সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে বড়সড় আলোড়ন তৈরি করল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) -এর সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar) -এর সিদ্ধান্ত। একের পর এক সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এ বার দলীয় সমস্ত পদ ছাড়ার আবেদন জানিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে চিঠি দিলেন তিনি। বারাসতের (Barasat) সাংসদ তাঁর চিঠিতে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, আরজি কর (RG Kar) ঘটনার অভিঘাত এবং আই-প্যাক (I-PAC) -এর ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। কয়েক দিন আগেই বারাসত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ ছেড়েছিলেন কাকলি। তার পরপরই তৃণমূল মহিলা কংগ্রেস (Trinamool Mahila Congress) -এর চেয়ারপার্সন-সহ বাকি সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি চেয়ে রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে (Subrata Bakshi) লেখা চিঠিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমার বিবেক আজ গভীর ভাবে আলোড়িত। রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি-সহ একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি ককরেছে।’
চিঠির বক্তব্যে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিতর্কিত ঘটনাগুলির উল্লেখ। বিশেষ করে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ (RG Kar Medical College) -এর প্রাক্তনী হিসেবে ২০২৪ সালের চিকিৎসক তরুণীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে তিনি গভীর ভাবে অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এই ঘটনাকে ঘিরে সম্ভাব্য ধামাচাপার অভিযোগ সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে, আমাকেও ব্যক্তিগত ভাবে প্রভাবিত করেছে।’ এই প্রসঙ্গ সামনে এনে তিনি কার্যত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। চিঠির আরও একটি অংশে কাকলি দলীয় সংস্কৃতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নাম না করেই তিনি শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) -এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। তিনি লিখেছেন, ‘যে পদে থাকাকালীন মহিলা সাংসদের উপর অন্য একজন অশিক্ষিত, অভদ্র দলীয় সাংসদের অশালীন আচরণ বন্ধ করা যায় না, কিংবা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সহযোগিতা পাওয়া যায় না, সেখানে সেই পদে থাকার কোনও অর্থ থাকে না।’ এই মন্তব্য ঘিরে দলের অন্দরে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
চিঠির দ্বিতীয় ভাগে উঠে এসেছে আই-প্যাক (I-PAC)-এর প্রসঙ্গ। তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে যুক্ত এই সংস্থাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কাকলি। তাঁর বক্তব্য, ‘যদি কোনও অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক প্রভাব ক্রমশ সংগঠনের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তা দলের আদর্শ ও ঐতিহ্যের পক্ষে শুভ নয়।’ এই মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, সংগঠনের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর অসন্তোষ দীর্ঘ দিনের। তবে নিজের সিদ্ধান্তকে তিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অভিমান থেকে নেওয়া নয় বলেই জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এখন থেকে দলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করতে চাই। দল, গণতন্ত্র এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই সিদ্ধান্ত।’ তাঁর এই অবস্থান অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে কাকলিকে সরানো হয়েছিল। সেই দায়িত্ব ফের দেওয়া হয় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই সিদ্ধান্তের পর সমাজমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কাকলি। তিনি লিখেছিলেন, ‘১৯৭৬ থেকে পরিচয়, ১৯৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।’ সেই পোস্ট নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এরই মধ্যে রবিবার বারাসত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ থেকেও তিনি ইস্তফা দেন। ফলে ধারাবাহিক ভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর এই পদক্ষেপ অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। মঙ্গলবার তিনি উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) প্রশাসনিক বৈঠকে। এই উপস্থিতি নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়। যদিও কাকলি পরে জানান, প্রশাসনিক বৈঠক কোনও দলের নয়, সেখানে অংশ নেওয়া দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাঁর কথায়, ‘প্রশাসন সবার জন্য, সেখানে দল দেখা ঠিক নয়।’ অন্য দিকে, শুভেন্দু অধিকারী জানান, তাঁদের সরকার ‘নির্বাচিত কিছু সাংসদ’-কে প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানাবে। তাঁর বক্তব্য, পূর্ববর্তী সময়ে বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের এমন বৈঠকে ডাকা হত না, সেই ধারা বদলাতে চায় বর্তমান সরকার। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ ঘিরে ইতিমধ্যেই তৃণমূলের অন্দরে চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরও এই ঘটনাকে হাতিয়ার করতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। দলের দীর্ঘ দিনের মুখ, অভিজ্ঞ সাংসদ এবং চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত কাকলির এই পদক্ষেপ আগামী দিনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জোর চর্চা চলছে। তাঁর চিঠির প্রতিটি লাইন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : TMC Opposition Status, Rathindranath Basu Speaker | বিধানসভায় তৃণমূলের মর্যাদা ও ঘর বরাদ্দ নিয়ে জটিলতা, স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর বার্তায় বাড়ল জল্পনা




