগামী দশকে ভারতের সামনে আরও কঠিন প্রতিযোগিতা। চিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, আমেরিকার প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, ইউরোপের শিল্পনীতি ও AI-নির্ভর নতুন বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যে ভারতকে নিজের জায়গা আরও শক্ত করতে হবে।

তাই ‘মোদী আরও দশ বছর থাকবেন কি না’ এই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে অন্য একটি প্রশ্ন: ভারত কি আগামী দশ বছরে এমন একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যা কোনও একজন নেতার উপর নির্ভরশীল না থেকেও বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত মোদী যুগের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।

ছবি: সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : Narendra Modi | আরও ১০ বছর মোদী কেন? বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের উত্থান, যুবশক্তি ও বিরোধীদের কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন