সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, মঙ্গলবার: প্রতি বছর ১ জুলাই দেশজুড়ে পালিত হয় ডাক্তার দিবস (Doctors Day)। এই দিনটি নিবেদিত বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও খ্যাতনামা চিকিৎসক ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় (Bidhan Chandra Roy) -এর স্মৃতিতে। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দুই-ই এই দিনে। আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ গঠনে তাঁর ভূমিকা বহুবার আলোচিত হয়েছে। তবে দেশভাগ-পরবর্তী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তু মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশাসনিক ও মানবিক উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু পরিবার পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার কারণে ঘরছাড়া মানুষের ঢল নামতে থাকে সীমান্তে। সেই সময় পরিস্থিতি ছিল অস্থির ও জটিল। বহু পরিবার সীমান্তে আটকে পড়ে, নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতে বাধ্য হয়। এই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালাতে বাধ্য হন। সেই সময় সরকারি অনুমতির অপেক্ষা না করেই ডাঃ রায় উদ্যোগী হন। জানা যায়, তিনি নিজস্ব ব্যবস্থায় একাধিক চার্টার্ড বিমান ও যাত্রীবাহী স্টিমার পাঠিয়ে ঢাকা (Dhaka), ফরিদপুর (Faridpur) ও বরিশাল (Barisal) থেকে বিপদে পড়া মানুষদের কলকাতায় নিয়ে আসেন। এই উদ্ধার অভিযানের ফলে বহু পরিবার নিরাপদে ভারতে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
শুধু উদ্বাস্তুদের শুধু আশ্রয় দেওয়া না, তাঁদের পুনর্বাসনের জন্যও বিস্তৃত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দফতর গঠন করা হয় তাঁর আমলেই। সরকারি উদ্যোগে শতাধিক ত্রাণ শিবির ও রিফিউজি কলোনি তৈরি করা হয়। বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৩৮৯টির মতো বসতি গড়ে ওঠে, যেখানে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পান বহু মানুষ। কলকাতা শহরে ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে ও দীর্ঘস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে ডাঃ রায় পরিকল্পিত উপনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। নদীয়া জেলার কল্যাণী (Kalyani) শহরটি গড়ে ওঠে মূলত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে। অন্যদিকে, কলকাতার পূর্ব প্রান্তে জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হয় সল্টলেক বা বিধাননগর (Salt Lake/Bidhannagar)। পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলগুলি গুরুত্বপূর্ণ আবাসন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। উদ্বাস্তুদের জীবিকা নিশ্চিত করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্যে ডাঃ রায় কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম (Calcutta State Transport Corporation বা CSTC) গঠন করেন। সেখানে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু যুবককে চালক, কন্ডাক্টর ও মেকানিক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি, সরকারি বিভিন্ন দফতরে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হয়।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছিল একাধিক পদক্ষেপ। উদ্বাস্তু শিবিরে যক্ষ্মা ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যাদবপুর (Jadavpur) ও কাঁচড়াপাড়ায় (Kanchrapara) বিশেষ চিকিৎসাকেন্দ্র ও টিবি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায়। ডাঃ রায়ের এই উদ্যোগগুলি বহু মানুষের জীবনে স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তবে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সব ক্ষেত্রেই সমান ভাবে সফল হয়নি। স্থানসংকুলানের কারণে কিছু উদ্বাস্তু পরিবারকে দণ্ডকারণ্য (Dandakaranya) অঞ্চল এবং রাঢ়বঙ্গের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে অনেকেই সমস্যার সম্মুখীন হন। সেই সময় এই বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধও তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান দিনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সীমিত সম্পদ এবং বিরাট জনস্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন বিধান চন্দ্র রায়। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর পরিচিতির পাশাপাশি একজন প্রশাসক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডাক্তার দিবসে তাঁকে স্মরণ করে বিভিন্ন মহল থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। চিকিৎসক সমাজ থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্র সর্বত্রই তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইতিহাসের সেই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, কঠিন সময়ে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত কতটা প্রভাব ফেলতে পারে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suchitra Sen Bidhan Chandra Roy | বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে সুচিত্রার ‘না’ ভাঙে, মহানায়িকা নিয়েছিলেন ১০০১ টাকা




