সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হাওড়া: রাজ্যের নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংক্রান্ত নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বৃহস্পতিবার হাওড়ায় এক প্রশাসনিক বৈঠক শেষে জানালেন, বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লে তাঁদের আর আদালতে পেশ করার প্রয়োজন নেই, সরাসরি সীমান্তে পাঠিয়ে দিতে হবে। এই নির্দেশ ইতিমধ্যেই পুলিশ এবং রেল সুরক্ষা বাহিনী বা আরপিএফ-কে (Railway Protection Force) জানানো হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। বুধবার নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রথম এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। পরের দিন হাওড়ার বৈঠকে সেই অবস্থান পুনরায় ব্যাখ্যা করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা সিএএ-র আওতায় পড়েন না, এমন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লে তাঁদের আদালতে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। তাঁদের খাবার দিয়ে সরাসরি বনগাঁ পেট্রাপোল সীমান্ত বা বসিরহাটের বিএসএফ চৌকিতে পৌঁছে দিতে হবে।’
দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেলস্টেশন হাওড়া স্টেশনকে বিশেষভাবে নজরে রাখতে বলেও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করেন এই স্টেশন দিয়ে। সেই কারণে এখানে নজরদারি বাড়ানোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসন। শুভেন্দু বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার এবং আরপিএফ-কে ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে, হাওড়া স্টেশন এলাকায় কড়া নজর রাখতে হবে যাতে কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা এড়াতে না পারে।’ শুধু ধরপাকড় নয়, তার নির্দিষ্ট হিসাব রাখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে কত জন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ছেন, তার রিপোর্ট ডিজিপি (Director General of Police) -এর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠাতে হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
নতুন এই পদক্ষেপের পেছনে কেন্দ্রীয় আইন এবং নির্দেশিকার প্রভাবও রয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (Citizenship Amendment Act) -এর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (Ministry of Home Affairs) নির্দেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ নির্দিষ্ট শর্তে শরণার্থীর মর্যাদা পেতে পারেন। তবে যাঁরা এই তালিকার বাইরে, তাঁদের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার গত বছরই একটি নির্দেশিকা পাঠিয়েছিল, কিন্তু আগের সরকার তা কার্যকর করেনি। এখন সেই নির্দেশিকা রাজ্যে চালু করা হয়েছে।’ তাঁর মতে, এই পদক্ষেপের ফলে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় অনুপ্রবেশ রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশ জানাচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পুলিশ, আরপিএফ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ (Border Security Force) -এর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত তাঁদের সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল তৈরি করা হচ্ছে। এক আধিকারিকের কথায়, ‘ধরা পড়ার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই মূল লক্ষ্য।’ রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। শাসকদলের দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই সরকার কাজ শুরু করেছে। বিজেপি (Bharatiya Janata Party) দীর্ঘদিন ধরেই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া অবস্থান নেওয়ার কথা বলে এসেছে। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলনই এই সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি তাদের। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একাংশ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের মতে, আদালতের প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি সীমান্তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আইনি দিক থেকে কতটা টেকসই, তা নিয়ে ভবিষ্যতে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। যদিও প্রশাসনের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা এবং বিদ্যমান আইন মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
হাওড়া স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। রেলপথ, সড়কপথ এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে যৌথ অভিযান চালানোর কথাও ভাবা হচ্ছে। রাজ্যের নতুন প্রশাসনিক অবস্থান যে কঠোর, তা এই সিদ্ধান্ত থেকেই পরিষ্কার। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এখন দেখার, এই নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর কী প্রভাব পড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari North Bengal, Siliguri BJP meeting | উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের অগ্রাধিকার, এক বছরের মধ্যে প্রতিশ্রুতি পূরণের ঘোষণা শুভেন্দুর




