সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ উত্তর ২৪ পরগণা : উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ায় রবিবার রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ওঠে, যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর গাড়ি লক্ষ্য করে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বীজপুর (Bijpur) এলাকার রাস্তায় তাঁর গাড়ি ঘিরে ফেলে একদল বিক্ষোভকারী। অভিযোগ, সেই সময় গাড়ির দিকে কাদা এবং ছেঁড়া চটি ছোড়া হয়, পাশাপাশি ওঠে ‘চোর-চোর’ স্লোগান। ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিশেষ সূত্রে খবর, কাঁচরাপাড়ায় পুলিশি হেফাজতে মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মমতা। সেই সফরেই এই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন পুলিশকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িকে নিরাপত্তার বলয়ে এনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বলেন, ‘নিরাপত্তা ভুলে যান, এখানে যারা আক্রমণ করছে, তাদেরই সুরক্ষা দিচ্ছে পুলিশ।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘আমার গাড়িতে বড় বড় ইট ছোড়া হয়েছে। মাথায় লাগলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, আমরা বাঁচতাম না।’ তাঁর দাবি, এই ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং ‘বিজেপি গুন্ডাদের দিয়ে এই কাজ করানো হয়েছে।’ এই ঘটনায় সরাসরি রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-কে নিশানা করেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘বাংলার পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রশাসন সাধারণ মানুষের পাশে নেই।’ পাশাপাশি তিনি জানান, এই ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিজেপি (BJP) এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, ‘এই ঘটনায় বিজেপির কোনও কর্মী যুক্ত নয়। যদি কেউ এমন কাজ করে থাকে, তা সমর্থনযোগ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন প্রাক্তন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এমন আচরণ কাম্য নয়, এর ফলে রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ রবিবারের এই সফরে মমতার সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) লোকসভার সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) এবং রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন (Dola Sen)। তাঁরাও বিক্ষোভের মুখে পড়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘পুলিশকে ব্যবহার করে রাজনীতি চালানো হচ্ছে।’ তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক। কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওট (Jenny Sharma Keot)-এর স্বামী বিরজু কেওট (Birju Keot)-কে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল হালিশহর থানার (Halisahar Police Station) পুলিশ। আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়। কিন্তু শনিবার জানা যায়, হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, লকআপের ভিতরে মারধরের জেরেই মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। এই ঘটনার প্রতিবাদেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাঁচরাপাড়ায় যান এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।
পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে মমতা বলেন, ‘এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভেঙে পড়েছে।’ তাঁর আরও দাবি, মৃতের পরিবারকে ভয় দেখানো হচ্ছে। এই অভিযোগ ঘিরেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। অন্যদিকে বীজপুরের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস (Sudipta Das) পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হচ্ছে।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা পরিবারের পাশে আছি এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত।’ তিনি আরও দাবি করেন, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা হয়নি এবং তারা স্থানীয় প্রতিনিধিদের উপর আস্থা রেখেছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। বিক্ষোভের সময় ঠিক কারা গাড়িতে আক্রমণ চালিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই ঘটনার পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। একদিকে শাসক ও বিরোধী শিবির একে অপরকে দোষারোপ করছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক শালীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আগামী দিনে এই ইস্যু আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee TMC crisis | কোয়েলের ইস্তফার ঝড়ে কাঁপছে তৃণমূল, ২১ জুলাইয়ের আগে ‘ডেডলাইন’ বেঁধে মমতার বড় বার্তা, নতুন করে দল গঠনের ইঙ্গিতে তপ্ত রাজনীতি




