সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ (West Bengal Assembly Election 2026)-এর ফল প্রকাশের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়সড় পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিনের শাসন শেষে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর শক্ত ঘাঁটিতে ধাক্কা দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)-এর উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে, বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাঙালি বিরোধী’ তকমা লাগানোর চেষ্টা সত্ত্বেও কীভাবে তারা ভোটের ময়দানে এগিয়ে গেল, সেই প্রশ্ন ঘিরে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
রাজ্যের উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু জনসংখ্যার এলাকায় বিজেপির প্রবেশ দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত ছিল। একই সঙ্গে সংখ্যাগুরু ভোটব্যাঙ্কেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমাতে শাসকদল ধারাবাহিক প্রচার চালিয়েছিল। বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনকেও এই প্রচারে যুক্ত করা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। এমনকি সিপিএম (CPM) ও কংগ্রেস (Congress)-এর একাংশও এই প্রচারে সুর মিলিয়েছিল বলে শোনা যায়। তবু ভোটের ফলাফল অন্য ছবি দেখাল।
প্রথম কারণ হিসেবে উঠে আসছে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষ। প্রায় দেড় দশক ধরে শাসন চালানোর ফলে স্থানীয় স্তরে নানা অভিযোগ জমা হতে থাকে। ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতি, জনপ্রতিনিধিদের সম্পত্তি বৃদ্ধির প্রশ্ন, সরকারি পরিষেবা বণ্টনে অসামঞ্জস্য— এই সব বিষয় নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। ‘নিচুতলার নেতৃত্বের আচরণে অনেক এলাকায় সমস্যা বাড়ছিল’, এমন মন্তব্য শোনা গিয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে। দ্বিতীয় বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতির অভিযোগ। চিটফান্ড (Chit Fund) থেকে শুরু করে নারদ (Narada Scam), শিক্ষক নিয়োগ, পুর নিয়োগ, রেশন, কয়লা ও গরু পাচার একাধিক ঘটনায় শাসকদলকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে, ‘কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের ছবি জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল’, এমন মত শোনা যাচ্ছে। একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির গ্রেফতারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচনায় এসেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR)। এই প্রক্রিয়ায় বহু ভুয়ো বা অপ্রামাণ্য নাম বাদ পড়ে। ‘ভোটার তালিকা থেকে অপ্রাসঙ্গিক নাম মুছে যাওয়ায় পুরনো ভোট ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে’, এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। নথিগত সমস্যার কারণে সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশের নাম বাদ পড়ার ঘটনাও আলোচনায় ছিল, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
চতুর্থ কারণ হিসেবে তোষণ নিয়ে বিতর্ক বড় ভূমিকা নিয়েছে। বিজেপি ধারাবাহিক ভাবে শাসকদলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে। কিছু হিংসার ঘটনা এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করে তারা প্রচার চালায়। ‘এই প্রচার জনতার একাংশের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল’, এমন মত উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। পঞ্চম কারণ হিসেবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন (Election Commission)-এর পদক্ষেপে রাজ্যের প্রশাসনে বড় রদবদল ঘটে। মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের বদলি করা হয়। ‘প্রশাসনের উপর শাসকদলের প্রভাব কমে গিয়েছিল’, এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে।
ষষ্ঠ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভোটের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা। ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফলে ভোটের পরিবেশে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ‘ভোটাররা ভয় ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছেন’, এই ধরনের প্রতিক্রিয়া বহু জায়গা থেকে এসেছে। এর ফলে বিরোধী ভোট একত্রিত হওয়ার সুযোগ পায় বলে মনে করা হচ্ছে। সপ্তম কারণ, নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ। বহু বছর পর তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হওয়ায় ভোটদানের হার রেকর্ড ছাড়ায়। বুথ দখল বা জোর করে ভোট দেওয়ার অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। এর ফলে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে বলে অনেকের ধারণা।
অষ্টম এবং শেষ কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে আই-প্যাক (I-PAC)-এর ভূমিকা। ভোটের আগে এই পরামর্শদাতা সংস্থার কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া শাসকদলের কৌশলে প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। ‘সংগঠনের ভেতরে কৌশলগত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল’, এমন কথাও শোনা গেছে। সংস্থার এক কর্তার গ্রেফতারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই সব কারণ মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বিজেপির এই সাফল্য কেবল ভোটের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সামনে রাজ্যের রাজনীতি কোন দিকে এগোবে, তা নিয়ে এখন নজর সবার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ : ২৯৪ আসনে কে কোথায় জয়ী ও পরাজিত হলেন? সম্পূর্ণ তালিকা


