Sasraya News Sunday’s Literature Special | 31st May 2026, Sunday | Issue 112 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল। ৩১ মে ২০২৬, রবিবার। সংখ্যা ১১২

SHARE:

ম্পাদকীয়

ণতন্ত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা নয় মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অর্জন করা যেমন কঠিন তেমনি তা ধরে রাখাও একটি দীর্ঘ ও দায়িত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বিশেষ করে মহিলাদের আর্থিক সহায়তামূলক প্রকল্পগুলি বহু মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে। ফলে এই প্রকল্পগুলির সঙ্গে মানুষের আবেগ প্রত্যাশা এবং ভরসা গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কোনও সরকারি ভাতা বা আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। প্রকৃত উপভোক্তার হাতে সরকারি সুবিধা পৌঁছানো এবং অনিয়ম রোধ করা একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনের অন্যতম কর্তব্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য যাচাই বা উপভোক্তা তালিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা উচিত। তবে, সেই প্রক্রিয়া যেন সাধারণ মানুষের জন্য অযথা জটিলতা বিভ্রান্তি বা উদ্বেগের কারণ না হয়ে ওঠে। সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আজকের ডিজিটাল যুগে নাগরিকদের বহু তথ্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি নথি ও ডেটাবেসে সংরক্ষিত রয়েছে। আধার, ভোটার পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, রেশন কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এই সমস্ত তথ্যের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ দ্রুত ও নাগরিকবান্ধব করা সম্ভব। ফলে যদি কোনও আবেদনপত্র অত্যন্ত দীর্ঘ জটিল বা সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে তাহলে বিশেষ করে প্রবীণ, স্বল্পশিক্ষিত এবং গ্রামীণ এলাকার মানুষেরা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল দর্শন হল নাগরিককে সহযোগিতা করা তাঁকে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বোঝার মধ্যে ফেলে দেওয়া নয়। তাই যে কোনও যাচাই প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যা একদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে মানুষের মর্যাদা ও সুবিধাকেও গুরুত্ব দেবে। প্রয়োজন হলে আবেদনপত্র সংক্ষিপ্ত করা। অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যম রাখা। সহায়ক ক্যাম্প আয়োজন করা এবং তথ্য যাচাইয়ের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা। এই গুলো করা যেতে পারে। তাহলে সহজ এবং সুন্দর হবে ‘মানুষের কাছে সরকার’, ‘মানুষের পাশে সরকার’।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশের ক্ষেত্রেও সংযম, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিহার্য। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে কিন্তু সহিংসতা বা সংঘাত কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিরোধিতা এবং শত্রুতা এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সভ্য আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করাই সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।

একটি রাজ্য তখনই দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে পারে যখন সরকার এবং নাগরিক উভয়ের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক দৃঢ় থাকে। প্রশাসনের কাজ হবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আর নাগরিকের কাজ হবে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ। এই দুইয়ের সমন্বয়েই উন্নয়ন। স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শান্তি সম্ভব।
ক্ষমতায় থাকা কোনও সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দল নয়। বরং মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে নীতি, স্বচ্ছতা, সরল প্রশাসন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটাতে হবে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল পরিকাঠামো এটা আমি শুধু বলব না; তার সঙ্গে এটাও প্রয়োজন মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশ্বাস।
আমরা আশা করি ভবিষ্যতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলিতে স্বচ্ছতা যেমন বজায় থাকবে তেমনি নাগরিকদের সুবিধা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। একটি শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক সরকারই পারে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা অর্জন করতে এবং গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের থা

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

ফল্গুতীরে শ্রাদ্ধকথা

রাম— লক্ষণ! পিতৃশ্রাদ্ধের কাল উপস্থিত হয়েছে। তুমি নিকটস্থ গ্রাম হতে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য সংগ্রহ করে লয়ে এস।
লক্ষ্মণ— গ্রামে যেতে হবে?
রাম— নচেৎ উপায় কি? শ্রাদ্ধকাল উপস্থিত, সেরূপ ফলতো কিছুই নাই। যাও তুমি বিলম্ব করো না ।
লক্ষ্মণ—আচ্ছা!
রাম— সীতা! ফল্গুনদী দেখছ?
সীতা— হাঁ নাথ! বড় সুন্দর জল। ফল্গুকে দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। আচ্ছা নাথ! এই ফল্গুতীরে কিছুদিন থাকলে হয় না?
রাম— বহু স্থানতো ভ্রমণ করা হল,এবার ইচ্ছা আছে বনবাসের অবশিষ্টকাল গোদাবরীতরে পঞ্চবটী বনে বাস করবো। সেই স্থানটি বড় মনোরম। তাইতো লক্ষ্মণ তো এখনো এলো নাম যাই, আমি দেখি, মধ্যাহ্নককাল অতীত প্রায়।
সীতা— তুমি কোথায় যাবে?
রাম— এই যে নিকটেই গ্রাম, আমি এখনই আসছি, ভয় নেই।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

সীতা— নাথের আমার গমন কি সুন্দর একটির পর একটি পা ফেলছেন, হাত দুখানি আপনা আপনি দুলছে, ঐ নরনারী, পশুপক্ষী, বৃক্ষলতা আকুল হয়ে আমার নাথের গমনলীলা দর্শন কচ্ছে। ধরণীর বক্ষে পদক্ষেপন কচ্ছেন, পাদস্পর্শে পৃথিবী যেন কন্টকিতা হয়ে উঠছেন। নাথ গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলেন। ফল্গুনদী আপন মনে বয়ে যাচ্ছে। ফল্গু! ফল্গু! তুমি কোথায় যাচ্ছ? বোধ হয় নাথের কাছে নয়? আচ্ছা, তোমার নিকটে এলাম তুমি কথা কচ্ছ না কেন ল? এ কি ফুলের গন্ধ— এই যে কেতকী গাছ রয়েছে। কেতকী ফুলের গন্ধতো বেশ, আজ কেতকী ফুল দিয়ে নাথের পূজা করবো। তাইতো মধ্যাহ্ন প্রায় অতীত হয়ে গেল— লক্ষ্মণ এখনও এলো না। প্রাণেশ্বর কেন বিলম্ব কচ্ছেন, শ্রাদ্ধের কাল চলে যাচ্ছে, রাক্ষসীবেলা পড়বে, কি হলো— কি করি— শ্রাদ্ধ পন্ড হয়ে যাবে? আচ্ছা, আমি স্নান করে অন্যান্য যোগাড় করি। স্নান করত ইঙ্গুদী তৈলের প্রদীপ জ্বালিয়ে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কি করি, কি করি, সময় চলে যাচ্ছে, লক্ষ্মণ বা নাথ তো এখনও এলেন না। শ্রাদ্ধতো পন্ড হয়ে যাবে। না আর অপেক্ষা করতে পারি না, স্ত্রী স্বামীর সহধর্ম্মিণী, নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়ার ত্রুটি হলে স্বামীর অপরাধ হবে। এই যা ফল আছে, এর দ্বারাই আমিই পিন্ড দান করি। হে শ্বশুর! হে আর্য্যশ্বশুর! হে প্রার্য্যশ্বশুর! এই পিন্ড গ্রহণ করুন। আমি মন্ত্রাদি কিছু জানি না, আপনারা কৃপা করে পিন্ড নিন।
(অলক্ষ্যে)

জনকনন্দিনি! আজ আমরা পরিতৃপ্ত হলাম। তুমি ধন্যা।

সুবর্ণালঙ্কৃত হস্তসকল পিন্ডগ্রহণার্থ বহির্গত হইল।

সীতা— আপনারা কে এসেছেন বলুন?
(অলক্ষ্যে)
হে সুব্রতে সীতে! আমি তোমার শ্বশুর দশরথ, আর আমার পিতৃগণ সঙ্গে আছেন, তোমার দত্ত পিন্ড লাভে আমরা পরিতৃপ্ত হয়েছি। তোমার শ্রাদ্ধ করা সফল হয়েছে।
সীতা— পিতঃ! এমন সৌভাগ্য তো আর কখন কারও হয়নি, এ হস্ত-দর্শনাদি অভূতপূর্ব্ব ঘটনা আমার স্বামীতো বিশ্বাস করবেন না। পুনরায় হয়তো শ্রাদ্ধ করবেন।
(অলক্ষ্যে)
হে অনঘে! তুমি কতগুলি সাক্ষী রাখ!
সীতা— হে ফল্গুনদী! হে ধেনো ! হে অগ্নি! হে কেতকী! তোমরা লব দেখলে শুনলে তোমরা সাক্ষী থাক। আমার স্বামী জিজ্ঞাসা করলে বলো।
হস্ত সকলের অন্তর্দ্ধান।

(রাম লক্ষ্মণের দ্রুতপদে প্রবেশ)

রাম— সীতা! সীতা! শ্রাদ্ধকাল গত প্রায়। শীঘ্র তুমি পাক করে দাও। পিতৃদেব অন্তরালে শ্রাগ্ধভোজনের জন্য উপস্থিত হয়েছেন।
সীতা— রামচন্দ্রের মুখের দিকে বিস্মৃতা হইয়া চাহিয়া রহিলেন ।
রাম—বিস্মিতা হয়ে মুখপানে চেয়ে রয়েছো, না যাও, দেরী করো না।
সীতা— নাথ,আজ এক অপূর্ব্ব ব্যাপার দেখেছি ম
রাম— কি বল! সত্বর বল!
সীতা— তুমি চলে যাওয়ার পর তোমার আসতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে স্নান করে প্রদীপ জ্বেলে ফলমূল যা ছিল তাই দিয়ে শ্বশুর মহাশয় প্রভৃতিকে পিন্ড দিয়েছিলাম, শ্বশুরমহাশয় বললেন— সীতা! আমরা পরম প্রীত হয়েছি তুমি ধন্যা। তাঁদের সুবর্ণভূষিত হস্তসকল পিন্ড গ্রহণ করলে দেখতে পেলাম। (অংশ বিশেষ) *বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত 

🍁কথা রামায়ণ | শ্রীশ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

 

🍁ফিরে ড়া

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় -এর কবিতাগুচ্ছ

অঙ্কন : জুয়াইরিয়া বিনতে সাইফুদ্দীন

কাকে যে বলি 

দিনের বেলায় ছিল আঁকিবুকি জীবন, একটা কবিতা পড়ে
মন ভালাে হয়ে গেল
এ কথা কাকে যে বলি, কেই বা বুঝবে!
বৃষ্টি এল কি এল না, আকাশ মেঘলা
লুপ্ত চাঁদ
আমার একটা হারানাে বােতামের জন্য কষ্ট হল
এ কথা কাকে যে বলি, কেই বা বুঝবে
বুঝবে না, আসলে বােঝানাে যাবে না, আত্মপাগলামির
এ এক নিভৃত জগৎ
তােমাকে মুখােশ পরতেই হবে, ভড়ং দেখাতেই হবে,
তােমার নকল কণ্ঠস্বর
নাটকের মতন উঠবে নামবে, তুমি হাসবে
আসলে আমি যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি
কেউ বুঝবে না, বােঝানাে যাবে না।

কই, কেউ তো ছিলো না 

কেউ কেউ ভালোবেসে ভুল করে, কেউ কেউ ভালোই বাসেনা
কেউ কেউ চতুরতা দিয়ে খায় পৃথিবীকে, কেউ কেউ বেলা যায়
ফিরেও আসে না
ওপরে চাঁদের কাছে মেঘ জমে পাহাড়ের মেষ তৃণে আগুন
লেগেছে
যাদের বাঁচার কথা ছিল, নেই, ভুল মানুষেরা আছে বেঁচে।
স্বপ্ন বারবার ভাঙে, তবু ফের স্বপ্ন উপাদান দেয় অচেনা নারীরা
তাদের গলায় দোলে রক্তমাখা অত্যুজ্জল ধাতুমালা, পান্না কিংবা
হীরা !
আমার যা ভালোবাসা, কাঙালের ভালোবাসা, এর কোন মূল্য আছে নাকি?
এ যেন জলের ঝারি, কেউ দেখা দেবে বলে হঠাৎ মিলিয়ে যায় বাবলা কাঁটার ঝোপে
যেমন জোনাকী!
সুধা ভ্রমে বিষ খাই, বিষ এত মিষ্টি বুঝি? তবে যে সকলে
বলো লোনা?
আমাকে মৃত্যুর হাতে ফেলে ওরা চলে যায়, বারবার
ওরা মানে কারা?
কই, কেউ তো ছিলো না!

নারী ও শিল্প 

ঘুমন্ত নারীকে জাগাবার আগে আমি তাকে দেখি
উদাসীন গ্রীবার ভঙ্গি, শ্লোকের মতন ভুরু
ঠোঁটে স্বপ্ন বিংবা অসমাপ্ত কথা।
এ যেন এক নারীর মধ্যে বহু নারী, কিংবা
দর্পণের ঘরে বাস
চিবুকের ওপরে এসে পড়েছে চুলের কালো ফিতে
সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না, কেননা আবহমান কাল
থেকে বেণীবন্ধনের বহু উপমা রয়েছে
আঁচল ঈষৎ সরে গেছে বুক থেকে-এর নাম বিস্রস্ত,
এ রকম হয়
নীল জামা, শাদা ব্রা, স্তনের গোলাপী আভাস, এক বিন্দু ঘাম
পেটের মসৃণ ত্বক, ক্ষীণ চাঁদ নাভি, সায়ার দড়ির গিঁট
উরুতে শাড়ীর ভাঁজ, রেখার বিচিত্র কোলাহল
পদতল-আল্পনার লক্ষ্মীর ছাপের মতো
এই নারী
নারী ও ঘুমন্ত নারী এক নয়
এই নির্বাক চিত্রটি হতে পারে শিল্প, যদি আমি
ব্যবধান ঠিক রেখে দৃষ্টিকে সন্ন্যাসী করি
হাতে তুলে খুঁজে আনি মন্ত্রের অক্ষর
তখন নারীকে দেখা নয়, নিজেকে দেখাই
বড় হয়ে ওঠে বলে
নিছক ভদ্রতাবশে নিভিয়ে দিই আলো
তারপর শুরু হয় শিল্পকে ভাঙার এক বিপুল উৎসব
আমি তার ওষ্ঠ ও উরুতে মুখ গুঁজে
জানাই সেই খবর
কালস্রোত সাঁতরে যা কোথাও যায় না।

দুই বন্ধু 

–কোন দিকে যাবাে?
–যেদিকে যখন খুশি, যাসনি দক্ষিণে
–এই মাত্র উত্তর সন্ধান করে ফিরে আসছি
–কি দেখলি?
—একটি রমণী তার হিংস্র নখে মেরে ফেললাে
একটি টিয়া পাখি,
পাখির রক্তের মধ্যে
মেশালে দুফোঁটা অশ্রু
তারপর হেসে উঠলাে –তারপর?
–নির্জনে নাচের সভা শুরু হলাে
–সভাসদ কারা?
–কেউ নয় কিংবা
একলা হিজল গাছ, ঝিরঝির নদী
এরাই দেখেছে সেই রমণীর
ছন্দোময় স্তন, ঊরু রেখার মহিমা

–আর তুই?
–আর আমি?
আদিবাসিনীর সেই অশ্রু মাখা হাসির উল্লাস
পাখিটির রক্ত
এর যেন অন্য কোনাে মানে আছে?
–হয়তাে রয়েছে।
–এবার বলতো কেন
নিষেধ করলি?
–আমি যা দেখেছি তােকে চাইনি দেখাতে
এক একটা দৃশ্য থাকে
নিজের বুকের মধ্যে কারুকার্য করে রাখা
অন্যের প্রবেশ মানা
সেইটাই সবার কাছে দক্ষিণের প্রবল নিষেধ।

এক পলক 

(বাংলা চার অক্ষর)

যেই এক পলক ফেললাম, দৃশ্য বদলে গেল
রোদ ঝলকাচ্ছিল না? এখন মৃদু চুম্বনের শব্দে বৃষ্টি পড়ছে
সেই বৃষ্টির রং একটি কিশোরীর ঘুমভাঙা চোখের মতন
যে-রাস্তায় ছজন লোক হল্লা করছিল, এখন সেখানে
শুধু এক অন্ধ ভিখিরি
পেয়ারা গাছের ডালটায় তিনটে ছাতারে পাখি নেই,
একটি মাত্র ফড়িং
বদলে যায়, এক পলকে অনেক কিছু বদলে যায়
বিনতা মাসি হাঁটু গেড়ে চোখ বুজে বসে আছেন, আগে তাঁর চোখে
চশমা ছিল না
রশিদ খান হারিয়ে গিয়েছিল, মশমশিয়ে হেঁটে আসছে রশিদ
পাশের তালাবন্ধ বাড়িটায় কেউ গলা সাধছে
মাঠের মধ্যে ফাঁকা মঞ্চ, মুখ্যমন্ত্রী সাপ-লুডো খেলছেন
তাঁর মেয়ের সঙ্গে
একটা ঘুড়ি দুলতে দুলতে গোঁত খেয়ে পড়ল পুকুরে
গেরুয়া পরা ছোট মামা মাথার চুলের মুঠি ধরে কাঁদছেন
ইস্কুলের ঘণ্টা হঠাৎ বেজে উঠল আজ ছুটির দিনে
একটু জিরিয়ে নেবার জন্য চেতন মিস্তিরি বাজাচ্ছে বাঁশি
ব্রিজের ঠিক মাঝখানে গম্বুজের মতন দাঁড়িয়ে আছে নিষ্পলক শেখ সুলেমান
সুনীল গাঙ্গুলির কলমের ডগায় প্রেমের কবিতার বদলে মৃত্যুভাবনা
চেনা মাছওয়ালা ঢোল বাজিয়ে মেতে উঠেছে হরি সংকীর্তনে
বারান্দা থেকে ঝুঁকে আছে যে-মেয়েটি, তাকে ঝাপটা দিয়ে গেল
পলাশ রঙের আলো
বদলে যায়, এক পলকে অনেক কিছু বদলে যায়
কৃষ্ণচূড়া পাতার আড়ালে একটা কোকিল শুধু ডেকেই চলেছে
কেউ সাড়া দেয় না, তবু সে ডাকে।

বঞ্চনা

সিংহদ্বার খুলে গেছে, ভেতরে দেখি শুধুই শূন্যতা
হা হা করছে অন্ধকার
কেউ নেই, কোনো রহস্যও না
যেন বালক বয়েসের হাওয়া ঘুরে যায়
দু’ একটা শুকনো পাতার শব্দ—
কেউ নেই ? আমি চেঁচিয়ে উঠি
প্রতিধ্বনি আসে কেউ নেই, নেই, নেই—
আমার তীব্র অভিমান হয়
এ কি এক ধরনের বঞ্চনা নয় ?
যদি কেউ না থাকবে, তবে দ্বার কেন বন্ধ ছিল?
কেন প্রতীক্ষায় ছিলাম এতদিন!

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস। ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

৩০.

নিন্দার বহু চোখ

বাড়িটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ, যে ধরনের বাড়ি শহরের ভেতরে অগণিত, চোখে পড়ে আবার পড়ে না। দোতলা, দেওয়ালের রং উঠে গিয়ে জায়গায় জায়গায় স্যাঁতস্যাঁতে দাগ, বারান্দার লোহার গ্রীলে পুরনো রঙের খসখসে স্তর, টবে মরে যেতে থাকা গাছ, সব মিলিয়ে এমন এক নির্লিপ্ততা, যা ভেতরের জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে যায়। কিন্তু এই বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে মানুষ শুধু বাস করে না, এখানে মানুষ মানুষকে লক্ষ্য করে, বিচার করে, মাপে। যেন প্রতিটি দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত আছে অদৃশ্য কিছু চোখ, যারা কখনও ঘুমোয় না।বেল্লা এই বাড়িতেই বড় হয়েছে। এই দেখার ভিতরেই। এই অদৃশ্য নজরের মধ্যে। সকাল শুরু হয় মায়ের গলার আওয়াজে। শিউলি দরজায় নক করেন না, ধাক্কা দেন—একটা তাড়াহুড়ো, একটা অধৈর্য, যেন সময়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা।
—বেল্লা! উঠবি না? এত ঘুমালে শরীর খারাপ হয়ে যাবে।

পিসির মন্তব্যে, টিভির ছবিতে, সহপাঠীদের শরীরে। একদিন সে এই কথাটা বলেছিল মিতাকে।
স্কুলের টিফিন টাইম। ক্লাস ফাঁকা। মিতা খাচ্ছে, বেল্লা চুপচাপ বসে।
—মিতা…
—কী?
—আমার শরীরটা… ঠিক না মনে হয়।
মিতা প্রথমে হেসে ফেলেছিল। —এইসব নিয়ে এত ভাবিস কেন?
তারপর একটু ঝুঁকে এসে বলল—শোন, একটা প্রেম কর। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেল্লা অবাক হয়েছিল।
—মানে?
—মানে, কেউ তোকে চাইবে, ছোঁবে… তখন তোর নিজেরও ভাল লাগবে।

ঘুম ভাঙার আগেই শরীরের প্রসঙ্গ চলে আসে। বেল্লা চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার মনে হয়, দিন শুরু হওয়ার আগেই যেন তাকে একটা অদৃশ্য পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। আয়নার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তবু কখনো কখনো তাকিয়ে ফেলে, আর তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়। তার নিজের মুখ তার কাছে অচেনা লাগে। যেন এটা তার নয়, অন্য কারও। রান্নাঘর থেকে বাসনের শব্দ, গ্যাসের আগুন, এটাওটার টুংটাং, আর মায়ের গলার তীক্ষ্ণ ওঠানামা সব মিলিয়ে সকালের একটা নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি হয়। সেই ছন্দের ভেতরে কোথাও কোনও কোমলতা নেই, আছে কেবল প্রয়োজন।
—খেয়ে নে আগে। না খেলে পরে মাথা ঘুরবে, তখন আবার আমাকেই সামলাতে হবে।

এই ‘আমাকেই সামলাতে হবে’ কথাটার মধ্যে একধরনের দায় আছে, কিন্তু তার মধ্যে ভালবাসার উষ্ণতা নেই। যেন সব কিছুই দায়িত্ব, অনুভূতি নয়। খাওয়ার টেবিলে বসে বেল্লা। অরিন্দম ইতিমধ্যেই বসে পড়েছেন। তার সামনে খবরের কাগজ, চোখ নিচু, ঠোঁটের কোণে স্থায়ী ক্লান্তি। তিনি এমন মানুষ, যিনি বাড়িতে থাকেন, কিন্তু বাড়ির ভেতরের কথোপকথনে পুরোপুরি থাকেন না।
—আজ স্কুলে কী আছে?
শিউলির প্রশ্ন।
—কিছু না।
বেল্লার উত্তর।
—সবসময় কিছু না! তোর জীবনে কিছুই হয় না নাকি?

অরিন্দম চশমার ফাঁক দিয়ে একবার তাকালেন। কিছু বললেন না। আবার কাগজে চোখ নামিয়ে নিলেন। এই টেবিলে কথাবার্তা হয়, কিন্তু যোগাযোগ হয় না। প্রত্যেকে নিজের ভেতরে আটকে থাকে।

দুপুরবেলা পিসি এলেন। কমলা পিসি। তিনি এই বাড়িতে এলেই শব্দ বাড়ে, কথার গতি বাড়ে, আর সঙ্গে সঙ্গে বিচারও বাড়ে।
—এই বেল্লা, আয় তো দেখি।
বেল্লা এগিয়ে যায়, জানে কী আসছে। পিসি তার দিকে তাকিয়ে, চোখ বুলিয়ে নিলেন মাথা থেকে পা পর্যন্ত।
—খুব শুকিয়ে গেছিস। এই বয়সে এমন থাকলে কিন্তু পরে সমস্যা হবে।
এই ‘সমস্যা’ শব্দটা বেল্লার ভেতরে ঢুকে যায়। কী সমস্যা? কার সমস্যা? কেউ ব্যাখ্যা করে না, তবু সবাই জানে।
পিসি আবার বললেন,
—মেয়েদের শরীর ঠিকঠাক না হলে তো বিয়ে-থা করতে অসুবিধা হয়।
এই কথাটা যেন সরাসরি নয়, কিন্তু খুব স্পষ্ট। বেল্লা মাথা নিচু করে। তার শরীর এখন কেবল তার নিজের নয়, একটা ভবিষ্যতের হিসেবের অংশ।
বিকেলে পাশের বাড়ির রেনু কাকিমা এলেন। তার কথা বলার ভঙ্গি নরম, কিন্তু তাতে একটা সূক্ষ্ম কৌতূহল থাকে।
—বেল্লা, বড় হচ্ছিস তো এখন। নিজের দিকে একটু খেয়াল রাখিস।
এই ‘নিজের দিকে খেয়াল রাখা’ -এর মানে কী? খাওয়া? সাজা? শরীর বদলানো? কেউ পরিষ্কার করে না। কিন্তু এই অস্পষ্ট নির্দেশই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করে। সন্ধ্যেবেলা টিভি চলছে। একটা সিরিয়ালে বিয়ের দৃশ্য। সাজগোজ করা মেয়ে, উজ্জ্বল আলো, হাসি। শিউলি হঠাৎ বললেন,
—দেখেছিস? কী সুন্দর গড়ন মেয়েটার!
গড়ন। এই শব্দটা আবার ফিরে আসে। বেল্লা চুপ করে থাকে। তার মনে হয়, তার শরীর যেন কোনও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। রাতে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। এই ঘরটাই তার একমাত্র জায়গা, যেখানে কেউ সরাসরি তাকায় না। তবু, এখানেও সে নিজেকে পুরো মুক্ত মনে করে না। সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে নিজের শরীরের দিকে তাকায়, একটা বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে। যেন সে নিজেকে দেখছে না, অন্য কাউকে দেখছে। তার মনে হয়, এই শরীরটা যেন ঠিকঠাক নয়। কোথাও যেন কিছু কম, কোথাও যেন কিছু অসম্পূর্ণ। এই অনুভূতির উৎস কোথায়? সে জানে না। কিন্তু প্রতিদিন এই অনুভূতি একটু একটু করে জমে উঠেছে মায়ের কথায়, পিসির মন্তব্যে, টিভির ছবিতে, সহপাঠীদের শরীরে। একদিন সে এই কথাটা বলেছিল মিতাকে।
স্কুলের টিফিন টাইম। ক্লাস ফাঁকা। মিতা খাচ্ছে, বেল্লা চুপচাপ বসে।
—মিতা…
—কী?
—আমার শরীরটা… ঠিক না মনে হয়।
মিতা প্রথমে হেসে ফেলেছিল। —এইসব নিয়ে এত ভাবিস কেন?
তারপর একটু ঝুঁকে এসে বলল—শোন, একটা প্রেম কর। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেল্লা অবাক হয়েছিল।
—মানে?
—মানে, কেউ তোকে চাইবে, ছোঁবে… তখন তোর নিজেরও ভাল লাগবে।
এই কথাগুলো শুনে বেল্লার ভেতরে কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। তার সমস্যাটা কি এত সহজ? তার শরীর কী কারও স্পর্শে ‘ঠিক’ হয়ে যাবে? সে আর কিছু বলেনি।

আরেকদিন সিনিয়র রিমা বলেছিল,
—ম্যাসাজ পার্লারে গেলে শরীর ঠিক হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
এই কথাটা শুনে বেল্লার মনে হয়েছিল, মানুষ কী সত্যিই এমনভাবে শরীরকে বদলায়? শরীর কি একটা যন্ত্র, যাকে ঠিক করা যায়? স্কুলের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজেকে আলাদা মনে করে। চারপাশে মেয়েরা হাসছে, গল্প করছে, নিজের শরীর নিয়ে নির্ভার। তাদের হাঁটার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস। বেল্লা পারে না। তার হাঁটা ধীর, চোখ নিচু, কাঁধ সামান্য কুঁজো। সে যেন নিজেকে ছোট করে ফেলতে চায়। সেদিন ক্লাসে সোমদত্তা বলছিলেন,
—মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় নিজের দৃষ্টি। অন্যরা যা বলে, তার চেয়েও বেশি।
বেল্লা মাথা তুলেছিল। এই কথাটা যেন তার ভিতরে ঢুকে গেল। সে বুঝল, তার সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের মানুষ নয়। তার নিজের চোখ। বাড়ি ফিরে সে খাতাটা খুলল। কলম হাতে নিল। অনেকক্ষণ কিছু লিখল না। তারপর ধীরে লিখল, আমার শরীর নিয়ে এত কথা, কিন্তু আমার ভিতরের কথাগুলো কে শুনবে?… লিখে সে থেমে গেল। তার হাত কাঁপছিল। এই প্রথম সে নিজের যন্ত্রণাকে শব্দে ধরার চেষ্টা করল।

সেদিনই রাতে খাওয়ার সময় আবার একই দৃশ্য। মা বলছেন, বাবা চুপ, বেল্লা নীরব। হঠাৎ অরিন্দম বললেন,
—ওকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও।
শিউলি বিরক্ত হয়ে বললে,
—নিজের মতো থাকতে থাকতে কী হবে? পরে যদি সমস্যা হয়?
এই ‘সমস্যা’ আবার! বেল্লা বুঝতে পারে যে এই বাড়িতে তাকে ভালবাসা হয়, কিন্তু তাকে বোঝা হয় না।
রাতে নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। জানালার বাইরে অন্ধকার। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। সে আবার খাতাটা খোলে। আজ আর ভয় লাগছে না। সে লিখতে থাকে, আমি আয়নায় নিজেকে দেখি না, আমি দেখি অন্যদের চোখ। আমার শরীর আমার নয়, তাদের কথার তৈরি।…
কলম থামে না। শব্দগুলো আসতে থাকে। তার মনে হয়, যদি সে না লেখে, সে ভেঙে যাবে। এই বাড়ি, এই মানুষগুলো– তারা তাকে আঘাত করতে চায় না। তবু তারা আঘাত করে। কারণ তারা জানে না, কোনও কথা কোথায় গিয়ে বিঁধে।
রাত গভীর হয়। বেল্লা খাতাটা বন্ধ করে বুকে চেপে ধরে। তার চোখে জল আসে না। কিন্তু বুকের ভেতর একটা ভার জমে থাকে। এই ভার নিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ে। এই প্রথম সে বুঝতে শুরু করেছে, তার যন্ত্রণা কেবল তার নয়। এটা তৈরি হয়েছে বহু মানুষের কথা, দৃষ্টি, প্রত্যাশা দিয়ে। আর এইসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খুঁজছে। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

 

🍂কবিতা 

 

অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

নতুন প্রাণ 

বৈধব্যে নীল আকাশ
নিচে সারা মাঠ জুড়ে সুধাময় শস্য ফুল।
সুধাকর এসে নিয়ম মেনে
সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে শোভা বাড়ায় নাক ফুল।
সেজে উঠে প্রকৃতি
নানা ফুল পলাশ শিমুল।
ধুধু মাঠ ঘাট
পিঠ সেঁকে রোদের কিরণে।
দীর্ঘ ভ্রমণের পথ ছেড়ে
অশ্বত্থ্ছায়া তলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা
শীতল ছায়ায় স্মৃতি বিছায়
দূরে বহু দূরে জন্ম লগ্ন থেকে বিদায়ের সন্ধিক্ষণে।
যেমনি উঠে প্রভাত ও সূর্যের হাসির রোল
তেমনি বিদায় সূর্য ধূসর পরিধানে
সমাপ্তি শেষে প্রস্তুত আবার নতুন প্রাণে।

 

 

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় -এর দু’টি কবিতা

গোপন চিঠি 

শরীর মানে অল্প আলো, গোপন চিঠি…

আমি এই শব্দগুলো আঙুলে ধরে পড়ব।

চোখের কোণে জমে থাকা নরম অন্ধকার
ধীরে ধীরে গলে যায় ঠোঁটের কাছে এসে…

শ্বাসের ভেতর উষ্ণতা
ছড়িয়ে পড়ছে বিছানায়
জানলার বাইরে শহর, ঘুমিয়ে পড়ে
ভিতরে ভিতরে জেগে থাকে ধীর ছন্দ

এখন একটু কাছে এলেই বোঝা যায়
ভালবাসা আসলে শরীরেরই আরেকটি নাম…

তাই?

 

ছায়া-ছবি 

ঘাড়ের কাছে থেমে থাকা সন্ধ্যা
আমি সেখানে মুখ রেখে সময়কে মাপি।

নরম ত্বকের নিচে ছায়া
নিজের মতো করে ডাকে, এসো…

তুমি হাসলে
শরীর জুড়ে
ঢেউ ওঠে
আমি শুধু তার তীর খুঁজে ফিরি
অল্প স্পর্শেই খুলে যায় দরজা…
ওখানে ভাষা ঢুকতে পারে না

রাত তখন গভীর, অথচ হালকা…
আমাদের মাঝখানে শুধু নিঃশ্বাসের যাওয়া-আসা

 

 

সৌমনা ঘোষাল -এর দু’টি কবিতা

আবাদ 

হঠাৎ খুব সাধারণ লাগে পৃথিবীটা।

জানলার বাইরে পৃথিবী
সে আর আলাদা করে ডাকে না।

তোমার হাতের কাছে আমার হাত
কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকে।

কিছু কথা বলা যায় না
তবু বোঝা যায়, স্পর্শে;

রাত গভীর আমরা নিজেদের কাছেই
আরও কাছে ফিরে আসি।

 

আমাদের কবিতা 

শরীরের গন্ধে
চেনা ঘরটাও
নতুন হয়ে গিয়েছে!

তাকিয়ে দেখি
এইটুকুই যথেষ্ট আমার জন্য

কাছে এলে সময়, ধীরে ধীরে নামে ঊরুর ওপর
ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে যায়!

একটু স্পর্শ, খুব স্বাভাবিক,
তার ভেতরে ঢেউ লুকনো।
কথা না বলেও
আমরা অনেক কিছু বলে ফেলি।

 

অরবিন্দ রায় -এর দু’টি কবিতা

শিরোনামহীন 

শাড়ির ভাঁজ, এখানে বিকেলে
আমি একটু কাছে গিয়ে খুঁজি গন্ধটুকু!
চুলে তোমার বৃষ্টির গন্ধ,
আঙুলে আমার অনভ্যস্ত কাঁপুনি।
চোখাচোখি হলেই
শহরটা হালকা নড়ে ওঠে,
ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন দুলছে
তুমি বলো : এত সিরিয়াস কেন?
আমি হেসে বলি : আসলে আবহাওয়া।
নীরবতা নেমে এলে বারান্দায়
দু’জনের নীরবতা আলতো ছুঁয়ে যাই…
তারপর হঠাৎ হাত ছুঁয়ে ফেলা
বাকি সব গল্প বাতাস বুঝে নেয়।

 

অঙ্কন : নাফিস মুঈন

আরও একটি শিরোনামহীন 

ওই ঠোঁটে উষ্ণতা

আমি শুধু দূর থেকে অভিধান খুঁজি

ঘড়ির কাঁটা থমকে
থাকে খানিক
সময়ও স্থির

কাঁধ…
তোমার হালকা চাপ
বাড়িটা তখন
একদম ব্যক্তিগত

জানলার বাইরে
নির্লিপ্ত চাঁদ
ভিতরে ছোট ছোট নদীর মত
দুঃসাহসী মৌনতা

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

হারিয়ে যাওয়া নারীর 

ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

১৭. 

সুনয়নাদি

এভাবেই সময় গড়িয়ে যায় সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। নেই নেই করে প্রায় ছটা মাস সোমাদি কাজ করছে। পড়ন্ত বিকেলের ছাদে দাঁড়িয়ে রুক্ষ শুষ্ক গাছগুলোকে একটু সতেজ করার জন্য ছাদের বালতি থেকে মগে করে তিথি জল দিতে দিতে এসব কথাই ভাবছিল। কাজের চাপে সুনায়নার খোঁজ নেওয়া হয়নি। স্কুলে পরীক্ষা চলল তার উপর ইলেকশন ডিউটি কেমন যেন একটা ভজগট ব্যাপার। লাস্ট কথা হয়েছিল বলেছিল হসপিটালে ভর্তি হবে, কিছু খবর তো দিল না। বলেছিল বৌদি আমাকে দেখতে এসো। সোমাদিও তো কিছু বলল না কী হল কেমন আছে কে জানে! যা ভ্যাপসা গরম দিয়েছে, ছাদেতেও পা রাখা যাচ্ছে না।

সত্যিই তো ওদের ভালবাসার সন্তান এভাবে চলে যাবে মায়ের বুক খালি করে কেউ ভাবতে পারে? এটা বড্ড কষ্টের সন্তানহারা মা ছাড়া কেউ বুঝবে না। ঈশ্বর ওকে সহ্য করার ক্ষমতা দিক, এছাড়া আর তিথি কী বলতে পারে ভগবানের কাছে। তবে সোমাদি কেন কথাটা জানালো না এটাই বুঝতে পারছে না। এক মাসে একবারও উচ্চারণ করল না। বিচিত্র এ পৃথিবী বিচিত্র মানুষের মন।

—একি মা তুমি এখানে কি করছ?
—গরম করছে। পায়ে গরম লাগছে এসো এসো তোমাকে একটু কোলে নিই ওলে বাবা, ওলে বাবা ওলে চাপবে না আজ! আচ্ছা ঠিক আছে মা পুচু। ওরে বাপরে ওটাতো প্রজাপতি তুমি ধরবে? তুমি ধরতে পারো, ধরতে পারো, আচ্ছা আচ্ছা খেলু খেলু করো। একটু চোখের আড়াল হবার। উপায় নেই। তিথিকে দেখতে না পেলেই এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াবে আর এটুকু জানে যে বিকেল বেলা ছাদেতেই আছে। তাই চলে এসেছে। ওদিকে ‘ও বৌমা বৌমা ও বৌমা।’
তিথি কান খাড়া করে শুনল কী ব্যাপার মনে হচ্ছে মায়ের গলা —হ্যাঁ মা আমি ছাদে আছি
—একটু আসো।
—হ্যাঁ যাই।
তিথি ছাদ থেকে তরতর করে নিচে নেমে আসলো পড়বে কি মরবে সে চিন্তা নেই। আর একটাই চিন্তা কাজ করছে আবার কি শাশুড়ি মা’র কিছু হল। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়াল শাশুড়ি মার ঘরের সামনে। দেখলো কল্যাণী দেবী বিছানায় বসে। তিথি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে জিজ্ঞেস করল
—হ্যাঁ মা বলুন।
—আমাকে বাথরুমে নিয়ে চলো।
—আচ্ছা চলুন।
—আমাকে ধরুন, সাবধানে পা ফেলুন।
—আচ্ছা–
—অসুবিধা হচ্ছে না তো।
—না না না।
—আচ্ছা, বৌমা আজকে সোমা আসেনি?
—এখনও তো ঢুকল না কি জানি আসবে কিনা!
—বাথরুমের দরজাটা লাগাবেন না।
—না না এখন কোন অসুবিধে নেই।
—আচ্ছা ঠিক আছে। হয়ে গেলে আমাকে ডাকবেন।
—ওই যে ফোন বাজছে।
—কে ফোন করল কে জানে
—হ্যালো…
—ও বৌদি।
—কে?
—আমি সোমা বলছি…
—হ্যাঁ বলো।
—আজকে বিকেলে কাজে যাচ্ছি না।
—-বিকেল গড়িয়ে গেল সোমাদি। এখন বলছ।
—যেতে পারলাম না একটু অসুবিধে হয়ে গেল একটু চালিয়ে নাও।
—একটু আগে বলতে পারো না! অসুবিধেটা যখন হয়েছে তুমি জানো তা, একটু আগেই ফোন করতে পারতে।
—হ্যাঁ করতে পারতাম ফোনটা আমার কাছে ছিল না।
—বেশ কোথায় যাবে?
—একটু হসপিটালে যাব।
—আগামীকাল আসবে তো?
—দেখি।
তিথির রাগে মাথাটা গরম হয়ে গেল। মানেটা কী?
মনে করে যেন সমস্ত বিশ্বটা এখনই গ্রাস করে ফেলবে। নিজেকে কন্ট্রোল করল, বলল কুল কুল, তিথি।
—কালকে আসবে কি আসবে না সেটা কনফার্ম বলতে পারবে না, আমাকে তো কাজগুলো গোছাতে হবে নাকি গো।
—না মানে বৌদি মনে হয় আসতে পারবো না।
—আবার সেই মনে হয় বোধহয় এগুলো ছাড়ো না বলো যে আসতে পারবে না।
চুপ করে থাকে সোমা।
কোনও মানে হয় এত কাজ একসঙ্গে সামলানো ওদিকে সুইটিও শুরু করেছে কামাই।
ফোনটা কেটে দিয়ে তিথি আপন মনে গজগজ করতে লাগল।
কি বিপদ! প্রায় সন্ধ্যা হয়েই গেল এত বাসন-কাশন সব রয়েছে ঘর মোছা বাকি রয়েছে এখন যদি বলে কাজে আসবে না কি করে হয়! কি আর করা যাবে আসবে না যখন যতই রাগ করি না কেন কাজগুলো তো তাকেই গোছাতে
হবে। অন্যদিকে সুনয়নার জন্য মনটা ভারী হয়ে আছে কেন? এতদিন হয়ে গেল ফোন করল না কে জানে। দেখি কাজগুলো গুছিয়ে নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় একবার ওকে ফোনটা করতে হবে। অন্যদিকে শ্বেতাম্বরী এসে কিউ কিউ করে কিছু একটা বলতে চাইল, কি হয়েছে মা? কি করবে? তুমি কি বাথরুম করতে যাবে? যাবে? ছাদে যাবে। চলো। এরা পশু হলে কী হবে ওদের সঙ্গে মিশলে বোঝা যায় ওরা কি বলতে চায়। রাজ্যের কাজ পরে রয়েছে। যাও ছাদের দরজা খুলে দিয়েছি যাও। পুচু দ্রুত চলে গেল ছাদে। এই যা কথায় কথায় চায়ের জল বসানো আছে জল ফুটতেই আছে, রান্না ঘরে ঢুকে চা টা করে শাশুড়ি মাকে দিতে গেল তিথি।
—মা এই নিন আপনার চা।
—কি হল বৌমা? আজকে তো ঘর মুছতে আসলো না সোমা।
—আর কি বলি আপনাকে এই নিয়েই তো ফোনে তর্ক হল। আসবে না। আসলে একজনকে দেখছে কন্টিনিউ কামাই তো ও ভেবে নিয়েছে এ কামাই ঠিকঠাক করলে এরা কিছু বলতে পারবে না। এদেরও লোকের দরকার ঠিক বুঝে গিয়েছে।
—আচ্ছা বৌমা ‘সু’র কোনও খবর পেলে?
—না পাইনি তবে ভাবছি নিজেই একবার ফোন করব।
—হ্যাঁ তাই কর।
—পবিত্র ফিরেছে।
—না এই সময় হয়ে গিয়েছে ফিরবে।
—মা আপনি চা খেয়ে রেখে দিন পরে এসে নেব।
—ঠিক আছে। ঠিক আছে। দাদুভাই কিছু খাবে তো?
—হ্যাঁ খাবে, ওর জন্য ম্যাগী করা হয়েছে।
—বাহ সুন্দর। ওতো খেতে পছন্দ করে।
কথাগুলো বলে দ্রুত পায়ে তিথি চলে গেল। সব কাজ গুছিয়ে করতে সাড়ে ছটা বেজে গেল এবার তিথি ফ্রেশ হয়ে সব একটু বসেছে তখনই ফোন বাজতে শুরু করেছে।
—দেখো তো কে ফোন করল।
-তুমি দেখো না।
—বাপরে তুমি একবার ফোন ঘাটতে শুরু করলে, অন্যের ফোন কিছুতেই দেখবে না।
—এই আমি ফোন ঘাটলে তোমার এত গায়ে লাগে কেন গো?
—দেখো, এই এত খাটাখাটনির পর না তর্ক করতে আর ভাল লাগে না আমার।
—সে তো ঠিকই।
—তোমরা সবাই হুকুম করবে, সময়ে কিছু না পেলে তার জন্য সব দায়ভার যেন আমার সংসারটা শুধু আমার একার।
—না তোমার একার নয় আমারও এটা স্বীকার করি।
—তাই যদি কর তাহলে বুবুনকে নিয়ে আসো।
—এই নাও ফোন রাগ ক’রো না।
—এতো সুনায়নার বাড়ি থেকে ফোন এসেছে।
—কি হল রে বাবা! আজকেই ওর কথা ভাবছিলাম। ফোন করব?
—হ্যাঁ করো।
—হ্যালো…
—কে বৌদি?
—হ্যাঁ তোমার কি খবর?
—আর কি খবর বৌদি? সর্বনাশ হয়ে গেছে।
—তিথি আমি বুবুনকে নিয়ে আসছি।
—কেন কি হয়েছে?
সুনয়না না, কাঁদতে শুরু করেছে
—তুমি তো হসপিটালে ভর্তি হবে বলেছিলে?
—হ্যাঁ হয়েছিলাম তো।
—তা আমাকে তো কিছু জানালে না!
—কি জানাতাম বৌদি! আমার নিজেরই মন মেজাজ ভাল নেই।
—ডাক্তার কি বলেছে?
সবকিছু হারিয়েছি আমার না সুখ কপালে নেই?
তিথি ঠিক বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে
—একটু পরিষ্কার করে বল…
—ফোনটা ওর বর কেড়ে নিয়ে বলল, বৌদি বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি।
—সে কি!
—এই খবরটা আপনারা পাননি।
—না না সোমাদিও তো কিছু এসে বলেনি।
—হ্যাঁ খবর পাঠিয়েছিলাম। হয়তো ভুলে গেছে।
—ঠিক আছে বৌদি রাখছি, ওকে তো সামলাতে হবে।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক আছে।
সত্যিই তো ওদের ভালবাসার সন্তান এভাবে চলে যাবে মায়ের বুক খালি করে কেউ ভাবতে পারে? এটা বড্ড কষ্টের সন্তানহারা মা ছাড়া কেউ বুঝবে না। ঈশ্বর ওকে সহ্য করার ক্ষমতা দিক, এছাড়া আর তিথি কী বলতে পারে ভগবানের কাছে। তবে সোমাদি কেন কথাটা জানালো না এটাই বুঝতে পারছে না। এক মাসে একবারও উচ্চারণ করল না। বিচিত্র এ পৃথিবী বিচিত্র মানুষের মন।
আজকে সত্যিই পুরনো কাজের মাসিদের কথা মনে পড়ছে। কাগজি মাসিটাই বা কেমন আছে কে জানে? অনেকদিন তো মাসি আসেনি বাড়িতে। তিথির মনটাই এরকম। সবার জন্য ভেবে ভেবে মরে। হঠাৎ গানটার কথা মনে পড়ে বন্ধু তোমার চোখের ভাজে চিন্তা খেলা করে ,বন্ধু তোমার কপাল জুড়ে চিন্তা লোকের ছায়া… 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂ছোদের আসর |ল্প 
ঠিক তখনই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। হঠাৎ করে জোরে হাওয়া বইতে লাগল। পাপড়ি ভয় পেয়ে অরণ্যদার একটি ডাল শক্ত করে ধরে রইল।
‘ভয় পাস না কিন্তু,’ অরণ্যদা বলল, ‘আমি আছি তো এই দ্যাখ।’

 

ফুলপরি আর গাছবন্ধু

অঙ্কন : অভিলাষা ঘোষ গৌরী

শংকর সান্যাল

নেক দিন আগের কথা। রঙিন একটি জাদুর জঙ্গলে থাকত ছোট্ট একটি ফুলপরি। ওঁর নাম পাপড়ি। পাপড়ির ডানাগুলো ছিল গোলাপি আর নীলের মিশেলে ঝলমলে। আর সে যখন উড়ত, তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত ফুলের মিষ্টি গন্ধ। জঙ্গলের সব ফুল আর প্রজাপতি ছিল তার বন্ধু। কিন্তু পাপড়ির সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল একটি পুরনো শালগাছ, তার নাম ছিল অরণ্যদা। অরণ্যদা ছিল খুব বড় আর জ্ঞানী। তাঁর ছায়ায় দাঁড়ালে গরমেও ঠাণ্ডা লাগত। পাখিরা এসে তার ডালে বাসা বাঁধত, কাঠবিড়ালিরা খেলত তাঁর গায়ে, আর পাপড়ি প্রতিদিন সকালে উড়ে এসে বসত তার একটি ডালে।

কান্নাভেজা চোখে পাপড়ি জিজ্ঞেস করল
‘তুমি কষ্ট পাচ্ছ?’
অরণ্যদা একটু হেসে বলল, ‘কিছুটা তো লাগে। কিন্তু তুই ঠিক আছিস, সেটাই বড় কথা।’
পাপড়ির চোখে ঝেঁপে জল এসে গেল। বলল, ‘তুমি আমার জন্য এত কিছু সহ্য করলে! আমি কীভাবে তোমার উপকার করব?’
অরণ্যদা বলল, ‘বন্ধুত্বে উপকারের হিসেব করতে নেই। তুই শুধু পাশে থাকলেই আমি ভাল থাকি।’

একদিন পাপড়ি এসে বলল, ‘অরণ্যদা, তুমি তো এত বড়, এত শক্তিশালী। তোমার কি কখনও একা লাগে না?’ অরণ্যদা ওমনি হেঁসে বলল, ‘না রে, আমি তোকে পেয়েছি, পাখিদের পেয়েছি, বাতাসকে পেয়েছি। আমি কখনও একা নই। কিন্তু তুই? তোর তো অঅঅনেক বন্ধু।’ পাপড়ি একটু চুপ করে বলল, ‘সবাই আছে, কিন্তু কেউ তো তোমার মতো গল্প বলতে পারে না।’
এই শুনে অরণ্যদা খুব খুশি হল। সে বলল, ‘আজ তোকে একটা গল্প বলি শোন, বন্ধুত্বের গল্প।’
ঠিক তখনই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। হঠাৎ করে জোরে হাওয়া বইতে লাগল। পাপড়ি ভয় পেয়ে অরণ্যদার একটি ডাল শক্ত করে ধরে রইল।
‘ভয় পাস না কিন্তু,’ অরণ্যদা বলল, ‘আমি আছি তো এই দ্যাখ।’

ঝড় শুরু হল। বৃষ্টি, বজ্রপাত জঙ্গল যেন কেঁপে উঠল। ছোট ছোট গাছগুলো দুলতে লাগল। কিছু ডাল ভেঙেও পড়ল। পাপড়ি কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘অরণ্যদা, তুমি ঠিক থাকবে তো?’
অরণ্যদা শান্ত গলায় বলল, ‘আমি অনেক ঝড় দেখেছি। কিন্তু তুই শক্ত করে ধরে থাক, কিছুটি হবে না।’

অনেকক্ষণ পর ঝড় থামল। চারদিকে জল আর জল, ভাঙা ডাল আর ক্লান্ত নীরব সব। পাপড়ি ধীরে ধীরে চোখ খুলল। ও দেখল, অরণ্যদার ক’য়েকটা ডাল ভেঙে গিয়েছে। ওমনি পাপড়ির চোখ ভর্তি জল। আর হবেই না কেন। কান্নাভেজা চোখে পাপড়ি জিজ্ঞেস করল
‘তুমি কষ্ট পাচ্ছ?’
অরণ্যদা একটু হেসে বলল, ‘কিছুটা তো লাগে। কিন্তু তুই ঠিক আছিস, সেটাই বড় কথা।’
পাপড়ির চোখে ঝেঁপে জল এসে গেল। বলল, ‘তুমি আমার জন্য এত কিছু সহ্য করলে! আমি কীভাবে তোমার উপকার করব?’
অরণ্যদা বলল, ‘বন্ধুত্বে উপকারের হিসেব করতে নেই। তুই শুধু পাশে থাকলেই আমি ভাল থাকব।’

পরের দিন থেকে পাপড়ি একটি নতুন কাজ শুরু করল। ও প্রতিদিন জঙ্গলের নানা ফুল থেকে মধু আর শিশির এনে অরণ্যদার ভাঙা ডালগুলোর কাছে ছড়িয়ে দিত। পাখিদের বলত, ‘অরণ্যদার যত্ন নাও।’ কাঠবিড়ালিদের বলত, ‘ওঁর গায়ে লাফালাফি কম করো।’
ধীরে ধীরে অরণ্যদা আবার সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। তাঁর নতুন কুঁড়ি বেরল, পাতাগুলো আবার সবুজ হয়ে উঠল।
এরপরে একদিন অরণ্যদা বলল, ‘পাপড়ি, তুই না থাকলে হয়ত এত তাড়াতাড়ি আমি ভাল হতাম না।’
পাপড়ি হেসে বলল, ‘তুমিও তো আমাকে বাঁচিয়েছ। আমরা দু’জনেই একে অপরের শক্তি।’

তারপর থেকে জঙ্গলে সবাই জানত যে, ফুলপরি পাপড়ি আর শালগাছ অরণ্যদা শুধু বন্ধু নয়, তারা একে অপরের পরিবারের মত। আর যখনই জঙ্গলে ঝড় আসত, পাপড়ি আর ভয় পেত না। কারণ সে জানত, তার গাছবন্ধু অরণ্যদা সব সময়ই পাশে আছে।🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন