সম্পাদকীয়
পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে বৈশ্বিক সংকট
যৌন সহিংসতা নিয়ে আলোচনা প্রায়শই আবেগ, ক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন আমরা বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তখন এই সমস্যার প্রকৃত গভীরতা ও জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৩৬ মিলিয়ন নারী অর্থাৎ প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, তা গভীরভাবে প্রোথিত বৈশ্বিক সংকটের প্রতিফলন।
প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল বিশ্বজুড়ে মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা পুলিশে রিপোর্ট করা হয়। অর্থাৎ, প্রকৃত সংখ্যাটি পরিসংখ্যানের তুলনায় বহু গুণ বেশি। এই অনুপাত দেখায় যে, আইনি কাঠামো থাকলেও সামাজিক লজ্জা, ভয়, বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও প্রতিশোধের আশঙ্কা ভুক্তভোগীদের মুখ বন্ধ করে রাখে। ফলে যে পরিসংখ্যান আমরা দেখি, তা বাস্তবতার কেবলমাত্র এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। দেশভেদে ধর্ষণের হার ও রিপোর্টিংয়ের পার্থক্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুইডেনে প্রতি এক লক্ষে ৬৩টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হলেও, ভারতে ২০২১ সালে মোট ৩১,৬৭৭টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আবার যুক্তরাজ্যে বছরে প্রায় ৯৭,০০০ ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এই বৈষম্য সরাসরি অপরাধের প্রকৃত পার্থক্য নির্দেশ করে না, তা বোঝায় কোন দেশে মানুষ কতটা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন ও বিচার ব্যবস্থার উপর কতটা আস্থা রাখেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধী হয় পরিবার বা পরিচিত মানুষ। ভারতে এই হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। এই তথ্যটি প্রচলিত ‘অপরিচিতের আক্রমণ’ ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং দেখায় যে নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় তাদের পরিচিত পরিবেশ থেকেই আসে। ফলে নিরাপত্তা কেবল জনসমাগম বা রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ নয়, তা ঘর, সম্পর্ক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও নিহিত। বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতাও এই সঙ্কটকে আরও গভীর করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৫.৭ শতাংশ ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়। যুক্তরাজ্যে রিপোর্ট হওয়া ধর্ষণের মাত্র ১.৬ শতাংশে দোষী সাব্যস্ত হয়। ভারতে এই হার কিছুটা বেশি হলেও (প্রায় ২৭ শতাংশ), তা এখনও সন্তোষজনক নয়। এই পরিসংখ্যানগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ফলে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই শাস্তির ভয় ছাড়াই সমাজে ঘোরাফেরা করে!
কোভিড-১৯ মহামারির সময় যৌন সহিংসতার হার বৃদ্ধি পাওয়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। লকডাউন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ফলে অনেক নারী তাদের নির্যাতনকারীর সঙ্গে একই স্থানে বন্দী হয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রে এই সময় ধর্ষণের রিপোর্ট ২৫ শতাংশ বেড়েছিল, যদিও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এটি দেখায় যে সঙ্কটের সময়ে নারীদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে। শিশু ও কিশোরীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সমান ভয়াবহ। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ মিলিয়ন মেয়ে শিশু ২০ বছরের আগেই জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক বা সহিংসতার শিকার হয়েছে। আবার প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে একজন জোরপূর্বক যৌন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। এই তথ্যগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর এই সমস্যার দীর্ঘ প্রভাবের দিকেও ইঙ্গিত করে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, শিক্ষার প্রসার ও ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি। বিচার ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ভুক্তভোগী-বান্ধব করতে হবে। একই সঙ্গে রিপোর্টিং প্রক্রিয়াকে সহজ ও নিরাপদ করা জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে সামনে আসতে পারেন।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যৌন সহিংসতাকে ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা সমাজের গভীরে প্রোথিত। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র সব জায়গাতেই সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উল্লেখ্য, পরিসংখ্যান আমাদের সতর্কবার্তা দেয়, কিন্তু পরিবর্তন আনার দায়িত্ব আমাদের সকলের। 🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
পিতা গার্হপত্য অগ্নি, মাতা দক্ষিণ অগ্নি এবং গুরু আহবনীয় অগ্নিস্বরূপ, পিতা মাতা ও গুরুদেবের পূজার দ্বারা অগ্নিত্রয়ের পূজা করা হয়৷ তজ্জন্য তাঁরা অগ্নিত্রয় হতে গরীয়ান, অপ্রমত্তভাবে এ তিন জনের সেবা করলে তিনলোক জয়ে সমর্থ হবে৷ পিতার সেবায় পরলোক, মাতার সেবায় ইহলোক এবং গুরুর সেবার দ্বারা ব্রহ্মলোক অবশ্যই জয় করতে পারবে৷ হে ভারত! উত্তমরূপে এঁদের সেবা পূজা কর তাহা হইলে তিনলোকে যশঃ মঙ্গল ধর্ম্ম ও সুমহৎ ফললাভ করবে৷ কখন এঁদের শয়নের পূর্ব্বে শয়ন, ভোজনের আগে ভোজন অথবা দোষ কীর্ত্তন করবে না৷ তাই-ই উত্তম সুকৃত, তার দ্বারাই তুমি কীর্ত্তি পুন্য ও উত্তম লোক সকল পাবে৷ যিনি এ তিন জনকে আদর করেন, তাঁর দ্বারা সমস্ত ধর্ম্ম আদৃত হয়ে থাকে৷ যে ব্যক্তি এঁদের অনাদর করে তার সমস্ত কর্ম্ম নিষ্ফল হয়, ইহ ও পরলোকে মঙ্গল হয় না ৷ আমি যে কর্ম্ম করি বা যা উপার্জ্জন করে থাকি, সে সকল তাঁদের নিবেদন করি, সে জন্য আমার তা শত সহস্র গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তজ্জন্য আমার নিকট তিন লোক প্রকাশিত হয়েছে৷

আমি মনে করি— মন্ত্রদাতা গুরু, পিতামাতা হতে গুরুতর, যেহেতু মাতাপিতা কেবল জন্মের কারণ, কারণ পিতামাতা বিনশ্বর দেহমাত্র দেন৷ গুরু দীক্ষা দানের দ্বারা যে জন্ম দেন তা অলৌকিক অজর ও অমর৷ বিদ্যালাভ করে যারা গুরুকে মন বা বাক্যের দ্বারা আদর করে না, তাদের ভ্রণহত্যা হতে অধিক পাপ হয়৷ পিতাকে সন্তুষ্ট করলে প্রজাপতি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হন, মাতাকে সন্তুষ্টকারীর পৃথিবীকে পূজা করা হয়৷ গুরুকে যিনি সন্তুষ্ট করেন তাঁর দ্বারা ব্রহ্ম পূজিত হন৷ এজন্য গুরু পিতামাতা হতে পূজ্যতম,গুরুর তুল্য পিতামাতা কেহই নন৷ গুরুসকল পূজিত হলে পিতৃগণের সহিত দেব ও ঋষি প্রীত হন তজ্জন্য গুরু পূজ্যতম৷ তাঁদের অবমাননা করা কর্ত্তব্য নহে। তাঁদের কর্ম্মে দোষারোপ করবে না৷ মহর্ষিগণ গুরুবৃন্দের এরূপ সমাদর অনুমোদন করেন৷ যারা গুরু পিতা মাতাকে মন বা কর্ম্মের দ্বারা পীড়িত করে তাদের ভ্রূণ হত্যা হতেও অধিক পাপ হয়৷ ভরণপোষণের দ্বারা বর্দ্ধিত যে আত্মজ পুত্র পিতামাতার ভরণপোষণ করে না, তার ভ্রূণ হত্যা হতেও অধিকতর পাপ হয়ে থাকে৷ সংসারে তদপেক্ষা পাপকারী আর নাই৷ মিত্রদ্রোহী উপকারীর অনিষ্টকারী স্ত্রী ও গুরু হত্যাকারী অর্থাৎ উভয়ের পীড়নকারী এই চারিজনের ইহ ও পরলোকে কুত্রাপি নিষ্কৃতি নাই৷ মানবের করণীয় যাহা আমি বেদের নির্দ্দেশ মত বললাম৷ এ অপেক্ষা কল্যাণজনক শ্রেষ্ঠ আর কিছু নাই৷ এই শ্রেষ্ঠ ধর্ম্মে যখন গ্লানি উপস্থিত হয়, তখন পিতামাতা ও গুরুভক্তি শিক্ষা দিবার জন্য দেহ ধারণ করে ধর্ম্ম সংস্থাপন করি৷
ব্রজনাথ-গাথা | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩৬.
অন্তর্গত নীল ঢেউ
সমুদ্রকে যারা দূর থেকে দেখে, তারা কেবল তার নীল রং দেখে। যারা সমুদ্রের ভেতরে বাস করে, তারা জানে, সমুদ্রের আসল রং নীল নয়, তা লবণের। আর লবণেরও একটি গন্ধ আছে; সেই গন্ধে মিশে থাকে মানুষের ঘাম, দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অপূর্ণ আলাপ, অদেখা সন্তানের মুখ, মায়ের কপালের ভাঁজ, স্ত্রীর নীরবতা ও কখনও কখনও এমন কিছু কান্না, যার শব্দ জলও শুনতে পায় না। উপকূলের মানুষ বলে, সমুদ্র কাউকে নিজের করে নেয় না। সে কেবল ধার করে রাখে। কেউ এক মাসের জন্য, কেউ ছয় মাসের জন্য, কেউ বা সারাজীবনের জন্য। ফিরিয়ে দেয় কাকে, আর কাকে দেয় না, সে হিসাব তার নিজের। এই কথাগুলো ছোটবেলায় বহুবার শুনেছিল নীলয়। তখন সে বুঝত না। মনে হতো, সমুদ্রও বুঝি গ্রামের বটগাছের মতো—যার কাছে গেলে ছায়া পাওয়া যায়। বড় হতে হতে বুঝল, সমুদ্রের ছায়া নেই। আছে শুধু দিগন্ত, যা যত কাছে যেতে চাও, তত দূরে সরে যায়।
সেই বছর আশ্বিনের শেষে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পরপর তিন রাত মেঘলা একই স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে সে একটি বিশাল সমুদ্র দেখে। সমুদ্রের মাঝখানে অসংখ্য জানালা ভাসছে। কোনও বাড়ি নেই। কোনও দেওয়াল নেই। শুধু জানালা। প্রতিটি জানালার ওপারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে। কেউ কাঁদছে। কেউ গান গাইছে। কেউ হাত নাড়ছে। কিন্তু তাদের কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
তার বাবা ছিলেন জেলে। এক বর্ষার রাতে ট্রলার আর ফিরে আসেনি। তিন দিন পরে ভাঙা জালের সঙ্গে বাবার নামটাই কেবল ভেসে উঠেছিল মানুষের মুখে। শরীর আর পাওয়া যায়নি।
মা তখন বলেছিলেন, ‘সমুদ্র মানুষকে মারে না রে, অপেক্ষা মারে।’
সেই বাক্যটি নীলয়ের বুকের কোথাও পাথরের মতো বসে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষ অদ্ভুত। যে আগুনে একবার পুড়ে যায়, অনেক সময় সেই আগুনের কাছেই আবার ফিরে আসে। সংসারের অভাব, ভাঙা চালের ঘর, মায়ের ওষুধ, কলেজে পড়তে না-পারা সেই সব দিন…! শেষ পর্যন্ত নীলয়ও সমুদ্রকেই বেছে নিল। জেলে নয়। একটি বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ। গ্রামের লোকেরা বলল, ওটা নাকি অনেক নিরাপদ।
নিরাপদ!
শব্দটা শুনে নীলয়ের হাসি পেয়েছিল। যে জায়গায় চারদিকে কেবল জল, সেখানে নিরাপত্তা কাকে বলে? গ্রামটির নাম চরকমলপুর। মানচিত্রে খুঁজলে হয়ত সহজে মিলবে না। বর্ষায় যার অর্ধেক জলে ডুবে যায়, শীতে যার পথ বদলে যায়, সেই গ্রামকে মানচিত্রও ঠিক মত মনে রাখতে পারে না। সেই গ্রামেই থাকত মেঘলা। মেয়েটি জানালা ভালবাসত। তার বাড়ির দক্ষিণমুখো জানালাটি কখনও বন্ধ থাকত না। জানালার ধারে একটি শিউলি গাছ। ভোরে ফুল ঝরে পড়লে সে কুড়িয়ে ছোট্ট পিতলের বাটিতে রেখে দিত। কেউ বলত, সে নাকি অপেক্ষা করতে ভালবাসে। কেউ বলত, সে খুব চুপচাপ। আসলে সে অপেক্ষা করত না। সে জানালার ওপারে পৃথিবীটাকে দেখত। তার বিশ্বাস ছিল, প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি জানালা থাকে। কেউ সেটি খুলে রাখতে জানে, কেউ ইট দিয়ে বন্ধ করে দেয়। নীলয়ের সঙ্গে তার আলাপও এক জানালাকে ঘিরে। পঞ্চায়েতের লাইব্রেরিতে বই ফেরত দিতে গিয়ে প্রথম দেখা। মেঘলা হাতে জীবনানন্দের কবিতা। নীলয় নিচ্ছিল সমুদ্রযাত্রার নেভিগেশন নিয়ে ইংরেজি বই। মেঘলা হেসে বলেছিল—আপনি সমুদ্রের বই পড়েন?
—সমুদ্রে যাচ্ছি।
—তাহলে তো বই পড়ে লাভ নেই। সমুদ্র নিজেই সব বদলে দেবে।
নীলয় অবাক হয়েছিল। এত সহজ কথার মধ্যে এত গভীরতা সে আগে শোনেনি। তারপর কথার পর কথা।
কবিতা থেকে নদী। নদী থেকে সমুদ্র। সমুদ্র থেকে মানুষ। মানুষ থেকে নীরবতা। কোনও প্রেমের ঘোষণা ছিল না। কোনও নাটকীয়তা ছিল না। অথচ দুজনেই বুঝেছিল, এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হচ্ছে।
বিয়ের পরে মেঘলা শহরে যেতে চায়নি। বলেছিল,
—এই জানালাটা ছেড়ে কোথাও যাব না।
নীলয় মজা করে বলেছিল,—জানালার সঙ্গে বিয়ে করলে পারতে।
মেঘলা উত্তর দিয়েছিল,
—মানুষ তো জানালার জন্যই বাঁচে। দরজা দিয়ে সবাই আসে, কিন্তু মানুষ দূরে তাকায় জানালা দিয়েই।
নীলয় তখন হেসেছিল। বহু বছর পরে সে বুঝবে, এই একটি বাক্যই ছিল তাদের দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় সত্য।
প্রথমবার জাহাজে ওঠার দিন ভোরে মেঘলা কোনও কান্না করেনি। কেবল বলেছিল,
–একটা কথা রাখবে?
—কী?
—যেখানেই থাকো, আকাশের দিকে অন্তত একবার তাকাবে। আমিও তাকাব।
—তাতে কী হবে?
—একটা আকাশ তো দু’জনেরই।
নীলয় হেসেছিল। কিন্তু সেই রাতেই, বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে যখন জাহাজ অন্ধকারে ঢুকে গেল, সে সত্যিই মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল, সেই একই আকাশের নিচে মেঘলাও হয়ত এখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
সমুদ্রে সময়ের গতি অন্যরকম। দিনগুলো ক্যালেন্ডারে নয়, ঢেউয়ে মাপে। একদিনের সঙ্গে আরেকদিনের কোনও পার্থক্য থাকে না। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ। লোহা। লবণ। আর অসীম জল। জাহাজের বৃদ্ধ রাঁধুনি ইউসুফ বলত,
—বাবা, এখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মুখটাই ভুলে যায়।
নীলয় হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু তিন মাস পরে একদিন আয়নায় তাকিয়ে সে নিজেই চমকে উঠেছিল। চোখ দু’টো যেন আরও গভীর হয়েছে। মুখে যেন অদৃশ্য লবণের আস্তরণ। এ কি সেই নীলয়? নাকি অন্য কেউ?
এদিকে চরকমলপুরে ঋতু বদলায়। শিউলি ঝরে। কাশফুল ফোটে। ধান পাকে। জানালার ধারে বসে মেঘলা প্রতিদিন একটি করে চিঠি লেখে। কিন্তু সব চিঠি পাঠায় না। কাঠের একটি বাক্সে জমিয়ে রাখে। প্রথম চিঠিতে লিখেছিল, ‘আজ তোমার যাওয়ার পর প্রথম বৃষ্টি হল। জানালায় জল পড়ার শব্দে মনে হচ্ছিল তুমি দরজায় কড়া নাড়ছ। খুলে দেখি—কেউ নেই।’ দ্বিতীয় চিঠিতে লেখে, ‘আজ শিউলি খুব কম ফুটেছে। গাছও বুঝি অপেক্ষা করতে শিখেছে।’
তৃতীয় চিঠিতে কিছুই লেখেনি। শুধু একটি জানালা এঁকেছিল। তার ওপারে একটি ছোট্ট নৌকা।
ডাকপিয়ন হরিপদ একদিন জিজ্ঞেস করল,
—সব চিঠি পাঠাও না কেন?
মেঘলা হেসে বলল,
—সব কথা মানুষের কাছে পৌঁছতে হয় না। কিছু কথা অপেক্ষার কাছেই থাকে। হরিপদ মাথা নাড়ল। সে বুঝল না। কিন্তু গ্রামের বাতাস বুঝেছিল।
সেই বছর আশ্বিনের শেষে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পরপর তিন রাত মেঘলা একই স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে সে একটি বিশাল সমুদ্র দেখে। সমুদ্রের মাঝখানে অসংখ্য জানালা ভাসছে। কোনও বাড়ি নেই। কোনও দেওয়াল নেই। শুধু জানালা। প্রতিটি জানালার ওপারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে। কেউ কাঁদছে। কেউ গান গাইছে। কেউ হাত নাড়ছে। কিন্তু তাদের কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না। শেষ জানালাটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নীলয়।।সে কিছু বলতে চায়। ঠোঁট নড়ে। কিন্তু তার মুখ থেকে জল বেরোয়। তারপর ধীরে ধীরে জানালাটি বন্ধ হয়ে যায়। মেঘলার ঘুম ভেঙে যায়। ভোর হয়ে গিয়েছে। জানালার বাইরে তখন সমুদ্রের দিক থেকে অস্বাভাবিক কালো মেঘ জমছে। দূরে কোথাও যেন একটি অদৃশ্য সাইরেন বাজল। সে জানত না, ঠিক সেই মুহূর্তে হাজার মাইল দূরে, উত্তাল সমুদ্রের বুকের ওপর নীলয়ের জাহাজও প্রথমবারের মতো ঝড়ের সতর্কবার্তা পেয়ে গিয়েছে।
দু’জনের মাঝখানে তখন কেবল নোনাজল। আর সেই নোনাজলের ওপারে, অদৃশ্য এক জানালা, যা এখনও খোলা আছে, কিন্তু কতক্ষণ খোলা থাকবে, তা কেউ জানে না। 🍂 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

দরজা খুলে বাইরে দেখোনা
মুখ নিচু করে বসে আছো যেন কতদিনের দুঃখ তোমাকে
অনেক কষ্ট দিয়েছে
আজ কতদিন পরে দেখতে এসেছি
তোমার ঝলমলে মুখ অবকাশের ঘুম চোখ আর আকাঙ্খা
বাইরের কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি
ডোরবেল বাজিয়ে আছি অপেক্ষায়
তবু কেউ তো দরজা খুলল না
এখন বিকেল গড়িয়ে শীতের অন্ধকার
বিকেল পাঁচটা
আমি যেন দেখতে পেলাম
অবিকল এক ছায়া কত চেনা
হেঁটে দূরে চলে যাচ্ছে
অন্য এক অন্ধকারের দিকে
যেখানে নির্জনতায় একা একা অনেকেই চলে যায়
বহুদিন পর কবিতার মতো সেই সব স্বপ্ন নিয়ে
দু’চার কথা বলার জন্যই এসেছিলাম
জানতে এসেছিলাম
হঠাৎ হঠাৎ এখনো কি আগের মতো দরজা খুলে বাইরে দেখ না
শংকর চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

ভয়
অযথা ভয়ের কাছে হাতজোড় করে বসে আছো
অযথা আকাশ জুড়ে ঘন অন্ধকারে
মুখ লুকোনোর আলো– আঁধারের খেলা
অবাক জ্যোৎস্নায় জমে আছে কত রং
এক হাতে নড়বড়ে ফ্ল্যাগ
অন্য হাতে বিপদের চিঠি দুঃখী রঙে লেখা
নতুন খেলার চৌকো বোর্ড চলো উল্টে দিয়ে আসি
খেলা হোক বিস্ময়ের
খেলতে খেলতে চলো সর্বনাশী অন্ধকারে আলোকিত চাদরের জ্যোৎস্না মেলে দিই।
অমিত কাশ্যপ -এর একটা কবিতা

যাত্রা
যাব বললেই যাওয়া হয় নাকি
হুশ বললেই যদি উড়ে যাওয়া যেত
তোমার সামনে ওই যে পথ পড়ে আছে
দেখ কেমন সামনে এসে দাঁড়ায়
প্রভাত বাবু আসছেন, তুমি কুশল বিনিময় করলে
তার স্মিত মুখ অভি প্রসন্ন হল
তিনি এগিয়ে গেলেন, পথও
উত্তর থেকে পুব কোণ ঘুরতেই অন্য অভিমুখ
আমি দক্ষিণ মুখে উড়ে এসে দাঁড়ায়
পশ্চিমে ডাকি,
কেমন জটলার স্রোত বিভ্রান্তি ছড়ায়,
জটিল এক উৎসব সামনে
দিন-রাত এক করে সমাধান সূত্র খুঁজে চলি।
অংশুমান কর -এর একটি কবিতা

প্রস্তাব
সেই একই বিচ্ছু হাওয়া
সেই একই বুড়ো বুড়ো রোদ
সেই একই কচি ডাব
সেই একই লাল সালু, খাতা
সেই একই এসএমএস
সেই একই চেনা চেনা ফোন
সেই একই মিছিলে পা
সেই একই ‘ছাড়ব না হাল’
এসেছে নূতন তবু
সবই যেন ভীষণ পুরনো…
শোনো কন্যা তুমি পারো
মুহূর্তে রঙিন করতে
যা কিছুই লাগে কালো-ধলো
যদি
দ্বিধা ঝেড়ে ফেলো যদি দাঁতে ঠোঁট চেপে
যে কথা বলোনি আগে
এ বছর সেই কথা বলো…।
ফাল্গুনী চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

শিলং ফাইল/৫২
চাঁদনী তলার মাঠে ঝর্ণা শুয়ে আছে
পাহাড়ের সাড়াশীতে তার চুপবেলা
বেহালায় বুঝি দর্দ রাখলো কেও
ধুয়ে যাওয়া রং এর দীঘিতে পারদ
নেমে আসছে ফের মফলা এর
সূর্যোদয়ে প্রজাপতির ডানা বয়ে আনে
পোত্তরোদ সাজান বাঁশের ছাউনিতে
আদরের লুকোচুপি ভালবাসা পণ
পাইনের পিংলা পথ—- নিঃশ্বাসের পাঠ
মনের জানলায় অসংখ্য নাসপাতি প্লাম
কমলা আর পীচ মাখা বেলার উথলে
পড়া — উপজাতির বস্তি ঘিরে ভালবাসার
নদী বইছে — জাতীয়তাবাদের নির্বিশেষে সোনায় এতো টুকু ও খাদ নেই —।
মোফাক হোসেন -এর একটি কবিতা

কালো জলের কাছে
আমি প্রতিদিন ডুবি
পানি-ডুবকির মতো
কত সযত্নে খোঁড়া কুয়োর কালো জলে,
তবু বিশ্বাস রাখি
জীর্ণ ঘিন্নির দড়িটির ওপর।
এপারে আমি,
ওপারে আমার ঈশ্বর,
মাঝখানে শুধু এক ব্যস্ত সড়ক
বুকের ওপর দিয়ে ছুটে চলে।
তবু গাড়ির কোলাহল
পৌঁছায় না ঈশ্বরের কানে।
তবু জীবন নিজস্ব ছন্দে—
চলন্ত ট্রামের জানালায় গা এলিয়ে,
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে,
গড়িয়ে-পড়া বিকেলের
নির্বিঘ্ন শরীর ছুঁয়ে ফেলে।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
২২.
—হ্যাঁ বাড়ি চিনব না কেন বৌদি, আসলে তখন আমি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম পাশের বাড়ি অখিল দা’কে দেখতে পেয়ে বললাম পুচুকে তোমাদের বাড়িতে দিয়ে দিতে।
সুনয়না যখন কথা বলছিল ওর কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল ওর ভেতরে অনেক কষ্ট। ভেতরটা যন্ত্রণাদীর্ণ।
তোমাদের বাড়ির ওখানে পাস করছিলাম তখন পুচু আমাকে দেখতে পেয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে।
—আমি অনেকবার বললাম যা ভেতরে যা কিন্তু গেটের কাছে এসে দেখলাম গেট বন্ধ।
—সেকি! বেরল কি করে?
—বৌদি আরে একটু বেশি টাকা দেবে আমার খুব দরকার।
—তিথি এবার বুঝতে পারছে হাতি গর্তে পড়েছে।
—আমি তোমাকে টাকা দিতে যাব কেন! তুমি কাজ ছেড়ে দেবে আমি তোমাকে টাকা দেব, তারপর তোমার পিছনে পিছনে ঘুরব।
—না গো আমি কাজ করব।কাজ করব না?
—তুমি কাজ করবে কী করবে না সেটা আমি কি করে জানব বলো।
—না আমি কাজ করব ।বলো তোমার এখন কী কাজ বাকি আছে করে দিয়ে যাই এসেছি যখন। তবে জানো বৌদি একটা ঘটনা ঘটেছে।
নির্ঘাত দুধ দিতে রফিক এসে ছিল সেই ফাঁকে বেরিয়েছে।
—হবে হয়ত বৌদি আমি জানি না।
—একবার আমার সঙ্গে দেখা করে যেতে পারতে।
সুনয়না চুপ করে থাকে।
—কাগজি মাসির কিছু খবর জানো?
—না তো অনেকদিন আগে শুনছিলাম শরীরটা খুব খারাপ তারপর আর কিছু জানি না।
—সোমাদিকে দেখতে পাও।
—হ্যাঁ।
–কেন বলত?
—কাজে আসছে না।
—ওওওও
—ওই দেখ এই মেয়ে-ছেলেটার লজ্জা নেই।
জোরে একটা আঘাতের আওয়াজ আসল
তিথি বুঝল কোনও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে।
সুনয়না আ আ আ করে আওয়াজ করে উঠল।
তিথি সুনয়না সুনয়না কী হল তোমার বলে চিৎকার করে উঠল। ফোন কেটে গেল।
কী অমানুষিক অত্যাচার হচ্ছে। এই কী চেয়েছিল সুনয়না। ভালো
বেসে একটা সংসার চেয়েছিল। স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার করবে। এরকম কত নারীর স্বপ্ন থাকে। কিন্তু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সে খবর ক’জন রাখে! মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে কোনও কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। হঠাৎ বেলবেজে উঠল এ সময় আবার কে আসলো?
পুচু দেখ তো কে এসেছে?শুধু লেজ নাড়লে হবে।
আচ্ছা চল, আমি তোমার সাথে যাচ্ছি তুমি তার দরজা খুলতে পারবে না কিন্তু দরজা খোলা থাকলে বেরিয়ে যেতে পারবে।একবারও মনে পড়ল না আমাদের কত কষ্ট হতে পারে তাই না? বাইরে গিয়ে কী করছিলি? কি দেখছিলি? ভাগ্যিস ওই পিসি ঠাম্মি দেখতে পেয়েছিল না হলে কি যে হতো। কি হতো সোনা মা। আর এভাবে যাবে না কেমন। লেজ নাড়তে নাড়তে চলে গেল। তিথি এত কষ্টের ভেতরও হেসে উঠল। ও কি বুঝল কে জানে?
আবার বেল বেজে উঠল হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ…
—ও বৌমা বৌমা আ…আ…আ…
আর কিছু না হোক মায়ের কানে বেল বাজানোর আওয়াজ দিব্যি পৌঁছে যায়।
কি বলছেন?
—বেল বাজালো কে আসলো?
—ওটা দেখতেই যাচ্ছি মা। জানি না।
—আচ্ছা দেখো কে আসলো।
—সুইটি কি আসবে না নাকি?
—লোক দেখতে হবে তো, ও তো কাজ করবে না বলেই দিয়েছে।
তিথি বলতে বলতে চলে গেল।
গেট খুলতেই দেখল সোমাদি দাঁড়িয়ে। ভুত দেখার মত দেখলো আজ প্রায় ১৫ দিন কামাই।
—কি ব্যাপার গো হঠাৎ করে মনে পড়ল আমাদের।
আসলাম। বলেই ঢুকে পড়ল।
—তা কী ব্যাপার?
কাজ করবে কি, না করবে না?
—কাজ না করলে কি খাব বলো?
—কোথায় কাজ করছ?
তাড়াতাড়ি এসে বসল ও-বৌদি ফ্যানটা একটু চালিয়ে দাও তো।
তিথি মনে মনে ভাবল, কোন মহারানী আসলেন যে উনি!
—না আমি ভাবলাম, তুমি পথ ভুল করে আসলে কিনা।
—তোমরা লোক পেয়েছ?
—চেষ্টা তো চালাচ্ছি, তোমাকে তো বললাম একজন লোক দিয়ে যাও।
—তোমাকে যেমন দিয়ে গিয়েছিল সুনয়না।
—লোক কোথায় পাব গো।
তিথি আর কথা বাড়াল না। এরসাথে আজকাল আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
—তুমি কি তোমার মাইনে নিতে এসেছ।
—হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ।
—এ মাসে ১৫ দিন কাজ করেছ।
—আমরা ঠিকই বলি গো।
আচ্ছা বসো, আমি তোমার মাইনে দিচ্ছি।
—বৌদি আরে একটু বেশি টাকা দেবে আমার খুব দরকার।
—তিথি এবার বুঝতে পারছে হাতি গর্তে পড়েছে।
—আমি তোমাকে টাকা দিতে যাব কেন! তুমি কাজ ছেড়ে দেবে আমি তোমাকে টাকা দেব, তারপর তোমার পিছনে পিছনে ঘুরব।
—না গো আমি কাজ করব।কাজ করব না?
—তুমি কাজ করবে কী করবে না সেটা আমি কি করে জানব বলো।
—না আমি কাজ করব ।বলো তোমার এখন কী কাজ বাকি আছে করে দিয়ে যাই এসেছি যখন। তবে জানো বৌদি একটা ঘটনা ঘটেছে।
—ওপরের ঘরগুলো কিন্তু মোছা হয়নি। বাসন পড়ে রয়েছে।
কল ঘরের দিকে গিয়ে বালতি আর ন্যাতা নিয়ে জল ভরে এবার তিথির সামনে বালতিটা রেখে বলল, শুনেছ?
তিথিও অত্যন্ত কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কি?
—তুমি কিছুই জানো না?
—কি করে জানব বলো, আমার বাড়িতে তো রিপোর্টার নেই!
সোমাদি হেসে গড়িয়ে বলল, —কি যে বলো না।
—কি ভুলটা বলেছি বলো? তবে তিথি মনে মনে ভাবল এর কাছে সুনয়নার খবর আছে। ওটাই শোনানোর জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তিথিও ঘুরিয়ে নাক দেখাচ্ছে।
এবার বললো জানো বৌদি ,আজকে কি মারটাই না মেরেছে সুনয়নাকে।
কি! মেরেছে। কে মেরেছে?
শাশুড়ি, জা!
—আর ওর বর কি করছিল? ভেড়া হয়েছিল?
—আরে বরটা তো এখন ভেড়াই হয়ে গেছে।
কি করে থাকবে মেয়েটা বলো!
তিথির কানে যেন কোনও কথা ঢুকতে চাইল না আপন মনে বলে গেল, সোমাদি
আর তিথি শুধু ভাবতে লাগল ওর অত্যাচারের দুঃস্বপ্নের দিনগুলো রাতগুলোর কথা। আর কতদিন এভাবে মেয়েরা পড়ে পড়ে মার খাবে ঈশ্বর তোমার কি চোখ খুলবে না।
তিথির মনের আকাশ জুড়ে এক দুর্যোগের ঘনঘটা তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঝড়ের পূর্বাভাস। বুঝতে পারছে না কি করবে!🍁 (ক্রমশঃ)
🍂বইপড়া
এই সমর্পণ-ই কবি ও কবিতার মধ্যে এক একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দৃঢ় যোগসুত্র তৈরি করেছে। তাই হয়ত কবির হাহাকারের দিনগুলির যাপন কেবলমাত্র কবিতার সঙ্গেই। কবি কুন্তল লেখেন : ‘কেউ বলে আগুন, কেউ বলে পিঙ্গলবর্ণ, পীতও বলে কেউ কেউ /গাছেদের হলুদপাতা সে-ও তো মৃত্যুর-ই প্রকাশ।’
সত্যির কাছে একজন কবি তাঁর কবি-জীবনের পূর্ণতা ও অপূর্ণতাকেই খুঁজবেন!

সানি সরকার
কবি কুন্তল মণ্ডল-এর ‘মেঘ পিওনের ব্যাগ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি সম্পর্কে একটু তলিয়ে ভাবলে অস্বীকার করার উপায় নেই, কবিতা কবির জীবন-যাপনের অখণ্ডিত সত্যি। এই সত্যির কাছে একজন কবি তাঁর কবি-জীবনের পূর্ণতা ও অপূর্ণতাকেই খুঁজবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কবি কুন্তল এই বইয়ের কবিতাগুলির মধ্যে নিজেকে এক-অন্য স্তরে উন্নীত করেছেন। শোক ও বিষাদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছকে পাঠক প্রত্যক্ষ করতে পারেন। যে গাছ হাজারও যন্ত্রণা নীরবে ধারণ করে স্থির থাকেন।
মুখাগ্নি যে করে, আমি নই।/কেন বারবার তোমরা আমাকে -/ আগুনের কাছে নিয়ে আসো,/কেন লেলিয়ে দিয়ে অযথা ধর্মের কুকুর, বানাতে চাও পিতৃ-মাতৃ হন্তারক? /…/ যে হাত চরণ স্পর্শ করে, ভরা থাক শস্যকুসুমে।/তীর্থ সফল সে হাতে কি বলো কোনো পাপকাজ শোভা পায়?/তবু যদি জ্বালাতেই হয়; সেই ভালো, বরং অন্য কাউকে খুঁজে নিও।/মুখাগ্নি যে করে সে নয় সন্তান।’
কবির সঙ্গে মিলেমিশে একসা হয়ে গিয়ে ‘মেঘ পিওনের ব্যাগ’ -এর কবিতাগুলি পড়তে পড়তে থমকে গিয়েছি; অনেক অনেকবার চূর্ণ বিচুর্ণ হয়েছি, কবিতার সঙ্গে পুড়েছি দাউদাউ আগুনে। কবি কুন্তল লিখেছেন : সুন্দর এত রহস্যময়, আগে কে জেনেছিল? /যখন চিতা সাজানো হয়, হেসে ওঠে চারপাশ। /দুঃখী চিবুক ডুবে থাকে-অন্ধকার, আঠায়।/একটি পরিকল্পিত দৃশ্যের জন্য সময়ের এই রচনা সারাটাক্ষণ—‘…
অথবা, ‘পিতার ভষ্ম নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। /পূর্ব পুরুষের স্মৃতিঘেরা এই মাঠ। মাথার ওপর, অনেক উঁচুতে গোঁ গোঁ শব্দে চলে গেল কপ্টার, /আকাশ মাপতে মাপতে। আমায় নিল না।’
কবি কুন্তল মণ্ডল দীর্ঘ বছর কবিতার সঙ্গে খুব শক্তভাবে জড়িয়ে আছেন। বলা ভাল ও-কবিতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন সম্পূর্ণত-ই। এই সমর্পণ-ই কবি ও কবিতার মধ্যে এক একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দৃঢ় যোগসুত্র তৈরি করেছে। তাই হয়ত কবির হাহাকারের দিনগুলির যাপন কেবলমাত্র কবিতার সঙ্গেই। কবি কুন্তল লেখেন : ‘কেউ বলে আগুন, কেউ বলে পিঙ্গলবর্ণ, পীতও বলে কেউ কেউ /গাছেদের হলুদপাতা সে-ও তো মৃত্যুর-ই প্রকাশ।’ সদ্য পিতৃহারা কবির একাকী কবিতার মধ্যিখানে কলম ঝংকার দিয়ে ওঠে : ‘মুখাগ্নি যে করে, আমি নই।/কেন বারবার তোমরা আমাকে -/ আগুনের কাছে নিয়ে আসো,/কেন লেলিয়ে দিয়ে অযথা ধর্মের কুকুর, বানাতে চাও পিতৃ-মাতৃ হন্তারক? /…/ যে হাত চরণ স্পর্শ করে, ভরা থাক শস্যকুসুমে।/তীর্থ সফল সে হাতে কি বলো কোনো পাপকাজ শোভা পায়?/তবু যদি জ্বালাতেই হয়; সেই ভালো, বরং অন্য কাউকে খুঁজে নিও।/মুখাগ্নি যে করে সে নয় সন্তান।’
কবি কুন্তল মণ্ডল-এর এই কাব্যগ্রন্থটিতে এমন অনেক কবিতা ছড়িয়ে আছে, সেই সমস্ত কবিতাগুলি পাঠককে এক-একটি দৃঢ় সুন্দরের কাছে পৌঁছে দেবে।
বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিপ্লব মণ্ডল।
মেঘ পিওনের ব্যাগ
লেখক: কুন্তল মণ্ডল
প্রকাশক : পাঠক🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।



