সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার রাজনৈতিক পরিসরে বড় আলোড়ন ফেলেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate বা ED) -এর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। বেআইনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) –এর একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে হস্তক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, যেখানে মোট প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা ছিল। পাশাপাশি দলের মোট ১৯টি অ্যাকাউন্টের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত একটি এফআইআর দায়ের হওয়া থেকে। প্রথমে বিধাননগর সাইবার থানার (Bidhannagar Cyber Police Station) হাতে তদন্ত শুরু হয়েছিল। পরে আর্থিক লেনদেনে অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে আসতেই তদন্তভার নেয় ইডি। তদন্তকারীদের দাবি, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহ তৈরি হয় যে, দলীয় তহবিলের কিছু অংশ বেআইনি পথে ঘুরিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই কারণেই এই কঠোর পদক্ষেপ।
তদন্তকারী সংস্থার নজরে এসেছে মোট ১৯টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। এর মধ্যে তিনটিতে বিপুল অঙ্কের টাকা থাকায় সেগুলি আগে ফ্রিজ করা হয়েছে। বাকি অ্যাকাউন্টগুলিও পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়েছে। ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘লেনদেনের ধরণ খতিয়ে দেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’। তদন্ত এগোলে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। মঙ্গলবার সকালে শহরের একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালায় ইডি। ‘কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন’ (Carewell Aviation) নামে একটি সংস্থার অফিস ও সংস্থার ডিরেক্টরের বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়। অভিযোগ, এই সংস্থার অ্যাকাউন্টে দলীয় তহবিল থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেই টাকার সাহায্যে একটি ছোট বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার কেনা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, পরে সেই বিমান ও হেলিকপ্টারই ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করা হত। এই লেনদেনের প্রকৃতি ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। একটি সূত্রের কথায়, ‘টাকার গতিপথ পুরোপুরি বোঝার চেষ্টা চলছে। কোথা থেকে কোথায় গিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে’। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। দলের তরফে জানানো হয়েছে, শুধু তিনটি নয়, আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে বাধা তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই আদালতের কাছে অন্যান্য অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত হলফনামা জমা দিয়ে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে দল। আদালতে এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সুব্রত তালুকদার (Subrata Talukdar) একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উত্থাপন করেন। তিনি জানতে চান, এই মামলায় বিশেষ অফিসার নিয়োগ করা প্রয়োজন কি না। বিষয়টি নিয়ে সব পক্ষের মতামত চাওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, ব্যাঙ্কের তরফে জানানো হয়েছে, তারা মূলত তিনটি অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতেই হলফনামা জমা দিয়েছে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য (Saugata Bhattacharya) -এর এজলাসে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আদালতের নির্দেশের উপরেই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিরোধী শিবির এই ঘটনাকে সামনে রেখে তৃণমূলকে আক্রমণ করেছে। অন্য দিকে, তৃণমূলের তরফে এই তদন্তের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই পদক্ষেপের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় তহবিলের একটি বড় অংশ আপাতত ব্যবহারের বাইরে চলে যাওয়ায় সাংগঠনিক কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে দলীয় নেতৃত্ব এখনও প্রকাশ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ইডি-র পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশ, এই দুইয়ের উপরেই নির্ভর করছে গোটা ঘটনার ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনার দিকে নজর রয়েছে সাধারণ মানুষেরও। কারণ, এত বড় অঙ্কের অর্থ এবং তার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টির চূড়ান্ত রূপ সামনে আসবে না, তবে আপাতত এই ঘটনাই রাজ্যের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee slap Kalighat incident | কালীঘাটে উত্তেজনা চরমে! ভিড় সামলাতে গিয়ে কর্মীকে চড় মমতার




