সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বুয়েনস আয়ার্স: বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম উজ্জ্বল করে তুললেন লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi)। আলজেরিয়া (Algeria)-এর বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে দলকে জয়ের পথে নিয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার (Argentina) অধিনায়ক। কিন্তু মাঠে এই অনবদ্য পারফরম্যান্সের পরেও ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে তাঁর নির্লিপ্ত মনোভাবই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ম্যাচ শেষে সতীর্থ রদ্রিগো ডি পল (Rodrigo De Paul) জানিয়ে দিলেন, ‘মেসির কাছে রেকর্ডের কোনও আলাদা মূল্য নেই, ও এসব নিয়ে ভাবেই না।’ এই ম্যাচে নামার আগে আরেকটি বড় মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন মেসি। এটি ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ২০০তম ম্যাচ। সেই ম্যাচেই হ্যাটট্রিক, একসঙ্গে তিনটি রেকর্ড গড়ে ফেললেন তিনি। ম্যাচের শুরুতেই আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় মেসিকে। প্রথম আট মিনিটের মধ্যেই বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তাতে থামেননি তিনি। দুই অর্ধ জুড়ে ধারাবাহিক আক্রমণে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে তিনটি গোল করে দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান।
মাঠে মেসির এই আগ্রাসী ফুটবল যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে তাঁর অন্য এক দিক, ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতি উদাসীনতা। ডি পল, যিনি মেসির ছায়াসঙ্গী হিসেবেই পরিচিত, খোলাখুলি বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, মেসির কাছে এই রেকর্ডগুলো খুব একটা গুরুত্ব পায় না। কখনও কখনও আমরা মজা করে বলি, “এই রেকর্ডটা করতে তোমার আর একটা গোল দরকার”, কিন্তু ওর কাছে এই সব হিসেব থাকে না।’ মাঠের ভেতরে ও বাইরে মেসির পাশে সব সময় দেখা যায় ডি পলকে। সেই কারণেই ফুটবল মহলে অনেকেই তাঁকে মেসির ‘বডিগার্ড’ বলে ডাকেন। ডি পলের কথায়, ‘মেসির সবচেয়ে বড় গুণ হল, ও খেলা উপভোগ করে। এত বছর ধরে যে চাপটা ওর উপর ছিল, এখন সেটা অনেকটাই কমেছে। ও এখন আরও স্বাভাবিক ভাবে খেলছে।’ ডি পল আরও জানান, দলের প্রতি দায়বদ্ধতাই মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়। ‘ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলগত সাফল্যকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় মেসি। ও সব সময় চায় দল জিতুক। সেই মানসিকতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।’ তাঁর মতে, দলের প্রতিটি ফুটবলারের মধ্যে এই মনোভাব ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফল মাঠে দেখা যাচ্ছে।
মেসির উপস্থিতি যে আর্জেন্টিনা দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়, সেটাও মেনে নিয়েছেন ডি পল। তিনি বলেন, ‘মেসি মাঠে থাকলে আমরা অন্যরকম শক্তি পাই। ও শুধু নিজের খেলাই খেলে না, গোটা দলকে চালনা করে। কঠিন সময়েও আমাদের চাঙ্গা রাখে।’
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্সের পর সাধারণত খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই আলাদা। তাঁর ফোকাস থাকে দলের উপর, জয়লাভের উপর। সেই কারণেই তিনি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে পেরেছেন বলে মনে করছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
এই ম্যাচের পর আর্জেন্টিনা দলের ভিতরেও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। প্রথম ম্যাচেই জয়ের ফলে পরবর্তী পর্বে এগোনোর পথ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। কোচ লিওনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni)-র কৌশল এবং মেসির নেতৃত্ব, এই দুইয়ের সমন্বয়ে দল এখন ছন্দে রয়েছে। মেসির কেরিয়ারে এর আগেও বহু রেকর্ড এসেছে। আটবারের বালঁ দ্যর (Ballon d’Or) জয়ী এই ফুটবলার বারবার প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বসেরাদের অন্যতম। কিন্তু তবুও তাঁর স্বভাবের এই সরলতা এবং দলকেন্দ্রিক ভাবনা তাঁকে আলাদা করে দেয়।
ডি পলের কথাতেই যেন সেই সত্যিটা ফুটে ওঠে, ‘মেসি নিজের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য খেলে।’ আর সেই কারণেই হয়তো মাঠে তাঁর প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি গোল শুধু পরিসংখ্যান নয়, হয়ে ওঠে একেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের শুরুতেই এমন দাপুটে পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখছে। এখন দেখার, মেসির নেতৃত্বে এই দল কত দূর যেতে পারে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার রেকর্ড নয়, জয়ই মেসির আসল লক্ষ্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lionel Messi World Cup 2026 News | ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মেসিকে নিয়ে ইংল্যান্ড তারকার মন্তব্যে ফুটবল মহলে তোলপাড়




