Sasraya News Sunday’s Literature Special | 21 June 2026, Issue 115 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ২১ জুন ২০২৬, সংখ্যা ১১৫। রবিবার

SHARE:

ম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক যোগ দিবস : প্রাচীন ভারতের জ্ঞানধারা, বর্তমান প্রেক্ষিত

প্রতি বছর ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে অনন্য সাংস্কৃতিক ও স্বাস্থ্যচেতনার অনুশীলন সামনে আসে। এই উদযাপন কিন্তু দীর্ঘ ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ, যার শিকড় প্রাচীন ভারতের গভীরে প্রোথিত। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ ও শারীরিক সমস্যার ভিড়ে দাঁড়িয়ে যোগচর্চা এই সময় নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অপরদিকে, যোগের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত থাকলেও, সাধারণভাবে মনে করা হয় যে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই এর প্রাথমিক রূপের অস্তিত্ব ছিল। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে যে ধ্যানমগ্ন মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তা যোগের প্রাচীনতার দিকেই ইঙ্গিত করে। পরবর্তী সময়ে পতঞ্জলির ‘যোগসূত্র’ এই শাস্ত্রকে সুসংহত রূপ দেয়। সেখানে যোগকে শরীরচর্চা হিসেবেই না, মন, বুদ্ধি ও আত্মার সমন্বিত সাধনা হিসেবে দেখা হয়েছে।

প্রাচীন ভারতে যোগ ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ঋষি-মুনিরা এটিকে আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মোন্নয়নের পথ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের কাছে যোগ মানে ছিল আত্মার সঙ্গে বিশ্বচেতনার মিলন। এই ভাবনার মধ্যে দার্শনিক গভীরতা রয়েছে, যা আজকের বৈজ্ঞানিক যুগেও প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত যোগচর্চা মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে ও শারীরিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রবলভাবে সক্ষম।

২০১৪ সালে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ঘোষণা করার পর এই প্রাচীন ভারতীয় সাধনার প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন দেশে বৃহৎ পরিসরে যোগাভ্যাসের আয়োজন করা হয়, এবং নানা বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। আবার যোগ একদিকে যেমন ভারতীয় সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে, তেমনি অন্যদিকে একটি সুস্থ জীবনযাপনের পথও দেখিয়েছে। তবে এই প্রসারে কিছু প্রশ্নও উঠে আসে। যোগ কী শুধুই শরীরচর্চার একটি পদ্ধতি? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে গভীরতর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্য? আধুনিক সময়ে যোগকে অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘ফিটনেস ট্রেন্ড’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এতে করে এর মূল ভাবনা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। প্রাচীন গ্রন্থাদিতে যোগের যে আটটি অঙ্গের কথা বলা হয়েছে তা হল : যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। তার মধ্যে বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল আসন ও প্রাণায়ামের দিকেই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। যোগের শারীরিক উপকারিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর মানসিক ও নৈতিক দিকগুলিও সমানভাবে বিবেচ্য। প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানধারার এই অনন্য সম্পদকে যদি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হয়, তবে তার সামগ্রিক রূপটিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য বরাবরই সমন্বয়-এর ওপর জোর দিয়েছে। যোগ তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে শরীর ও মনের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই, বরং স্পষ্ট আছে পারস্পরিক সহযোগিতা। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বের মধ্যে এই সমন্বয়ের ভাবনা নতুন করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মানুষ প্রযুক্তির দৌলতে একদিকে যেমন সংযুক্ত, অন্যদিকে তেমনি মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় যোগচর্চা এক ধরনের অভ্যন্তরীণ স্থিতি এনে দিতে পারে।

কিন্তু, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস গভীর সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার। প্রাচীন ভারতের এই জ্ঞানধারা আজকের বিশ্বে নতুন অর্থে ফিরে আসছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সুস্থতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি অন্যদিকে মানুষের অন্তর্গত শান্তি ও সামঞ্জস্যের খোঁজও জোরদার হচ্ছে। আবার মনে রাখতে হবে যে, যোগ শুধু অতীতের গৌরব অবশ্যই তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক। তবে এর প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা ও গভীর অনুধাবন। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস সেই অনুধাবনেরই একটি উপলক্ষ্য, যা আমাদের প্রাচীন শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের কথা

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
পিতা গার্হপত্য অগ্নি, মাতা দক্ষিণ অগ্নি এবং গুরু আহবনীয় অগ্নিস্বরূপ, পিতা মাতা ও গুরুদেবের পূজার দ্বারা অগ্নিত্রয়ের পূজা করা হয়৷ তজ্জন্য তাঁরা অগ্নিত্রয় হতে গরীয়ান, অপ্রমত্তভাবে এ তিন জনের সেবা করলে তিনলোক জয়ে সমর্থ হবে৷ পিতার সেবায় পরলোক, মাতার সেবায় ইহলোক এবং গুরুর সেবার দ্বারা ব্রহ্মলোক অবশ্যই জয় করতে পারবে৷ হে ভারত! উত্তমরূপে এঁদের সেবা পূজা কর তাহা হইলে তিনলোকে যশঃ মঙ্গল ধর্ম্ম ও সুমহৎ ফললাভ করবে ৷ কখন এঁদের শয়নের পূর্ব্বে শয়ন, ভোজনের আগে ভোজন অথবা দোষ কীর্ত্তন করবে না৷ তাই-ই উত্তম সুকৃত, তার দ্বারাই তুমি কীর্ত্তি পুন্য ও উত্তম লোক সকল পাবে৷ যিনি এ তিন জনকে আদর করেন, তাঁর দ্বারা সমস্ত ধর্ম্ম আদৃত হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি এঁদের অনাদর করে তার সমস্ত কর্ম্ম নিষ্ফল হয়, ইহ ও পরলোকে মঙ্গল হয় না ৷ আমি যে কর্ম্ম করি বা যা উপার্জ্জন করে থাকি, সে সকল তাঁদের নিবেদন করি, সে জন্য আমার তা শত সহস্র গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তজ্জন্য আমার নিকট তিন লোক প্রকাশিত হয়েছে৷

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি :  সংগৃহীত

আমি মনে করি— মন্ত্রদাতা গুরু, পিতামাতা হতে গুরুতর, যেহেতু মাতাপিতা কেবল জন্মের কারণ, কারণ পিতামাতা বিনশ্বর দেহমাত্র দেন৷ গুরু দীক্ষা দানের দ্বারা যে জন্ম দেন তা অলৌকিক অজর ও অমর৷ বিদ্যালাভ করে যারা গুরুকে মন বা বাক্যের দ্বারা আদর করে না, তাদের ভ্রণহত্যা হতে অধিক পাপ হয়৷ পিতাকে সন্তুষ্ট করলে প্রজাপতি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হন, মাতাকে সন্তুষ্টকারীর পৃথিবীকে পূজা করা হয় ৷ গুরুকে যিনি সন্তুষ্ট করেন তাঁর দ্বারা ব্রহ্ম পূজিত হন ৷ এজন্য গুরু পিতামাতা হতে পূজ্যতম, গুরুর তুল্য পিতামাতা কেহই নন৷ গুরুসকল পূজিত হলে পিতৃগণের সহিত দেব ও ঋষি প্রীত হন তজ্জন্য গুরু পূজ্যতম৷ তাঁদের অবমাননা করা কর্ত্তব্য নহে৷ তাঁদের কর্ম্মে দোষারোপ করবে না ৷ মহর্ষিগণ গুরুবৃন্দের এরূপ সমাদর অনুমোদন করেন ৷ যারা গুরু পিতা মাতাকে মন বা কর্ম্মের দ্বারা পীড়িত করে তাদের ভ্রূণ হত্যা হতেও অধিক পাপ হয় ৷ ভরণপোষণের দ্বারা বর্দ্ধিত যে আত্মজ পুত্র পিতামাতার ভরণপোষণ করে না, তার ভ্রূণ হত্যা হতেও অধিকতর পাপ হয়ে থাকে ৷ সংসারে তদপেক্ষা পাপকারী আর নাই। মিত্রদ্রোহী উপকারীর অনিষ্টকারী স্ত্রী ও গুরু হত্যাকারী অর্থাৎ উভয়ের পীড়নকারী এই চারিজনের ইহ ও পরলোকে কুত্রাপি নিষ্কৃতি নাই৷ মানবের করণীয় যাহা আমি বেদের নির্দ্দেশ মত বললাম। এ অপেক্ষা কল্যাণজনক শ্রেষ্ঠ আর কিছু নাই ৷ এই শ্রেষ্ঠ ধর্ম্মে যখন গ্লানি উপস্থিত হয়, তখন পিতামাতা ও গুরুভক্তি শিক্ষা দিবার জন্য দেহ ধারণ করে ধর্ম্ম সংস্থাপন করি ৷ (*বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত) 

ব্রজনাথ-গাথা | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস | ১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

৩৩. 

যে নীরবতা নাম ধরে ডাকে 

শীত এ বছর যেন একটু অন্যরকম। কুয়াশা শুধু মাঠ-ঘাট ঢেকে রাখছে না, মানুষের ভেতরের অপ্রকাশিত কথাগুলোকেও আড়াল করে দিচ্ছে। ভোরবেলা জানালা খুললেই বেল্লার মনে হয় পৃথিবীটা যেন অর্ধেক দৃশ্যমান, অর্ধেক অদৃশ্য। দূরের গাছগুলোকে দেখে মনে হয় তারা আছে, অথচ পুরোপুরি নেই। এই অনুভূতিটা তার নিজের জীবনের মতো। আগে সে ভাবত তার সমস্যাটা শরীর। তারপর মনে হয়েছিল তার সমস্যাটা অন্য মানুষের দৃষ্টি। এখন ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করেছে, তার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা ছিল নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক।

নিজেকে সে কখনও বন্ধু হিসেবে ভাবেনি। নিজেকে সে বিচার করেছে। নিজেকে সে মাপজোখ করেছে। নিজেকে সে অস্বীকার করেছে। আর সেই অস্বীকারের ভিতরেই ধীরে ধীরে জমেছে ভয়।আজকাল সে খাতায় লিখতে বসলে এই কথাগুলো বারবার ফিরে আসে। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল সে। আগের মতো দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়নি। অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তার মুখটা বদলায়নি। চোখও একই আছে। চুল একইভাবে কপালের উপর নেমে আসে। তবু কিছু একটা বদলেছে। দৃষ্টিটা। নিজের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটা। মায়ের ডাক শুনে সে চমকে উঠল।
—বেল্লা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মায়ের গলায় আজকাল আগের মতো বিরক্তি নেই। আছে ক্লান্তি। আর তার নিচে লুকিয়ে থাকা একধরনের উদ্বেগ। মেয়েকে নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তা করেন। কিন্তু সেই চিন্তার ভাষা খুঁজে পান না। ফলে উদ্বেগ অনেক সময় উপদেশ হয়ে বেরোয়, কখনো সমালোচনা হয়ে বেরোয়, কখনও অকারণ রাগ হয়ে।
বেল্লা আজ প্রথমবার মায়ের দিকে একটু অন্যভাবে তাকাল। হঠাৎ মনে হলো, মা-ও হয়তো সুখী নন। মা-ও হয়ত কোনও দিন নিজের শরীর, নিজের জীবন, নিজের স্বপ্ন নিয়ে বিচার্য হয়েছেন।

 

তিতাসকে কি সত্যিটা বলা উচিত? মানুষ কি নিজের জন্মের ইতিহাস জানার অধিকার রাখে না? আবার, সব সত্যি কি মানুষকে মুক্তি দেয়? কিছু সত্যি ভেঙেও দেয়। এই দ্বন্দ্ব তাকে আজকাল ঘুমোতে দেয় না। সোমদত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে বিষয়টা আরও জটিল হয়েছে। কারণ অতীত এখন আর শুধু অতীত নেই। সে বর্তমানের দিকে হাঁটছে। ধীরে ধীরে। অপরিহার্যভাবে ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

হয়ত সেই উত্তরাধিকারই অজান্তে মেয়ের দিকে চলে এসেছে। এই ভাবনাটা তাকে অদ্ভুতভাবে নরম করে দিল। স্কুলে পৌঁছে সে দেখল মাঠের ঘাসে এখনও শিশির লেগে আছে। সকালের আলো তির্যকভাবে পড়েছে। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় সে অনুভব করল, আগের মতো সবার চোখ তাকে অনুসরণ করছে বলে আর মনে হচ্ছে না। হয়তো মানুষ বদলায়নি। বদলেছে তার উপলব্ধি। যে ভয় ভেতরে থাকে, সে বাইরের পৃথিবীকেও ভয়ঙ্কর করে তোলে। তৃতীয় পিরিয়ডের আগে লাইব্রেরিতে ঢুকল সে। লাইব্রেরি তার কাছে সবসময় আশ্রয়ের মতো ছিল। বইয়ের তাকগুলো যেন মানুষের চেয়ে কম বিচার করে। ভেতরে ঢুকেই সে ঋত্বিককে দেখতে পেল।

ছেলেটা জানালার ধারে বসে আছে। তার সামনে খোলা একটা বই। কিন্তু চোখ বইয়ে নেই। বাইরে। কুয়াশা ভাঙা আলোয়। বেল্লাকে দেখে সে মাথা তুলল। একটা ছোট্ট হাসি। এই হাসিটা খুব সাধারণ। তবু বেল্লার বুকের মধ্যে যেন হালকা উষ্ণতা ছড়িয়ে গেল।
—আজও লিখেছ?
প্রশ্নটা শুনে সে অবাক হল না। এখন এই প্রশ্নটাই যেন তাদের মধ্যে অভিবাদনের জায়গা নিয়েছে।
—হ্যাঁ।
—কী নিয়ে?
—জানি না।
ঋত্বিক হেসে বলল, যারা সত্যি লেখে, তারা সবসময় জানে না তারা কী নিয়ে লিখছে। কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বেল্লা নিজেই জিজ্ঞেস করল,
—তুমি?
—আমিও লিখি মাঝে মাঝে।
—কবিতা?
—না। অসমাপ্ত বাক্য।
বেল্লা অবাক হয়ে তাকাল। ঋত্বিক বলল,
—আমার মনে হয় মানুষ আসলে পুরো বাক্যে বাঁচে না। সবাই অসমাপ্ত।
এই কথাটা শুনে বেল্লার মনে হল, ছেলেটা যেন তার নিজের কোনো অচেনা চিন্তাকে উচ্চারণ করল। তারা অনেকক্ষণ বসে রইল। কথা খুব কম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই কম কথার মধ্যেই একটা গভীরতা আছে। কিছু সম্পর্ক আছে যাদের শুরু শব্দ দিয়ে হয় না। শুরু হয় মনোযোগ দিয়ে। শুরু হয় কাউকে বিচার না করার ক্ষমতা দিয়ে। স্কুল ছুটির পর তারা মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটছিল।

সূর্য নামছে ধীরে ধীরে। শীতের বিকেলের আলো পৃথিবীকে সবসময় একটু বিষণ্ণ করে দেয়। ঋত্বিক হঠাৎ বলল, তুমি কি কখনো কাউকে সব কথা বলেছ? বেল্লা থেমে গেল। প্রশ্নটা সহজ না। সে ভেবে বলল, না।
—কেন?
—ভয় পাই।
—কীসের ভয়?
—মানুষ বদলে যাবে।
ঋত্বিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—হয়ত।
—হয়ত?
—হ্যাঁ। কিছু মানুষ বদলে যায়। কিছু মানুষ যায় না।বেল্লা তাকিয়ে রইল।
—আর যদি চলে যায়?
— তাহলে সে থাকার মতো মানুষ ছিল না।
কথাটা খুব সরল। তবু তার ভিতরে একধরনের নির্মম সত্যি আছে। সেদিন বাড়ি ফিরে বেল্লা অনেকক্ষণ খাতা নিয়ে বসে ছিল। তারপর লিখল,
—আমি সবসময় ভেবেছি মানুষ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আজ ভাবছি, যারা চলে যায়, তারা কি সত্যিই কখনও ছিল?
কলম থেমে গেল। সে বুঝতে পারল, তার লেখা বদলাচ্ছে। আগে লেখাগুলো শুধু যন্ত্রণার ছিল। এখন সেখানে প্রশ্ন আছে। ভাবনা আছে। আলোও আছে।

অন্যদিকে সেই রাতেই দিশা মিত্র নিজের ঘরে একা বসেছিল। তিতাস পাশের ঘরে। পড়ছে। হয়ত গান শুনছে। হয়ত নিজের কোনও পৃথিবীতে ডুবে আছে। দিশা জানে না। মায়েরাও সব জানে না। বরং অনেক সময় সবচেয়ে কাছের মানুষটাই সবচেয়ে অজানা থেকে যায়। তার সামনে খোলা ডায়েরি। বহু পুরোনো। পাতাগুলো হলদে। কালির দাগ ছড়িয়ে গেছে।কিন্তু কিছু বাক্য এখনও তীক্ষ্ণ। “একটা জীবন ভুল হতে পারে না।” লাইনটা আবার চোখে পড়ল। দিশার বুকের ভেতর কেমন টান লাগল। সে কি ঠিক করেছিল?
এত বছর পরে দাঁড়িয়ে এখনও কি সে একই উত্তর দেবে?
হ্যাঁ।
দেবে।
তবু প্রশ্ন অন্য জায়গায়।
তিতাসকে কি সত্যিটা বলা উচিত? মানুষ কি নিজের জন্মের ইতিহাস জানার অধিকার রাখে না? আবার, সব সত্যি কি মানুষকে মুক্তি দেয়? কিছু সত্যি ভেঙেও দেয়।
এই দ্বন্দ্ব তাকে আজকাল ঘুমোতে দেয় না। সোমদত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে বিষয়টা আরও জটিল হয়েছে। কারণ অতীত এখন আর শুধু অতীত নেই। সে বর্তমানের দিকে হাঁটছে। ধীরে ধীরে। অপরিহার্যভাবে ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। দিশা প্রথমে ধরতে চাইল না। তারপর ধরল। ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর এক পুরুষ কণ্ঠ। ক্লান্ত। বয়সের ভারে বদলে যাওয়া।
— হ্যালো… দিশা?
দিশার বুকের মধ্যে হঠাৎ বরফের মতো কিছু নেমে গেল। এই কণ্ঠ। এত বছর পরেও সে চিনতে পারল। রণজয়। কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ বেরোল না। সময়ের একটা অংশ যেন হঠাৎ ভেঙে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
— তুমি?
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর, হ্যাঁ।
দিশার মনে হল, পৃথিবীর সব শব্দ হঠাৎ দূরে সরে গেছে। সে শুধু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। রণজয় ধীরে বলল, তোমার সঙ্গে কথা বলা দরকার।
—এত বছর পরে?
—জানি।
—এখন কেন?
আবার নীরবতা। তারপর খুব আস্তে, কারণ আমি আর পালাতে পারছি না।
দিশার ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসি এল। ব্যথার হাসি।
—পালাতে তোমার অনেক সময় লেগেছে।
ওপাশে কোনও উত্তর নেই। শুধু শ্বাসের শব্দ। দিশা জানে না ফোনটা কেটে দেবে কি না। সে জানে না এই কথোপকথনের প্রয়োজন আছে কি না। কিন্তু সে এটুকু জানে, যে গল্পকে সে মৃত ভেবেছিল, সেই গল্প এখনও বেঁচে আছে। আর দূরে কোথাও, অন্য এক বাড়িতে।
সোমদত্তা একটি পুরোনো ফাইল খুলে বসে আছেন। ফাইলের ভেতরে কলেজ জীবনের কিছু ছবি। কিছু নথি। কিছু স্মৃতি। একটি ছবিতে রণজয় দাঁড়িয়ে। তরুণ। আত্মবিশ্বাসী। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত। সোমদত্তা দীর্ঘক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, তুমি কি ফিরছ, রণজয়? জানালার বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। কিন্তু কুয়াশারও একটা সীমা আছে। তার ওপারে অপেক্ষা করে দৃশ্যমান পৃথিবী। ঠিক তেমনই, বহু বছর ধরে লুকিয়ে থাকা সত্যিগুলোও ধীরে ধীরে আলোয় উঠে আসে। আর সেই আলো সবসময় উষ্ণ হয় না। কখনও কখনও সে আলোই মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার শুরু। 🍁

 

 

মানস অধিকারী -এর একটি কবিতা 

যতনা 

অন্ধকার যত গভীর হয়
তত কাছে আসে ভোর
ভাঙা স্বপ্নের মাঝেও
জাগে নতুন কোনো ঘোর।

একটু আশা, একটু আলো
মানুষ বুকে রাখে,
তাই তো জীবন হাজার ব্যথা
নিয়ে আবার হাঁটে।

 

 

কেয়া চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

প্রতিজ্ঞা

সব পথের হারিয়ে ফেলেছি
এখন ঈশ্বর ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না।

পড়ে যাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানো
দিনের ভিতর রাত রাতের ভিতর আবার দিন—

তাঁর কাছেই আমরা মাথা ঝুঁকই
সব অলৌকিকতার আবরণ সরিয়ে
তিনি হঠাৎই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান

পুরনো চিহ্নগুলি মাটিতে পড়ে থাকে
আমরা আবার শৈশবের মতো কাঁপা পায়ে হাঁটি
হাতের উষ্ণতা ধরে নতুন পথ চিনে নিই।

আমি তো আমার না!

 

চঞ্চল দেবনাথ -এর একটি কবিতা

অপেক্ষা ও অবশেষ

আবার কবে চলে গিয়েছিলে-
ভাঙা আয়নায় লেখা আছে তা।
শেষ বিদায় হয়েছিল দৃষ্টিহীন শব্দ ব্যয়ে,
তাই চোখের ঠিকানা লিখে দিয়েছিলাম
তোমার অজ্ঞাত শহরে।

এখন আমার ঘর বলতে
একটা ফোকলা চেয়ার,
জরাগ্রস্ত টেবিলের পায়া।
জানালার কাচে পুরোনো লতার লুডোখেলা।

পেরেকে ঝুলে গেছে বিকৃত সময়।

ঘরের উষ্ণতা
আমাকে ছাড়িয়ে গেছে সেই কবে-
ভেতরে এখন
পাহাড় চাষের মহড়া।

পরিত্যক্ত কিছু অভ্যাস ছাড়া
তোমার আর কিছুই
অবশিষ্ট নেই আমার কাছে।
সেগুলো বালিশের ভাঁজে, চাদরের কোণে
ঝাঁঝালো হয়ে লেগে আছে।
আমি তাদের বিনিময়ে হলেও
আবার ঘুমাতে চাই।

 

যতন কুমার দেবনাথ -এর একটি কবিতা

নিজস্ব দুপুর 

ঠিক নেই ক্ষণ। বদলে যায় দিন- প্রতিদিন

পালা করে কালা সেজে পাহারা দেই ক্ষেত
খয়বর চাচার খুঁড়িয়ে চলা সংসার

ধারের ধারে ফালি ফালি সুখ

মুখ ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দ্যায় প্যাচাল ফজর আলী
কার বেটি পালিয়েছে। ধরা খেয়েছে কার বউ

আমি তখন হাসির সরতা দিয়ে গড়পড়তা কেটে
বিছিয়ে দেই নিজস্ব দুপুর।

 

শতদল আচার্য -এর একটি কবিতা

গল্প নয়, অন্য কথা 

বন্ধু তোমার কথাই বলে বলে
জড়িয়ে কটা বছর
ভালবাসা– মায়া
নামল আমার চোখে
বয়স যখন গড়িয়ে যায়,
কেবল মায়াই থাকে।
শরীরের স্বাদ তো খুঁজে নি।
হ্যা তোমার কথাই লিখেছি
ভূগোল ইতিহাস না জেনে
ভালবাসার সাঁতার দিতে দিতে
এক আকাশ ভাবনা ভাবি।

এ শহর ও জানে
প্রতিটা গলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে
হেঁটে হেঁটে একা
অবিরত এক বিষাদ জড়তায়।

এ শহর সব জানে
নদীরও বাঁক ঘুরে ফিরে আসে
তুমি সেন্ট্রাল রোড ছুঁয়ে
ডান বাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে
চিনিয়ে দিলে সুখ-দুঃখ ।

আমায়
সবাই বলে উঠল দুঃখে আছি
দুঃখের সাথে পরিচয়।
সবাই বলে দিল
সুখে আছি
সুখের সাথে দেখা
তুমি ও বলে দিলে
সুখে আছি
আমি জেনে গেলাম
সুখে আছি, তোমার সাথে আছি।

মাঝে মাঝে কবিতার মত বিকাল
একটা বিকাল
তুমি আসবে জেনে ভালো থাকাই সুখ
তুমি এলেও না।

বন্ধু একটু সময় গড়িয়ে গেলে আনন্দ।
কত দীর্ঘ পথ হেঁটে বাড়ি ফিরা
সবাই ফিরে একদিন বাড়ি
একটা বিকালের ভাবনায়
কত সুখি হয়ে উঠে।
সুখ আর সুখের জন্য যুদ্ব ।
যুদ্ব সুখ দেয় না
তবু পৃথিবীর মানুষ যুদ্ব চায়
সুখের জন্য
সমস্ত পৃথিবী জুড়ে যুদ্বের গল্প ।
সমস্ত ইতিহাস জুড়ে যুদ্বের কথা
এত যুদ্বের পর শান্তি এলো না
এত যুদ্বের পর ও
এখনোও শান্তি নেই
পৃথিবী জুড়ে আরোও যুদ্বের আয়োজন।

বন্ধু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে
আমার পথ ছোট হয়ে আসছে
বুঝি না
কতটুকু ভালবাসলে
তোমার হওয়া যায়।
কতটুকু বাঁধনে মুক্ত হয় মন।
একদিন চলে যাবার আগে
আমার সব দোষ গুণের
জানা অজানা সমস্ত কথার
জানালা খুলে দিবো।
সেদিন ঘৃণায় মুখ ফিরাবে
নয়তো বেঁচে থাকার সমস্ত কাল
আমার গল্প থাকবে
তোমার কাছে।

এসব নিয়ে অনুভবে
আলো রেখা খুঁজি
পাখিরা যখন খুঁজে ফিরে যায় বাড়ী
আমি তখন বাড়ী খুঁজি
কোন শান্তির রেখাপাত নেই
ঘুম কেবলই ঘুম
শান্তির ছবি আঁকে দিয়ে যায়।
বাড়ী ফিরলেই কি?, বাড়ীতে থাকা হয়।

এত ভালবাসার ছবি দিয়ে
আয়োজন সমারোহে
ঘুরে ফিরে তাকানো
কাছে এসো
অলৌকিক আলো পড়ছে মনে
এতটাই হয়তো সুখ।
কতটা দীর্ঘ পথ জ্বালিয়ে রেখে
চলছে মন।
আলোর এত আয়োজন
তবে কেন চলে যায়
তোমার না আসা গান হয়ে নামে
তোমাকে দেখায়, আলো জ্বলে মনে

সব আয়োজনে আয়োজনে
শূন্য হোক
মনের গান
মন হোক একা
স্বাবলম্বী।

তারপর ও থাকুক না
ভালবাসা
তোমার উপর।

 

নীলাদ্রি ভট্টাচার্য -এর একটি কবিতা

কবেকার কিছুক্ষণ 

উঠোনের রোদে,ভরভরন্ত শীতে গুছিয়ে রাখা যোগাযোগহীন দুজনের একসময়।

একেরপর এক মরে যাওয়া গোলাপী কথা

মধ্যাহ্ন নিবিড় কবেকার দৃশ্যের হাততালি
হাওয়ার যাত্রা
দূরে সরে যাওয়া ঝিল্লি

তার মাঝে লুকিয়ে আছে মিলনসূত্র পরাণ গাছের রস
এমনকী একফোঁটা আবেগের এলোমেলো রক্তপথ।

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২

 

সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

২০.

সুনয়নাদি 

র কিন্তু আমি পেরে উঠছি না এই গরমে বুবুন এবার কিন্তু আমি বকব। ওঠো ওখান থেকে সেই থেকে জল ঘাটছো।
তিথি রান্না ঘরের মাজা শুকনো বাসনগুলো ঝুড়িতে তুলতে তুলতে বলল।
উঠেছ? পুচু তুমি কেন রান্নাঘরে? ও তো লেজ নাড়তেই থাকে, কি হল বল?
এবার হাত দুটো দিয়ে তিথির গলাটা জড়িয়ে ধরল
কি চাই তোমার মা। ছাদে যাবে?
লেজ নাড়তেই থাকে।
তাহলে কি?

ওদের কাছে শুধু টাকা আর টাকা। আমি কোথা থেকে টাকা রোজগার করব বলো! যেখানে থাকতাম মাসীরা টাকা টাকা করত এখানে আসলাম ওই নরকের জীবন থেকে নিজেকে পরিত্রাণ দেবার জন্য একজনকে ভালোবেসে সুখের স্বপ্নে একটা ঘর বানাব বলে। সে ঘরেও আমার সুখ নেই। কপালে শান্তি নেই।

আবার লেজ নাড়তে থাকে। যদি ওর ছাদে যাবার সময় হতো তাহলে বলার সঙ্গে সঙ্গে ছাদে চলে যেতাম আর যদি ছাদে না যাবে তাহলে এরকম করতে থাকে।
তাহলে কি করবো মা আদর।
হাত দুটো দিয়ে ডাকছে।
না মা এখন তো আদর করার সময় নেই ।তুমি এখন যাও। দেখ তো দাদা কি করছে।
ও বাবা সত্যিই পুচু চলে গেল রান্নাঘর থেকে তিথি দেখছে উঁকি দিয়ে। ঠিক বুবুন এর কাছে গিয়েছে। বুবুনটা এত দুষ্টু ও আবার একটু ওকে জল দিয়ে দিল গায়ে।
—ও কি করছ বুবুন?
এবার তো তোকে আমি দেবই দু ‘ঘা।
তিথি সত্যি সত্যি রান্নাঘর থেকে বেরল বুবুন এবার জলঘাটা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে গেল রুমে।
—কি ব্যাপার হল সুনয়নাদি এখনও মায়ের ঘর থেকে নামেনি —কেন?
—ব্যাপারটা কি!
এবার গেল শাশুড়ি মায়ের ঘরের দিকে। ও বাবা এ কি দেখছে সুনয়নাদি ঘুমোচ্ছে মায়ের ঘরে।
শাশুড়ি মাও ঘুমাচ্ছে। ভাবছে ওকে তুলবে কিনা।
এমন সময় শাশুড়ি মা বলল কে —বৌমা?
—হ্যাঁ মা।
—কিছু বলবে?
অনেকক্ষণ থেকে ভাবছি সুনয়না দি কোথায় চলে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল না তারপর সংসারে এত কাজ আর ওদিকে বুবুনও খুব দুষ্টুমি করছিল
ফলে আসতেও পারিনি।
—কোথায় গেল?
এই তো এখানেই তো ছিল
এ বাবা নিমিষের মধ্যে ভানিস
না গো বৌমা দেখো আছে শরীরটা মনে হচ্ছে ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়েছে খাটের তলায়! একি কাণ্ড!
—ও সুনয়নাদি, সুনয়না দি।
সুনয়না যেন একটা স্বপ্নের ঘরের মধ্যে ছিল তার রিস্কার দেই
—হ্যাঁ বৌদি।
একেবারে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল।
—চোখটা লেগে গিয়েছিল গো।
না ঠিক আছে ঘুমাও না।
তিথি মনে মনে ভাবছে কিছুতো একটা গন্ডগোল আছে নইলে ও এখনও বাড়ি যাবার চিন্তা করছে না কেন। সুনয়নার চোখগুলো ফুলেছে, বেশ ডিপলি ঘুমিয়ে পরেছিল।
—একটা কথা বলব সুনয়না দি।
—হ্যাঁ ব’লো না।
বলছি তোমার কি বাড়িতে কিছু গন্ডগোল হয়েছে।
—না না গন্ডগোল হবে কেন ।
কেন বলছো এসব কথ বৌদি।
—আমার দেখে যেন কেমন লাগছে তোমাকে।
সুনয়না চুপ করে থাকে।
—ব’লো না আমাকে, ভরসা করে।
—ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।
—কি হয়েছে রে, বল সু।
সুনয়না শাশুড়ি মার পা ধরে কাঁদতে থাকে।
—আমাকে একটু তোমাদের বাড়িতে কাজে নাও না গো।
কেন আমি শুনলাম, তুমি নাকি কাজ করছ কোথাও তিথি বলল।
হ্যাঁ গো বৌদি ঢুকেছিলাম কিন্তু…
—কিন্তু কি সুনয়নাদি।
চুপ করে আছে।
—কিরে, বল সু।
—আমার কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে?
—এমন কি কথা যে তোমার কথা বিশ্বাস করবে না।
হ্যাঁ, বল কল্যাণী দেবী বললেন।
—কি বলি বৌদি আমাদের শরীরের উপর কি স্টাম্প লেগে গিয়েছে।
—কিসের স্ট্যাম্প।
এই ধরনা আমরা যদি ভাল হয়ে সমাজে বাস করতে চাই, তাহলে কেউ ভাল ভাবতেই পারে না।
কি কি বুঝল এর ভেতর একটা গুরুতর ব্যাপার আছে।
আমি না কোথাও কাজ করতে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারি না। কতদিন এভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে যাব বলো, তোমাদের বাড়িতে এসে এইটুকুনি আমি একটু ঘুম দিলাম সেটা যে কত শান্তির ঘুম কি বলব বৌদি। আমার নিজের শ্বশুরবাড়িতেও আমার বোধহয় এরকম সুন্দর ঘুম হয়নি।
—কেন রে সু অন্য বাড়িতে বুঝি তোর উপর দৃষ্টি আছে।
সুনয়না চুপ করে থাকে।
—আমি যে কি করব না কিছু ভেবে পাচ্ছি না।
—কিন্তু আমার বাড়িতে এখন তো কাজের লোক আছে ওরা না ছেড়ে গেলে তো আমি বলতেও পারছি না।
—কি বলি বলো দেখিনি।
—তোমার বর কিছু বলে।
—আজকাল ওকে কিছু বলতে গেলেও মাঝে মাঝে শুনে আবার মাঝে মাঝে শোনে না বলে, —সবকিছু মানিয়ে নাও।
—কি করে মানিয়ে নেব। বাড়িতেও যদি আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি।
—কেন তোর বাড়িতে আবার কি অসুবিধা রে সু।
—আমি কি করে বলব? বাড়ির কথা উপরের থুতু দিলে নিজের গায়েই পড়বে এসে।
—আরে খুলে বল না তোকেও তো হালকা হতে হবে।
—ওমা আমি খাবারটা আপনাকে দিয়ে দিই
—দাঁড়াও কথাটা শুনে নিই।
জানো বৌদি, আমার বাচ্চাটা মারা যাবার একমাসও হয়নি। একেতেই তো মন মেজাজ খুব খারাপ তার ওপর একলা ঘরে আমি শুয়ে আছি বলে থেমে গেল।
—কিরে বল থামলি কেন?
—সেদিন আমার বর কাজ করে ফিরতে একটু রাত হয়েছে আমার চোখটা লেগে এসেছে। দরজাটা ভ্যাজানোই ছিল।
কখন যে দরজাটা খুলে আমার ঘরে ঢুকেছে।
—কে ঢুকেছে?
—কি বলি মাসিমা, হঠাৎ করে দেখছি আমার পায়ের দিকে শাড়িটা কেউ যেন মনে হচ্ছে তুলছে একবার আমি ঘুমের তাড়নায় নিজের থেকে আপন মনেই শাড়িটা নামিয়ে দিলাম একটু পরে দেখছি আবার চোখ বুজেই এসব অনুভব করছি। তারপর দেখছি আস্তে আস্তে যেন একটা হাত আমার গায়ে পড়ল। আমি না ধড়ফড় করে উঠেছি।
তারপর তারপর… আমি তো ভয় যতটা পেয়েছি অবাক ততটাই হয়েছি।
—তারপর…
—-দেখছি আমার ভাসুর আমার মুখটা চেপে ধরেছে দিয়ে আমাকে ভয় দেখাল। এই কথা যদি কাউকে বলেছিস তোর এ বাড়িতে থাকা চির জীবনের মত ঘুচিয়ে দেব।
—কি সাংঘাতিক!
—তা তুই চিৎকার করলি না কেন?
—চোখে জল নিয়ে সুনয়না বলল, আমি চিৎকার করিনি।
—-তুই চিৎকার করলি না? তুই চাপা দিতে চাইলি তাহলে তো তোর সর্বনাশ তুই নিজে ডেকে আনলি।
—আহ মা, ওকে বলতে দিন না কথার মাঝে সব সময় কথা বলে দিচ্ছেন।
—না বৌমা ভাবো ভাসুর হয়ে ভাই ছোট ভাইয়ের বউয়ের ঘরে ঢুকেছে আবার বাজে মতলব নিয়ে ঢুকে আবার ওকেই শাসাচ্ছে।
—তা কি করতে বলুন ওর কথা কেউ শুনত? ওর কথা কেউ বিশ্বাস করত।
—আমারও তো এখানেই প্রশ্ন বৌদি আপনারাও কি বিশ্বাস করবেন।
—আমাদের বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা ছাড়ো। তুমি যেখানে থাকো সেখানে লোকই যদি তোমাকে বিশ্বাস না করে তুমি থাকবে কি করে ও বাড়িতে।
—আমি কি ভাবছি জানো বৌদি? ভাবছি আমি যে পুরনো জীবনে ছিলাম না এখন মনে হচ্ছে আমি সেখানেই ফিরে যাই…
—ছি: এসব কথা কি বলছ?
অতি কষ্টে বলছি বৌদি
এত সুন্দর একটা জীবন পেয়েছ, সংসার পেয়েছ তোমার স্বামী পেয়েছ আর ওই নরকের জীবনে তুমি ফিরে যেতে চাইছ।
—আমাদের মত মেয়েদের না সবাই ওই নরকেই ফেলে দিতে চায়।
—আমরা ভাল হতে চাইলে ভাল হতে কেউ দেবে না।
সুনয়না দু’ পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে আমি এখন কি করবো? আমার কি একুল-ওকুল দুই কুলই গেল।
—কিন্তু তোমাকে তো প্রমাণ করতেই হবে যে তুমি ভাল হয়েই বাঁচতে চাও।
—বৌদি সেখানে তো আমার একজন ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে।
হ্যাঁ তোমার স্বামী তো তোমার কে ভালবাসে।
—হ্যাঁ ভালবাসে আর ভালবাসতো দু’টো এক কথা নয়।
—কি বলছ এসব!
—সত্যি বলছি বৌদি, ওদের কাছে শুধু টাকা আর টাকা। আমি কোথা থেকে টাকা রোজগার করব বলো! যেখানে থাকতাম মাসীরা টাকা টাকা করত এখানে আসলাম ওই নরকের জীবন থেকে নিজেকে পরিত্রাণ দেবার জন্য একজনকে ভালোবেসে সুখের স্বপ্নে একটা ঘর বানাব বলে। সে ঘরেও আমার সুখ নেই। কপালে শান্তি নেই।
—আবার কাজের বাড়ি যাব, সেখানেও সকলের নজর আমার গতরটার দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুনয়না মাথা ধরে বসে পড়ল।
তিথি শাশুড়ি মার মুখের দিকে তাকাল। শাশুড়ি মা তিথিতে কিছু না বলতে হাত দিয়ে ইশারা করলেন।
—তা এখন কি করবি। বাড়ি যাবি তো।?
—জানি না।
—মানে!
—হয়ত যেতে হবে, হয়ত বা যাব না।
—এ আবার কি ধরনের কথা।
যাইহোক সুনয়না মাথা ঠাণ্ডা করো। দুপুরে খাবারদাবার খাও। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ভেব কি করবে।
—খালি পেটে ধর্ম হয় না জানো না।
একথা বলে তিথি নিচে চলে গেল। তিথির তসলিমা নাসরিনের দু’টো কবিতার লাইন খুব মনে পড়ল ‘বাদল বেদনা’ থেকে
“জলে দু’জনের ভেজা গা গতর ফিরে ফিরে দেখি যৌবন তেড়ে ওঠে বুনো ষাঁড় যেন দড়ি ছিঁড়ে রেসে দৌড়োবে।”
সুনয়নার ভরাযৌবনের দিকেই যেন সকলের নজর।
এই যৌবনে শুধু কামুকতার ঘ্রাণ
এই যৌবনে নেই ভালবাসার টান। 🍁(ক্রমশঃ)

 

 

🍂গল্প 

 

তারপর হঠাৎ মেঘলা বলল, জানো, আমি আজও মাঝে মাঝে ভাবি যদি সেদিন তুমি কিছু বলতে…
অর্ণব চোখ নামিয়ে বলল, আমি ভয় পেয়েছিলাম। হারানোর ভয়, দায়িত্বের ভয়… সবকিছু মিলে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।
মেঘলা ধীরে ধীরে বলল,
আমিও হয়ত অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আমরা কেউই কিছু বলিনি।
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছে।
অর্ণব হঠাৎ বলল, এখন যদি বলি?

 

বৃষ্টিদিনে তোমার নাম

শুভ্র মল্লিক

কাশটা সেদিন অদ্ভুত ধূসর ছিল। দুপুরবেলা, তবুও আলো যেন ঠিকমতো নামছিল না। হাওড়া ব্রীজের ওপর দিয়ে বাতাস বইছিল, আর গঙ্গার জল কেমন চুপচাপ। এমন দিনে সাধারণত মানুষ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যায়, কিন্তু অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল ব্রীজের রেলিং ধরে, ওর ভেতর এক অপেক্ষা। অর্ণব জানত না কেন সে আজ এখানে এসেছে। হয়ত অভ্যাস, হয়তো কোনো অজানা টান। কিংবা হয়ত সেই নামটা, মেঘলা। যে নামটা গত তিন বছর ধরে তার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে লুকিয়ে আছে।

তিন বছর আগে ঠিক এমনই এক বৃষ্টির দিনে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। অর্ণব তখন কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র, আর মেঘলা ছিল পাশের কলেজের। সেদিন হঠাৎ করে বৃষ্টি নামায় সবাই দৌড়ে আশ্রয় নিচ্ছিল। অর্ণব একটা পুরনো বইয়ের দোকানের ছাউনি তলে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ পাশ থেকে একটা কণ্ঠ, একটু সরে দাঁড়াবেন? ভিজে যাচ্ছি।
অর্ণব তাকিয়ে দেখেছিল, চোখে বড় বড় চশমা, চুল ভেজা, মুখে হালকা হাসি। সেই হাসিটাই যেন সবকিছু বদলে দিয়েছিল।

অনেক দেরি হয়ে যায়নি তো? অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ভালবাসার জন্য কখনওই খুব দেরি হয় না… যদি সেটা সত্যি হয়।
অর্ণব ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরল।

অবশ্যই, বলে সরে দাঁড়িয়েছিল অর্ণব। সেদিন তাদের কথাবার্তা খুব বেশি হয়নি। শুধু নাম, কলেজ, আর কয়েকটা ছোট ছোট প্রশ্ন। কিন্তু সেই সামান্য কথোপকথনেই অর্ণব বুঝেছিল, মেয়েটি অন্যরকম। তারপর দেখা হতে থাকে। কখনো কলেজের সামনে, কখনও বইমেলায়, কখনো বা গঙ্গার ধারে। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্বের আড়ালে জন্ম নেয় ভালবাসা।

মেঘলা খুব সাধারণ মেয়ে, কিন্তু তার স্বপ্নগুলো অসাধারণ। সে চেয়েছিল বড় হয়ে শিক্ষক হতে, ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতে। অর্ণব তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যেত। সে নিজেও স্বপ্ন দেখত, একদিন একটা ছোট্ট বাড়ি, জানালার পাশে দু’টো চেয়ার, আর সেখানে বসে তারা চা খাবে। কিন্তু জীবনের গল্পগুলো কখনোই এত সহজ হয় না।

কলেজ শেষ হওয়ার পর অর্ণব চাকরির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর মেঘলা পেয়ে যায় একটা স্কুলে পড়ানোর সুযোগ। স্কুলটা শহরের বাইরে, অনেক দূরে। প্রথমে তারা ভেবেছিল দূরত্ব কিছুই না। ফোন আছে, মেসেজ আছে, সব ঠিক থাকবে। কিন্তু ধীরে ধীরে কথার সংখ্যা কমতে থাকে। ব্যস্ততা, ক্লান্তি, নতুন জীবন তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়।একদিন মেঘলা বলেছিল, অর্ণব, তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালবাসো? নাকি এটা শুধু অভ্যাস?
অর্ণব উত্তর দিতে পারেনি। সে নিজেও জানত না তার অনুভূতিগুলো কতটা গভীর, কতটা সত্যি। সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে তাদের বিচ্ছেদের কারণ। তারপর একদিন, হঠাৎ করে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কোনও ঝগড়া নয়, কোনও নাটকীয় বিদায় নয়, শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া।

তিন বছর পর, সেই একই বৃষ্টির দিনে অর্ণব আবার দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গায়। হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামতে শুরু করল। চারপাশে মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ ছাতা খুলছে, কেউ আশ্রয় খুঁজছে। অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল, যেন সে ভিজতেই চায়। ঠিক তখনই, পাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ, একটু সরে দাঁড়াবেন? ভিজে যাচ্ছি।
অর্ণবের বুকটা ধক করে উঠল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
মেঘলা। একই চোখ, একই হাসি কিন্তু একটু ক্লান্ত, একটু বড় হয়ে যাওয়া।
তুমি?
অর্ণবের গলা কাঁপছিল।
মেঘলা হালকা হাসল।
হ্যাঁ, আমি। অনেকদিন পর, তাই না?
কিছুক্ষণ তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শুধু বৃষ্টির শব্দ, আর হৃদয়ের ধুকপুকানি। অর্ণব বলল,
তুমি কেমন আছ?
ভাল, মেঘলা বলল।
তুমি?
চলছে।
আবার নীরবতা। তারপর হঠাৎ মেঘলা বলল, জানো, আমি আজও মাঝে মাঝে ভাবি যদি সেদিন তুমি কিছু বলতে…
অর্ণব চোখ নামিয়ে বলল, আমি ভয় পেয়েছিলাম। হারানোর ভয়, দায়িত্বের ভয়… সবকিছু মিলে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।
মেঘলা ধীরে ধীরে বলল,
আমিও হয়ত অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আমরা কেউই কিছু বলিনি।
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছে।
অর্ণব হঠাৎ বলল, এখন যদি বলি?
মেঘলা তাকাল তার দিকে।
কি বলবে?
অর্ণব এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,
আমি এখনও তোমাকে ভালবাসি। হয়তো সবকিছুর পরেও, এখনও।
মেঘলার চোখে জল জমে উঠল, বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিশে গেল।
অনেক দেরি হয়ে যায়নি তো? অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ভালবাসার জন্য কখনওই খুব দেরি হয় না… যদি সেটা সত্যি হয়।
অর্ণব ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরল। এবার আর কোনও ভয় নেই, কোনও দ্বিধা নেই। হাওড়া ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে, বৃষ্টির ভেতর, তারা আবার শুরু করল তাদের গল্প, একটা অসম্পূর্ণ প্রেমের নতুন পর্ব। আর গঙ্গার জল যেন চুপচাপ সাক্ষী হয়ে রইল, দু’টি মানুষের, যারা হারিয়ে গিয়েও আবার একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আজ আর কষ্টের নয়। শুরুর। কারণ, কিছু প্রেম কখনও শেষ হয় না। শুধু অপেক্ষা করে, সঠিক সময়ের জন্য। 🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন