শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রত্ন থাইল্যান্ড (Thailand) বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। ভারতীয় ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে তো এই দেশ এখন যেন ‘বিদেশযাত্রার প্রথম ধাপ’। কারণ, সাগর, পাহাড়, বৌদ্ধ সংস্কৃতি, প্রাচীন ঐতিহ্য, সুস্বাদু খাবার এবং আতিথেয়তায় ভরা এই দেশের প্রতিটি কোণেই আছে আলাদা আকর্ষণ। সবচেয়ে বড় কথা, যাত্রাপথ সহজ, খরচও তুলনামূলকভাবে কম, তাই বছরে লাখো ভারতীয় পাড়ি দেন এই ‘ল্যান্ড অব স্মাইলস’-এ।
আরও পড়ুন : Travelog : Nahargarh Fort, Rajasthan | রাজপ্রাসাদের ছায়ায় নাহারগড়, জমকালো ঐতিহ্যের ব্যঞ্জনা
আগে যেখানে ব্যাংকক (Bangkok), পাটায়া (Pattaya) বা ফুকেট (Phuket) -এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ভ্রমণ, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর ও দক্ষিণ থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত প্রান্তেও। কেউ যাচ্ছেন চিয়াং মাই (Chiang Mai)-এর পাহাড়ি শান্ত শহরে, কেউ বা আন্দামান সাগরের ধারে ফুকেটের সূর্যাস্ত দেখতে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, থাইল্যান্ডে যাওয়ার সবচেয়ে আদর্শ সময় কোনটি? কোন মরসুমে গেলে খরচও কম, ভ্রমণও আরামদায়ক হবে?থাইল্যান্ড মূলত গরম দেশের তালিকায় পড়ে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে রোদ ও আর্দ্রতা। বর্ষায় এই দেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, বিশেষত দক্ষিণাংশে। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল এখানে একেবারে ‘গোল্ডেন সিজন’। এই সময় তাপমাত্রা মাঝারি, আকাশ পরিষ্কার, আর বাতাসে হালকা ঠান্ডার ছোঁয়া। ব্যাংকক ও পাটায়ার মতো শহরে ঘুরে দেখা, বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন, নাইট মার্কেট ঘোরা বা নদীপথে ভাসা, সবই উপভোগ করা যায় এই সময়টায়। শহরের মধ্যে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময়। নভেম্বর বা মার্চেও আবহাওয়া যথেষ্ট আরামদায়ক। দিনে সূর্যের আলো, রাতে হালকা শীত, এই সময় তাইল্যান্ডের শহুরে জীবনকে উপভোগ করার সবচেয়ে ভালো সময়। ব্যাংককের ‘গ্র্যান্ড প্যালেস’ থেকে শুরু করে পাটায়ার বিখ্যাত ‘ওয়াকিং স্ট্রিট’, সবকিছুই প্রাণবন্ত থাকে।
অন্যদিকে, জুলাই ও আগস্ট মাসে থাইল্যান্ডে বর্ষা নামে। এই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ যেমন ফুকেট (Phuket), ক্র্যাবি (Krabi), কোহ ল্যানটা (Koh Lanta), কোহ ফি ফি (Koh Phi Phi) ইত্যাদি এলাকায় প্রবল বৃষ্টি বা ঝড়ের সম্ভাবনা থাকে। ফলে সমুদ্রযাত্রা বা আইল্যান্ড হপিং প্ল্যান বেশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফুকেট থেকে বিখ্যাত ফিফি আইল্যান্ড বা জেমস বন্ড আইল্যান্ডে যাওয়ার পরিকল্পনাও আবহাওয়ার কারণে ব্যাহত হতে পারে। তবে যাঁরা বর্ষার রোম্যান্সে বিশ্বাসী, তাঁদের কাছে এই সময়টাও আলাদা আকর্ষণের, বৃষ্টির ফোঁটায় সেজে ওঠে সবুজ পাহাড়, আর সাগরের রঙ নেয় রহস্যময় গাঢ় নীল ছায়া।
তবে বাস্তবিক দিক থেকে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়টি অফ-সিজন। পর্যটকের সংখ্যা কম থাকে, কিন্তু একথাও ঠিক, এই সময়েই বিমান ভাড়া ও হোটেল ভাড়ায় পাওয়া যায় বিশাল ছাড়। ফলে যাঁরা বাজেট ভ্রমণে আগ্রহী, তাঁদের কাছে এই সময়টা হয়ে ওঠে ‘ভ্যালু ফর মানি’। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে তবেই ভ্রমণ পরিকল্পনা করা জরুরি।
থাইল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে রয়েছে কোহ স্যামুই (Koh Samui), কোহ ফ্যাগন (Koh Phangan), কোহ তাও (Koh Tao)-এর মতো দ্বীপ। এখানে বর্ষার প্রভাব তুলনামূলক কম। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টাকে ধরা হয় এই দ্বীপগুলিতে ঘোরার আদর্শ সময় হিসেবে। তাপমাত্রা থাকে ২৩-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে, যা বেশ সহনীয়। এই সময়ে সাগরের জল স্বচ্ছ থাকে, রোদ নরম, আর আকাশ থাকে ছবির মতো নীল।ফুকেট বা আন্দামান সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলির জন্য আবার ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি সেরা সময়। এই সময় ফুকেট, কোহ ল্যানটা (Koh Lanta) ও কোহ ফি ফি দ্বীপের তাপমাত্রা থাকে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রির মধ্যে,
না খুব গরম, না খুব ঠাণ্ডা সূর্যাস্তের সময়ে পাটং বিচের (Patong Beach) আকাশের রঙ যেন গলে পড়া সোনার মতো লাগে। অবশ্য মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়টা যেহেতু বৃষ্টিপ্রবণ, তাই এই সময় যাঁরা যাবেন, তাঁদের একটু বেশি পরিকল্পনা করে ভ্রমণ সাজাতে হবে। এই সময় ব্যাংকক বা চিয়াং মাইয়ের মতো শহর ভ্রমণ করা নিরাপদ, কারণ এখানে সড়কপথে চলাচলে তেমন বাধা আসে না। বৃষ্টির আবহে শহরগুলির মন্দির, জাদুঘর, কফি শপে বসে থাইল্যান্ডের নিরিবিলি মুখটি দেখা যায়।
চিয়াং মাই (Chiang Mai) ও চিয়াং রাই (Chiang Rai)-এর মতো উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলিতে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া থাকে সবচেয়ে আরামদায়ক। পাহাড়ি হাওয়া, ঠাণ্ডা সকাল, রঙিন ফুলের বাগান -এই সময়টা যেন একেবারে পোস্টকার্ডের দৃশ্য। বিশেষত চিয়াং মাইয়ের ইয়ি পেং (Yi Peng) ফেস্টিভ্যাল, অর্থাৎ আকাশে ভাসমান হাজার প্রদীপের উৎসব, নভেম্বর মাসে পর্যটকদের কাছে অনন্য এক অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ক্র্যাবি ও ফুকেট অঞ্চলকে যদি কেউ দেখতে চান, তাহলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়টিই বেছে নেওয়া উচিত। এই সময় সাগর শান্ত থাকে, নৌভ্রমণ নিরাপদ, আর ডাইভিং বা স্নরকেলিংয়ের জন্যও আদর্শ।
এখানে বিশেষভাবে বলা যায়, থাইল্যান্ড এমন এক দেশ, যেখানে প্রতিটি ঋতুরই আলাদা রূপ আছে। কেউ গরমে চান সমুদ্রের নীল শান্তি, কেউ শীতে চান পাহাড়ি শহরের কুয়াশা। তাই নিজের পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী সময় নির্বাচন করলেই থাইল্যান্ডের প্রতিটি সফর হয়ে উঠতে পারে জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞ ভ্রামণিকরা বলেন, “থাইল্যান্ড এমন এক গন্তব্য, যেখানে সময়কে ছুটে যেতে দেখা যায় না। এখানে সকাল শুরু হয় মন্দিরের ঘণ্টায়, আর রাত শেষ হয় সৈকতের ঢেউয়ে।” তাই আপনি যদি পরিকল্পনা করেন এক সপ্তাহের বিদেশ সফর, থাইল্যান্ডই হতে পারে আপনার পরবর্তী পকেট-ফ্রেন্ডলি প্যারাডাইস।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Travelog : Mathura Vrindavan boat ride | মথুরা বৃন্দাবনের যমুনা ঘাটে নৌকা ভ্রমণ যেন স্বর্গীয় শান্তির স্পর্শ



