সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২১ জুন: আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষ্যে এ বছর কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোড যেন এক বিশাল যোগমঞ্চে পরিণত হল। সকাল হতেই শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজার হাজার মানুষ। দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে ঘিরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi), যিনি নিজেও সক্রিয়ভাবে যোগাভ্যাসে অংশ নিয়ে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন।
শনিবার রাজ্য সফরে পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছনোর পর রবিবার ভোরেই রেড রোডে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী। তার আগে হুগলির তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং রাত কাটান লোকভবনে। রবিবারের এই বিশেষ দিনে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari), রাজ্যপাল আর এন রবি (R N Ravi) এবং প্রশাসনের একাধিক শীর্ষকর্তা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী উভয়েই বক্তব্য রাখেন। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং শারীরিক সমস্যার প্রেক্ষাপটে যোগের গুরুত্ব নিয়ে তাঁরা আলোকপাত করেন। এরপর শুরু হয় সমবেত যোগাভ্যাস। প্রধানমন্ত্রীকে কখনও পদ্মাসনে বসে, কখনও দাঁড়িয়ে বিভিন্ন আসন করতে দেখা যায়। তাঁর অংশগ্রহণে উপস্থিতদের মধ্যে আলাদা উদ্দীপনা তৈরি হয়। যোগাভ্যাসের পর প্রধানমন্ত্রী নিজে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ঘুরে তাঁদের অনুশীলন লক্ষ্য করেন। কোথাও ভঙ্গির ত্রুটি চোখে পড়লে তা সংশোধন করতেও দেখা যায় তাঁকে। এই সময় তিনি বলেন, ‘যোগ কেবল শরীরচর্চা নয়, এটি জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি।’ তাঁর এই সরাসরি অংশগ্রহণ বহু মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
এ বছরের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘Yoga for Healthy Ageing’। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যোগ এমন একটি চর্চা যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত অভ্যাস মানুষকে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম রাখে।’ তিনি আরও জানান, যোগ কোনও নির্দিষ্ট বয়সের জন্য নয়, বরং সকলের জন্যই উপযোগী।নিজের বক্তব্যে তিনি স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda), ঋষি অরবিন্দ (Sri Aurobindo) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)-এর নাম উল্লেখ করেন। তাঁদের চিন্তা ও দর্শনের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতির যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি তৈরি হয়েছে, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, আর যোগ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
এই বৃহৎ আয়োজনকে কেন্দ্র করে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বড় স্ক্রিন বসানো হয়, যেখানে রেড রোডের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। বহু মানুষ সেই স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে যোগাভ্যাসে অংশ নেন। ফলে গোটা শহর জুড়ে একযোগে এই দিবস উদ্যাপনের ছবি ধরা পড়ে। শুধু কলকাতাতেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও পালিত হয় আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। হুগলির ইমামবাড়া, চন্দননগরের পুলিশ লাইনস এবং চুঁচুড়ার বঙ্কিম নিবাসে ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়। চন্দননগরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এভারেস্টজয়ী পিয়ালী বসাক (Piyali Basak)। অন্যদিকে গঙ্গাসাগরের কপিল মুনির আশ্রমে প্রায় তিন হাজার মানুষ একসঙ্গে যোগচর্চায় অংশ নেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের কর্তা অভিষেক তিওয়ারি (Abhishek Tiwari)।
প্রধানমন্ত্রী সমাজমাধ্যমেও এই আয়োজন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, ‘কলকাতার রেড রোডে আজকের আয়োজন ছিল অনন্য। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ যোগচর্চার বিস্তারকে নতুন গতি দেবে।’ তাঁর মতে, সুস্থ জীবনধারার জন্য যোগের গুরুত্ব আজ আরও বেশি। দেশের অন্যান্য প্রান্তেও এই দিনটি নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে। গুয়াহাটিতে নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman), আহমেদাবাদে অমিত শাহ (Amit Shah), বিকানেরে অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw), দিল্লিতে এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar) এবং মেঘালয়ে রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) যোগাভ্যাসে অংশ নেন। ফলে জাতীয় স্তরেও এই দিনটি ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।
কলকাতার রেড রোডের এই আয়োজনকে ঘিরে রাজনৈতিক এবং সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের বৃহৎ পরিসরের যোগ দিবস উদ্যাপন আগে খুব একটা দেখা যায়নি। তাই এবারের অনুষ্ঠান একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল। বর্তমান সময়ে অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং শারীরিক সমস্যার মধ্যে মানুষ ক্রমশ বিকল্প পথ খুঁজছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যোগ আবারও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। রেড রোডের এই বিশাল আয়োজন সেই প্রবণতারই প্রতিফলন হিসেবে সামনে এল।
ছবি : সংগৃহীত



