সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভোট-পরবর্তী অস্থিরতার আবহে দীর্ঘ বিরতির পর ফের রাজপথে নামলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কলকাতার ওয়াই চ্যানেলে আয়োজিত ধর্নামঞ্চ থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে তিনি কার্যত রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন পর্বের সূচনা করলেন। সংবিধান হাতে নিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হটাকে যায়েঙ্গে (যদি বেঁচে থাকি বিজেপি-কে সরাবই)।’ তাঁর এই উচ্চারণ ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে ধর্নামঞ্চ, স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন উপস্থিত কর্মী-সমর্থকেরা।
ধর্মতলার এই ধর্না ছিল ভোটের ফল ঘোষণার পর মমতার প্রথম বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তৃণমূলের অন্দরে নানা টানাপোড়েনের আবহেই তিনি মাঠে নামলেন। নিজের দলের কঠিন সময়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি কারও সুদিনে না-হোক, দুর্দিনে আছি।’ একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম।’ তাঁর এই বক্তব্যে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণও উঠে আসে। ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর থেকে তাঁকে এবং তাঁর দলকে নানাভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে। তাঁর কথায়, ‘আমাকে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এ ভাবে আমাকে থামানো যাবে না। যেখানে পারব বসে পড়ব।’ তিনি জানান, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে কর্মসূচির অনুমতি না-মেলায় তাঁদের ওয়াই চ্যানেলে ধর্না করতে হয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের এখানে ধর্নায় মাইকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক নিয়ে বলতে হচ্ছে।’ মমতার অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ভূমিকাও। তিনি বলেন, ‘ইডি, সিবিআই দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে, বিজেপিকে সমর্থন করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।’ তাঁর দাবি, দলের বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং কর্মীদের উপর নানা ধরনের চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি তাঁদের গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমাদের লোকদের ভয় দেখাবেন না, গ্রেফতার করবেন না।’
সোনারপুরে তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর উপর হামলার ঘটনাও ধর্নামঞ্চ থেকে তুলে ধরেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ওটা গলির মধ্যে ছিল। হেলমেট না-দিলে পাথরটা ওর মাথায় লাগত।’ এই ঘটনার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সমস্যার কথাও জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, ‘যখন সিরিয়াস অবস্থায় রোগী নিয়ে গেলাম তখন অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছিল। পরে ট্রমা কেয়ারে ভর্তি করা হয়।’ এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে ছিল। ধর্নামঞ্চ থেকে প্রশাসনের উদ্দেশ্যেও কড়া বার্তা দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘যাঁরা আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার ঘেরাও হবে, নবান্না ঘেরাও হবে, সব থানা ঘেরাও হবে।’ যদিও পরে তিনি যোগ করেন, পুলিশকে তিনি দোষ দিচ্ছেন না, কারণ তারা নির্দেশ মেনে কাজ করে। তাঁর কথায়, ‘আমি প্রশাসনে ছিলাম, জানি ওরা চেয়ারের কথা শোনে।’
এ দিন দুপুরে কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে রেড রোডে গিয়ে ড. বি.আর. অম্বেডকর (B. R. Ambedkar) -এর মূর্তিতে মালা দেন মমতা। এরপর মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi) -এর মূর্তিতেও শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকেই তিনি ধর্নামঞ্চে পৌঁছন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মদন মিত্র (Madan Mitra), কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh), কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee), দোলা সেন (Dola Sen) প্রমুখ। ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে সকাল থেকেই জড়ো হতে শুরু করেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পুলিশের তরফে দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই মতো নিরাপত্তার কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মহিলা পুলিশের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এই কর্মসূচীকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল অনিশ্চয়তা। তৃণমূলের দাবি ছিল, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্নার অনুমতি না দিয়ে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ জানায়, বিকল্প জায়গা হিসেবে ওয়াই চ্যানেলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এই নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ এবং সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, কেন নতুন করে আবেদন করতে হবে।
উল্লেখ্য, ভোটের পর তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। কালীঘাটে বৈঠকে বহু বিধায়কের অনুপস্থিতি এবং সই জাল-কাণ্ড নিয়ে বিতর্ক পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সেই আবহেই মমতার এই ধর্না কর্মসূচী রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সুরে বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালেন, তা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তাঁর চ্যালেঞ্জ, ‘মারলে মারো, কিন্তু যত দিন কণ্ঠ রয়েছে, তত দিন মাথা নত করাতে পারবে না।’ এই উচ্চারণেই বোঝা যাচ্ছে, রাজনৈতিক লড়াইয়ে তিনি আপসের পথে হাঁটতে নারাজ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee protest | ধর্মতলায় ধর্না বনাম তারকেশ্বর কটাক্ষ : মমতা-শুভেন্দু সংঘাতে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি



