সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি: লোকসভাকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অন্দরে চলা টানাপোড়েন নতুন মোড় নিল। দলের মধ্যে বিদ্রোহী সাংসদদের পৃথক ব্লক গঠনের উদ্যোগের খবর সামনে আসতেই এ বার সরাসরি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) দ্বারস্থ হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তিন পাতার একটি বিস্তারিত চিঠিতে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল। আইনতও তৃণমূল একটিই।’ তিনি একই সঙ্গে সংসদের ভিতরে কোনও পৃথক গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ, আগামী সোমবার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের। তারা লোকসভায় পৃথক ‘ব্লক’ হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তার আগেই এই চিঠি পাঠিয়ে কার্যত আগাম অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন অভিষেক। রবিবার বিকেলে এই চিঠি স্পিকারের বাসভবনে পৌঁছে দেন রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ (Sagarika Ghose) ও লোকসভার সাংসদ কীর্তি আজাদ (Kirti Azad)। তাঁরা দু’জনেই তৃণমূলের ‘কালীঘাট শিবির’ -এর ঘনিষ্ঠ বলে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। দিল্লির ২০, আকবর রোডে স্পিকারের বাসভবনে গিয়ে তাঁরা চিঠি জমা দেন। একই সময়ে দিল্লির অন্য প্রান্তে, ৯ নম্বর মতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদব (Bhupender Yadav) -এর বাংলোয় বৈঠকে বসেন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা। এই সমান্তরাল রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অভিষেক তাঁর চিঠিতে সাংবিধানিক ও আইনি দিক তুলে ধরে বলেন, ‘লোকসভায় যে সংসদীয় দল রয়েছে, সেটি মূল রাজনৈতিক দলের উপর নির্ভরশীল এবং সেই দলেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই দলের মধ্যে সাংসদেরা নিজেদের ইচ্ছায় আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে স্বীকৃতি চাইতে পারেন না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, একজনই লোকসভা দলনেতা এবং একজনই হুইপ থাকেন, যাঁদের নিয়োগ হয় দলের অনুমোদনে। চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের প্রসঙ্গও টানা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সঙ্কট সংক্রান্ত মামলায় সাংবিধানিক বেঞ্চ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, তা উল্লেখ করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, একই দলের মধ্যে বিভাজনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যায় না।
চিঠি জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কীর্তি আজাদ বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ জানিয়েছে, কোনও বিভাজন হতেই পারে না।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, দলীয় ঐক্য রক্ষার প্রশ্নে তাঁরা আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। সাগরিকা ঘোষও বলেন, ‘এইভাবে দল ভাঙার চেষ্টা করলে তা সফল হবে না। আমরা স্পিকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছি। সংবিধানের পরিপন্থী কোনও উদ্যোগ মেনে নেওয়া যায় না।’ অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরও নিজেদের অবস্থান থেকে সরেনি। রবিবার দুপুরে ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন একাধিক তৃণমূল সাংসদ। প্রকাশ্যে আসা একটি ছবিতে দেখা যায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar), শতাব্দী রায় (Satabdi Roy), সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (Sudip Bandyopadhyay), দেব (Dev), পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmick), অসিত মাল (Asit Mal), জগদীশচন্দ্র বসুনিয়া (Jagadish Chandra Basunia), প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (Prasun Bandyopadhyay), মালা রায় (Mala Roy), শর্মিলা সরকার (Sharmila Sarkar), মিতালি বাগ (Mitali Bag), বাপি হালদার (Bapi Halder), ইউসূফ পাঠান (Yusuf Pathan), জুন মালিয়া (June Malia), সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh) ও কালীপদ সোরেনকে (Kalipada Soren)।
এই বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিরোধী দল বিজেপির এক শীর্ষ নেতার বাসভবনে তৃণমূলের সাংসদদের উপস্থিতি নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সংসদের ভেতরে দলীয় কাঠামো ভাঙার চেষ্টা হলে তা কেবল রাজনীতিতেই নয়, সাংবিধানিক দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। লোকসভায় কোনও দলের স্বীকৃতি, হুইপ, দলনেতা, সব কিছুই নির্ভর করে মূল দলের সংগঠনগত অনুমোদনের উপর। ফলে পৃথক ব্লক গঠনের প্রশ্নে স্পিকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ এই টানাপোড়েন আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন দেখার। একদিকে দলীয় নেতৃত্ব ঐক্যের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। সব মিলিয়ে দিল্লির রাজনৈতিক আবহে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Adhir Ranjan Chowdhury statement, Mamata Banerjee Congress speculation | মমতা জল্পনায় বিস্ফোরক অধীর, কংগ্রেস-তৃণমূল সমীকরণে নতুন বিতর্ক




