সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সরকারি চিকিৎসকদের ডিউটি নিয়ে বিতর্কের আবহে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadvat Mukhopadhyay)। সপ্তাহে ৯৬ ঘণ্টা কাজ করতে হবে, এমন কোনও সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়নি বলে স্পষ্ট জানালেন তিনি। বরং চিকিৎসকদের উদ্দেশে তাঁর অনুরোধ, তাঁরা যেন সপ্তাহে অন্তত ৯৬ ঘণ্টা নিজেদের ডিউটি স্টেশনে উপস্থিত থাকেন, যাতে প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত পরিষেবা দেওয়া যায়। রবিবার একটি চিকিৎসক সংগঠনের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয় এই বিতর্ক। সেখানে মন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে চিকিৎসকমহলের একাংশে প্রশ্ন ওঠে, সত্যিই কি সপ্তাহে ৯৬ ঘণ্টা কাজ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে?
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ব্যাখ্যা। সেই প্রেক্ষিতেই সোমবার নিজেই সামনে এসে অবস্থান পরিষ্কার করেন শারদ্বত। তিনি জানান, ‘কাজের সময় বাড়ানোর কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আমি শুধু অনুরোধ করেছি, চিকিৎসকেরা যেন তাঁদের কর্মস্থলে সপ্তাহে অন্তত ৯৬ ঘণ্টা উপস্থিত থাকেন।’ তাঁর বক্তব্য, চিকিৎসকেরা যদি কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকেন, তা হলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছোনো সম্ভব হবে, যা রোগী পরিষেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই একটি সমস্যা নিয়ে অভিযোগ জমা পড়ছিল, বহু চিকিৎসকের স্থায়ী বাসস্থান যেখানে, সেখানে নয়, অন্য জেলায় তাঁদের পোস্টিং থাকলেও তাঁরা নিয়মিত সেই কর্মস্থলে থাকেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কলকাতার বাসিন্দা কোনও চিকিৎসক উত্তরবঙ্গের কোনও হাসপাতালে কর্মরত হলেও, তিনি সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় নিজের শহরে কাটান। এতে পরিষেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রসঙ্গেই রবিবারের অনুষ্ঠানে কড়া সুরে কথা বলতে শোনা যায় মন্ত্রীকে। তিনি বলেন, ‘জনগণের চিকিৎসার জন্য সরকার বেতন দেয়। সেই দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করতে হবে। না হলে অন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ খোলা আছে।’ তাঁর আরও মন্তব্য ছিল, ‘শিক্ষক-চিকিৎসকদের সপ্তাহে অন্তত ৯৬ ঘণ্টা সেন্টারে থাকতে হবে।’ এই বক্তব্যই নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
চিকিৎসক মহলের একাংশ এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন তোলেন, সপ্তাহে ৯৬ ঘণ্টা মানে কি দৈনিক প্রায় ১৪ ঘণ্টার বেশি কাজ? সেই হিসাব কষে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেকে। তবে মন্ত্রীর সোমবারের ব্যাখ্যার পর সেই বিভ্রান্তির অনেকটাই কাটে। শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadvat Mukhopadhyay) সামাজিক মাধ্যমে জানান, ‘ডিউটি স্টেশনে উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে, কাজের সময় বাড়ানোর কথা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসককে দ্রুত পাওয়া যায় না। যদি তিনি কর্মস্থলের আশপাশে থাকেন, তা হলে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হবে না।’ পাশাপাশি, এই বিষয়ে কারও কোনও প্রশ্ন থাকলে সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা উন্নত করার লক্ষ্যে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি স্বাস্থ্য দফতরের। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলাগুলিতে চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে কর্মরত চিকিৎসকেরা যদি নিয়মিত না থাকেন, তা হলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিষেবায় প্রভাব পড়ে। আরও একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সামনে আসছে, কিছু চিকিৎসক নির্দিষ্ট ডিউটির সময় প্রাইভেট প্র্যাকটিসে যুক্ত থাকেন। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে সরকারি ভাবে সব সময় কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে উদ্বেগ রয়েছে। রবিবারের অনুষ্ঠানে সেই প্রসঙ্গেও ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার উপর জোর দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসন। ডিউটি স্টেশনে চিকিৎসকদের সময় কাটানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে জরুরি পরিষেবা আরও দ্রুত দেওয়া সম্ভব হবে বলে মত প্রশাসনিক মহলের। তবে এই নির্দেশিকা বাস্তবে কী ভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। চিকিৎসকদের একাংশ মনে করছেন, কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি বাস্তবসম্মত ভাবে বিবেচনা করা দরকার। দূরবর্তী এলাকায় থাকার পরিকাঠামো, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সুবিধার প্রশ্নও উঠে আসছে। অন্যদিকে, রোগী পরিষেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে দিকটিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যার পর পরিস্থিতি অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। সপ্তাহে ৯৬ ঘণ্টা কাজ বাধ্যতামূলক নয়, বরং উপস্থিতি নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, এই বার্তাই এখন সামনে এসেছে। প্রশাসন আশা করছে, এতে সরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিষেবার মান আরও উন্নত হবে এবং রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, Mamata Banerjee | শুভেন্দুর তোপে মমতা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসের অভিযোগে তোলপাড় বাংলা




