Meghahatuburu travel guide, Jharkhand hill travel | মেঘের দেশ মেঘাহাতুবুরু: পাহাড়, জঙ্গল আর মেঘের রহস্যময় ছোঁয়া

SHARE:

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিম সিংভূমের দূরবর্তী কোণে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি মেঘাহাতুবুরু (Meghahatuburu)। নামের মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত টান। ‘মেঘের মাথায় বুরু’, অর্থাৎ মেঘের পাহাড়। যতবার নামটি উচ্চারণ করি, ততবারই মনে হয় যেন কোথাও পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের সঙ্গে হাত মেলানো যায়। শহরের কোলাহল, ধোঁয়া, ব্যস্ততা সব ফেলে যেদিন যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম, এই সফর কেবল একটি ট্রিপই নয়, এটি এক প্রাকৃতিক আত্মমগ্নতা।

আরও পড়ুন : Indian passport ranking, Henley Passport Index 2026 | ভারতীয় পাসপোর্টের শক্তি বাড়ল, ভিসা ছাড়াই ৫৫ দেশে ভ্রমণের সুযোগে সস্তা বিদেশ সফরের নতুন দরজা

আরও পড়ুন : Rajgad Travelog in Bengali with full travel details | রাজগড়ে একদিন: সাহ্যাদ্রি পাহাড়ে হারানো রাজ্যের খোঁজ

ট্রেনের জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকে পড়ছিল। গাড়ির থেমে গেল মনোহরপুর (Manoharpur) স্টেশনে। এখান থেকেই শুরু মেঘের রাজ্যের পথে যাত্রা। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল পাহাড়ি পথ বেয়ে, চারপাশে শুধু সবুজ আর মাটির গন্ধ। রাস্তার দু’ধারে সালো, মহুয়া, শিমুলের গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে দেখা মিলছিল বুনো ফুলের। এক ঘণ্টার পথ শেষে পৌঁছলাম মেঘাহাতুবুরু। পাহাড়ের গায়ে তখন সকালের মেঘ ঝুলে আছে পর্দার মতো। দূরের টিলা, লাল মাটি আর ঘন বন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক স্বপ্নময় দৃশ্য। মনে হচ্ছিল যেন মেঘ নিজেই এসে হাত ছুঁয়ে বলছে, ‘স্বাগতম’।

জঙ্গলের বুকে নির্জনতা 

গাড়িতে টুকটাক খাওয়া হলেও তখন বেশ খিদে পেয়েছিল। তাই প্রথমেই থামা হল স্থানীয় এক ছোট্ট হোটেলে। গরম ভাত, আলু-পোস্ত, ডিম-ঝোল, আর সঙ্গে মহুয়া ফুলের ভাজা, এই ছিল সকালের সরল অথচ সুস্বাদু আহার। হোটেলের মালিক, চুনু সোরেন (Chunu Soren) হাসিমুখে বললেন, “আপনারা তো শহর থেকে এসেছেন, আমাদের এখানে কিছুই নেই, শুধু মেঘ আর বন।” কিন্তু এই “শুধু মেঘ আর বন”-এর মধ্যেই যে এত সৌন্দর্য, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। খাওয়াদাওয়া শেষে বেরিয়ে পড়লাম পাহাড় চূড়োর দিকে। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে আছে লাল মাটির গ্রাম, কিছু কুঁড়েঘর, উঠোনে শুকোতে রাখা মহুয়া ফুল। এক দল শিশু মাঠে খেলছে, আর দূরে কিছু মহিলা নদীর ধারে কাপড় ধুচ্ছে। এ যেন এক অন্য পৃথিবী, যেখানে সময় থেমে আছে।

প্রাতঃভ্রমণ আর শিবমন্দিরের শান্তি 

পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম প্রাতঃভ্রমণে। পাহাড়ি বাতাসে তখনো মেঘের আর্দ্রতা। ছোট্ট পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম স্থানীয় শিবমন্দিরে (Shiva Temple)। মন্দিরটি খুব বড় নয়, কিন্তু শান্ত। ভেতরে শিবলিঙ্গের ওপর জল পড়ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে, পাশে বেলপাতা আর ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে। আশেপাশে লেক গার্ডেন, ছোট্ট একটি হ্রদ, যাকে স্থানীয়রা বলেন, “ঝিল”। পাখির কলতানে মুখরিত গোটা এলাকা। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন কত সহজ হতে পারে, যদি এমন কিছু মুহূর্ত প্রতিদিন পাওয়া যেত।

লেক গার্ডেনের টান 

লেক গার্ডেন (Lake Garden) মেঘাহাতুবুরুর অন্যতম আকর্ষণ। ছোট্ট একটি জলাশয়ের চারপাশে ঘন সবুজ, রঙিন মরশুমি ফুল, আর অসংখ্য প্রজাতির পাখি। কেউ কেউ নৌকো চালাচ্ছেন, কেউ আবার বসে আছেন জলাশয়ের ধারে, হাতে চায়ের কাপ। শহুরে জীবনের ক্লান্ত মন এখানে এসে যেন নতুন করে শ্বাস নেয়। স্থানীয় একজন বললেন, “এই লেকটা আমাদের প্রাণ। ভোরে বা বিকেলে এখানে এলেই মনটা হালকা হয়ে যায়।”
মেঘাহাতুবুরু পাহাড়ের চূড়ো থেকে দেখা যায় জঙ্গলের ছাউনি, যেখানে গাছের মাথা ছুঁয়ে থাকে আকাশ। কিছুটা দূরেই কিরিবুরু (Kiriburu) যমজ শহর বলা চলে, একে অপরের প্রতিবেশী। এখানকার পাহাড় ও জঙ্গল ঘিরে রয়েছে প্রাকৃতিক আকর্ষণ, সঙ্গে লুকিয়ে আছে কিছু বিষণ্ণতা।

প্রকৃতি, মানুষ আর বাস্তবতার ছায়া 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধে। মেঘ ধীরে ধীরে নেমে আসছিল পাহাড়ের গায়ে। তখনই যেন বোঝা গেল, এই জায়গার সৌন্দর্যের আড়ালে কত না অব্যক্ত বেদনা লুকিয়ে আছে। জঙ্গলের সম্পদ আজ অনেকাংশেই ব্যবসায়ীদের দখলে, পাহাড়ের বুক চিরে চলছে খনিজ উত্তোলন। অথচ এই বনই আদিবাসীদের (Adivasi) জীবনের অংশ, তাদের রুটি-রুজি, সংস্কৃতি, উৎসব সব কিছুই এই প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত।
মনোহরপুর ফেরার পথে গাড়ি থেকে দেখছিলাম, কুঁড়েঘরের পাশে কিছু যুবক হাড়িয়ার (Hadiya) মত্ততায় লুটিয়ে আছে। মহুয়ার (Mahua) গন্ধে ভরপুর বাতাস, আর দূরে বেজে উঠছে ঢোলের শব্দ। মনে হচ্ছিল, এই আনন্দের আড়ালে রয়েছে এক নিঃশব্দ অবক্ষয়। প্রযুক্তি, উন্নতি, শহরের আলো, কিছুই যেন পৌঁছায়নি এখানে পুরোপুরি। এত অগ্রগতি সত্ত্বেও এই চিত্রের পরিবর্তন ঘটেনি।

ফেরার মুহূর্তের বিষাদ 

রাত সাড়ে দশটার ট্রেন আমাদের মনোহরপুর থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল শহরের পথে। গাড়ি যখন স্টেশনে পৌঁছল, তখন মনটা এক অদ্ভুত বিষাদে ভরে গেল। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি পিছনে, হয়ত সেই নির্জনতা, সেই মেঘের ভেজা বাতাস, বা হয়ত সেই সহজ সরল মানুষগুলোকে।ফেরার সময় চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। দূরে পাহাড়গুলোর গা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারে, মেঘও যেন বিদায় নিচ্ছিল নীরবে। মনে হচ্ছিল, মেঘাহাতুবুরু এখন আমার মনেরই এক অংশ, যে অংশে আমি ফিরে যেতে চাই বারবার।

মেঘাহাতুবুরু কোনও ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ নয়, এটি প্রকৃতির জীবন্ত পাঠ। এখানে এসে শেখা যায়, প্রকৃতি কেবল দেখার জিনিস নয়, তাকে অনুভব করতে হয়। আর এই অনুভবেই মিশে থাকে বিনম্রতা, ধ্যান, আত্মার শান্তি। হয়তো এই কারণেই যারা একবার আসে, তারা ফিরে গিয়েও ভুলতে পারে না এই মেঘের দেশকে। আসলে ভ্রমণ মানে কেবল দূরে যাওয়া নয়, তা নিজের ভিতরে নতুন করে ফিরে আসা। আর মেঘাহাতুবুরু সেই উপলব্ধির এক সুন্দর প্রতীক।

ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী

আরও পড়ুন : Santragachi Digha train time | গরমে দিঘা ভ্রমণে বড় স্বস্তি! সাঁতরাগাছি-দিঘা পার্মানেন্ট ট্রেন চালু, জানুন সময়সূচী ও স্টপেজ

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন