সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: তিন দশকেরও বেশি পুরনো এক রাজনৈতিক অধ্যায় ফের সামনে এনে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের গুলি-কাণ্ডে বিচার দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে (Suvendu Adhikari) চিঠি পাঠালেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar)। সেই চিঠিতে তিনি অভিযোগ তুলেছেন, তৎকালীন ঘটনায় অভিযুক্তদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর সরকারের আমলে আড়াল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি একাধিক নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরে নতুন করে তদন্তের আর্জি জানিয়েছেন। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কলকাতার (Kolkata) এসপ্ল্যানেড চত্বরে যুব কংগ্রেসের (Youth Congress) কর্মসূচী চলাকালীন পুলিশের গুলিতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে মহাকরণ অভিযান ডাকেন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আন্দোলনই পরবর্তীকালে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়। ঘটনাচক্রে, সেই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারও। দীর্ঘ সময় পরে সেই ঘটনার পুনর্বিচারের দাবি তুলে তিনি বর্তমান সরকারের কাছে সরব হয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে কাকলি একাধিক দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনার ন্যায়বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি।’ তিনি প্রথমত নতুন করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর আবেদন জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) -এর সরকারের আমলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, পুলিশ আধিকারিক এবং আমলাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ধারায় চার্জশিট গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তৃতীয়ত, মমতা সরকারের আমলে গঠিত ২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কাকলির অভিযোগ, ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি পরবর্তীকালে পুরস্কৃত হয়েছেন। সেই প্রসঙ্গে তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত (Manish Gupta) -এর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল, তাঁদেরই পরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।’ এই অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
চিঠিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রাখা হয়েছে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক স্তরের কোনও সংস্থার সহায়তায় তদন্ত সম্পন্ন করার। তাঁর বক্তব্য, ‘এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’ একই সঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ২১ জুলাইয়ের ঘটনার তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশনের প্রধান ছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় (Sushanta Chattopadhyay)। সেই কমিশনের সামনে হাজিরা দিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (Buddhadeb Bhattacharjee)-সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যদিও সেই কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই চিঠির তাৎপর্য আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর একাংশ আলাদা হয়ে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিআই (NCPI)-তে যোগ দিয়েছে। প্রায় ২০ জন সাংসদ এই নতুন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন কাকলি। তার পরেই ২১ জুলাইয়ের ফাইল পুনরায় খোলার দাবি সামনে আনায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা বাড়ছে। এই ইস্যুতে তৃণমূলের দুই অংশের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। একদিকে অতীতের ঘটনাকে সামনে এনে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলছেন কাকলি, অন্যদিকে দলীয় স্তরে এই অভিযোগ খারিজ করার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক সংঘাত ইতিমধ্যেই আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, বহু পুরনো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হওয়া রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ২১ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হয়, যা বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিচার দাবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে নজর রয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই চিঠির পর কী পদক্ষেপ নেন। নতুন তদন্ত শুরু হবে কি না, কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসবে কি না, এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে কাকলির এই পদক্ষেপ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India AI Impact Summit 2026 | AI ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬: ২০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, গ্লোবাল ঘোষণা ও ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোডম্যাপ




